মিথলজি : সত্য ও মিথ্যা যেখানে এক (শেষপর্ব)

MYTHOLOGY.jpg 1

আমাদের আশেপাশে ঘটতে থাকা অদ্ভুত ঘটনাগুলো মাঝে মাঝেই হয়ে ওঠে মুখরোচক কোন গল্প। কিছু গল্প সময়ের সাথে সাথে লোককাথা হয়ে হারিয়ে যায়। আবার কিছু ঐতিহাসিক সত্য গল্পের সাথে মিথ্যে মিশিয়ে তৈরি হয় মিথ, যা টিকে থাকে শত শত বছর।

গত পর্বে মিথ সম্পর্কিত বিভিন্ন খুঁটিনাটি জেনেছি আমরা। দেখেছি একটি বিদেশী প্রেক্ষাপটে মিথ তৈরির কথা। আজ দেখবো আমাদের দেশে একসময়কার প্রচলিত বেশ কিছু মিথ, যার কিছু কিছু এখনও শোনা গেলেও আদতে এসবই ধাপ্পা! তবে চলুন দেখে আসা যাক, আমাদের দেশের প্রচলিত কিছু মিথ।

সেতু বিসর্জন

এই মিথটি খুব বেশি প্রচলিত আমাদের দেশে। এমনকি গ্রাম ছাড়িয়ে শহরর বেশ কিছু জায়গায় বেশ চর্চা করা হয়ে এটিকে। যেহেতু আমাদের দেশ নদীমাতৃক দেশ, তাই নদী বেশী থাকায় পারাপার বা যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সেতু তৈরী করতে হয় অহরোহ। আর প্রত্যেক জায়গায় সেতু তৈরীর আগে রটে যায় অসংখ্য মিথ। যেমন নদীতে কাউকে বিসর্জন দিতে হবে। তা নাহলে সেতু বানানো সম্ভব না। ভালো সংবাদ  হলো এই সময়কার মানুষেরা এটিকে গুজব হিসেবে আখ্যায়িত করতে    সক্ষম হয়েছে। তবে মিথ হিসেবে এটির শক্তি অবশিষ্ট্য আছে বটে। যেমন, ওই সময় আশেপাশে কাউকে খুন করা হলেও সবাই বিষয়টাকে খুব স্বাভাবিক দেখতো এই কারণে যে, হয়তো সেতু বানানোতে তাকে প্রয়োজন হবে। ব্যাপারটা খুবই অবৈজ্ঞানিক ও ভয়ংকর বিষয়। আমরা সবাই জানি পদ্মা নদীর উপর দিয়ে তৈরী হচ্ছে পদ্মা সেতু। এই সেতু প্রকল্পটি সরকার ঘোষণা করার কিছুদিন পরই শুরু হয় নানা রকম মুখরোচক আজগুবি সব গল্প। স্থানীয় কিছু মানুষের মুখে ছড়াতে থাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে এই সেতু তৈরী করতে হলে পদ্মাতে বিসর্জন করতে হবে একজন মা ও তার সন্তানের জীবন। তা নাহলে কাজ শুরু করা যাবে না। তবে এই স্বপ্ন যে আসলে কে দেখেছে তা জানা যায় না কখনই। কিন্তু আনন্দের বিষয় হলো, এসব  গুজব ও মুখরোচক গল্পের বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থানে ছিলো প্রশাসন। যার দরুন পদ্মা সেতুই বাংলাদেশের প্রথম বৃহৎ সেতু যা নিয়ে সব চেয়ে কম মিথ তৈরী হতে পেরেছে।

বিয়ের বাসন

নদী নিয়ে আরো অদ্ভুত সব মিথ ছড়িয়ে আছে আমাদের দেশে। এর মধ্যে বিশেষ একটা হলো বিয়ের আগে নদী থেকে বাসন-কোসন প্রাপ্তি। এটি খুবই পুরনো লোকগাথা বলা চলে। নদীর পাড়ে যেসব জেলা গড়ে উঠেছে যেমন ফরিদপুর বা শরিয়তপুর এসব অঞ্চলে এটি খুবই প্রচলিত একটি মিথ। আগে যদি কারো বাড়িতে বিয়ে হতো, তবে তারা নদীর কাছে গিয়ে বিয়ে বাড়ির রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় রান্নার পাত্র বা বাসন এসব চাইতো। পরদিনই নদীতে ভেসে উঠতো চাওয়া অনুযায়ী বাসন কোসন। বিয়ে বাড়ির রান্না শেষে সবগুলো নদীতে দিলে তা আবার উধাও হয়ে যেত।

লেগে গেলো যুদ্ধ!

যদিও ঐতিহাসিক ভাবে এসব লোকগাথা বা মিথের তেমন কোন মূল্য নেই। কিন্তু এমন মিথ নিয়েই তৈরী হয়েছে ইতিহাস বা সংঘটিত হয়েছে যুদ্ধ। এমনই এক যুদ্ধ হলো ‘রিলিয়াসের যুদ্ধ’। যদিও এই যুদ্ধ নিয়ে অনেকের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। এবং একেক জায়গায় এ যুদ্ধের আলাদা আলাদা নামও রয়েছে। মুখে মুখে বলা মিথ থেকে তারা আস্ত একটি রাজ্যই আক্রমন করে বসে। সবার মুখে একটি মিথ প্রচলিত ছিলো যে, সূর্য যেদিন দূর্বল হয়ে পড়বে সেদিন সামনের রাজ্যের সবাই দূর্বল হয়ে যাবে। কেননা তারা সবাই সৌর শক্তিতে শক্তিমান। এমন মিথ নিয়ে বছরের পর বছর পার করেছে রিলিয়াসের বাসিন্দারা। হঠাৎ স্থানীয় কেউ একজন সূর্যকে দুর্বল অবস্থায় দেখে (অপেক্ষাকৃত কম আলো দৃশ্যমান অবস্থায়) সবাইকে অবহিত করে। সবাই মিলে আক্রমন করে সামনের রাজ্য জয়ের জন্য। অতর্কিত হামলায় তারাও হতকচিত হয়ে পরে। গবেষকদের হিসেবমতে, সেদিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিলো। সেটা দেখেই তাদের ধারণা হয় যে। সূর্য আসলে দূর্বল হয়ে পড়েছে। এতে প্রাণ হারায় অনেকে। মাত্র একটি মিথ ও যে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, তার বড় উদাহরণ হলো এই রিলিয়াস ট্রাজেডি।

একদম শুরুতে মিথ শব্দের অর্থ নিয়ে আমরা কথা বলেছিলাম। মিথ শব্দের অর্থ ‘লোকমুখে ছড়ানো সত্য ঘটনা’ অথবা ‘লুকোনো আছে এরকম’ কিছু। আমরা এখন এরকম একটা ট্রাজেডি নিয়েই কথা বলবো যাতে মিথ শব্দের এই দুটো অর্থই পরিলক্ষিত হয়েছে। এটি ঐতিহাসিক ভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। মিথোলজিতেও এটি সবার উপরের দিকের গুরুত্ব পায়। অনেকে হয়তো এটি সম্পর্কে জেনেও থাকতে পারি। তা হলো ট্রয় নগরী।

মিথের শহর ট্রয়

ট্রয় বা ত্রয় একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরীর নাম। যেটি একসময় ছিলো শিল্প ও বানিজ্যে ভরপুর এক সম্রাজ্য। গ্রীক ভাষায় ট্রয়কে বলা হয় ‘ত্রোইয়া’ বা ‘ইলিয়ড’। লাতিনে যাকে বলা হয় ‘ক্রুইয়া’ বা ‘ইলিয়ন’। হিত্তিও ভাষায় উইলিউয়া আর তুর্কিতে একে বলে ক্রুভা। বোঝাই যাচ্ছে এটি অসংখ্য দেশেই বিখ্যাত তাই একেক জায়গায় নামের ভিন্নতাও রয়েছে। এটির সঠিক অবস্থান নিয়ে অনেক দ্বিমত রয়েছে। তবে আবিষ্কৃত রিপোর্ট অনুযায়ী এর অবস্থান প্রাচীন গ্রীস যা বর্তমানে তুরস্ক। ট্রয় নগরীর বাসিন্দাদের ট্রোজান বলা হতো।

তার আগে বলতে হয়  বিখ্যাত কবি হোমারকে নিয়ে। যার জন্মকাল নিয়ে রয়েছে হাজারো বিতর্ক। তবে বেশীরভাগ মানুষের মতে তার জন্ম খ্রিষ্টপূর্ব ৮৫০ সালে। তার দুটো মহাকাব্য গ্রন্থ পৃথিবী জুড়ে জনপ্রিয়। সেগুলো হলো ‘ওডিসি’ এবং ‘ইলিয়াড‘। আর ইলিয়াড হলো সেই ট্রয় নগরীর নাম যেটি নিয়ে আগ্রহ পুরো বিশ্বের ভূতত্ত্ববিদদের।

BUY NOW

ইলিয়াড বইটি সম্পর্কে একটু কথা বলে নেয়া দরকার। ইলিয়াড হলো ট্রয়ের আরেক নাম। এটিতে ট্রয় নগরীর এক অবিশ্বাস্য যুদ্ধের বর্ণনা করেছেন হোমার। বইটিতে প্রায় ষোলো হাজার পঙক্তি রয়েছে। রচিত হয়েছিলো গ্রীক ভাষায়। এটিও ঠিক কোন সময় রচনা করা হয় তা জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের দিকে এটি লেখা হয়। হোমার তার লেখা ইলিয়াডে এমন এক শহরের কথা বর্ণনা করেছেন যেখানে দশ বছর ধরে একটি যুদ্ধ চলেছিলো। সেখানে ছিলো একটি সুসজ্জিত নগরী। ইলিয়াড মহাকাব্যে বেশ সুন্দর ভাবে যুদ্ধ সহ সবকিছুর বর্ণনা দেয়া ছিলো। তার ইলিয়াড পৃথিবীতে এক ধরণের নতুন মিথ সৃষ্টি করে। সবাই ট্রয় নগরীর ট্রোজানদের কল্পনা করতে থাকে। অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, এরকম একটা নগরী ছিলো। যদিও বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী এই নগরীকে কয়েকবার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো তা তেমন বিশ্বাসযোগ্য ছিলো না।

পুরো ব্যাপারটা পালটে যায় তখনই,  যখন জার্মানের হাইরনিশ শ্লিমান নামের একজন প্রতত্নবিদ ১৮৭০ সালে এরকম একটা নগরীর খোঁজ পান। তিনি ওই বছরই সেখানে খনন কাজ শুরু করেন। আর খনন কাজ করা অবস্থাতেই প্রমান হয় এখানে বেশ কয়েকবার শহরের ধ্বংসস্তূপের উপরই নতুন করে নগরী স্থাপন করা হয়েছিলো। আর অনেক আলামতের সাথে হোমার রচিত ইলিয়াডের বর্ণনারও মিল পাওয়া যায়। যেটি ছিলো প্রায় অবিশ্বাস্য ব্যাপার। পরে ১৯৯৮ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় ট্রয়কেও যুক্ত করে।

ধারণা করা হয়, ট্রয় নগরী প্রথম নির্মিত হয় যিশু খ্রিস্টের জন্মের ৩০০০-২৬০০ বছর আগে। এরপর প্রায় নয়বার নগরীটি পুর্নগঠিত হয়েছিলো। এতে এও প্রমান হয় যে, নগরীটি একাধিকবার ধ্বংস হয়েছিলো। গবেষকদের ধারণা সপ্তমবার নির্মিত হবার পরের ঘটনাই কবি হোমার বর্ণনা করেছেন। যদিও তিনি এই কাহিনী কিভাবে জানলেন তার কোন উত্তর নেই। সর্বশেষ ট্রয় নগরী নির্মিত হয়েছিলো খ্রিস্টপূর্ব ১০০ বছর আগে। এই কাহিনীটি পৃথিবীতে খুবই বিখ্যাত হয়েছিলো। ২০০৪ সালে ‘ট্রয়’ সিনেমাটি মুক্তি পায়। যা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়য়ে ব্যবসা সফল ছবির মধ্যে একটি। যদিও সিনেমার খাতিরে এর গল্পে অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছিলো।

মিথ নিয়ে বই

BUY NOW

ক্লদ লেভির লেখা মিথ এন্ড মিনিং দুর্দান্ত একটি বই। মিথের সঙ্গে মানবসভ্যতার ইতিহাসের সম্পর্ক বেশ প্রাচীন। মিথের আখ্যানগুলোর ভিত্তিতেই মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি ব্যাখ্যাত হয়েছে বহুদিন ধরে। কিন্তু সপ্তাদশ শতকে বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তিবাদের উদ্ভবের ফলে মিথের এই ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে। কিন্তু সত্যি কি মিথের আধারে মানবসমাজ-মানসের রূপ অন্বেশঘণ অকার্যকর হয়ে গেছে? এই প্রশ্ন নিয়েই মিথ এন্ড মিনিং-ই বিস্তারিত আলোচনা করেছেন কাঠামোবাদী দার্শনিক ক্লদ লেভি স্ত্রস।

BUY NOW

এডিথ হ্যামিল্টনের লেখা মিথলজি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বিক্রীত বইগুলোর মধ্যে একটি। চিরায়তভাবে মন্ত্রমুগ্ধকারী কাহিনীগুলোর অতি নিখুঁত ও অভিগম্য পুনর্বর্ণনার মাধ্যমে এডিথ হ্যামিল্টন পুরাণ শাস্ত্রে জীবনের এই উত্তরাধিকারকে দান করেন এক নতুন মাত্রা। পুরাণের এই চিরায়ত রহস্যবোধ এবং দেব-দেবতার ধারণার বাইরেও নভোমণ্ড কিংবা নক্ষত্র রাজির ঘটনায় মিথলজির উপস্থিতি নিয়ে এডিথ হ্যামিল্টন তৈরি করেছেন অনন্য এক বই।

এরকম অসংখ্য সত্য মিথের মিল বন্ধন নিয়ে তৈরী মিথ। যার কোন সত্যতা নেই আবার এটি মিথ্যে তারও কোন প্রমাণ নেই। প্রাচীন কাল থেকে মিথোলজি এমন এক অদ্ভুত সুতোয় এগিয়ে যাচ্ছে যার সাথে মিশে আছে সত্য ও মিথ্যে একই সাথে। তাহলে আমরা কি মিথ মানেই মিথ্যে বলে তাকে উড়িয়ে দিতে পারি?

মিথলজি : সত্য ও মিথ্যা যেখানে এক (১ম পর্ব) 

 

গ্রিক মিথলজি বিষয়ক অন্যান্য বই দেখতে ক্লিক করুন 

 

Zubayer Ibn Kamal

Zubayer Ibn Kamal

For the last half a decade, I have been writing stories, articles, features, and other content in various national level magazines. I am most interested in creative writing. I have read thousands of fiction books in the last few years. I have memorized the book of the last revelation of God. My day goes by reading books and thinking.

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading