জ্যাঁ পিঁয়াজের কালজয়ী মতবাদ: জন্ম থেকে দুই বছর বয়সের শিশু

জা পিয়াজে ফিচার

শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশের প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণায় সুইজারল্যান্ডের মনোবিজ্ঞানী জ্যাঁ পিঁয়াজে অমর হয়ে রয়েছেন। জন্ম থেকে শিশু দের বুদ্ধির বিকাশ কিভাবে হয়, কিভাবে সে চারপাশের প্রকৃতি থেকে জ্ঞান লাভ করে, সেই জ্ঞানের সাথে বড়দের জ্ঞানের পার্থক্য কী, আনুষ্ঠানিক লেখাপড়ায় এই জ্ঞানীয় উপাদানগুলো কিভাবে প্রভাব ফেলে- তা নিয়েই গবেষণা করেছেন। তিনি ১৯৩০ সালে International Bureau of education এর ডিরেক্টর হিশেবে নিযুক্ত হন। তাঁর কালজয়ী মতবাদ Piaget’s theory of cognitive development এখনও বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। জ্যাঁ পিঁয়াজের বিভিন্ন মতবাদ ও গবেষণাগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে এখানে।

জ্যাঁ পিঁয়াজের জ্ঞান বিকাশ সম্পর্কিত মতবাদ জানার জন্য আমাদের মোটামুটি সব রসদ জোগাড় হয়ে গেছে। তবুও আরেকবার মনে করিয়ে দিচ্ছি পিঁয়াজের মতে শিশুর জ্ঞান বিকাশের চারটি স্তর হলো

১. ইন্দ্ৰীয়-পেশীয় সমন্বয় কাল (Sensorimotor Period) : জন্ম থেকে ২ বৎসর
২. প্রাক প্রায়োগিক কাল (Pre-operational Period) : ২ থেকে ৭ বৎসর
৩. বাস্তব প্রায়োগিক কাল (Concrete operational Period) : ৭ থেকে ১১ বৎসর ৪. রীতিবদ্ধ প্রায়োগিক কাল (Formal operational Period): ১১ থেকে ১৫/১৬ বৎসর

মানুষের সব ধরনের শেখার পেছনেই রয়েছে ইন্দ্রিয় পেশীর সমন্বয়। জন্মের পর থেকেই শিশু সারাক্ষণই নতুন কিছু শিখতে থাকে, সারাক্ষণই মাথা খাটাতে থাকে। চারপাশের সবকিছু নিয়ে তার ধারণাও মাঝেমাঝেই বদলাতে থাকে। জন্ম থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময়কে তাই শিশুর জ্ঞান বিকাশের সূচনাকাল বলা যায়। পিঁয়াজে এই সময়ের নাম দিয়েছেন ইন্দ্রিয়-পেশীয় সমন্বয়কাল বা Sensorimotor Period।

ছবিঃ অন্তর্জাল

জন্ম থেকে দুই বছর পর্যন্ত বয়সে শিশু তার আশেপাশে যা যা দেখে-শুনে-অনুভব করে-ঘ্রাণ-স্বাদ গ্রহণ করে, অর্থাৎ সে তার পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা যেসব অভিজ্ঞতা লাভ করে- সবকিছুকেই তার নিত্যদিনের এক্টিভিটিতে কাজে লাগায়। এই সময়ে শিশুর সব কাজই মূলত দুইটি বিষয়ের যোগফল-

১. তার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আন্ডারস্ট্যান্ডিং

২. তার শারীরিক ক্ষমতা অর্থাৎ পেশীর ম্যাচুরিটি।

এই ক্ষমতাগুলো সে জন্ম সূত্রে লাভ করে না বটে, তবে বারবার চেষ্টা করা, ট্রায়াল এন্ড এরর এবং কোন বিষয়টাতে তাকে উৎসাহ ও পুরষ্কৃত করা হচ্ছে — তা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করে। জন্মের সময় শিশু কিছু সহজাত রিফ্লেক্স প্রবণতা নিয়ে আসে- যেমন, চুষতে পারা, হাত-পা নড়াচড়া করতে পার, চিৎকার বা কান্না করতে পারা ইত্যাদি। এই ক্ষমতা বা রিফ্লেক্সগুলো বার বার প্র্যাকটিস করে শিশু নিজের মধ্যে নতুন নতুন জ্ঞান বা তথ্য (পিঁয়াজে যাকে ’স্কিমা’ বলেছেন) তৈরি করে।

পরবর্তীকালে এসব জ্ঞান বা স্কিমার সাহায্যে শিশু বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ঘটনায় নানাভাবে রিএ্যাক্ট করে। এভাবে রিএ্যাক্ট করতে করতেই তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ও পেশীর দক্ষতা তৈরি হয়।যেমন, নিজের আঙ্গুল চোষা, কোন কিছু ধরে মুখে দেওয়া ও কামড়ানো অথবা বিছানায় প্রস্রাব করার পর ভেজা স্থান থেকে নড়েচড়ে শুকনো জায়গায় চলে যাওয়া- এই কাজগুলোর মাধ্যমে শিশুরা প্রথম স্তরের কিছু বুদ্ধিগত দক্ষতা অর্জন করে।

জ্ঞান বিকাশের প্রথম পর্যায়ে শিশুর প্রতিটি আচরণের কোন না কোন একটা ডেস্টিনেশন থাকে, কোন না কোন লক্ষ্য থাকে। যেমন, কোন বস্তুকে ধরার উদ্দেশ্যে শিশু হাত বাড়াতে পারে বা দূরে কোন কিছু থাকলে তা পাওয়ার জন্য সেদিকে হেঁটে, দৌড়িয়ে বা হামাগুড়ি দিযে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে এ পর্যায়ে শিশুর ইমাজিনশন ক্ষমতা তুলনামূলক কম থাকে। পিঁয়াজের মতে, জীবনের প্রথম আঠারটি মাস শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসময়ের মধ্যেই শিশুর বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিত্ব ও কল্পনার জগত তৈরি হতে থাকে। যা তার পরবর্তী জীবনের বুদ্ধি বিকাশের পাওয়ার হাউজ হিসাবে কাজ করে।

জীবনের প্রথম আঠারটি মাস শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ

দুই বছরের মধ্যে শিশুর পেশীগত দক্ষতার সাথে সাথে ল্যাঙ্গুয়েজ ডেভেলপমেন্ট বা ভাষার বিকাশও ঘটতে থাকে। সূচনা পর্বে শিশুদের ব্যক্তিগত শব্দভাণ্ডারে অল্প কিছু শব্দ থাকে, কাজেই কোন অভিজ্ঞতাকে ব্যক্ত করার জন্য তারা কোন মৌখিক ভাষা ব্যবহার করতে পারে না। তাছাড়া এসময় শিশুর স্মৃতিশক্তি খুব নিম্ন পর্যায়ে থাকে বলে সে কোন ঘটনা মনে রেখে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। শিশু তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ইন্সট্যান্ট যা ঘটছে , তা-ই করে। দেখে মনে হয়, এই বয়সে মানুষের কোন অতীত থাকে না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক বছরের যে শিশু ক্ষুধায় চিৎকার করছে তাকে ‘অপেক্ষা করো, দুধ গরম করছি’ এ ধরনের কথা বলে আদতে কোন লাভ নেই। যেহেতু এক বছর বয়সে সে অল্প কিছু শব্দের মানে বোঝে- তাই এই বাক্য তার কাছে হিব্রু ভাষার মতই দুর্বোধ্য মনে হবে। একমাত্র দুধের ফিডার তার মুখে দিলেই সে শান্ত হবে, কারণ এই বয়সে কথা শুনে নয়, বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়েই সে ডিসিশান নেয়।

শিশু এবং তার অভিজ্ঞতার মাঝখানে এ পর্যায়ে কোন মাধ্যম নেই । তার কাছে এখন সব কিছুই নতুন। তার প্রতিটি অভিজ্ঞতাই প্রথম ও ইন্টারেস্টিং। আমরা যখন কোন নতুন জায়গায় ঘুরতে যাই বা নতুন কারো সাথে পরিচিত হই- তখন যে অবস্থা হয় শিশুর প্রতিটি অভিজ্ঞতা তার চেয়েও নতুন ও আকর্ষণীয়।

কেবল বাস্তব অভিজ্ঞতার উপর শিশু কতটা নির্ভর করে, তার একটি পরীক্ষা করা যেতে পারে। কোন আকর্ষণীয় বা উজ্জ্বল বস্তুকে শিশুর চোখের সামনে নিয়ে বারবার এদকি ওদিক নাড়াচাড়া করলে দেখা যাবে যে শিশুও ঐ বস্তুকে অনুসরণ করে তার চোখ বার বার এদিক ওদিক ঘোরাচ্ছে। সে যতক্ষণ পারা যায়, এমনভাবে বস্তুটির দিকে তাকাবে যেন তা চোখের আড়াল হলেই তার কাছ থেকে হারিয়ে যাবে। আর কোন কিছু চোখের আড়াল হলেই সঙ্গে সঙ্গে তা তাদের মন থেকেও হারিয়ে যায়। কোন বস্তু চোখের আড়াল হলেই যে তা হারিয়ে যায় না, এ বয়সের শিশুদের সে অভিজ্ঞতা নেই।

ভাষা আমাদের মাথায় এক ধরনের ইমেজ তৈরি করে। শিশুর মনে কোন বস্তুর স্থায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, তখন সে মনে মনে ঐ বস্তুটির ছবি এঁকে নিতে সক্ষম হয়। যেমন- হাতের মধ্যে একটি মার্বেল দেখিয়ে তা মুঠ করে রাখলে শিশু তা পাওয়ার জন্য ঐ হাতের মুঠো ধরে টানাটানি করতে থাকে। বস্তুর স্থায়িত্ব সম্পর্কে ধারণার কারণে শিশু এমনটা করে।
এ স্তরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অভিজ্ঞতা অর্জন। সুতরাং বুদ্ধিমত্তা বিকাশের জন্য এ বয়সের শিশুর সামনে যত বিচিত্র ধরনের খেলনা ও বিভিন্ন রং-এর জিনিসপত্র উপস্থাপন করা যায়, ততই ভাল। পিঁয়াজের মতে, জন্মের সময় শিশু দুটি মৌলিক দক্ষতা নিয়ে জন্মায়- ১. স্বতঃস্ফূর্ত অঙ্গ সঞ্চালন বা নিজের ইচ্ছেমতো হাত পা নাড়ানো (spontaneous movement) এবং স্বাভাবিক প্রতিবর্তী ক্রিয়া (reflex)। শিশু এই দু’টি ক্ষমতা বারবার প্র্যাকটিস করার ফলে কোন কাজে অভ্যস্ত হয়ে উঠে।

ব্লগটি লিখেছেন- ওয়াসিফা জান্নাত

প্যারেন্টিং বিষয়ক বইগুলো দেখতে ক্লিক করুন 

পাঠ্যপুস্তকের বাইরে আপনার সন্তানকে পড়তে দিতে পারেন যে বইগুলো 

rokomari

rokomari

Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading