কীভাবে নিজেই নিজের আয়কর রিটার্ন তৈরি করবেন?

আয়কর রিটার্ন

আয়কর রিটার্ন দাখিল শুরু হয়েছে গত ০১ জুলাই ২০২১ থেকে। জরিমানা ছাড়া ব্যক্তি করদাতা নিজ নিজ সার্কেল-এ রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন ৩০ নভেম্বর ২০২১ পর্যন্ত। প্রতি বছরই নভেম্বর মাসে আয়কর মেলা হয়ে থাকে। আয়কর মেলায় করদাতাদের উৎসাহ নিয়ে রিটার্ন দাখিল করতে দেখা যায়। কিন্তু গত বছর করোনা ভাইরাসের প্রকোপের কারনে আয়কর মেলা হয়নি। এবছরও আয়কর মেলা হবে কিনা তা এখনো জানা যায়নি।

আয়কর মেলা না হলেও আপনি আপনার ট্যাক্স সার্কেল-এ রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। তবে শেষদিকে তাড়াহুড়া না করে এখন থেকেই রিটার্ন তৈরির প্রস্তুতি নিতে পারেন। এক্ষেত্রে আপনি অন্যের সাহায্য নিয়ে যেমন রিটার্ন তৈরি করতে পারেন আবার তেমনি নিজেই নিজের রিটার্ন তৈরি করতে পারেন।

যদিও আয়কর গণনা করে রিটার্ন তৈরি করা একটা দীর্ঘ এবং ঝটিল কাজ তারপরেও আপনি যদি কিছু পদ্ধতি মেনে চলেন তাহলে সহজেই রিটার্ন তৈরি করতে পারবেন। এজন্য আপনাকে কিছু কাজ ধাপে ধাপে করতে হবে। তাহলে আপনার কাছে রিটার্ন তৈরি করা আর ঝটিল মনে হবে না।

রিটার্ন তৈরির আগে যাদের টিআইএন আছে তাদের মনে কিছু সাধারন প্রশ্ন আসে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ। কি সেই প্রশ্নগুলো?

প্রথমেই যে প্রশ্নটি সবাই করে থাকেন তাহলো, আমার টিআইএন আছে কিন্তু আমার আয় নেই। এখন আমি যদি রিটার্ন দাখিল করি তাহলে আমাকে কি আয়কর দিতে হবে? এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো, না। গত বছর থেকে আইন হয়েছে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যাদেরই টিআইএন আছে তাদের সবাইকেই বাধ্যতামূলকভাবে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। ব্যতিক্রম হলো, আপনি টিআইএন নিয়েছেন জমি বিক্রি বা ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য কিন্তু আপনার আয় একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে, তাহলে আপনাকে আর রিটার্ন দাখিল করতে হবে না। এই দুইটি দরকার ছাড়া যারাই টিআইএন নিয়েছেন তাদের সবাইকেই আয়কর আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।

এখন তাহলে আরেকটি প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে কখন কর দিতে হবে? বা ন্যূনতম কর কখন দিতে হয়?

একটু আগে উপরে বলেছি, যদি আপনার আয় একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে তাহলে আপনাকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। এই নির্দিষ্ট সীমা পুরুষ করদাতার ক্ষেত্রে তিন লাখ টাকা এবং মহিলা করদাতার ক্ষেত্রে সাড়ে তিন লাখ টাকা। এই সীমা যদি অতিক্রম করে তাহলেই আপনাকে আয়কর দিতে হবে। এবং এক্ষেত্রে আপনার ন্যূনতম কর হলো ঢাকার যেকোন সিটি কর্পোরেশনের অধিবাসী হলে পাচ হাজার টাকা। করদাতার অবস্থান অনুযায়ী এই ন্যূনতম করের পরিমান কমতে পারে। এখানে উল্লেখ্য, আপনার কর যদি পাচ হাজার টাকার কমও হয় তারপরেও আপনাকে কিন্তু এই পাচ হাজার টাকাই দিতে হবে।

আপনার যখন উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা হয়ে যাবে তখন আপনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন আপনাকে রিটার্ন দিতে হবে কিনা বা রিটার্ন দিলেই কর দিতে হবে কিনা। এবার আপনি আয়কর রিটার্ন তৈরির সম্পূর্ণ কাজকে তিনটি ধাপে ভাগ করে নিন। তাহলে আপনার রিটার্ন তৈরি করা অনেক সহজ হবে।

দরকারি কাগজপত্র সংগ্রহ করুন

প্রথম ধাপে আয়কর রিটার্ন তৈরি করার জন্য দরকারি কাগজপত্রগুলো সংগ্রহ করুন। আপনার সারা বছর ধরে যে উৎস থেকে আয় হয়েছে সেই সম্পর্কিত কাগজপত্র সংগ্রহ করুন। যেমন, আপনি যদি চাকরি করেন তাহলে বেতন খাতে আপনি যে টাকা পেয়েছেন তার জন্য স্যালারি সার্টিফিকেট, যে ব্যাংকে বেতন ট্রান্সফার হয়েছে সেই ব্যাংক স্ট্যাটমেন্টস, বেতন থেকে উৎসে যে কর কর্তন করেছে তার চালানের কপি ইত্যাদি। এই কাগজপত্রগুলো আপনি যখন আয়কর গণনা করবেন তখন যেমন দরকার পরবে তেমনি আবার রিটার্ন ফরম যখন পূরণ করবেন তখন সাথে এই কাগজগুলো জমা দিতে হবে।

আয়ের খাত অনুযায়ী দরকারি কাগজপত্র আলাদা হবে। রিটার্ন তৈরির জন্য কী কী কাগজপত্র লাগবে এবং পরে কীভাবে আপনি আয়কর গণনা করে রিটার্ন ফরম পূরণ করবেন এ সম্পর্কিত লেখকের একটি বই রয়েছে “ট্যাক্স রিটার্ন প্রিপারেশনঃ কমপ্লিট গাইড ২০২১”। এই বাংলা বইটি উদাহরণ ব্যবহার করে হাতে-কলমে দেখানো হয়েছে একজন করদাতা কীভাবে আয়কর গণনা করে রিটার্ন তৈরি করবেন।

ট্যাক্স রিটার্ন প্রিপারেশন কমপ্লিট গাইড ২০২১
ট্যাক্স রিটার্ন প্রিপারেশন কমপ্লিট গাইড ২০২১

BUY NOW

আয়কর গণনা করুন

আপনার যখন দরকারি কাগজপত্রগুলো সংগ্রহ হয়ে যাবে তারপরে আপনি দ্বিতীয় ধাপে আয় থেকে অব্যাহতি বাদ দিয়ে করযোগ্য আয় বের করুন। এই ধাপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এটা সবার কাছেই অনেক ঝটিল মনে হয়। কারন, কোন খাতে কতো অব্যাহতি আছে তা আয়কর আইনে বলা আছে। আপনাকে এই বিষয়গুলো জানতে হবে। তাহলেই আপনি আপনার করযোগ্য আয় বের করতে পারবেন।

আপনাকে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, একজন করদাতা তার আয়ের উপর কর দেন না। আয় থেকে অব্যাহতি বাদ দিয়ে যে করযোগ্য আয় বের হয় তার উপর কর গণনা করা হয়। এবং আপনার করযোগ্য আয় যদি তিন লাখ টাকা অতিক্রম করে তাহলেই আপনাকে কর দিতে হবে যা উপরে বলেছি।

এখন এই যে অব্যাহতি কথা বলছি তা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, আপনি যদি চাকরি করেন তাহলে মূল বেতন, বাড়ি ভাড়া ভাতা, যাতায়াত ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ইত্যাদি পেয়ে থেকেন। এসব খাতে আয়কর আইন অনুযায়ী আপনি একটা নির্দিষ্ট পরিমান অংক অব্যাহতি হিসেবে বাদ দিতে পারবেন। এভাবে বাদ দিয়েই আপনি করযোগ্য আয় বের করবেন।

আপনি যখন আপনার করযোগ্য আয় পেয়ে গেলেন তারপর আপনাকে কর ধাপ অনুযায়ী কর হার ব্যবহার করে করদায় নির্ণয় করতে হবে। আপনার যে করদায় বের হয়েছে তাহলো মোট করদায়। আপনি এই মোট করদায় থেকে কর রেয়াত বাদ দিবেন। কর রেয়াত পেতে হলে আপনাকে নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগ করতে হবে।

কর রেয়াত পেতে কোথায় বিনিয়োগ করবেন?

কর রেয়াত একজন করদাতার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারন, কর রেয়াত আপনার করদায় বহুলাংশে হ্রাস করে থাকে। কিন্তু এই কর রেয়াত সুবিধা পেতে হলে আপনাকে আয়কর আইনে উল্লেখিত খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। তবে আপনি বিনিয়োগের পাশাপাশি দান করেও কর রেয়াত সুবিধা পেতে পারেন। দানের ক্ষেত্রেও আয়কর আইনে কিছু নির্দিষ্ট খাত উল্লেখ করা আছে।

কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, করদাতা বিনিয়োগ বা দান ঠিকই করেছেন কিন্তু উল্লেখিত খাতে না করার কারনে কর রেয়াত সুবিধা নিতে পারছেন না। আবার কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, যতটুকু পরিমান বিনিয়োগ করার কথা ছিলো তা থেকে কিছু কম করা হয়েছে। এর ফলে সম্পূর্ণ কর রেয়াত সুবিধা নিতে পারছেন না। তাই আয় বছর শেষ হওয়ার আগেই আপনি আপনার করযোগ্য আয় অনুযায়ী হিসেব করে দেখুন কতো বিনিয়োগ করতে হবে। সেই অনুযায়ী বিনিয়োগ করুন যাতে করে সম্পূর্ণ সুবিধা নিয়ে করের পরিমান কমাতে পারেন।

আপনার যখন কর রেয়াত গণনা হয়ে গেলো তারপরে আপনি মোট করদায় থেকে কর রেয়াত বাদ দিয়ে নীট করদায় বের করুন। এই কাজ শেষ হলেই আপনাকে শেষ ধাপে রিটার্ন ফরম পূরণ করতে হবে।

আপনার জন্য কোন রিটার্ন ফরম প্রযোজ্য?

রিটার্ন ফরম পূরণের মাধ্যমেই আয়কর রিটার্ন তৈরির কাজ শেষ হয়। কিন্তু তার আগে আপনাকে জানতে হবে কোন রিটার্ন ফরম আপনার জন্য প্রযোজ্য। আপনি যদি শুধু নিয়ম রক্ষা করার জন্য রিটার্ন দাখিল করে থাকেন তাহলে এক পৃষ্ঠার যে রিটার্ন ফরম রয়েছে তা পূরণ করতে পারেন।

আর আপনি যদি শুধু চাকরিজীবী করদাতা হয়ে থাকেন তাহলে মাত্র তিন পৃষ্ঠার রিটার্ন ফরম রয়েছে। আপনি খুব সহজে এই রিটার্ন ফরম পূরণ করতে পারবেন। এর বাইরে সকল ব্যক্তি শ্রেণীর করদাতার জন্য রয়েছে আইটি-১১গ২০১৬। এই রিটার্ন ফরমটি তুলনামূলকভাবে একটু দীর্ঘ। মূল রিটার্ন ফরমের সাথে কিছু বিবরণী এবং তফসিল রয়েছে। তবে এই বিবরণী বা তফসিল সবার জন্য প্রযোজ্য নয়।

যতোগুলো বিবরণী রয়েছে তার মধ্যে পরিসম্পদ, দায় ও ব্যয় বিবরণী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিবরণী যখন করদাতা পূরণ করতে যান তখন কিছু প্রশ্ন শুনতে পান। এর মধ্যে রয়েছে, সম্পদের পরিমান বেশি দেখিয়ে দিলে ভবিষ্যতে লাভ আছে। আবার, সোনার পরিমান কতোটুকু দেখাবেন? জমির মূল্য কতো দেখাবেন? এই প্রশ্নগুলো প্রায়ই শুনা যায়। এর উত্তর হলো, আপনার যা আছে আপনি তাই দেখাবেন। যা নাই তা দেখাতে গেলে লাভের চেয়ে অসুবিধা হতে পারে।

পরিসম্পদ, দায় ও ব্যয় বিবরণী পূরণের সময় আরেকটি বিষয় নিয়ে করদাতা সমস্যায় পড়েন, তাহলো আয়ের উৎসর সাথে ব্যয়ের পরিমান মিলাতে হয়। এখানেই সমস্যা হয়। আমরা যেহেতু আমাদের দৈনন্দিন খরচ লিখে রাখি না তাই এক্ষেত্রে সমস্যা হয়। তাই চেষ্টা করুন লিখে রাখতে। তাহলে আর ঝামেলা হবে না।

আশা করছি, উপরে উল্লেখিত ধাপ অনুযায়ী আপনি যদি রিটার্ন তৈরি করেন তাহলে নিজেই নিজের রিটার্ন তৈরি করতে পারবেন।

আয়কর রিটার্ণ সম্পর্কে জানতে যে বইটি অবশ্যই সংগ্রহ করতে পারেন

 

*লিখেছেন- জসীম উদ্দিন রাসেল, জসীম উদ্দিন দি ইন্সটিটিউট অফ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অফ বাংলাদেশ (আইসিএবি)-র ফেলো মেম্বার। তিনি ট্যাক্স কনসালট্যান্ট হিসেবে কোম্পানির ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্ট, ট্যাক্স অ্যাডভাইসরি, ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স ইত্যাদি কাজে সহায়তা দিয়ে থাকেন। একটি কোম্পানির ট্যাক্স প্লানিং কী হওয়া উচিত, কোথায় বিনিয়োগ করলে সবচেয়ে বেশি ট্যাক্স সুবিধা পাওয়া যাবে এসব বিষয়ে তিনি পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading