বই পড়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?

importance of book reading

একটা সময় ছিল, যখন মায়ের বকুনির ভয়ে আমরা লুকিয়ে গল্পের বই পড়তাম। তখন পাঠ্যবই কিংবা বালিশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে গল্পের বই পড়ার মধ্যে ছিল যেন সীমাহীন আনন্দ। তবে এই আনন্দে প্রায়সময়’ই ভাটা পড়তো। মা এসে ঠিকই বুঝে ফেলতেন, পাঠ্যবইয়ের আড়ালে আমরা গল্পের বই পড়ছি।

কেউ কেউ একটু বেশি’ই ঝুঁকি নিতো। বাবার পকেট কেটে তিন গোয়েন্দা বা মাসূদ রানা সিরিজের বই কেনারও নজির আছে। আমাদের বন্ধুদের মধ্যেই এরকম আরও কত গল্প লুকিয়ে আছে! কী সাংঘাতিক তাই না?

তবে ইদানীং খুব মন খারাপ হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিন দিন নাকি পাঠক কমে যাচ্ছে। বাজারে বই আছে অথচ মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে ব্যস্ত। বই পড়ার ধৈর্য্য এবং অভ্যাস যেন হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন।

বই পড়া এবং নিউ মিডিয়ার সৃষ্টি মানুষকে বই-বিমুখ করে তুলছে না আরও বই পড়ুয়া সৃষ্টি করছে

বই পড়ার গুরুত্ব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উল্লেখযোগ্য মন্তব্য করেছেন জর্ডান পিটারসন।

এই বিষয়ে তারও একই মত। এখন অধিকাংশ মানুষই বই বিমুখ হয়ে পড়েছে। আনন্দের জন্য খুব কম মানুষই বইকে সঙ্গী করছে। এর মধ্যেও যারা আনন্দের জন্য বই পড়ছেন, তাদের মাঝে খুব অল্প সংখ্যকই বই ক্রয় করে পড়ছেন। এই কিনে পড়ার মতো বই-পড়ুয়ার মধ্যে আবার খুব অল্প সংখ্যক পাঠকই কঠিন কঠিন বই কেনেন। এ রীতি বহু বছর ধরেই চলে আসছে। এখানে বিশেষ কোনো পরিবর্তন তিনি লক্ষ্য করেননি। কিন্তু যে লক্ষণীয় পরিবর্তন বইয়ের জগতে এসেছে তা হলো, বই পড়ায় অনেকখানি জায়গা করে নিয়েছে ইউটিউব ভিডিও এবং পডকাস্ট। বই পড়ুয়া সংখ্যায় কমছে না, কিন্তু ভাগ হয়ে যাচ্ছে দুটি মাধ্যমে। দুটি মাধ্যমেরই ভাল-মন্দ রয়েছে। জর্ডান পিটারসনের কাছে বই হচ্ছে –

একটি পোর্ট্রেইট অথবা একটি ছবির মতো। পোর্ট্রেইটে যেমন একজন শিল্পী একটির পর একটি তুলির আঁচড় দিয়ে যেতে পারেন, সেখানে একরকম গভীরতা আসে যা ছবিকে আরও সুন্দর করে তোলে। বইয়ের বিষয়টাও ঠিক তা-ই। বই তার স্বস্থানে থেকেই একজন পাঠককে বারবার ভাবায়। বই পড়ার সময়ও একজন পাঠক একই জায়গা বারবার পড়তে পারে, বারবার ভাবতে পারে নতুন কিছু। তিনি বলেন, “বইয়ের যে গভীরতা আছে তা অন্য কোনো মাধ্যমে নেই বলেই আমি মনে করি।”

এখন জানা যাক এই স্বনামধন্য ব্যক্তির পরিচয়। জর্ডান বার্নট পিটারসন একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, স্কলার এবং কানাডিয়ান লেখক। ১৯৬২ সালের ১২ জুন তিনি কানাডার আলবার্টা প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানে বি.এ পাস করে ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। বর্তমানে তিনি টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত, পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন লেখালেখিও।

Jordan Peterson
জর্ডান পিটারসন

জর্ডান পিটারসন ১৯৯৯ সালে তার প্রথম বইটি রচনা করেন। ২০১৬ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে তিনি সকলের নজরে আসেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেই তিনি নতুন প্রযুক্তির উপকারিতা সম্পর্কে বলেছেন। তার কাছে বইয়ের পাশাপাশি  পডকাস্ট কিংবা অন্য কোনো প্রযুক্তি, যেমন: অডিও বুক-এর প্রয়োজনীয়তা আছে। কারণ যেকোনো মানুষ যেকোনোটাতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারে।

পডকাস্টও বইয়ের সমতুল্যই। তবে কেউ যদি পড়তে পারেন অথবা বই পড়ার আগ্রহই থাকে, তাহলে তিনি বইয়ের লাইন শোনার চেয়ে বই আরও দ্রুতগতিতে পড়তে পারবেন।

রকমারি পডকাস্ট : উদ্যোক্তা হতে চাইলে কোন বই পড়বে

পিটারসন নিজেও একজন বইপড়ুয়া ছিলেন। খুব ছোট বয়স থেকেই তিনি বিখ্যাত সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েল, এলডাস হাক্সলি, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, আয়ান র‍্যান্ডদের মতো লেখকদের বই পড়ার সুযোগ পেয়েছেন লাইব্রেরিতে যাতায়াতের সুবাদে।

পডাকাস্টের বিভিন্ন ইতিবাচক দিকও আছে। যেমন: একজন পাঠক গাড়ি চালানো ও থালা-বাসন ধোয়ার সময় বই পড়তে পারেন না, কিংবা শরীরচর্চার সময়ে বই পড়ায় মনোযোগ দেওয়া অসম্ভব। এরকম সময় দেখা যায় অনেকে গান শোনেন। কিন্তু পডকাস্ট থাকায় এখন মানুষ গান ছাড়া আরও নানা কিছু শোনার অভিজ্ঞতা নিতে পারছে। ঠিক এসব ক্ষেত্রে পডকাস্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখন মানুষ প্রচুর পরিমাণে পডকাস্ট ব্যবহার করছে। কঠিন কঠিন রাজনৈতিক আলোচনায় মনোনিবেশ করছে যা হয়তো টেলিভিশন কিংবা রেডিও দ্বারা সম্ভব হত না। প্রায় দুই-আড়াই ঘন্টা পডকাস্টে খুব সহজেই মনোযোগ ধরে রেখে যেকোনো কিছু শোনা যায়।

এছাড়া, জর্ডান পিটারসন নিজেও একটি ইউটিউব চ্যানেল চালু করেছেন, যেখানে তিনি ছোট ছোট গুরুত্বপূর্ণ নানা কন্টেন্টের পাশাপাশি নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক লেকচারের ভিডিও আপলোড করে থেকেন। দর্শনশাস্ত্র, উপকথা, ধর্মশাস্ত্রে তার আগ্রহ ছিল বরাবরই। তিনি এসকল বিষয় নিয়ে ঢের পড়াশোনা করে তার দর্শক-পাঠক-শ্রোতাদের জন্য লেকচার তৈরি করেন। তার তৈরি সেসব কন্টেন্টে আসে লাখ লাখ ভিউও।

নিউ মিডিয়ার এই উদ্ভাবনগুলো তিনি বেশ উপভোগ করেন। কেননা, তিনি নতুন জিনিস জানতে ও শিখতে ভালোবাসেন। শেখার কোনো বয়স নেই। তাই প্রচুর বই পড়ার পরামর্শ দেন তিনি। শুধু বই নয়, ভাল ভাল লেখকদের ভাল ভাল বই। তিনিও কিশোর বয়সে বিখ্যাত লেখকদের বই পড়তে পেরেছিলেন বলেই তার মানসিক গঠন, জীবনধারা, চিন্তাভাবনা আর দশজনের চেয়ে আলাদা। তার মতে-

১। ভাল এবং সুন্দর জীবনযাপন করার জন্য ভাল বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই।

২। বই একজন পাঠককে ভাবতে শেখায়। কিছু বলতে শেখায়।

৩। বই পড়া যেমন ভাবতে শেখায়, বলতে শেখায়, পাশাপাশি লেখতে শেখায় নানা নতুন জিনিস। মানুষ তার চিন্তা-ভাবনাগুলো প্রকাশ করতে পারে লেখনীর দ্বারা।

৪। একরকম আত্মপ্রকাশ ঘটে বই পড়ার মাধ্যমে। নিজেকে প্রস্ফুটিত করার একটি উত্তম মাধ্যম হচ্ছে বই।

বই পড়ার কোনো শেষ নেই। একটি বই হাতে নিয়ে পড়ার যে অনুভূতি, ঠিক সেই অনুভূতি হয়তো আপনাকে নিউ মিডিয়া দিতে পারবে না। কিন্তু তারপরও আপনার সময় বাঁচাবে পডকাস্ট, অডিও বুক-এর মতো মাধ্যমগুলো। তাই চাইলেই হার্ড কপি কী সফট কপি- যেকোনো মাধ্যমে একটি ভাল বইকে সঙ্গী করে নেওয়া এখন অনেক সহজ। ঘরে-বাইরে তাই শুধুই পড়ুন বই, বই আর বই!

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article


Notice: Undefined offset: 4 in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-includes/class-wp-query.php on line 3300

Notice: Trying to get property 'ID' of non-object in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 30

Notice: Trying to get property 'ID' of non-object in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 31

Notice: Trying to access array offset on value of type bool in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 33
Rokomari-blog-Logo.png
Loading