কর্মজীবী মা -বাবারা সন্তানের শৈশবকে রাঙাতে পারেন যেভাবে

2021-03-02 কর্মজীবী মা -বাবারা সন্তানের শৈশবকে রাঙাতে পারেন যেভাবে...3ল

রাহেলা বেগম। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সকালে যান, সন্ধ্যায় ফেরেন। ফেরার পর বাসার কাজেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। রাহেলা বেগমের স্বামীও চাকরি করেন। একটি ক্লিনিকে। বাসায় ফিরে খাওয়াদাওয়া করেই ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। তাদের সাত বছরের একটি বাচ্চা রয়েছে। মা-বাবা কেউই শিশুটিকে খুব একটা সময় দিতে পারেন না।

একদিন অফিস থেকে ফিরে রাহেলা বেগম খেয়াল করেন, তার সন্তানটি ইদানীং অস্বাভাবিক আচরণ করছে। আগের মতো হাসছে না। খেলছে না। দুষ্টুমি করছে না। মনমরা হয়ে বসে থাকে। স্বামী কর্মস্থল থেকে ফেরার পর বিষয়টি জানান। তারপর মা-বাবা দুজনই সন্তানকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা শুরু করেন।

দিনকে দিন ছেলের অস্বাভাবিতা বাড়তে থাকে। প্রথমে তারা ভাবেন, শারিরীক অসুস্থতা। ডাক্তার দেখান। চিকিৎসা করান। নাহ, তাতেও কোনো উন্নতি হয়নি।

রাহেলা বেগম তার এক কলিগকে ঘটনাটি খুলে বলেন। সব শুনে তিনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞের দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দেন। রাহেলা বেগম সেটাই করেন। সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, এটি বাচ্চাটির শারিরীক কোনো সমস্যা নয়। সমস্যাটি হচ্ছে মানসিক। একাকীত্বের কারণে তার এই সমস্যাটি হয়েছে। এ রোগের তেমন কোনো ঔষধ নেই। তবে বাচ্চার সঙ্গে মা-বাবার কোয়ালিটি সম্পন্ন সময় কাটালে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে সে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে চারিদিকে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। আর্থিকভাবে ভালো একটা জীবন যাপন করার জন্য মা-বাবা দুজনকেই চাকরি করতে হয়। দিনের প্রায় পুরোটা সময় থাকতে হয় বাসার বাইরে। বাচ্চাকে রেখে যেতে হয় কাজের মেয়ের কাছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাজের মেয়ে শিশুটিকে আপন করে নিতে পারে না। ফলে বাচ্চাটিও তার সঙ্গ পছন্দ করে না। একটি শিশুর একাকীত্বের শুরুটা হয় মূলত এখান থেকেই।

কঠিন এই বাস্তবতায় দিনের দীর্ঘ একটা সময় মা-বাবার সান্নিধ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। মলিন হয়ে যাচ্ছে তাদের দুরন্ত শৈশব। একাকীত্বকে ঘাড়ে চেপে বেড়ে উঠছে তারা। ফলে মানসিক কষ্টসহ নানাবিধ সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে তাদের। অনেকক্ষেত্রে এই সমস্যা তাদের গোটা জীবনটাই নষ্ট করে দেয়।  জড়িয়ে যায় ভয়ানক অপরাধমূলক কাজের সঙ্গেও। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

কর্মজীবী মা-বাবারা সন্তানের শৈশবকে রাঙাতে পারেন যেভাবে নিম্নে তা তুলে ধরা হলো—

ক. শিশুর জন্য সময় বের করুন

কর্মজীবী হওয়া সত্ত্বেও মা-বাবাকে অবশ্যই কোনো-না-কোনোভাবে তার শিশুটির জন্য সময় বের করতে হবে। এর বিকল্প নেই। কেননা, সমীক্ষায় দেখা গেছে, একাকীত্বে ভোগা শিশুরা তাদের মা-বাবার উপস্থিতিটা খুব বেশি অনুভব করে। তাদের ইচ্ছে করে মা-বাবার সঙ্গে সময় কাটাতে। বাসায় থেকে তারা হয়তো সারাদিন টিভি দেখে, কম্পিউটারে গেমস খেলে অথবা পড়াশোনা করে। কিন্তু সবসময় এসব তাদের ভালো লাগে না। ইচ্ছে করে মা-বাবার সঙ্গে কথা বলতে, গল্প করতে।

অফিসে লাঞ্চের পর অথবা সময় বের করতে পারলেই শিশুটির সঙ্গে ভিডিয়ো কলে কথা বলুন। বাসায় ফেরার সময় তার পছন্দের কিছু নিয়ে যান। রাতের খাবার সবাই একসঙ্গে খাওয়ার চেষ্টা করুন। ছুটি পেলে সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে যান। বাচ্চাটির জন্মদিন এলে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তা উদযাপন করুন। ঈদ-পূঁজোয় তাকে নিয়ে গ্রামে বেড়াতে নিয়ে যান।

এভাবেই চাকরির পাশাপাশি সময় বের করে আপনি আপনার সন্তানের শৈশবটাকে চাইলেই রাঙিয়ে দিতে পারেন।

খ. শিশু-উপযোগী বই কিনে দিন

কর্মজীবী হবার কারণে যেহেতু সন্তানকে যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না, সেহেতু তাকে তার উপযোগী গল্প-ছড়ার বই কিনে দিন। এসব পড়ার মধ্য দিয়ে সে তার একাকীত্ব খুব সহজেই দূর করতে পারবে। পাশাপাশি রঙিন হয়ে উঠবে তার শৈশব-দুনিয়া।

তবে যেমন-তেমন বই বাচ্চার হাতে তুলে দেবেন না। তার পছন্দের বাইরের বই তুলে দিলে হিতের বিপরীত ঘটবে। বই পড়ার প্রতি তার আগ্রহ নষ্ট হবে। এ ক্ষেত্রে তার আগ্রহটাকে প্রাধান্য দিন। সে ঠিক যে বিষয়ে আগ্রহী সে বিষয়ের বই-ই তাকে কিনে দিন। এ ক্ষেত্রে অক্ষরবৃত্ত প্রকাশনের শিশুকিশোর উপযোগী বইগুলো সংগ্রহ করতে পারেন। দীর্ঘ দিন ধরে তারা শিশুদের জন্য বিষয়ভিত্তিক মানসম্মত বই প্রকাশ করে আসছে।

শিশু-উপযোগী বই কিনে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার বয়সটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। বয়স ০১-০৫ বছর হলে তাকে যুক্তবর্ণহীন বইগুলো কিনে দিন। গল্পকার আহমেদ রিয়াজ-এর ভালো ভালো কয়েকটি যুক্তবর্ণহীন গল্পের বই রয়েছে। সেগুলো তাকে তুলে দিতে পারেন। এ ছাড়া রাজা-রানি, ডাইনি, দৈত্য, জাদুকর ইত্যাদি রূপকথার গল্পও তাকে কিনে দিতে পারেন। দিতে পারেন কমিক্সের বইগুলোও। আরো যে বইগুলো তুলে দিতে পারেন—

গুফি-র ‘বর্ণ নিয়ে খেলি (স্বরবর্ণ ও ব্যাঞ্জনবর্ণ)’ সিরিজ, গুফি-র ‘বর্ণ গল্প— ২ (মূল্যবোধ ও নৈতিকতা)’ সিরিজ, ওয়ার্ল্ড অব চিলড্রেন’স বুকস লিমিটেডের  ‘ছবি দেখি, গল্প শুনি– ১’ সিরিজ, পাঞ্জেরী পাবলিকেশনর শিশুতোষ বই, অ্যাডর্ন বুক্‌স ফর চিলড্রেন (এবিসি)-এর ‘ছোট্ট বই সিরিজ‘ ইত্যাদি।

বয়স ০৫-১১ বছর হলে তাকে দস্যিপনায় ভরপুর—এমন বইগুলো কিনে দিন। সেক্ষেত্রে গল্পকার ও ছড়াকার জনি হোসেন কাব্যর বইগুলো তার পাঠকে সমৃদ্ধ করতে পারে। সেগুলো সংগ্রহ করুন।

এ বয়সের শিশুদের সায়েন্স ফিকশনেও বিশেষ আগ্রহ থাকে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল, মোশতাক আহমেদসহ অন্যান্য লেখকদের  সায়েন্স ফিকশনের বইগুলো তুলে দিতে পারেন।  আরও যে বইগুলো নির্দ্বিধায় তুলে দেওয়া যায়—

ওয়ার্ল্ড অব চিলড্রেন’স বুকস লিমিটেডের ‘চিরকালের রূপকথার সিরিজ’, ইকরি মিকরির শিশুকিশোর বই, ময়ূরপঙ্খি প্রকাশনীর শিশুকিশোর কালেকশন ইত্যাদি।

গ. পাঠ্যবইয়ের প্রতি বিরক্তি দূর করবে এমন কিছু উপহার দিন 

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের দেশে পাঠ্যবইগুলো শিশুদের আনন্দ লাভের উদ্দেশ্য তেমন পূরণ করে না। ধরা যাক, শিশু উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে পড়ছে। কিন্তু এই ব্যাপারটাকে পাঠ্যবইয়ে এমন ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কঠিন ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে যে, সহজ বিষয়টাই কঠিন হয়ে ওর পড়ার প্রতি আগ্রহ নষ্ট করে দিয়েছে। ফলে সেও হয়ে উঠেছে তার পাঠ্যবইয়ের প্রতি বিরক্ত। একটু সচেতন হলেই আপনি তার এই বিরক্তিটুকু দূর করে তার শিক্ষাজীবনটাকে করে তুলতে পারেন মধুর। কিভাবে? তাকে এমন কোনো খেলনা বা উপকরণ উপহার দিন, যা তার সেই ভীতি আর বিরক্তি দূর করে দেবে। উদাহরণস্বরূপ বিজ্ঞানবাক্সের কথা বলা যায় এখানে।

শিক্ষামূলক বিনোদন উপকরণের জাদুকরী এক বাক্স এ বিজ্ঞানবাক্স। এ বাক্সের ভেতর যে উপকরণগুলো থাকে, সেগুলো দিয়ে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়কে হাতে-কলমে পরীক্ষা করা যায়। অনেকগুলো বিজ্ঞানবাক্স রয়েছে। প্রতিটিই বিষয়ভিত্তিক। আপনি তাকে ‘OnnoRokom BigganBaksho‘ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। এই চ্যানেলটিতে মূলত বিজ্ঞানবাক্সের ভেতরের উপাদানগুলো ঠিক কীভাবে কাজ করে তা ভিডিও কনটেন্টের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।

ঘ. আঁকাআঁকি করতে দিন

স্বভাবতই শিশুরা আঁকাআঁকি করতে পছন্দ করে। সৃজনশীল এ বিষয়টিতে তাকে উৎসাহিত করার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন তুলি, রঙ, রঙপেন্সিল, আর্টপেপার ইত্যাদি কিনে দিন। আপনি যেহেতু শিশুটিকে সেভাবে সময় দিতে পারছেন না সেহেতু তাকে আঁকাআঁকি শেখা যায় এমন বইগুলো কিনে দিন। সেক্ষেত্রে ‘গুফি ডিজাইন বুক সেট‘টি তার জন্য বেশ কার্যকর হতে পারে। এ ছাড়াও রকমারি.কমে এমন অসংখ্য বইয়ের কালেকশন রয়েছে। যা পড়ে ও দেখে বাচ্চাটি আঁকাআঁকির দিকনির্দেশনা পেয়ে যাবে এবং সহজেই এর প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠতে পারবে। এভাবেই সে তার একাকীত্ব দূর করে শৈশবকে রাঙিয়ে তুলতে পারবে।

শিশুর একাকীত্ব দূর করে তার শৈশবকে রাঙিয়ে তোলার এমন অসংখ্য উপায় রয়েছে। উল্লেখযোগ্য উপায়গুলোও যদি ঠিকঠাকভাবে পালন করা যায় তবে শিশুর একাকীত্ব ও মানসিক সমস্যা দূর হওয়ার পাশাপাশি মানসিক বিকাশও ঘটবে।

Goofi সিরিজের অন্যান্য বইগুলো দেখতে ক্লিক করুন  

খেলতে খেলতে বিজ্ঞান শেখার জন্য সহায়ক ‘বিজ্ঞানবাক্স’র প্যাকেজগুলো দেখুন 

শিশু-কিশোরদের উপযোগী বইগুলো দেখুন 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading