সব কিছু কি আর চোখে দেখা যায়!

silence-on-mental-health

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা চোখে দেখা যায়। কিন্তু যদি এমন কোন সমস্যা হয় যা চোখে দেখা যায় না। বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখতে না পাওয়া প্রতিবন্ধকতার যন্ত্রণা অনেক তীব্র। ভয়ংকর। আমাদের পরিবারে অনেক শিশু কিশোর বড় হচ্ছে এই ধরনের সমস্যা নিয়ে । যাকে বলা হয়ে থাকে মনো-দৈহিক এবং আচরণগত প্রতিবন্ধকতা। ফলাফল শিশু কিশোর এর মানসিক এবং শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত। আমরা বুঝি না। বরং উল্টো রেগে যাই শিশু কিশোরটির উপড়ে। দোষ দেই যে, বংশের ধারা। অথবা বাবা মা ঠিক মত শাসন করছে না। তাই বেয়াদব হচ্ছে। অথবা বলি বাবা মায়ের আদর পেয়ে মাথায় উঠছে। কোন আদব কায়দা জানা নেই।

আবার কেউ কেউ নিজেকে আরও বেশী সমজদার চিন্তা করে মাথা নেড়ে খুব গম্ভীর ভাবে বলে ফেলে, হুম, খারাপ বাতাস লাগসে, কিছু একটা ভর করছে ওর উপড়ে। চিকিৎসা দিয়া কাম অইব না, ঝাঁর ফুক করাও, কবিরাজ দেখাও।

আসলেই কি তাই? কৈশোরের এই  মনো-দৈহিক এবং আচরণগত সমস্যা গুলি নিয়ে রচিত গবেষণা গল্প “প্রচ্ছন্ন কৈশোর”।

আমরা অনেকেই আমাদের শৈশব কৈশোরে বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠেছি। আমাদের সময়ে কখনো এই ধরনের কোন ডিসঅর্ডারের কথা শুনিনি। শৈশবে বা কিশোর বয়সে এইরকম কিছু হতে পাড়ে তাতো চিন্তাতেই আসেনি। আমাদের তো নাই। এমন কি আমাদের বাবা মায়েরও না। শুধু পরিচিত ছিলাম শারীরিক সুস্থতা এবং অসুস্থতা নিয়ে। কিন্তু এখন মনে হয় আমাদের সাথেও এইরকম অনেকেই ছিল। স্কুলে আমাদের সাথে একটি ছেলে পড়তো। আমাদের এক শিক্ষকের ছেলে। যার রেজাল্ট ছিল সবার শেষে। শুধু কি তাই? আমরা সেই সময়ে জানতাম যে শিক্ষকের ছেলে বলে তাকে প্রতিবছর পাশ করিয়ে দেয়া হয়। সে কোন কিছুই পারত না। তার আচরণ ও কেমন যেন ছিল। প্রায় ছেলেরাই তার সাথে বিভিন্ন ধরনের দুস্টামি করতো। এখন মনে হচ্ছে কি ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে সে তার কিশোর বয়সের সময় গুলি পাড় করতো। কথা বলার সময়ে মুখে আটকে যেতো। তা নিয়ে অন্য সবার সে কি হাসাহাসি। আহারে বেচারা। কতই না জানি কষ্ট ছিল মনে। কতই না জানি মন খারাপ হতো তার।

একটি ছেলে ছিল যে সারাক্ষন চিন্তা করতো কিভাবে অন্য আরেকজন কে বিপদে ফেলা যায়। কিভাবে নিজে দুস্টামি করে অন্য কারো নাম দিয়ে স্যার এর হাতে মাড় খাওয়ানো যায়। এটা এক দুইনের জন্য ছিল না। বছর জুড়ে সে একই কাজ করতো। একবার আমাদের এক সহপাঠী স্যার কে পড়া দেবার জন্য উঠে দাঁড়ালো। তার কিছুক্ষন আগেই দুপুরের টিফিন দেয়া হয়েছিলো সিঙ্গারা। তখনও সবাই খায়নি। সেই ছেলেটিও না। সে তার সিঙ্গারা থেকে আলু বের করে নিলো। তারপর যে ছেলেটি দাঁড়িয়ে স্যার কে পড়া দিচ্ছিল ঠিক তার বসার জায়গাতে সিঙ্গারা থেকে নেয়া সেই আলু গুলি রেখে দিলো। স্যার কে পড়া দেবার পড়ে সেই ছেলেটি বসে পড়লো ঠিক সিঙ্গারার আলুর উপড়ে। যেহেতু স্কুলের পোশাক ছিল সাদা, সিঙ্গারার হলুদ রঙের আলু একেবারে তার পেছনের দিকে যায়গা মত লেপ্টে গেলো। সাদা প্যান্টের উপড়ে হলুদ সিঙ্গারার চ্ছাপ। কেমন লাগছে দেখতে?

আরেকবারের কথা। তখন ঝর্ণা কলম ব্যাবহার হতো। সেই কলম ঝারা দিলেই কালি ছিটকে পড়তো। এক ছেলের সার্টে পেছনে থেকে কলমের কালি ইচ্ছে মত ঝেরে দিয়ে দৌড়। সাদা সার্টের উপড়ে কালির ছিটা। পুরো সার্ট টাই নষ্ট হয়ে গেলো। প্রায় সময়ে এক জনের বিরুদ্ধে আরেকজনের কাছে বলে বিভিন্ন সমস্যা তৈরি করে রাখতো। এক সময়ে তার নাম হয়ে গিয়েছিলো “জিলাপির প্যাঁচ”। এইরকম আরও কত ধরনের কত জন ছিল।

মন আমারও খারাপ হয়ে যেতো। সেই ছোট বেলা থেকেই। যখন প্রথম স্কুল শুরু করি সেই সময়ে থেকেই। নাহ ভুল বললাম। তারও আগে থেকে।

মনে পরে আমাদের পাড়ায় একটি নতুন পরিবার এলো। আমার বয়সী একটি ছেলেও আছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধু হয়ে গেলো। প্রতি বিকেলেই আমরা এক সাথে খেলি। ছুটির দিনে একসাথে ধর্ম সাগরে গোসল করতে যাই। বিকেলে আমরা খেলতে যেতাম ধর্মসাগরের পারে যে পার্ক ছিল সেখানে। পার্কে তখন অনেক বড় বড় গাছ গাছালীতে ভরা ছিল। দেখলেই মনে হতো প্রাচীন কালের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক একটা গাছ। একদিন বিকেলে খেলতে খেলতে চলে যাই পার্কের শেষ মাথায় যে বুড়ো বট গাছটি ছিল সেখানে। হঠাত করেই আমাদের সেই বন্ধুটি সেখানে শুয়ে পরে। কেমন যেন চোখ মুখ উলটে মুখে দিয়ে অদ্ভুত রকমের শব্দ করতে থাকে। আমরা ভয় পেয়ে যাই। বন্ধুদের কয়েকজন দৌড়ে ওর বাসায় খবর দেয়। কয়েকজন মিলে ধরে তাঁকে বাসায় নিয়ে আসা হয়। পরে শুনতে পাই ওর সাথে নাকি খারাপ বাতাস আছে। সেইদিন বিকেলে পার্কের সেই গাছ থেকে আরও বেশী করে খারাপ বাতাস লেগেছে। তারপর থেকে ভয়ে আমরা আর কেউ তাঁর সাথে খেলি না। সে খেলতে এলেও আমরা অন্যদিকে চলে যাই। অনেক দিন এসে সে বলতো যে, এই দেখো, -আমার সাথে তাবিজ আছে, তাবিজ থাকলে ওরা আর কাছে আসে না। কিন্তু আমরা তাকে দেখে ভয়ে দৌড়ে পালাতাম। প্রায়ই সে মন খারাপ করে জানালা দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকতো। এখন বুঝি কি কষ্ট নিয়ে সে তাঁর কৈশোর পাড় করেছে। আমাদের সমবয়সী আরেকটি মেয়ে ছিল আমাদের পাড়ায়। তাঁকে দোতলার একটা ঘড়ে সব সময়ে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। কারন তাঁর সাথে নাকি জিন আছে। আমরা মাঝে মাঝে লুকিয়ে দেখতে যেতাম। মাঝে মাঝে সে শেকল খুলে দৌড়ে বের হয়ে যেতো। আমাদের খেলার স্থানে চলে আসতো। আমরা তখন দৌড়ে পালাতাম। এরকমের আরও বেশ কিছু ঘটনা আমাকে তাড়া করে ফিরতো সবসময়ে।

শৈশব কৈশোর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াকালীন সময়ে বেশ কিছু সহপাঠীর আচরণ দেখে মনে হয়নি এরা স্বাভাবিক। এখন বুঝি এরা হয়তো কেউ কেউ attention deficit hyperactivity disorder (ADHD), oppositional defiant disorder (ODD), conduct disorder (CD), Obsessive-Compulsive Disorder (OCD), autism spectrum disorder (ASD) -জাতীয় কোন নিউরো-সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ছিল। অথবা ছিল gender identity disorder (GID)। একজন এর কথা মনে আছে যে কিনা সারাদিন পড়াশুনা করতো, অথচ পরীক্ষায় প্রতিবার ফেইল করতো কিংবা বিশেষ বিবেচনায় পাশ করানো হতো। সেই সময়ে জানতাম না learning disabilities যেমন dyslexia, dyscalculia, dysgraphia ইত্যাদি সম্পর্কে। সেই কৈশোর থেকেই শিশু কিশোরের এই ধরনের ডিসঅর্ডার বিষয়ে আমার কৌতূহল। তখন বুঝতাম না সঠিক ভাবে, তবে এতোটুকু বুঝতাম যে কোথাও একটা সমস্যা হচ্ছে। যখন খুব কাছের কয়েকজনের ঘটনার সামনে দাঁড়াতেই হয় আমাকে। তারপর থেকেই বিভিন্ন বাস্তব ঘটনা সংগ্রহ করে তা নিয়ে চলছে গবেষণা। সেই গবেষণার ছোট্ট আংশিক এক গল্প হল “প্রচ্ছন্ন কৈশোর”। যদি পাঠক মহল গ্রহন করে এই গবেষণা গল্প, তাহলে হয়তো এই গল্পের পরত্যেকটি চরিত্র নিয়ে প্রত্যেকটি ব্যাধির এক একটি নির্দিস্ট গল্প বই আকারে প্রকাশ করার উৎসাহ জাগবে।

মানব জীবনের বিভিন্ন বয়সের মনোদৈহিক আচরণগত বিভিন্ন সমস্যা এবং রোগের বর্ননা গল্পের মত করে বলে যাওয়া অনেক জটিল ব্যাপার। প্রচ্ছন্ন কৈশোর গল্পগ্রন্থে সহজ সরল ভাষায় বলার চেষ্টা করা হয়েছে মনোদৈহিক আচরণগত বিভিন্ন সমস্যার গল্প। শুধু মাত্র আমাদের নিজেদেরকে সচেতন করার অভিপ্রায়ে নিজের আগ্রহে মনোদৈহিক আচরণগত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে এই গবেষণাগল্প।

এই আচরণগত, মনো-দৈহিক ব্যাধি (disorder/ডিসঅর্ডার) সমূহ বর্ননা করা হয়েছে Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders, 5th Edition (DSM-5) এর উপর ভিত্তি করে। DSM – হল American Psychiatric Association (APA) থেকে প্রকাশিত একটি নির্দেশিকা যা আচরণগত, মনো-দৈহিক ব্যাধি (disorder/ডিসঅর্ডার) সমূহ নির্নয়ে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশু কিশোরদের বিঘ্নিত মনোদৈহিক আচরণ এবং মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সাধারণ মানুষের জ্ঞান খুবই অল্প। আবার অন্যভাবে বলা যায় খুব অল্প সংখ্যক  মানুষের এই বিষয়ে জ্ঞান আছে। “প্রচ্ছন্ন কৈশোর” বইটিতে বেশ সাবলীল সহজ স্বাভাবিক ভাষায় কিছু জটিল বিঘ্নিত মনোদৈহিক আচরণ এবং মানসিক প্রতিবন্ধকতার  কেইস স্টাডি তুলে ধরা হয়েছে। কেইস স্টাডি গুলি কখনো কথা বলছে কিশোর নিজে, কখনো কিশোরের বাবা-মা এবং সেই সাথে আলোচনা করা হয়েছে কেন হয়, ঝুঁকি কি এবং এই ক্ষেত্রে সাধারণ পেরেন্টিং কিভাবে করতে হবে।

এই পৃথিবীতে শৈশব কৈশোরের বিঘ্নিত আচরণ খুবই কমন একটি ঘটনা।

জন্মগত কারনে মানব শিশুর মস্তিস্কে কেমিক্যাল ইম্ব্যালেন্স হতে পারে। অথবা শৈশব কৈশোরের ভয়ংকর কোন অভিজ্ঞতা থেকে অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারে। আমরা বুঝতে পারি না তাই উল্টো রেগে যাই শিশু কিশোরটির উপড়ে। কোন ধরনের চিকিৎসা করাই না মনে করি উচ্ছন্নে যাচ্ছে।

আমার বিশ্বাস এই বইটি পড়লে পাঠক অবশ্যই অনেক কিছুই জানতে পাড়বে এবং মনোদৈহিক বিঘ্নিত আচরণ এবং মানসিক প্রতিবন্ধকতা বা মানসিক রোগে আক্রান্ত শিশুকিশোরদের সাথে ভালো ব্যাবহার করতে উতসাহিত করবে। শিশু কিশোর আমাদের ভবিষ্যৎ এবং গর্ব। পৃথিবীতে প্রতিটি শিশু কিশোর প্রত্যাশা করে ভালবাসাময় আদর এবং যত্নে তাদের শৈশব এবং কৈশোর রঙিন থাকুক। হোক না সে মানসিক ভাবে প্রতিবন্ধক।

আমরাই পারি তাদের সুস্থ জীবন এবং আনন্দ দিতে।  যে কিশোরদের গল্প এখানে বলা হয়েছে তাদের কাউকে কি আমি চিনি? অথবা আমাকেই আমি!

কিছু অংশ পড়েদেখুনঃ ড. মাসুম আহ্‌মেদ পাটওয়ারীর লেখা বই প্রচ্ছন্ন কৈশোর

rokomari

rokomari

Published 29 Jan 2018
Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Loading