মিথলজিঃ সত্য ও মিথ্যা যেখানে এক (প্রথম পর্ব)

MYTHOLOGY.jpg 1

গত বছর গ্রামে যাওয়ার সময় ছোট চাচা আমাকে বললেন, পদ্মা নদীর ঠিক মাঝখানে পানির নিচে নাকি একটা দরজা আছে। শুধুমাত্র যাদের জীবনে পাপ খুব কম তারাই এই দরজা দেখতে পায়। আমার কাছে প্রথম প্রথম ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত মনে হলেও পরে বুঝতে পেরেছিলাম বিষয়টা আসলে পুরোপুরি ধাপ্পা! মানুষের মধ্যে প্রচলিত মুখরোচক এসব গল্পই হয়ে ওঠে একসময় সত্য ঘটনা কিংবা ভয়ংকর কুসংস্কারের মতো কোনো কিছু!

মিথ শব্দটার সাথে আমরা অনেকেই পরিচিত। মূলত বিভিন্ন দেশের রূপকথা বা পৌরাণিক কাহিনীগুলোকেই আমরা মিথ বলে জেনে থাকি। কিন্তু আসলেও কি মিথ শুধু সেটুকুই? যদি না হয় তবে মিথ আসলে কি? আজ আমরা পরীক্ষায় আসা রচনামূলক প্রশ্নের মত আলোচনা করবো মিথের আভিধানিক অর্থ বা সংজ্ঞা নিয়েও। সঙ্গে পরিচিত হবো এমন কিছু মিথের সাথে যা পৃথিবীর অনেক মানুষ বিশ্বাস করে গেছেন বছরের পর বছর। এবং সাথে সাথে ইন্টারেস্টিং বেশ কিছু মিথের ময়না তদন্ত করে বের করার চেষ্টা করবো এর আদ্যোপান্ত। তো চলুন, শুরু করা যাক।

মিথ কী? 

প্রথমেই নিজদের ভেতর প্রশ্ন আসার কথা মিথ আসলে কী? শুরুতেই আভিধানিক অর্থ। মিথ শব্দটি আসলে কোন ভাষা থেকে এসেছে তা সঠিকভাবে বলাও এক প্রকার মিথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সর্বসাকুল্যে গ্রীক ভাষায়ই গ্রহণযোগ্য। মিথ শব্দটি এসেছে মুলত গ্রীক শব্দ ‘মাইথোস’ থেকে। এর শাব্দিক অর্থ ‘লোককথা’ বা ‘লোকমুখে ছড়ানো সত্য কথা’ ইত্যাদি। যেখানে আমরা ভেবে নিয়েছি সেসব গল্পই মিথলজিতে পাওয়া যায়, যা রূপকথা বা বানোয়াট গল্প, সেখানে মিথ শব্দের অর্থই হলো সত্য কথা। ব্যাপারটা কিন্তু বেশ মজার। তো যাইহোক, মিথের সাথে আরেকটি শব্দ জড়িত। তা হলো ‘মিও’। যার সহজ বাংলা হলো ‘লুকোনো সত্যের সন্ধান পাওয়া’। এই অর্থটায় কিন্তু বেশ রহস্য রহস্য গন্ধ আছে, তাই না? হ্যাঁ! আসলেই মিথকে ঘিরে আছে পৃথিবীর অসংখ্য সব রহস্য, যার সমাধান আজও আমাদের অজানা।

যেহেতু মিথের অর্থ লোককথা বা সত্য, সুতরাং এটা অন্তত নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে লোকমুখে ছড়ানো সত্য কথাকেই মূলত মিথ বলা হতো। মানে যতই মিথ্যে মেশানো থাকুক না কেন মিথের শেকড় আসলে সত্যের মাঝেই। কিন্তু সত্য বলতেই বা আমরা কী বুঝি! আজ আমরা সত্য বলতে যা বুঝি কয়েক শতক আগেরকার মানুষরা কি সত্য বলতে সেটাই বুঝতো? সত্যকে বাহ্যিকভাবে একটি ধ্রুবক মনে হলেও এটি বেশ আপেক্ষিক একটি ধারণা। জ্ঞান ও বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে মানুষের মধ্যে পরিবর্তিত হয়েছে সত্য বিষয়ক ধারণাও।

যেহেতু সত্য বিষয়ক ধারণাই বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সুতরাং স্বভবতই মিথের প্রতিও এক প্রকার অবিশ্বাস বা প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। এভাবে চলতে চলতে শুরুর চারশো বছর পর মিথ চলে আসে নিছক কল্পনা, ফিকশন বা মুখরোচক সব গল্পের গন্ডিতে। প্রথম দিককার গবেষক ও বিজ্ঞানীরাও মিথের বাস্তবতা ও সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো, চারশো বছর আগের মিথ কি তাহলে সত্যি ছিলো? তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নিই সেগুলোও মিথ্যে তবে এতদিন আগের প্রচলিত গল্প বা কাহিনীগুলোকেই বা আমরা কোন যুক্তিতে মিথ্যে প্রমান করতে পারি? মিথ কি আসলেই মিথ্যে? এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাটা আসলে নতুন কিছু না। বরং এটি চলছে যিশু খ্রিস্টের জন্মেরও শত শত বছর আগে থেকে।

যেখান থেকে শুরু

পৃথিবীর প্রথম মিথ কী অথবা কোত্থেকে এর উৎপত্তি তা জানা কিন্তু অসম্ভব। কিন্তু ধারণা করা হয় মিথের সূচনা হয়েছিলো খ্রিস্টপূর্ব সাতশো বছর আগে। আফ্রিকার সাগর পাড়ে গড়ে ওঠা জনপদদের মধ্যে। যদিও এসময় যে অন্য কোন সম্রাজ্যে বা সম্প্রদায়ের মাঝে মিথের কোন প্রকার কিছু জন্ম নেয়নি তা সঠিকভাবে বলা কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়। কিন্তু সভ্যতার প্রথম দিকে বেশিরভাগ মানুষই ধর্মের বিভিন্ন বিধি-বিধানের সাথে নানান অদ্ভুত ও অতিপ্রাকৃত ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করতো। তাই গবেষকদের ধারণা, যখন মানুষ বুঝেছিলো এগুলো আসলে ধর্মের বিধান নয় বরং ধর্মের বিভিন্ন বিধি-বিধানের সাথে মেলানো হয়েছে, তখন থেকেই মিথের প্রতি অবিশ্বাস আসা শুরু করে। যেমন পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই রয়েছে পৃথিবী ও মহাবিশ্ব সৃষ্টিকর্তার অধীনেই রয়েছে। তিনিই সবকিছু পরিচালনা করেন। মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবী আসলে কিভাবে কোথায় অবস্থান করছে তা নিয়েই মিথ আছে শ’খানেকের মত। এরমধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ভারত উপমহাদেশের মিথ। সে সময়কার মানুষরা ধারণা করতো পৃথিবী ধরে আছে চারটি হাতি। হাতিগুলো দাঁড়িয়ে আছে বিশালাকার একটি কচ্ছপের উপর। কিন্তু কচ্ছপটি আসলে কিসের উপর দাঁড়ানো এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারতো না। ভারতীয়রা ভাবতো এটা তাদের ধর্মের কথা। কিন্তু হিন্দু ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থের কোথাও এসবের উল্লেখ নেই। এখানেই স্পষ্টতর হয়ে যায় যে, আসলে মানুষ ধর্মকে পুঁজি করে বিভিন্ন ধরণের মুখরোচক গল্প তৈরি করতো, যা পরবর্তীতে হয়ে উঠেছে মিথ।

পৃথিবী ধরে আছে চারটি হাতি

কিন্তু মিথের শক্তি অন্যান্য লোককথা থেকে অনেক বেশি। একটা মিথ মানেই প্রায় একটা ইতিহাস। ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিথ মিশে আছে। মজার বিষয় হলো, অনেক মিথের কারণে পরিবর্তিত হয়েছে রাজ্যের ইতিহাস। অথবা ভয়ংকর সব যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে যার কেন্দ্রে একমাত্র কারণ ছিলো সামান্য মিথ। যদিও এতকিছুর পর মিথকে আর ‘সামান্য’ বলা যাচ্ছে না। তো চলুন, দেখে আসা যাক কিভাবে তৈরি হয় মিথ্যে কোন একটি মিথ।

কিছু মিথ

নাজকা লাইন:

লিমা থেকে প্রায় চারশো কিলোমিটার দূরে নাজকা এলাকায় হঠাৎই একটি বিমান উড়ন্ত অবস্থায় ভূমিতে অস্বাভাবিক কিছু একটা দেখতে পান। তারা লক্ষ্য করেন অনেক বড় একটি নকশা, পাথুরে মরুভূমির মধ্যে আঁকা। বিষয়টি পরদিন পত্রিকায় ছাপা হলে বেশ সাড়া পরে যায়। ওখানে দেখা যায়, নাজকার বুকে বিশাল আকৃতির সব নকশা। কিছু নকশা তো প্রায় ২০০ মিটারও ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। এটি প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৯৩০ সালে। তখন ওই এলাকা দিয়ে প্রথম বিমান চলাচল শুরু করেছিলো। গবেষক ও নাজকার বাসিন্দাদের ধারণামতে, আনুমানিক যিশু খ্রিস্টের জন্মের ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ছয়শো বছর আগে এগুলো তৈরি করা হয়েছিলো। এত আগে তেমন কোন প্রযুক্তি ছিলো না যে, তা দিয়ে এত নিখুঁতভাবে বিশাল আকৃতির এতসব নকশা আঁকা সম্ভব। তাছাড়া নকশাটি সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ মিটার উপরে উঠতে হবে। তখন উড়োযান বা বেলুন কিছুই আবিষ্কৃত হয়নি যার মাধ্যমে উপরে ওঠা সম্ভব। ব্যাপারটা আসলেই একটি রহস্য। কিন্তু এই ব্যাপারটিকে নিয়েই গড়ে উঠলো অসংখ্য মিথ।

নাজকা লাইন। ছবিঃ ইন্টারনেট

প্রথম মিথটি তৈরি করেন সুইজারল্যান্ডের একজন গবেষক। তিনি বলেন, খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সালে নাজকার বাসিন্দারা এলিয়েনদের সাহায্য নিয়ে নকশাগুলো তৈরি করেন। এরপর থেকেই আস্তে আস্তে প্রচলিত হতে শুরু করলো মুখরোচক সব গল্প। যেমন একটি গল্প আছে কিছুটা এরকম- এক দেশের রাজার একবার অসুখ হলো। এমন একটা কথা রটে গেলো যে রাজার উপর মেঘেরা চটে গেছে, এজন্যই এই অসুখ। রাজ বৈদ্য বললেন অসুখকে ভালো করতে হলে মেঘেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। তখন ঠিক করা হলো ভূমিতে আঁকা হবে বিশাল বিশাল সব নকশা। যা দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে মেঘেদের। কয়েকশো মানুষ রাতদিন খেটে তৈরি করলো এই নাজকা লাইন। কিন্তু কিভাবে পাথরের মধ্যে এরকম দাগ দিলো, কিভাবেইবা নকশার ব্যাপারটা ঠিক আছে কিনা, তা দেখলো অথবা হাজার বছর পর কিভাবেইবা এগুলো টিকে আছে তার উত্তর কিন্তু কেউ দিতে পারেনি।

এগুলো অনেক বছর চলেছিলো। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি তাদের ওয়েবসাইটে নাজকা লাইন নিয়ে একটি আর্টিকেল প্রকাশ করলে ব্যাপারটা আবার সবার নজরে আসে। তখনই এ বিষয় সব মিথ বেরিয়ে আসতে শুরু করে।

এটা তো গেলো বিদেশের কথা। আমাদের দেশও কিন্তু মিথে কোনভাবেই পিছিয়ে নেই। আমরা বরং ভিত্তিহীন ও মনগড়া সব মিথ লালন করে যাচ্ছি বছরের পর বছর ধরে। আমরা পরের পর্বে আলোচনা করবো কিভাবে মিথকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এছাড়াও দেশী প্রেক্ষাপটে তৈরি করা প্রচলিত কিছু মিথ দেখবো পরের পর্বে। আরো দেখবো মিথ সম্পর্কিত বেশ কিছু বইয়ের খবর। তবে মিথলজির ধারণা এই পৃথিবীর মাঝে আমাদেরকে অদ্ভুত এক পৃথিবীর সন্ধান দেয় প্রতিনিয়ত।

মিথলজি : সত্য ও মিথ্যা যেখানে এক (শেষ পর্ব) 

 

গ্রিক মিথোলজির চমকপ্রদ সব কাহিনী জানতে পড়তে পারেন যে বইগুলো 

 

Zubayer Ibn Kamal

Zubayer Ibn Kamal

For the last half a decade, I have been writing stories, articles, features, and other content in various national level magazines. I am most interested in creative writing. I have read thousands of fiction books in the last few years. I have memorized the book of the last revelation of God. My day goes by reading books and thinking.

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading