কর্মক্ষেত্রে পরচর্চা এড়িয়ে চলার কার্যকর ৪ উপায়

gossip-illustration-one-excited-girl-whispers-secret-girlfriend_176448-122

আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি কি আপনার কর্মক্ষেত্রে আপনার সহকর্মীদের সম্পর্কে পরচর্চা বা গসিপ করেন?

আপনি হয়ত অপমানিত বোধ করবেন এবং একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বলবেন “অবশ্যই না”।  কিন্তু আপনাকে যদি এই প্রশ্নটি করা হয় যে, আপনার কর্মক্ষেত্রে আপনি এমন কোনো আলাপচারিতায় অংশ নিয়েছেন কি না যেখানে যে ব্যক্তিকে নিয়ে কথা হচ্ছে তিনি অনুপস্থিত অথবা অফিসে তিন-চার জন সহকর্মী একসাথে বসে অন্য একজনের সম্পর্কে বা তার কোনো কাজ নিয়ে কথা বলেছেন কি না ঐ ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে?

স্বাভাবিকভাবে আপনার উত্তরটি হবে, এটা তো নিত্যকার দিনের ব্যাপার আমরা প্রায় সবাই কর্মক্ষেত্রে এই কাজটা হরহামেশা করে থাকি। পরিসংখ্যান বলে শুধু আপনি একা নন অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এই একই উত্তর দিয়ে থাকেন। আপনি জানেন কি?  আপনি বা কর্মক্ষেত্রে যারা এই ধরণের কাজ করে তারা সবাই পরচর্চা করছেন যা একটি আদর্শ কর্মস্থলের বিষফোঁড়া। অবাক হচ্ছেন? তাহলে চলুন জেনে নেয়া যাক কর্মক্ষেত্রে “পরচর্চা বা গসিপ” কাকে বলে।

গবেষক ন্যান্সি কুর্ল্যান্ড এবং লিসা হোপ পোলেদ তাদের এক গবেষণাপত্রে পরচর্চা বা গসিপের সংজ্ঞায়নে বলেছেন, “কর্মক্ষত্রে পরচর্চা বা গসিপ বলতে এমন একটি অনানুষ্ঠানিক ও মূল্যায়নমূলক আলাপচারিতা বুঝায় যা সংগঠিত ঐ সংস্থার গুটিকয়েক কর্মীর মাধ্যমে অন্য এক সদস্য সম্পর্কে যখন সে অনুপস্থিত থাকে।” তাহলে এটা সহজেই অনুমেয়  কম-বেশি প্রতিটা কর্মী তাদের কর্মস্থলের পরর্চচার দুষ্ট চক্রে আবদ্ধ।

কেন কর্মস্থলে পরচর্চা পরিহার করবেন?

ঝামেলাপূর্ণ, বিষাদগ্রস্ত, এবং বিরক্তিকর একটা জীবন কিন্তু কেউ-ই চায় না। তবুও, মানুষের জীবনজুড়ে হাহাকার, বিষাদে ভরপুর, কর্মক্ষত্রের অশান্তি যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কখনও ভেবেছেন কেন আপনার কর্মক্ষেত্রের চাপ, অশান্তি আপনার জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে? কখনও ভেবেছেন কেন-ই বা আপনার সহকর্মীর প্রমোশনে আপনার মুখে হাসি ফুটলে অন্তরে হিংসে হয়?  কেন-ই বা মানুষ পরচর্চা করে থাকে?

কারণ, পরচর্চা হল মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েল মেডিকেল কলেজের গবেষক, মনোবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক ডা. পেগি ড্রেস্লার লিখেছেন যে “নৃতাত্ত্বিকরা বলেছেন যে মানব ইতিহাসে গসিপ বা পরচর্চা অন্যদের সাথে বন্ধুত্ব করার এক উপায় ছিল, এমনকি যারা এই গোষ্ঠীটিকে সমর্থন করছেন না তাদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার জন্যও মানুষ গসিপ বা পরর্চচা করে থাকে। “

পরচর্চা ব্যক্তি কিংবা সংস্থার কোনো উপকারে আসে না বরং এটা পারস্পরিক আস্থার ক্ষয়, মনোঘাত, ব্যক্তির মনোবল হ্রাস, ব্যক্তিগত এবং পেশাদার বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস, উদ্বেগ, বিভাজন এবং হতাশার সৃষ্টি করে একটি সংস্থার সদস্যদের মধ্যে এবং যার খেসারত দিতে হয় ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক শান্তি বিনষ্টের মধ্য দিয়ে।

চলুন দেখা যাক কর্মক্ষেত্রে পরচর্চা পরিহার করার ৪টি  কার্যকরী উপায়

১. পরচর্চাকে নিছক আলাপ বলা পরিহার করুন

একটি সমস্যার সমাধানের প্রথম ধাপটি হল সমস্যাটা চিহ্নিতকরণ। আপনি একটি জিনিসকে যদি সমস্যা বা বাধা হিসেবে মনে-ই না করেন তাহলে তার সমাধান কোনোভাবেই সম্ভবপর হবে না। আপনি যে আলাপচারিতায় অংশ নিচ্ছেন সেখানে কি আপনি কোনো কাজের গঠণমূলক সমোলোচনা করছেন বা কোনো কিছুর সমাধান নিয়ে কাজ করেছেন?  যদি না করে থাকেন তাহলে উক্ত আলাপচারিতাকে আপনি নিছক আড্ডা বলে চালানো বন্ধ করুন। আপনি যেটাকে নিছক আড্ডা বলছেন আসলে এটা একজন ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তাকে নিয়ে করা পরচর্চা। এই অভ্যাসটি পরিহার করুন এবং এর পরিবর্তে গঠনমূলক আলোচনা, সমস্যার বুদ্ধি-দীপ্তক সমাধান ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে আলাপ করুন যা আপনার সংস্থার সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

২. সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করুন নিজের অভিমত নিয়ে নয়

নিজেকে প্রশ্ন করুন অপর একজন মানুষের যে ব্যবহার আপনি নিজে পর্যবেক্ষণ করেছেন তা নিয়ে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির সাথে আলোচনা করার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি না! আপনি অন্য মানুষ সম্পর্কে কি চিন্তা করছেন তা ঠিক কি না ভুল এটা যাচাই করার জন্য অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে আলোচনায় বসবেন না। কারণ, এটা আপনাকে পরচর্চার দিকে ঠেলে দিবে। তাই, সমস্যা নিয়ে কথা বলুন এবং খুঁজুন তার যৌক্তিক সমাধান, পরিহার করুন নিজের অভিমত নিয়ে অযথা আলাপচারিতা।

৩. আপনার সম্পর্কে অভিযোগ জানাতে অন্যদের উৎসাহিত করুন

ইংরেজিতে একটা টার্ম আছে “Tell Me First” অর্থাৎ আপনার সম্পর্কে যদি কারো অভিযোগ থাকে সবার আগে যেন ঐ অভিযোগটা আপনাকে জানানো হয়। আপনি আপনার কর্মক্ষেত্রে এই বিষয়টি স্পষ্ট করে দিন যে আপনি এই রীতিতে বিশ্বাসী। আপনি নিজের সহকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে উৎসাহিত করুন এই কাজে। কেউ যখন অন্য কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে কোনো অভিযোগ নিয়ে আপনার সাথে আলাপ করতে আসবে তখন তাকে এই রীতির কথা মনে করিয়ে দিন এবং জিজ্ঞেস করুন সে অভিযুক্ত ব্যক্তিটিকে সরাসরি উক্ত অভিযোগটি জানিয়েছে কি না।

৪. আপনার চারপাশে গঠনমূলক সমোলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করুন

আপনি যদি আপনার চারপাশে গঠনমূলক সমোলোচনার (উভয়ই ইতিবাচক এবং নেতিবাচক) পরিবেশ সৃষ্টি না করেন বা গঠনমূলক সমোলোচনাকে উৎসাহিত না করেন তাহলে আপনার সহকর্মী ও সংশ্লিষ্ট লোকেরা অভিযোগ, হতাশা, ও উদ্বেগ প্রকাশের জন্য বিকল্প উপায়ের সন্ধান করবে। যা নিশ্চিতভাবেই পরচর্চা বা গসিপের সৃষ্টি করবে। তাই সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদনে বা মিটিংয়ে সদস্যদের গঠণমূলক সমোলোচনাকে উৎসাহিত করুন। পারস্পরিক ইতিবাচক এবং নেতিবাচক সমোলোচনার পরিবেশ বজায় রাখুন।

পরিশেষে এটা সহজেয় অনুমেয় যে গসিপ বা পরচর্চা একটি ধ্বংসাত্মক যোগাযোগ পদ্ধতি যা ব্যক্তি, দল বা পুরো সংস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই প্রক্রিয়া রোধে ওপরোক্ত কার্যকর পদ্ধতিগুলো হতে পারে আপনার অন্যতম সহায়ক।

ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায় নেতৃত্ব দক্ষতা বাড়াতে যে বইগুলো পড়া উচিৎ

*লিখেছেনঃ তারিফুল ইসলাম

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading