অর্থনীতিতে আদৌ নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় কিনা ?

নোবেল

আগামী ০৭ থেকে ১৪ অক্টোবর নোবেল ফাউন্ডেশন নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী এনিয়ে সুধীসমাজে নানা গুঞ্জন দেখা যাচ্ছে। অন্যান্যবারের মতোই এবারেও পাঁচটি ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার দেয়া হবে। একইভাবে, অর্থনীতি ক্ষেত্রে ‘দ্য স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল’ পুরস্কারটি প্রদান করা হবে বলে আমরা আশা করছি। এনিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমসহ পাঠকদের মধ্যেও ব্যাপক শোরগোল শোনা যাচ্ছে। কারা হবেন এবারের নোবেল বিজয়ী। বর্তমান বিশ্বে সাহিত্য কিংবা চিকিৎসাশাস্ত্র, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা রসায়নশাস্ত্রে যুগপরিবর্তনকারী নায়ক কারা।

১৯৬৯ সালে প্রথম দ্য স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক প্রাইজ প্রদান করা হয়। বিদ্বৎসমাজ থেকে শুরু করে গণমাধ্যম প্রায় সবাই উক্ত পুরস্কারকে ‘নোবেল পুরস্কার’ বলে প্রচার করে আসছেন। দেশি-বিদেশি এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন পত্রিকাগুলোও উক্ত পুরস্কারকে নোবেল বলে উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে বিষয়টি এমনভাবে দাঁড়িয়ে গেছে যে, এই অবাস্তব তথ্যটি বাস্তব বলে সুপ্রতিষ্ঠিত। গত পাঁচ দশক ধরে দেশী-বিদেশী সকল বুদ্ধিজীবী, গবেষক, গণমাধ্যম এই অবাস্তব তথ্যটি এভাবে প্রচার করে আসছেন। এরই মধ্যদিয়ে গণমাধ্যম ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্বৎসমাজের কোন দিকটি ফুটে উঠে?

১. ১৮৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর আলফ্রেড নোবেল প্যারিসে অবস্থিত সুইডিশ-নরওয়েগিয়ান ক্লাবে জীবনে শেষবারের মতো তৃতীয়বার উইলে স্বাক্ষর করেছিলেন। উইলে তিনি একটি পুরস্কার প্রদানের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা করার কথা উল্লেখ করে যান, যা পরবর্তীতে নোবেল পুরস্কার বলে বিশ্বখ্যাতি লাভ করেছিলো। কিন্তু তার মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা উক্ত উইলের বিরোধীতা করেন। উইলের দায়িত্বলাভকারী ব্যক্তিগণ পরিবারের এধরণের সিদ্ধান্তগ্রহণে অস্বীকার জ্ঞাপন করেন। এনিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ও  আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক তর্ক-বিতর্ক দেখা দেয়। অবশেষে ১৯০১ সালে প্রথম নোবেল প্রাইজ প্রদান করা হয়।

নোবেল
অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ১৯৯৮ সালে ‘দ্য স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল’ পুরস্কারে ভূষিত হন

১৯০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ৯৩৫ জন গুণীব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানকে ৫৯০ বার নোবেল পুরস্কার ও ‘দ্য স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল’ প্রদান করা হয়। বলা বাহুল্য যে, ১৯১৩ সালে ইংরেজি সাহিত্য অসাধারণভাবে তুলে ধরার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নোবেল প্রাইজ প্রদান করা হয় (“because of his profoundly sensitive, fresh and beautiful verse, by which, with consummate skill, he has made his poetic thought, expressed in his own English words, a part of the literature of the West.”)। নীচু থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সৃষ্টির প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ (“for their efforts to create economic and social development from below.”) ২০০৬ সালে মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংককে যৌথভাবে নোবেল প্রাইজ দিয়ে সম্মানিত করা হয়। ১৯৯৮ সালে “কল্যাণমূলক অর্থনীতিতে অবদানের জন্য” (“for his contributions to welfare economics”) অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক প্রাইজ প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, অর্থনীতিতে প্রদত্ত পুরস্কারটির পুরো নাম হলো ‘দ্য স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল’। ১৯৬৯ সালে প্রথম পুরস্কারটি প্রদান করা হয়। বিষয়টি বিস্তারিতভাবে প্রামাণ্যসহকারে উপস্থাপন করা হলো। (সূত্র: https://www.nobelprize.org/)

২. বর্তমানে নোবেল ফাউন্ডেশন মূলত ৬টি ক্ষেত্রে দুই ধরণের পুরস্কার প্রদান করেন। ১. নোবেল পুরস্কার। ২. অর্থনীতি ক্ষেত্রে ‘দ্য স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল’। নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নশাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা, সাহিত্য, ও শান্তি ক্ষেত্রে।  ১৯০১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ফাউন্ডেশন ৯৩৫ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ৬টি ক্যাটাগরিতে ৫৯০ বার পুরস্কৃত করেছেন। ( সূত্র: https://www.nobelprize.org/prizes/)

১৯০১ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ফাউন্ডেশন ৫টি ক্ষেত্রে পুরস্কার প্রদান করেছে, যা নোবেল প্রাইজ বলে বহুল পরিচিত। ১৯৬৯ সালে ফাউন্ডেশন সুইডেনের কেন্দ্রিয় ব্যাংকের ৩০০ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ব্যাংকের তহবিল দিয়ে আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে ব্যাংকের নামানুসারে ‘দ্য স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল’ নামে অর্থনীতিতে পুরস্কার চালু করে। এটি কোনো নোবেল পুরস্কার নয়। ফাউন্ডেশন স্পষ্টভাবে তাদের ওয়েবসাইটে উক্ত পুরস্কার সম্পর্কে লিখেছেন যে, “অর্থনীতিতে প্রদত্ত পুরস্কারটি নোবেল পুরস্কার নয়।” এবিষয়ে নোবেল ফাউন্ডেশনের ভাষ্য: “The Prize in Economic Sciences is not a Nobel Prize. In 1968, Sveriges Riksbank (Sweden’s central bank) instituted “The Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel”… (অর্থাৎ “ইকোনমিক সায়েন্সে প্রদত্ত পুরস্কার নোবেল প্রাইজ নয়। ১৯৬৮ সালে স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক (সুইডেনের কেন্দ্রিয় ব্যাংক) “দ্য স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল” পুরস্কারটি চালু করেছেন…”)। নোবেল ফাউন্ডেশন তাদের সাইটে পুরস্কারটি সম্পর্কে লিখেছে,

The prize in economic sciences is not a Nobel Prize. In 1968, Sveriges Riksbank (Sweden’s central bank) instituted “The Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel”, and it has since been awarded by the Royal Swedish Academy of Sciences according to the same principles as for the Nobel Prizes that have been awarded since 1901. The first prize in economic sciencess was awarded to Ragnar Frisch and Jan Tinbergen in 1969. (সূত্র – https://www.nobelprize.org/nomination/economic-sciences/ )

৩. অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুরস্কারটি সম্পর্কে ফাউন্ডেশনের বক্তব্য-

In 1968, Sveriges Riksbank (Sweden’s central bank) established the Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel, founder of the Nobel Prize. The prize is based on a donation received by the Nobel Foundation in 1968 from Sveriges Riksbank on the occasion of the bank’s 300th anniversary. The first prize in economic sciences was awarded to Ragnar Frisch and Jan Tinbergen in 1969.

The prize in economic sciences is awarded by the Royal Swedish Academy of Sciences, Stockholm, Sweden, according to the same principles as for the Nobel Prizes that have been awarded since 1901. (সূত্র: https://www.nobelprize.org/prizes/economic-sciences/)

অর্থনীতিতে ‘দ্য স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল’ পুরস্কারটি প্রদান করেন দ্য রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস । তাদের ওয়েবসাইটে উল্লেখ রয়েছে,

“Each year, the Royal Swedish Academy of Sciences awards the Nobel Prizes in Physics and Chemistry and the Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel, but also many other prizes in recognition of distinguished achievements. Mostly to researchers, but sometimes to teachers, writers and translators.”

এই বক্তব্য একটু সাবধানে খেয়াল করতে হবে। এখানে বলা হয়েছে যে, “প্রতি বছর রয়েল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস থেকে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে নোবেল প্রাইজ এবং আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে অর্থনীতিতে স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক প্রাইজসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অসাধারণ অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ একাধিক পুরস্কার প্রদান করা হয়।”

উল্লেখ্য, প্রথম বাক্যে and ব্যবহার করা হয়েছে দু’বার। এরই মধ্যদিয়ে একাডেমি দুই ধরণের পুরস্কার প্রদান করেন বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, নোবেল প্রাইজ দেয়া হয় পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন শাস্ত্রে। এবং অর্থনীতিতে স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক প্রাইজ দেয়া হয়। দুটো পুরস্কারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

৪. ফাউন্ডেশন তাদের সাইটে উল্লেখ করেছে যে, “নোবেল পদকে পুরস্কৃত হয়েছেন এমন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ‘নোবেল লরিয়েট’ বলা হয় (“A person or organisation awarded the Nobel Prize is called Nobel Laureate.”)। আমাদের প্রশ্ন  হলো স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক পদক লাভ করেছেন এমন কাউকে নোবেল লরিয়েট বলা যাবে কিনা ? নোবেল কমিটির বক্তব্য-

“A person or organisation awarded the Nobel Prize is called Nobel Prize laureate. The word “laureate” refers to being signified by the laurel wreath. In ancient Greece, laurel wreaths were awarded to victors as a sign of honour.”

অর্থনীতিতে প্রদত্ত পুরস্কারটি প্রদানের ক্ষেত্রে ফাউন্ডেশন বলছে,

“The Prize [Sveriges Riksbank Prize] in Economic Sciences is awarded by The Royal Swedish Academy of Sciences, Stockholm, Sweden, according to the same principles as for the Nobel Prizes that have been awarded since 1901.”

এরই প্রেক্ষিতে বলাই যায়, অর্থনীতিতে প্রদত্ত পুরস্কারটি নোবেল পুরস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ। এর মানে এই নয় যে, ফাউন্ডেশন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার দেন।

৫. ১৯৬৯ সালে প্রথম দ্য স্ভ্যারিগস রিক্সব্যাংক প্রাইজ প্রদান করা হয়। বিদ্বৎসমাজ থেকে শুরু করে গণমাধ্যম প্রায় সবাই উক্ত পুরস্কারকে ‘নোবেল পুরস্কার’ বলে প্রচার করে আসছেন। দেশি-বিদেশি এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন পত্রিকাগুলোও উক্ত পুরস্কারকে নোবেল বলে উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে বিষয়টি এমনভাবে দাঁড়িয়ে গেছে যে, এই অবাস্তব তথ্যটি বাস্তব বলে সুপ্রতিষ্ঠিত। গত পাঁচ দশক ধরে দেশী-বিদেশী সকল বুদ্ধিজীবী, গবেষক, গণমাধ্যম এই অবাস্তব তথ্যটি এভাবে প্রচার করে আসছেন। এরই মধ্যদিয়ে গণমাধ্যম ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্বৎসমাজের কোন দিকটি ফুটে উঠে?

আরও পড়ুন- সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদানে যেসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়

নোবেল বিজয়ীদের বইগুলো দেখুন 

আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্ত বাংলায় অনূদিত বইসমূহ

rokomari

rokomari

Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading