যেভাবে জটিল সিদ্ধান্ত নিতে হয়…

জটিল সিদ্ধান্ত বিষয়ে কী বলছেন টেড টকের বক্তা রুথ চ্যাং?
hard decision

এমন একটা জটিল সিদ্ধান্তের কথা ভাবুন তো, খুব শীঘ্রই আপনি যেটার মুখোমুখি হবেন। এটা হতে পারে দুটি পেশার মধ্যে– শিল্পী নাকি হিসাবরক্ষক– অথবা কোথায় বাস করবেন– শহরে নাকি শহর থেকে দূরে? অথবা হতে পারে এমনটাও, দু’জন ব্যক্তির মধ্যে কাকে বিয়ে করবেন,  বা এখন সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া যায় কিনা…

জটিল সিদ্ধান্ত নেয়া অনেক সময় ভীষণ কষ্টদায়ক। এটা মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আসলে কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা ভুল ধারণা করি। জটিল সিদ্ধান্তকে সঠিকভাবে বুঝতে পারলে তা আমাদের ভেতরের লুকানো শক্তিকেই উন্মোচন করে।

সিদ্ধান্ত তখনই কঠিন হয়ে উঠে যখন এর সাথে নানা বিকল্প সম্পর্কিত থাকে

একটা সিদ্ধান্ত তখনই কঠিন হয়ে উঠে যখন এর সাথে নানা বিকল্প সম্পর্কিত থাকে। যখন আমরা সহজ সিদ্ধান্ত নিই, তখন একটা বিকল্প অপরটা থেকে ভালো হয়। জটিল সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় একটা বিকল্পের কিছু ভাল দিক থাকে, অপরটার আবার অন্য দিক থেকে কিছু ভাল দিক থাকে, সবমিলিয়ে দুটি বিকল্পের কোনটিই কোনটির চেয়ে ভালো নাও হতে পারে। আপনি ভাবতে থাকেন, কোন চাকরিতে থাকা ঠিক হবে– শহরের বর্তমান চাকরিতে, নাকি জীবনকে চেনা পরিবেশ থেকে সরিয়ে দেশের আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং কোন কাজে? কারণ- ছোট কাজটা করার কিছু ভালো দিক আছে, আবার এখান থেকে চলে গেলেও তা অন্য দিক থেকে ভালো। আসলে সব মিলিয়ে কোনটিই অপরটির চেয়ে ভাল নয়। 😀

কখনো কখনো বড় জটিল সিদ্ধান্তকে চিহ্নিতও করা যায় না! 

“কখনো কখনো বড় জটিল সিদ্ধান্তকে চিহ্নিতও করা যায় না…”

এটা ভাবা ঠিক নয় যে, সব জটিল সিদ্ধান্তই বড় কোনো বিষয় হবে। যেমন, আপনি সকালের নাস্তায় কী খাবেন তা নিয়ে ভাবছেন। আপনি আলুভাজি আর রুটি খাবেন, নাকি ফ্রিজে রাখা চকলেট ডোনাট খেয়ে নেবেন? ধরুন, এ সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনের বিষয়গুলো হল- স্বাদ কতটুকু ও স্বাস্থ্যকর কিনা। একদিকে, রুটি আপনার জন্য ভালো, অপরদিকে ডোনাটের স্বাদ বেশি। সব মিলিয়ে কোনোটাকেই অপরটার চেয়ে ভালো বলা যায় না, তাই এটা একটা জটিল সিদ্ধান্ত। ছোট ছোট পছন্দগুলো বুঝতে পারাও জটিল হতে পারে অনেক সময়,  আবার কখনো কখনো বড় জটিল সিদ্ধান্তকে চিহ্নিতও করা যায় না।

আমি দুটো বিকল্পের ভালো-মন্দ দিকগুলো খুঁজে বের করতে চেষ্টা করলাম

এটা ভাবা উচিত না যে, আমরা বোকা বলে এ ধরণের সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন লাগে আমাদের কাছে। আমি দর্শন খুব ভালবাসতাম। দার্শনিক হিসেবে আপনি দারুণ দারুণ জিনিস শিখতে পারবেন, এবং ইজি চেয়ারে বসেই আপনি হয়তো এসব শিখতে পারবেন। কিন্তু আমি একটা সাধারণ অভিবাসী পরিবার থেকে এসেছি, যেখানে বিলাসিতার ধারণা ছিল পর্কের জিহ্বা ও জেলি স্যান্ডউইচ আমার টিফিন বক্সে নেয়ার মত। তাই সারাজীবন চিন্তা করে ইজি চেয়ারে কাটানো আমার কাছে অতিরঞ্জন ও বোকামী মনে হয়েছিল। আমি একটা হলুদ নোট প্যাড নিলাম, মাঝখানে একটা রেখা টানলাম, আর দুটো বিকল্পের ভালো-মন্দ দিকগুলো খুঁজে বের করতে চেষ্টা করলাম। আমার মনে আছে, আমি মনে মনে ভাবছিলাম, যেন কেবল আমিই জানি আমার জীবনে এক একটি পেশা কেমন হতে পারে। যদি কেবল সৃষ্টিকর্তা বা Netflix আমাকে একটা DVD পাঠিয়ে দিত সম্ভাব্য দু’টি পেশার ভবিষ্যত সম্পর্কিত, আমি শুরু করতে পারতাম। আমি এদেরকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করতাম; দেখতে পারতাম কোনটা বেশি ভালো। এতে সিদ্ধান্ত নেয়াও সহজ হত।

কিন্তু আমি সেরকম কোন DVD পাইনি। আর যেহেতু কোনটা বেশি ভালো তা আমি বের করতে পারিনি, বেশিরভাগ মানুষ যা করে তাই আমি করে বসলাম। জটিল সিদ্ধান্ত নিতে আমি সবচে নিরাপদ রাস্তাটাই বেছে নিলাম। বেকার দার্শনিক হয়ে থাকার ভয়ে আমি একজন আইনজীবী হয়ে গেলাম। এবং একটা সময় আমি আবিষ্কার করলাম, আইন পেশায় আমি ঠিক খাপ খাইনি। আমি আসলে সেরকম ছিলাম না। তাই এখন আমি একজন দার্শনিক। আমি জটিল সিদ্ধান্ত নিয়ে পড়াশোনা করি। 😀

যদি বিকল্পগুলো সমান ভালো হয়, তবে একটা পয়সা টস করলেই তো হয়! 

এটা একটা ভুল ধারণা যে, কঠিন সিদ্ধান্তে একটা বিকল্প অপরটা থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো হবে। কিন্তু আমরা অনেকেই বোকার মত তাই ভাবি। আর যেহেতু আমরা জানি না, তাই আমরা সবচে কম ঝুঁকিপূর্ণ উপায়টি বেছে নিই। যদি দুটো বিকল্পকে পাশাপাশি রেখে বিবেচনা করি সম্পূর্ণ তথ্যসহ, তখনও সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হতে পারে। জটিল সিদ্ধান্তগুলো আমাদের অজ্ঞতার কারণে জটিল নয়; এগুলো জটিল, কারণ- এতে সর্বোচ্চ ভালো কোনো বিকল্প নেই।

এখন, যদি সবচেয়ে ভালো কোনো উপায় নাই থাকে, যদি দুটো বিকল্পের মধ্যে একটাকে অপরটা থেকে সুবিধাজনক বলা না যায়, তবে দুটো বিকল্পকেই সমানভাবে ভালো বলতে হবে। তাই এটা বলা যায়, জটিল সিদ্ধান্তগুলো জটিল, কারণ- এখানে সকল বিকল্পই সমানভাবে ভালো। কিন্তু এটা ঠিক হতে পারে না। যদি বিকল্পগুলো সমান ভালো হয়, আপনার তবে একটি পয়সা টস করলেই তো হয়।

জটিল সিদ্ধান্তকে সমান দুটো বিকল্প থেকে কেবল পছন্দ করার বিষয় নয়। মনে করুন, দুটো পেশা থেকে আপনাকে একটা বেছে নিতে হবে। আপনি বিনিয়োগকারী ব্যাংকার হতে পারেন বা একজন গ্রাফিক শিল্পী হতে পারেন। এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় ভাবতে হয়, যেমন- আপনি কাজটা আগ্রহের সাথে করবেন কিনা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়, পরিবার গড়ে তোলার যথেষ্ঠ সময় পাবেন কিনা ইত্যাদি।

জটিল সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের মূল্যবোধের শক্তিও উপলব্ধি করতে হয়

যখন বিকল্পগুলো সমান সমান থাকে, আমরা কী করব তা ঠিক করতে পারি না। আমাদের যুক্তিগুলো নির্ধারণ করে, আমরা যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি তা ভুল হলো কিনা। তাই জটিল সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের মূল্যবোধের শক্তিও উপলব্ধি করতে হয় এবং তা ব্যবহার করতে হয়। আপনার জন্য আপনি যে উপায়ে যুক্তি খুঁজে বের করেন, তা আপনাকে এমন এক ব্যক্তিতে পরিণত করে যে, আপনার কাছে শহরের জীবনে থাকার চেয়ে শহরের বাইরে বাস করা বেশি আনন্দের হয়ে ওঠে।

যখন আমাদের দুটো সমান সমান বিকল্প থেকে একটা বেছে নিতে হয়, আমরা আসলে একটা অসাধারণ কাজ করতে পারি। আমরা আমাদের নিজস্ব সত্তাকে কোন বিকল্পের পেছনে রাখতে পারি। আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি—এই তো আমি। আমি ব্যাংকিং পেশার জন্য, আমি চকোলেট ডোনাটের জন্য। জটিল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই উত্তরগুলো হয়ে যায় বৌদ্ধিক বা যৌক্তিক উত্তর। কিন্তু এটা এমন হওয়া ঠিক নয় যে, যুক্তি আমাদের আদেশ করবে। যখন আমরা আমাদের জন্য যুক্তি খুঁজে বের করি কোনো এক ধরনের ব্যক্তি হয়ে ওঠার জন্য, আমরা সেই ব্যক্তিটা হওয়ার জন্য হৃদয় থেকে চেষ্টা করি। আপনি বলতে পারেন, এভাবে আমরা নিজেদের জীবনের আলেখ্য লিখতে পারি।

তাই যখন আমরা জটিল সিদ্ধান্ত নেয়ার মুখোমুখি হই, কোন বিকল্পটি বেশি ভালো, তা ভেবে দেয়ালে মাথা ঠোকা উচিত নয়। আসলে সবচেয়ে ভালো বলে কোনো বিকল্প নেই। বাইরে পর্যবেক্ষণ করে যুক্তি বের করার চেয়ে আমাদের নিজেদের ভেতর যুক্তি খোঁজা উচিত। আমি কী হতে চাই?

যারা মূল্যবোধের ক্ষমতার চর্চা করে না, তারা যাযাবর ধরনের 

যারা এক্ষেত্রে মূল্যবোধের ক্ষমতার চর্চা করে না, তারা যাযাবর ধরনের। আমরা এ ধরনের মানুষ চারপাশে দেখি। আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে একজন আইনজীবী ছিলাম। আইন পেশায় আমি আমার ক্ষমতা প্রয়োগ করিনি। আমি আইনজীবী পেশার জন্য উপযুক্ত ছিলাম না। এ ধরণের উদ্দেশ্যহীন লোকেরা তাদের গল্প লেখার ভার পৃথিবীর উপর ন্যস্ত করে। তারা নির্ধারণ করে যান্ত্রিক উপহার ও শাস্তি- এক ভয় থেকে তারা সহজ উপায়টা বেছে নেয়। তাই জটিল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যা করতে হয় তা হলো- গভীরভাবে ভাবুন, কোথায় আপনি আপনার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। জটিল সিদ্ধান্তের ভেতর দিয়ে আপনি সেই ব্যাক্তিটিই হয়ে যান, যা আপনি হতে পারবেন।

ধন্যবাদ।

(টেড টক-এর বক্তা রুথ চ্যাং এর বক্তৃতার অনুবাদ )

আরও পড়ুন- দক্ষতা অর্জনের উপায় জানতে চান? তাহলে পড়ুন এই ৫টি বই

আত্মোন্নয়নমূলক বইগুলো দেখতে ক্লিক করুন 

 

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading