কলকাতায়ও কি পড়া হয় বাংলাদেশের বই ??

Untitled-স

এক দশক আগেও পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের বই পাওয়া ছিল দুষ্কর। তবে এখন তা বেশ অনেকটাই সহজলভ্য। কলকাতার বিভিন্ন বইবিতান থেকে শুরু করে পুরো রাজ্যের নানা জায়গায় পাওয়া যায় বাংলাদেশের কবি-লেখকদের নানা ধরনের বই। বাংলাদেশের সৃজনশীল বইয়ের পাঠক ও ক্রেতা পশ্চিমবঙ্গে যেমন বেড়েছে, তেমনি সেখানের পাঠক হৃদয় জয় করছেন এ দেশের লেখকরা।

বাংলাদেশের বই নিয়ে কলকাতার পাঠকসমাজে আগ্রহ কম ছিল এক দশক আগেও। আগে বাংলাদেশের বইয়ের কাটতিও কম ছিল। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি নেই। এ দেশের কবি-সাহিত্যিকদের বইয়ের চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। বাংলাদেশের বইয়ের প্রতি শুধু কলকাতা নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গসহ বাংলাভাষী অঞ্চলে আগ্রহ বেড়েছে ক্রেতা-পাঠকদের।

জানা যায়, ভাষা ও সংস্কৃতি অভিন্ন বলে পশ্চিমবঙ্গের ক্রেতা-পাঠকরা দিন দিন আগ্রহী হয়ে উঠছে এ দেশের সাহিত্যিকদের রচনায়। বিশেষ করে এ দেশের সঙ্গে যাদের নাড়ির সংযোগ রয়েছে, যারা এ দেশ ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমিয়েছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের বইয়ের কাটতি বেশি। এ ছাড়া কলকাতার বিদগ্ধ পাঠকসমাজে বৃদ্ধি পেয়েছে এ দেশের কবি-লেখকদের বইয়ের চাহিদা।

শুধুমাত্র কলকাতা নয়, বর্তমানে গোটা পশ্চিম-বাংলা জুড়েই নানা জায়গায় পাওয়া যায় বাংলাদেশের কবি-লেখকদের বই। বাংলাদেশের বইয়ের কাটতিও বেড়েই চলেছে। কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় যেমন বাংলাদেশের বই পাওয়া যায়, তেমনি আট বছর ধরে শুধু বাংলাদেশের বই নিয়ে কলকাতায় আয়োজিত হচ্ছে বাংলাদেশ বইমেলা। কলকাতার বাজারে এখন নিয়মিত যায় বাংলাদেশের বই। এ ছাড়া বাংলাদেশ বইমেলা ঘিরে সেখানে পাঠক ও ক্রেতার আগ্রহ-ও বেড়েছে।

সারা বছরই কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ায় নির্দিষ্ট কিছু দোকানে বাংলাদেশের বই পাওয়া যায়। বছরের শুরুতে কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তক মেলাতেও থাকে বাংলাদেশের বই। তার পরেও কেন আলাদা করে এই বাংলাদেশ বইমেলা?‌……

যেহেতু বাংলাদেশের সব নতুন বই একুশের বইমেলাতেই বের হয় এবং তার অনেক আগে শেষ হয়ে যায় কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা, নতুন বই ঢাকা থেকে কলকাতায় আসতে আবার প্রায় এক বছর। সেখানে এই বাংলাদেশ বইমেলা সুযোগ করে দেয়, আরও আগে বইগুলি হাতে পাওয়ার।

প্রতিবছরই বাংলাদেশের বইয়ের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। সেখানের পাঠক ও ক্রেতারা মুখিয়ে থাকেন বাংলাদেশ বইমেলার জন্য। বইমেলায় যেমন ক্রেতা, পাঠক ও দর্শনার্থী বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে প্রকাশনা সংস্থাও। ২০১৮ সালে অংশ নিয়েছিল ৬০ টির মতো প্রকাশনা সংস্থা। ২০১৯ সালে তা ৮০ ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে অক্ষর প্রকাশনী, দি রয়্যাল পাবলিশার্স, দিব্য প্রকাশ, অঙ্কুর প্রকাশনী, মাওলা ব্রাদার্স, অনুপম প্রকাশনী, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, কথা প্রকাশ, নালন্দা, কাকলী প্রকাশনী, ভাষাচিত্র, সৃজনী, নবযুগ প্রকাশনী, অন্বেষা প্রকাশনা, প্রতীক প্রকাশনা, শোভা প্রকাশ, বর্ণায়ন, প্রথমা প্রকাশন, আহমেদ পাবলিশিং হাউস উল্লেখযোগ্য।

চেইন বুক শপ বাতিঘরের কর্ণধার দীপঙ্কর দাশ বলেন, “বাংলাদেশের বই কলকাতায় কিভাবে বাজার দখল করতে পারে, আমরা তার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কলকাতা থেকে যে পরিমাণ বই বাংলাদেশে আসে, সেই পরিমাণ বই কলকাতায় যায় না। এটি আমরা সব সময় বলি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, নিজেদের বাজার নিজেদেরই তৈরি করতে হয়। আমি সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। আশা করছি, গোটা পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের সৃজনশীল বইয়ের বড় বাজার সৃষ্টি হবে।”

প্রকাশকদের মতে, তথ্য-প্রযুক্তির যুগে, ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ফলে বাংলাদেশের লেখক ও বই সম্পর্কে সহজেই জানতে পারছেন পশ্চিমবঙ্গের পাঠকরা। যার ফলে তাদের আগ্রহও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাঠকও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেলার পাশাপাশি স্থায়ীভাবে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের বই বিক্রি করার ব্যবস্থার দাবি প্রকাশকদের।

নবীন লেখকদের মধ্যে কলকাতার পাঠকমহলে এখন বেশ জনপ্রিয় সাদাত হোসাইন। বাংলাদেশের শিল্পসাহিত্য জগতে সাদাত হোসাইন ইতিমধ্যেই একটা ব্র্যান্ড। এখন এপার বাংলাতেও তাঁকে ঘিরে পাঠকমহলে প্রবল প্রতিক্রিয়া। কলকাতা বইমেলায় তাঁকে দেখতে, তাঁর বই কিনতে উপচে পড়া ভিড়। গত বইমেলায় একদিনে বই বিক্রির রেকর্ড গড়েছেন তিনি। বইয়ের বাজারের দিকে সাধারণ পাঠককে আকৃষ্ট করে তুলতে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখির পক্ষপাতী। তাঁর মতে, সেখানে যে বিপুল সংখ্যক পাঠক আছেন, তাঁরা অনেকেই তাঁর ফেসবুকের লেখালেখি ভালবেসে তাঁর বই কিনতে আসেন। পশ্চিমবঙ্গে গল্প প্রেমীদের কাছে হুমায়ূন আহমেদ অনেক জনপ্রিয়। সাদাত হোসাইনের জনপ্রিয়তা দেখে অনেকেই তাঁকে হুমায়ুন আহমেদের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেছেন।

হুমায়ূন আহমেদ ছাড়াও অনেক বিখ্যাত কবি, লেখক, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক এদেশে আছেন। হয়তো হুমায়ূন আহমেদ এর মতো তাঁদের বইয়ের সংখ্যা অত নেই, তবে লেখার মান অনেক উঁচু পর্যায়ের। কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দী‌নকে তো সকলেই ভালোভাবেই চেনে। রয়েছেন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখক  মুহম্মদ জাফর ইকবাল। এছাড়াও রয়েছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আহমদ ছফা, জহির রায়হান, শহীদুল জহির, শহীদুল্লাহ্ কায়সার, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, জাহানারা ইমাম, সুফিয়া কামাল, হাসান আজিজুল হক, আনিসুল হক, ইমদাদুল হক মিলন, সেলিনা হোসেন, মুনীর চৌধুরী, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, শওকত ওসমান, আবু ইসহাক, আবদুল্লাহ আল মুতী, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, হুমায়ুন আজাদ, বেগম রোকেয়া, কায়কোবাদ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, মীর মশাররফ হোসেন, সৈয়দ মুজতবা আলী, গোলাম মোস্তফা, মোহাম্মদ নজিবর রহমান, নীলিমা ইব্রাহীম, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ূন কবির, ডা. লুৎফর রহমান, শহীদ কাদরী, সেলিম আল দীন, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, মহাদেব সাহা সহ আরও অসংখ্য লেখক – যাদের লেখা কলকাতার মানুষেরা পড়ার সুযোগ পেলে হয়তো পারস্পরিক দূরত্ব ঘুচে যেত অনেকাংশে। জনপ্রিয়তা পেত ব্যাপক।

বছরের পর বছর ধরেই ওপার বাংলার লেখকদের বই আমাদের ঘরে ঘরে, ফুটপাতের বইয়ের দোকান থেকে অভিজাত দোকান, লাইব্রেরি পর্যন্ত। ওপারের লেখকদের নাম, বইয়ের নাম আমাদের ঠোঁটস্থ। অথচ এপার বাংলার লেখকদের নাম ওখানকার পাঠকেরা বলতে গেলে সেভাবে জানেনই না। আমাদের হাতেগোনা যা-ও দুয়েকজন লেখক ওখানে পরিচিত, তা-ও সেভাবে বিস্তৃত পরিসরে নয়। এখানে যেমন সুনীল, সমরেশ, শীর্ষেন্দু। হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া ওপারের তরুণ পাঠকরা আমাদের অন্য লেখকদের কথা, লেখার কথা তেমন জানেনও না। এর প্রধান কারণ, কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গে আমাদের বইয়ের বাজার তেমন বিস্তৃত নয়, সহজলভ্যও নয়।

কলকাতায় এই বাংলাদেশ বইমেলা সেই পরিপ্রেক্ষিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রাখতে পারে। মেলায় প্রবীণদের পাশাপাশি তরুণ পাঠকদের উপস্থিতিও আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে দুই বাংলার তরুণ লেখক ও পাঠকদের মধ্যে একটি নতুন সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে হ্যাঁ, এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রকাশক, লেখকদের চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার সংশ্লিষ্ট মহলকেও আরও এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মূলধারার মিডিয়াকে। এখন বাজার ব্যবস্থার যুগ। আর বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে বিজ্ঞাপন, প্রচার এবং প্রসার খুব জড়িত। কলকাতার মেইন্সট্রিম মিডিয়াগুলো যদি এই মেলা নিয়ে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ ছাপে, তাহলে এই মেলাটি আরও কার্যকর ও জমজমাট হয়ে উঠতে পারে।

সম্প্রতি কলকাতার পাঠকেরা বাংলাদেশের তরুণ লেখকদের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন—এটি সত্য। এর পেছনে অবশ্যই একটি বড় কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বিশেষ করে ফেসবুক। একটা সময় সীমানা বন্ধ করে দিলেই বা কড়াকড়ি আরোপ করলেই লেখালেখি, সিনেমা বা বইয়ের মতো সৃজনশীল কন্টেন্ট হয়তো এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছাতে পারতো না। এখন আর সেই অবস্থা নেই। এখন লেখা বা সিনেমা যদি ভালো হয়, তাহলে তা এই দৃশ্যমান সীমানাকে থোড়াই কেয়ার করে ফেসবুক-ইউটিউবের মাধ্যমে বিশ্বব্যপী ছড়িয়ে পড়ে। তবে সেক্ষেত্রে কন্টেন্ট অবশ্যই ভালো হতে হবে। কন্টেন্ট যদি পাঠক বা দর্শককে আকৃষ্ট করতে পারে, তবে এখন সীমানা আর বাধা হয়ে দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতা রাখে না।

খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই ফেসবুকের কল্যাণেই কিন্তু মূলধারার সাহিত্য বা লেখালেখির চর্চায় উপেক্ষিত বা অগুরুত্বপূর্ণ অনেক লেখকই পাঠকের কাছে পৌঁছে গেছেন বা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন। সেটি এপার বাংলার ক্ষেত্রে যেমন সত্য, তেমনি ওপার বাংলার লেখকদের ক্ষেত্রেও। বিশ্ব এখন এক ওপেন প্ল্যাটফর্ম। একটা সময় তরুণ লেখকদের বিশাল বড় নির্ভরতার জায়গা ছিল দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদকেরা। যেন তাদের দেওয়া একটা সুযোগই এই নবীন লেখকদের লেখকজনম স্বার্থক করে দেবে, প্রতিষ্ঠিত বা গুরুত্বপূর্ণ করে ফেলবে। নবীনদের লেখা বিস্তৃত পরিসরে পাঠকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেবে।

এই সুযোগ তারা না পেলে তাদের আর পাঠকের কাছে পৌঁছানো হবে না। কিন্তু সময় বদলেছে। অল্প-স্বল্প দ্বিমত থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিচিত জন, ফেসবুক বন্ধু ও ভক্তরা নতুন কিংবা তরুণ লেখক, কবি এবং সাহিত্যিকদের বই বিক্রিতে প্রধান ভরসা। লেখার পরিচিতির ক্ষেত্রে এই পরিচিতজনরাই তাদের সাঁকো। কেউ কেউ বলছেন, গণমাধ্যমে বইয়ের প্রচারণা ও বই নিয়ে ইতিবাচক খবর বই বিক্রিতে বড় ভূমিকা রাখে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য গণমাধ্যমের সেই খবরও লিংক হয় ফেসবুক দিয়েই ঘুরে। আসলে আমাদের অগোচরেই একটা বড় বিপ্লব বা পরিবর্তন ঘটে গেছে, পাঠক ও লেখকের সম্পর্ক ও যোগাযোগে।

তাই শুধু বই নয়, বর্তমান সময়ের অধিকাংশ পণ্য বা সেবার প্রচার, প্রসার ও বিক্রির ক্ষেত্রে ফেসবুকের তুলনা মেলা ভার। এর কারণ প্রযুক্তি। কিন্তু যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি ব্যবস্থা বা ধারণার মধ্যে বসবাস করেছেন, অভ্যস্ত হয়েছেন, তারা কেউ কেউ বিষয়টি উপেক্ষা করার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ অগ্রাহ্য বা নাকচ করে দেয়ার চেষ্টা করছেন। আবার কেউ কেউ মেনেও নিচ্ছেন। আসলে সময় এবং ব্যবস্থা পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনটা যারা ধরতে পেরেছেন, মানিয়ে নিতে পেরেছেন, তারাই টিকে রয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম সামগ্রিক পরিসরে একটি বড় পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের তরুণ লেখকেরা চমৎকারভাবে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। যার ফল তাদের পাঠক বেড়ে যাওয়া। সেটি যেমন এপার বাংলায়, তেমনি ওপার বাংলায়ও।

পশ্চিমবঙ্গের সকল বই দেখুন- এখানে 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading