অবিশ্বাস্য মহাবিশ্ব কিংবা গল্পে গল্পে জ্যোতির্বিজ্ঞান

2021-10-16 মহাবিশ্ব কী অবিশ্বাস্য - আলী হাসান

মহাবিশ্ব কী অবিশ্বাস্য! শিরোনাম দেখেই বইটি পড়তে মন ইচ্ছে করছে, তাই না? ‘মহাবিশ্ব কী অবিশ্বাস্য’ এমন একটি উপযুক্ত ও কাব্যিক নাম যা যে কোনো লেখক বা বইয়ের জন্য ঈর্ষণীয়। আলী হাসান এমনই একটি বইয়ের গর্বিত লেখক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পর্দাথ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে তিনি অধ্যাপনা করছেন। মহাবিশ্ব কী অবিশ্বাস্য বইটির ইতিমধ্যেই তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। এ থেকে বোঝাই যায় যে বর্তমান সময়ের পাঠক মহাবিশ্ব সম্পর্কে কতোটা আগ্রহী!

মহাবিশ্ব নিয়ে বিভিন্ন লেখকের বই রয়েছে। কিন্তু আলী হাসানের বইটি কেন পাঠক প্রিয়? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে প্রথমে বলা যায় যে, বইটি পড়লেই বোঝা যায় যে, কেন পাঠকপ্রিয়। আর দ্বিতীয়ত বলা যায় এ বইটি একটি ব্যতিক্রমী ও বিপুল তথ্য উপাত্ত সম্মৃদ্ধ একটি বই। ১২৮ পৃষ্ঠার বইটিতে লেখক খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, সরল গদ্যে ও গল্পের মতো উপস্থাপন করেছেন এই বিশাল, বিপুল, অজেয় মহাবিশ্বকে

BUY NOW

মহাবিশ্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ছোটদের উপযোগী করে লেখা মোট সতেরটি প্রবন্ধ রয়েছে এ বইটিতে। বইটির প্রথম প্রবন্ধ ‘যেভাবে পাওয়া গেল বিশ্বকাঠামো’ দিয়ে শুরু করেছেন লেখক। শিরোনামই বলে দিচ্ছে এ প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে। এছাড়াও মহাবিস্ফোরণ থেকে মহাবিশ্ব, তারার জন্ম, নীহারিকা থেকে সূর্য, অতঃপর…, গ্রহ-উপগ্রহের জন্ম, সূর্য যে পরিবারের কর্তা, চাঁদের কিস্সা, মহাকাশের ভূত―ধূমকেতু, খসেপড়া তারার রহস্য, কৃষ্ণবিবর―এক মহাভয়ঙ্কর মৃত্যুফাঁদ, মহাজাগতিক ঘড়ি―পালসার, রহস্যময় নক্ষত্র―কোয়াসার, পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাব, রহস্যাবৃত তুঙ্গুস্কা বিস্ফোরণ, আইনস্টাইন-এর তত্ত্ব কি ভুল, হিগস-বোসন থেকে ঈশ্বরকণা, ভূমিকম্প শিরোনামের প্রবন্ধগুলো রয়েছে।

যতদূর জানা যায়, ব্যাবিলনীয়দের মাধ্যমে মহাকাশ বিষয়ে আধুনিক চিন্তা-ভাবনার উন্মেষ ঘটে। তারাই প্রথম নক্ষত্রের তালিকা তৈরি এবং গ্রহগুলো কীভাবে চলাফেরা করে তার হিসাব কষতে শুরু করে। ওই ব্যাবিলনীয়দের অধিকাংশ ছিল পুরোহিত। তারা পুরোহিতের ধ্যান-ধারণার আলোকে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, জগৎ চালায় দেবতারা। কোন নক্ষত্র কখন কোথায় উঠবে, দেবতাদের কৃপায় (তাদের ধারণায়) তা-ও তারা অনুমান করতে পারত। কিন্তু বলতে পারত না, গ্রহ-নক্ষত্রগুলো কেন স্থান পরিবর্তন করে, কেন চাঁদ-সূর্যকে বড় আর তারাগুলোকে ছোট দেখা যায় ইত্যাদি। এসব ব্যাখ্যা করার মতো কোনো তত্ত্ব তাদের ছিল না; ছিল শুধু পর্যবেক্ষণনির্ভর বর্ণনা। কিন্তু বিজ্ঞানে শুধু বর্ণনা দিয়ে কাজ চলে না, প্রয়োজন হয় তত্ত্ব গঠন ও ব্যাখ্যার। তত্ত্ব গঠনের কাজ প্রথম শুরু করে গ্রিকরা। গ্রিকদের পুরাণের অভাব ছিল না, কিন্তু তারা পৌরাণিক উপকথার সাহায্যে বিশ্বকে বর্ণনা করত না, করত বিশ্ব-কাঠামো কল্পনা করে। গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি তারা উদ্ভাবন করেছিল এক ধরনের জ্যামিতিক বিশ্বকাঠামো

BUY NOW

আমাদের বাসস্থান পৃথিবীও একটি গ্রহ। পৃথিবী তার নিকটবর্তী আরও সাতটি গ্রহ, কিছু উপগ্রহ, কয়েকটি বামন গ্রহ, উল্কা, ধূমকেতু ইত্যাদি নিয়ে মহাবিশ্বের অত্যন্ত ক্ষুদ্র যে অঞ্চলটিতে অবস্থান করছে তার নাম সৌরজগৎ (Solar System)-এর কেন্দ্রে রয়েছে সূর্য। সূর্য একটি নক্ষত্র বা তারা (Star)। মেঘমুক্ত রাতের আকাশে যে অসংখ্য আলোর টুকরোকে ঝলমল করতে দেখা যায় সেগুলোই তারা। যতই এলোমেলো দেখাক না কেন নক্ষত্রগুলো বিভিন্ন গুচ্ছ-উপগুচ্ছে বিভক্ত। নক্ষত্রের এরকম একটি গুচ্ছকে বলে গ্যালাক্সি। সৌরজগৎ যে গ্যালাক্সির সদস্য তার নাম ‘ছায়াপথ গ্যালাক্সি’। ইংরেজিতে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি (Milkway Galaxy)। এর আরও কয়েকটি নাম আছে: আকাশগঙ্গা, সুরগঙ্গা, স্বর্গগঙ্গা ইত্যাদি।

আমাদের পরিচিত সৌরজগতের গ্রহ-উপগ্রহগুলোর গঠন উল্লেখিত প্রক্রিয়াতেই হয়েছে বলে এখন পর্যন্ত বিশ্বাস করা হচ্ছে। বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা এবং ঘটনা পর্যবেক্ষণে বিশ্বাসের সত্যতা মিলেছে। পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪ কোটি ষাট লক্ষ বছর। ‘অ্যাপোলো অ্যাসট্রোনট’ এবং মনুষ্যহীন সোভিয়েত মহাশূন্যযান দ্বারা সংগৃহীত চাঁদের মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তার বয়সও প্রায় পৃথিবীর বয়সের সমান। অতএব, বিষয়টি আলোচিত মতবাদকে পূর্ণমাত্রায় সমর্থন দেয়। গ্রহ-উপগ্রহ গঠনে সূর্যের তাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রচ- তাপের প্রভাবে সূর্যের নিকটবর্তী গ্রহসমূহে বরফ জমতে পারেনি। তাই অপেক্ষাকৃত নিকটবর্তী গ্রহ বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গলের দেহ প্রধানত শিলা এবং ধাতব পদার্থ দ্বারা গঠিত। আর দূরবর্তী গ্রহ বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনের দেহ গ্যাসীয় এবং এ গ্যাসীয় উপাদানের সাথে প্রচুর বরফও জমা আছে।

BUY NOW

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জে বি বার্নেল এবং তার সহকর্মী অ্যান্টনি হিউইস দূর-আকাশে দুরবিন তাক করে রাতের পর রাত দূরবিশ্বের জ্যোতিষ্কের সন্ধান করতেন। ১৯৬৭ সালের ২৮শে নভেম্বর, সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী এমন এক বিরতিযুক্ত আলোক উৎস তাঁদের দুরবিনে ধরা পড়ল, যা তাঁদেরকে শুধু চমৎকৃতই করল না রীতিমতো বিপাকেও ফেলল। তাঁদের মনে হলো―দূরজগৎ থেকে বুদ্ধিমান প্রাণীরা হয়তো পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে সংকেত পাঠাচ্ছে। তবে কাজের কাজ একটি হলো; পর্যবেক্ষণে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে লাগল উৎসগুলোর নানা অজানা তথ্য।

আমাদের বাসভূমি পৃথিবীর বয়স ৪৫০ কোটি বছরের কিছু বেশি। এ বিষয়ে সকল বিজ্ঞানীই একমত। এ সুদীর্ঘ সময়ের প্রারম্ভে পৃথিবীর যে পরিবেশ ছিল তার সাথে বর্তমান পরিবেশের ব্যাপক ব্যবধান। মহাবিস্ফোরণের কোটি কোটি বছর পর সূর্যের চারপাশে যে গ্যাসীয় মেঘ অবশিষ্ট ছিল তারই একটি অংশ ধাপে ধাপে ঘনীভূত হয়ে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের সুজলা-সুফলা এই নয়নাভিরাম পৃথিবীতে পরিণত হয়েছে। প্রথমে গ্যাসীয় পদার্থের কণাসমূহ মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে ধীরে ধীরে পরস্পরের কাছে আসতে শুরু করে এবং নানা জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভ্রুন-পৃথিবীর জন্ম হয়। সম্ভবত এ সময় থেকেই পৃথিবীর বয়সের হিসাব ধরা হয়। কিন্তু গ্যাসীয় অবস্থা থেকে ওই ভ্রুন অবস্থায় আসতে কত সময় লেগেছিল তার সঠিক হিসাব পাওয়া কষ্টকর।

বইটিতে লেখক আলী হাসান পিথাগোরাস, প্লেটো, ইউডোক্সাস, অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে স্টিফেন হকিং পর্যন্ত এসে থেমেছেন। মহাবিশ^ নিয়ে এই সকল মহাজ্ঞানীদের কর্মযজ্ঞের কথা তিনি তার ভাষায় প্রকাশ করেছেন। মহাবিস্ফোরণ থেকে মহাবিশ^, তারার জন্ম, নীহারিকা থেকে সূর্য, অতঃপর…, চাঁদের কিস্সা প্রবন্ধগুলো দিয়ে ধাপে ধাপে এগিয়েছেন আলী হাসান। এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বিশ্লেষণধর্মী লেখাগুলো সুক্ষè ও সচেতনভাবে সাজিয়েছেন, যা যেকোনো বয়েসী পাঠকের জন্য প্রযোজ্য।

মহাবিশ্ব সৃষ্টির বিজ্ঞানভিত্তিক তত্ত্ব মেনে নেয় যে, হিগস-বোসনের দ্বারা গঠিত হিগসক্ষেত্রের কারণেই সৃষ্টি হয়েছে মহাবিশ্ব। সে-বিবেচনায় কেউ কেউ ওই কণাটিকেই (হিগস-বোসন) ঈশ্বর ভাবলে ভাবতে পারেন। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞান মোটেও এ ভাবনাকে উৎসাহিত করে না। তাহলে ঈশ্বরকণা নামটি এলো কোথা থেকে? খুব স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন, উত্তরও অস্বাভাবিক কিছু না। তবে শব্দটি প্রচলিত হওয়ার সাথে ছোট্ট একটি ঘটনা আছে। ১৯০০ সালের দিকে হিগস-বোসনের সন্ধান সম্পর্কে একটি বই লিখেন নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ লিওন লেডারম্যান। তিনি বইটির নাম দেন The God Particle: If the Universe Is the Answer, What Is the Question? দুর্বোধ্য, বিশাল এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার শঙ্কা করে প্রকাশক রাজি হলেন না ওই নামে বই প্রকাশ করতে। বিরক্ত লেডারম্যান। কিছুটা রাগতস্বরে বললেন, তা হলে কি Goddamn Particle রাখলে আপনি খুশি হন? তবে রাখেন The Goddamn Particle। গড-ড্যাম পারটিকল, অর্থাৎ ঈশ্বর-নিকুচি কণা। প্রকাশক ভালো কাটতির প্রত্যাশায় এটিকে সামান্য ছেঁটে বানালেন The God Particle। নামটি প্রচারমাধ্যমের সৌজন্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল এবং হিগস-বোসন কণা নামধারণ করল ঈশ্বরকণা।

এ বইটি পড়তে পড়তে মনে হবে যেন পাঠক মহাবিশ্ব  ভ্রমণ করছেন। এই যে, আমাদের মাথার ওপর দিনে রাতে চাঁদ- সূর্যের উদয় অস্ত এর বাইরের যে কতো কী কী আছে তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। আর যা কিছু আবিষ্কার হয়েছে তাও যেন বিশ্বাস হয় না। বিজ্ঞান, ধর্ম, রাজনীতি ও নানা কুসংস্কার সব মিলিয়ে মহাবিশ্ব একটি আলোচিত ও বিস্ময়কর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে হাজার হাজার বছর ধরে। মহাবিশ্বের নানা ছবি যুক্ত করা হয়েছে লেখার সাথে। বইটির সংস্করণ যত বাড়বে ততই পাঠকের কৌতুহল মিটবে।

বইটির লেখক আলী হাসান টাঙ্গাইল জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের থানা নাগরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মরহুম মারফত আলী, মা মোছাম্মত জিরাতন্নেছা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর অতিক্রম করে নাগরপুর কলেজ থেকে ১৯৮৫ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে অধ্যয়ন শুরু। বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানকালে বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম এবং নাট্যগোষ্ঠির সংস্পর্শে আসার সুযোগ ঘটে। লেখালেখি শুরুও তখন থেকেই। ১৯৮৮ সালে স্নাতক এবং ১৯৮৯ সালে নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত। বর্তমান গ্রন্থের অনেকগুলো প্রবন্ধ বিভিন্ন সময়ে ড. মুহাম্মদ ইব্রাহীম সম্পাদিত ‘বিজ্ঞান সাময়িকী’, ‘দৈনিক প্রথম আলো’, ‘দৈনিক সমকাল’ পত্রিকায় প্রকাশিত।

মহাবিশ্বের রহস্য সম্পর্কে আরও জানতে ক্লিক করুন

আলী হাসানের সকল বই পড়তে ক্লিক করুন

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading