গণিত অলিম্পিয়াডের আদ্যোপান্ত

math olympiad

১৯৯৪ সাল। সদ্য দেশে ফিরে এসেছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল। প্রফেসর মোহাম্মদ কায়কোবাদ এসেছেন তার বাসায়। অল্প দুই-চারটি কথা বলার পরই হঠাৎ মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলে উঠলেন, ‘বুঝলেন জাফর ভাই, পৃথিবীর সব দেশের ছেলেমেয়েরা ইন্টারন্যাশনাল ম্যাথ অলিম্পিয়াড-এ যায়, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা যেতে পারে না। আমাদেরও যেতে হবে!’

মুহম্মদ জাফর ইকবাল গণিত অলিম্পিয়িাডের শুরুর কথা লিখতে গিয়ে উপরের ঘটনাটা উল্লেখ করে লিখেন “সেই থেকে শুরু। একটা দেশ থেকে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে কীভাবে টিম পাঠাতে হয়, সেই টিম কীভাবে তৈরি করতে হয়; আমরা তার কিছুই জানি না! প্রথমে চেষ্টা করা হল, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগকে দিয়ে। সেখানকার প্রফেসর গৌরাঙ্গ দেব রায় আমার খুবই বন্ধু মানুষ। তাকে নিয়ে নানা জায়গায় চিঠিপত্র লেখা হল, যোগাযোগ করা হল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই করা গেল না। এভাবে বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে।

তখন একদিন প্রফেসর কায়কোবাদ এবং আমি ভাবলাম, সত্যিকারের গণিত অলিম্পিয়াড যদি শুরু করতে নাও পারি; এদেশের ছেলেমেয়েদের গণিতে উৎসাহী করতে শুরু করে দিলে কেমন হয়? আমরা ঠিক করলাম, কোনো একটা পত্রিকায় আমরা প্রতি সপ্তাহে পাঁচটা করে গণিতের সমস্যা দেব- ছেলেমেয়েরা সেগুলো করবে, গণিতকে ভালোবাসবে।

পরিকল্পনা করে আমরা আর দেরি করলাম না, দু’জনে মিলে তখন-তখনই প্রথম আলো অফিসে হাজির হয়ে সম্পাদক মতিউর রহমানকে বললাম, আপনারা পত্রিকায় বিনোদনের জন্য খেলাধুলার জন্য কতকিছু করেন! গণিতের জন্য একটা কিছু করবেন? সপ্তাহে একদিন পত্রিকার এক কোনায় ছোট একটু জায়গা দেবেন, সেখানে আমরা পাঁচটা করে সমস্যা দেব! সেটাই হবে আমাদের গণিত অলিম্পিয়াড।”

নিউরনে অনুরণন

প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান সেদিন সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। ২০০১ সালের ১৭ জুন প্রথম প্রথম আলোর বিজ্ঞান বিষয়ক সাপ্তাহিক আয়োজন বিজ্ঞান প্রজন্ম পাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় নিউরনে অনুরণনপ্রথম আলো রেডিক্যাশ গণিত অলিম্পিয়াড। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ নিউরনে অনুরণন পরিচালনার দায়িত্ব নেন। এছাড়া সামগ্রিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নেন মুনির হাসান।  প্রথম আলোর বিজ্ঞান প্রজন্ম পাতায় প্রতি সপ্তাহে পাঁচটি করে গণিতের সমস্যা ছাপানো শুরু হয়। সমস্যাগুলোর সঠিক সমাধান কখনো প্রকাশ করা হয় না। নিউরনে অনুরণন-এর প্রথম সমস্যাটি ছিল এরকম- একজন লোক তার বাড়ি থেকে উত্তরদিকে দশ মাইল গিয়ে একটা ভালুকের মুখে পড়ল। অনেক কষ্ট করে ভালুকের কবল থেক মুক্তি পেয়ে প্রথমে দশ মাইল দক্ষিণদিকে, তারপর আবার পূর্বদিকে দশ মাইল গিয়ে তার বাড়িতে ফিরে এলো। ভালুকের গায়ের রং কী?

নিউরনে অনুরণন
BUY NOW

প্রথম অলিম্পিয়াড

দেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ের গণিত অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয় ২০০৩ সালে। বাংলাদেশ গণিত সমিতির অনুমতিক্রমে ৩১ জানুয়ারি ও ১লা ফেব্রুয়ারি, দুই দিনের এই উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে। সামগ্রিকভাবে অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক ছিল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ১০৫ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫০-এর অধিক শিক্ষার্থী প্রথম বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করে।

আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড (আইএমও)- এ বাংলাদেশ

দুই ধাপে শুরু অনুষ্ঠিত হয় গণিত অলিম্পিয়াড। প্রথমে বিভাগীয় পর্যায়ে। তারপরে সেখানকার বিজয়ীদের নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের গণিত অলিম্পিয়াড। জাতীয় পর্যায়ের বিজয়ীদের থেকে নির্বাচিতদের নিয়ে করা হয় গণিত ক্যাম্প, সেখান থেকে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (আইএমও) অংশ নিতে বাংলাদেশ দলের সদস্য নির্বাচন করা হয়। আইএমওর নিয়ম অনুযায়ী, প্রথম বছর বাংলাদেশ দল অংশগ্রহণ করে পর্যবেক্ষক দল হিসেবে। সেবার মুনির হাসান একাই গিয়েছিলেন। ২০০৫ সালে যায় বাংলাদেশের প্রথম দল। সে বছর বাংলাদেশ দলের মোট নম্বর ছিল ৩। ২৫২ নম্বরের মধ্যে মাত্র ৩। আয়োজক কমিটিতে অন্য কেউ থাকলে হয়তো হতাশ হয়ে সবকিছু বন্ধ করে দিতেন। কিন্তু জাফর ইকবাল, কায়কোবাদ ও মুনির স্যাররা সাধারণ কেউ নন বলেই রচিত হলো ভিন্ন ইতিহাস।  ২০১৮ সালে বাংলাদেশ আইএমও দলের মোট নম্বর ছিল ১১৪। ৩ থেকে ১১৪। এই বিশাল পার্থক্য এক দিনে আসেনি, এসেছে ধারাবাহিকভাবে নিয়মিত উন্নতির মাধ্যমে।

২০০৬ সালে বাংলাদেশ দলের পক্ষে প্রথম একটি সমস্যা সম্পূর্ণভাবে সমাধান করেন শহীদুল ইসলাম। ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো আইএমওতে বাংলাদেশের পক্ষে সামিন রিয়াসাত এবং নাজিয়া চৌধুরী ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেন।[ ২০১২ সালে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম রৌপ্য পদক অর্জন করেন ধনঞ্জয় বিশ্বাস। আর ২০১৮ সালের বাংলাদেশের হয়ে প্রথম স্বর্ণ পদক অর্জন করেন আহমেদ জাওয়াদ চৌধুরী।

গণিত অলিম্পিয়াডের সময়

ডিসেম্বর মাস থেকে দেশব্যাপী শুরু হয় গণিত অলিম্পিয়াডের আয়োজন। মোট চারটি ক্যাটাগরিতে গণিত অলিম্পয়াডে অংশগ্রহণ করে শিক্ষার্থীরা। প্রাইমারি ক্যাটাগরিতে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি, জুনিয়র ক্যাটাগরিতে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম, সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে নবম-দশম এবং হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। প্রথম পর্যায়ে হয় বিভাগীয় উৎসব। এ জন্য কতগুলো অঞ্চলে ভাগ করা হয় সারা দেশকে। একটি করে বিভাগীয় উৎসব হয় প্রতিটি অঞ্চলে।

বিভাগীয় পর্যায়ের বিজয়ীরা এসে অংশগ্রহণ করে জাতীয় উৎসবে। সারা দেশের সব বিজয়ীর মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় আরেকটা পরীক্ষা। প্রাইমারির শিক্ষার্থীদের জন্য দুই ঘণ্টা, জুনিয়রের শিক্ষার্থীদের জন্য তিন ঘণ্টা, সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারির শিক্ষার্থীদের জন্য চার ঘণ্টার এ পরীক্ষা হয় উৎসবের প্রথম দিনে। জাতীয় উৎসবের বিজয়ীদের নিয়ে এরপরে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় ক্যাম্প। আবাসিক এই ক্যাম্পে কখনো টানা ৫ দিন, কখনোবা টানা ৭ দিন, আবার কখনো টানা ১০–১২ দিন ধরে চলে গণিত অনুশীলন। ক্যাম্পের ট্রেইনার এবং ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে থাকেন গণিত অলিম্পিয়াডেরই পুরোনো ক্যাম্পের সদস্যরা। জাতীয় ক্যাম্পের আরও পরে অনুষ্ঠিত হয় এক্সটেনশন ক্যাম্প এবং তারপরে আইএমও ক্যাম্প। আইএমও ক্যাম্পের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে গঠন করা হয় ছয় সদস্যবিশিষ্ট আইএমও দল।

প্রতিযোগিতার খবরাখবর রাখতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা (খবরাখবর ও প্রস্তুতি) বইটি সংগ্রহে রাখা যেতে পারে।

 প্রস্তুতি

বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড-এর একাডেমিক কাউন্সেলর কামরুজ্জামান কামরুল অলিম্পিয়াডের প্রস্তুতি সম্পর্কে লিখেন  “গণিত অলিম্পিয়াডের প্রস্তুতি  নিতে চাইলে ধাপে ধাপে এগোতে হবে সবাইকে। যারা আগে কখনোই গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করেনি তাদের জন্য পরামর্শ হচ্ছে, একদম শুরুতে নিজের বই সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা থাকা, পাশাপাশি নবম-দশম শ্রেণির জ্যামিতি বই পুরোটা পড়ে ফেলতে হবে। এ ছাড়া অনলাইনে Kushtia Math Circle–এর ওয়েবসাইটে অনেক নোট এবং প্রবলেম সেট দেওয়া আছে, এগুলো পড়তে পারো। পাশাপাশি গণিত অলিম্পিয়াডের আগের বছরগুলোর প্রশ্ন ডাউনলোড করতে পারো ওয়েবসাইট থেকে। সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করাও প্রয়োজন। কেউ চাইলে AIME, NIMO, OMO থেকে সমস্যা সমাধান করতে পারো। সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা সমাধানের দর্শন বোঝার জন্য এবং ধারাবাহিকভাবে চিন্তাশক্তির উন্নয়ন করতে চাইলে মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং মুহাম্মদ কায়কোবাদের নিউরনে অনুরণন এবং নিউরনে আবারো অনুরণন বই দুটি পড়া মোটামুটি অপরিহার্য। বাড়তি প্রস্তুতি হিসেবে কেউ চাইলে দেখতে পারো brilliant.org বা expii.com ওয়েবসাইটের বিষয়গুলোও।

অলিম্পিয়াড
BUY NOW

পরের ধাপটা আরেকটু কঠিন। কিছু সমস্যা সমাধানভিত্তিক বই সম্পূর্ণ পড়ে ফেলতে হবে এ ধাপে। বাংলা বইয়ের মধ্যে প্রাণের মাঝে গণিত বাজে, একটুখানি গণিত, ম্যাথোস্কোপ খুবই চমৎকার বই শুরু করার জন্য। ইংরেজি বইয়ের মধ্যে ‘The Art & Craft of Problem Solving’, ‘104 Number Theory Problems’, ‘Principles & Techniques of Combinatorics’, ‘Plane Euclidean Geometry’—এইগুলো হচ্ছে একদম শুরুর দিকের বই। অলিম্পিয়াডের সমস্যাগুলো মূলত চারটি অংশ থেকে করা হয়, Algebra, Number Theory, Combinatorics ও Geometry। কাজেই পৃথকভাবে এই চারটি বিষয়ের জন্যই গড়ে তুলতে হবে দক্ষতা। আমাদের উপমহাদেশীয় অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা মূলত কারিকুলামের কারণেই জ্যামিতিতে স্বাভাবিকভাবে অধিকতর দক্ষ হয়ে থাকে। তাই আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অনেক দেশের চেয়ে জ্যামিতিতে আমাদের ফলাফল তুলনামূলকভাবে ভালো।”

এছাড়া ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ স্যারের যারা গণিত অলিম্পিয়াডে যাবে বইটিও পড়া যেতে পারে।  ২০১৮ সালে স্বর্ণজয়ী আহমেদ জাওয়াদ চৌধুরী  ও তার দলের সদস্য  তামজীদ মোর্শেদ রুবাব লিখিত  গণিতের স্বপ্নযাত্রা ২: গণিত অলিম্পিয়াডের প্রথম ধাপ বইটি সহায়িকা হিসেবে কাজে দিবে। । ক্লাস থ্রি থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত স্কুলের বাচ্চাদের জন্য গণিত অলিম্পিয়াড প্রস্তুতি এবং  জুনিয়র, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিডিএমও প্রস্তুতি  খুবই গুরুত্বপূর্ণ  চমৎকার সহায়িকা বই।

নিবন্ধন

চারটি ক্যাটাগরিতে গণিত অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়।
ক) প্রাইমারি: তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি বা সমমান এবং স্ট্যান্ডার্ড-৩ থেকে স্ট্যান্ডার্ড-৫।
খ) জুনিয়র: ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি বা সমমান এবং স্ট্যান্ডার্ড-৬ থেকে স্ট্যান্ডার্ড-৮।
গ) সেকেন্ডারি: নবম, দশম শ্রেণি ও এসএসসি পরীক্ষার্থী বা সমমান এবং ও–লেভেল এবং ও–লেভেল পরীক্ষার্থী।
ঘ) হায়ার সেকেন্ডারি: একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী বা সমমান এবং এ–লেভেল এবং ও-লেভেল পরীক্ষার্থী।

গণিত অলিম্পিয়াডের ওয়েব সাই‌টে (https://www.matholympiad.org.bd) গিয়ে অনলাইন গণিত অলিম্পিয়াডের নিবন্ধনের জন্য “নিবন্ধন” বোতামে ক্লিক করতে হবে। অনলাইনে নিবন্ধন করেছে এমন প্রত্যেকেই অনলাইন বাছাই পর্বে অংশগ্রহণ করতে পারবে।
বাছাই অলিম্পিয়াডে বিজয়ীদের নিয়ে আঞ্চলিক পর্ব আয়োজন করা হবে। বাছাই পর্ব থেকে নির্বাচিতরাই কেবলমাত্র আঞ্চলিক পর্বে অংশগ্রহণ করতে পারবে।
আঞ্চলিক পর্বের বিজয়ীরা জাতীয় গণিত উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত হিসেবে বিবেচিত হবে।

 গণিত শেখো, স্বপ্ন দেখো

গণিত অলিম্পিয়াডের স্লোগান—গণিত শেখো, স্বপ্ন দেখো। এই স্বপ্ন যাত্রায় তুমিও শামিল হতে পারো।  তবে আর দেরি কেন? শুরু হয়ে যাক স্বপ্নযাত্রা…

গণিত অলিম্পিয়াড সম্পর্কে আরও জানতে ক্লিক করুন

 

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading