রিয়াজ ফাহমীর নিভৃতে সিরিজ ও ‘নারীরণ্য’

2021-10-23 রিয়াজ ফাহমীর নিভৃতে সিরিজ ও নারীরণ্য

নিভৃতে বাস করে ব্যস্ত শহর থেকে বহু দূরে। নির্জনে খুঁজে পায় তার আপন অস্তিত্ব। জীবন কাটে নস্টালজিক ভালোবাসায়।সময় কাটে বিচিত্র অভিজ্ঞতায়। অদ্ভুত রহস্য তাঁর পিছু ছাড়ে না কখনো। সেই রহস্য সমাধান তাকে নিয়ে যায় আরও বিচিত্র জগতে। নিঃসঙ্গতা, নস্টালজিক প্রেম আর মনস্তাত্বিক রহস্য নিয়ইে এগিয়ে চলে নিভৃতের খেয়ালি জীবন।

এরকম একটি চরিত্রের প্রথম দেখা মিলেছিল  ‘নিভৃতে’  সিরিজের প্রথম বই ‘নিভৃতে’ উপন্যাসে।

উপন্যাসের শুরুটার সাথে লেখকের নিজের জীবনের একটি বিশেষ স্মৃতি জড়িয়ে আছে। লেখকের বর্ণনামতে তিনি প্রথম নাটোরে যান ২০০৬ সালে। বর্ষাকাল। জায়গার নাম সাঁতারদিঘী। নাটোর শহর থেকে সম্ভবত ঘন্টা দুইয়ের রাস্তা। সাথে তাঁর স্কুলজীবনের এক বন্ধু। তাঁর বাসাতেই রাতে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। বিকেল পর্যন্ত লেখকের বিশেষ কিছু মনে হয়নি। সময় যত গড়াল লেখক এই জায়গার প্রেমে পড়তে শুরু করলেন।

চলন বিলের মাঝে দ্বীপের মতো ছোট গ্রাম। বিদ্যুৎ নেই। মোবাইলের নেটওয়ার্ক পেতে ঘর থেকে বেরিয়ে  যেতে হয় বহুদূর। সাথেই নাগর নদী। খুবই সরু। একটু পরপর বাঁক। সন্ধ্যার পর লেখক নদীর তীর ধরে খুব সাবধানে হাঁটছেন। বৃষ্টিতে রাস্তা কাদায় মাখামাখি। উদ্দেশ্য নওগাঁর পতিসর। রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি। একদিনের জন্য গিয়েছিলেন। শেষে তিনদিন থেকে গেলেন। লেখকের মনের ভিতরে সেই স্মৃতি শক্তভাবে গেঁথে রইল। এই ঘটনার এক যুগ পর যখন তিনি ‘নিভৃতে’ লিখছেন, শুরু করলেন সেই স্মৃতি মাথায় রেখেই –

‘প্রফেসর আব্দুস সোবহান কলেজ। নাটোর শহর থেকে আড়াই ঘন্টার রাস্তা । ঘন্টা দুই বাসে। এরপর রিকশায় তিরিশ মিনিট এক ঘন বর্ষায় এই কলেজে আমার কর্মজীবন শুরু।…..’

nibhrite
BUY NOW

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র নিভৃত কলেজ শিক্ষকের চাকুরি নিয়ে হাজির হন মফস্বলের এক ছোট কলেজে। সেখানে অরণ্য, পাখি আর নি:সঙ্গতা নিয়েই তাঁর দিন কাটে। মাঝে মাঝে স্মৃতিতে আসে তাঁর ফেলে আসা প্রেম রেনুমা আর বন্ধু সৌমিত্র। এক সময় তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান স্যারের সাথে যিনি নিজেও নি:সঙ্গ, একই সাথে পাখি প্রেমিক।

অকস্ম্যাৎ এক রাতে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে নিভৃতের ঘরে চলে আসে তাঁর কলেজেরই এক ছাত্রী, হেনা। তাঁর কিছু সময় পর এই ছাত্রীর রহস্যজনক মৃত্যুর সম্ভাবনায় পরিস্থিতি হয়ে ওঠে ক্রমশ জটিল। আরও রহস্যজনকভাবে বহু বছর পর উপস্থিত হয় সৌমিত্র। নিভৃতে, হেনা, রহমান স্যার আর সৌমিত্রকে নিয়ে শুরু হয় মনস্তাত্ত্বিক রহস্যের খেলা।

‘নিভৃতে’ প্রকাশিত হয় ২০২০ এর জুনে। এর ছয় মাস পর প্রকাশিত হয় নিভৃতে সিরিজ এর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘নির্জন’। এই উপন্যাসে নিভৃতেকে দেখানো হয়েছে অনেকটা রহস্যভেদী গোয়েন্দার মতো। নির্জন’ উপন্যাস শুরু এক নতুন চরিত্রের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে, যার নাম আবীর চৌধুরী। নিভৃতের মতন সেও একজন নি:সঙ্গ কলেজ প্রফেসর। তিনি একদিন অপরিচিত এক নারীর অদ্ভুত চিঠি পান।

“স্যার,

আপনি আমাকে চিনবেন না। আট বছর আগে আপনি আমার কলেজের শিক্ষক ছিলেন। খুব সম্ভবত সেটা আপনার প্রথম চাকুরি ছিল। আমি সেই কলেজের ছাত্রী। শিক্ষক হিসেবে আপনি খুবই নার্ভাস ছিলেন। মেয়েদের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন না। বখাটে আর দুষ্ট ছাত্র ছাত্রীদের আপনিএড়িয়ে চলতেন। ক্লাসের মাঝে অনেকেই আপনার লেকচার না শুনে গল্প করত।আপনি দেখেও না দেখার ভান করতেন।

এক বৃষ্টির দিনে আপনার ক্লাস ছিল। ছাত্র ছাত্রীদের উপিস্থিতি কম। আমিসহ দশ বারোজন ছিলাম। আমরা কেউ ক্লাস করতে চাচ্ছিলাম না। একজন ছাত্র বলে উঠল, স্যার, আজ পড়ব না। একটা গল্প বলেন। আমরা আজ আপনার গল্প শুনব।সেই কথা শুনে ক্লাসের সবাই হেসে উঠল। আপনি সেই রসিকতা ধরতে পারলেন না। ভাবলেন, সত্যি সত্যিই আমরা আপনার গল্প শুনতে চাচ্ছি। ঘটনাটা আপনার মনে নেই, তাই না ? মনে থাকার কথাও না। আমার মনে আছে। একটা ভূতের গল্প বলেছিলেন। কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের কেউ ভূতের গল্প শোনায়! এরপর থেকে আপনাকে সবাই আড়ালে ভূত স্যার বলে ডাকত।

নির্জনে
BUY NOW

এবার আসল কথায় আলি। আসল কথাটা তেমন বড় নয়। একটা ছোট গল্প। গল্পে একটা মেয়ে প্রতিরাতেই একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পেত। তীব্র সেই কান্নার আওয়াজ। প্রথমে একটা বাচ্চার কান্না শোনা যায়। এরপর দুটো। তারপর তিনটা। একসময় অসংখ্য বাচ্চার কান্নার আওয়াজে মেয়েটার বদ্ধ উন্মাদের মতো অবস্থা হতো। স্যার, গল্পটা কি এখন আপনার মনে পড়েছে? ঘন্টা পড়ে যাওয়াতে আপনি আর গল্পটা শেষ করতে পারেননি। আমি সেই গল্পের বাকি অংশ শুনতে চাই।

ইতি

হেনা।”

আবীর এক নিঃশ্বাসে চিঠিটা পড়লেন। এরকম কোনো গল্প তিনি জানতেন না। বুঝতে পারলেন সম্ভবত গল্পটি তৎক্ষণাৎ বানিয়ে বলেছিলেন। তবে মেয়েটাকে তিনি চিনতে পারলেন। সেই সময় একটা মেয়ে হুট করেই ক্লাসে আসা বন্ধ করে দেয়। দশ পনেরো দিন পর শুনলেন, এলাকা ছেড়ে পুরো পরিবার চলে গেছে। ছোট মফস্বল শহরে সেটা ছিল বেশ বড় ঘটনা। আবীর চৌধুরী মেয়েটার জন্য অদ্ভুত এক কষ্ট বোধ করতে লাগলেন।

জীবনে প্রতারিত হয়েও নিজের জন্য কোনো দু:খ নেই। সব দু:খ পৃথিবীর আলো না দেখা এক শিশুর জন্য। এই দুঃখ মাতৃত্বের দুঃখ। মাতৃত্বের সুখের চেয়ে মাতৃত্বের দুঃখ হয় প্রবল। খুবই প্রবল। ‘নির্জন’ উপন্যাসে এই ঘটনা দিয়ে আবীর চৌধুরীর  আগমন ঘটে। তাঁকে ঘিরে পাঠকের মনে শুরুতে যে কোমল ধারণা জাগে, সেই ধারণায় বড়ো ঝাঁকুনি দিতেই যেন উপন্যাসের মাঝামাঝি ঘটে নিভৃতে এর আগমন। নি:সঙ্গ আবীর চৌধুরীর অদ্ভুত মনোজগতের রহস্য উন্মোচিত করেই আবার বিদায় নেন নিভৃতে।

BUY NOW

‘নিভৃতে’ উপন্যাসে তাই নিভৃতেকে জানার সুযোগ থাকলেও, ‘নির্জন’ উপন্যাসের মূল লক্ষ্যই যেন আবীর চৌধুরীর রহস্য উম্মোচন। নিভৃতেকে জানার সুযোগ তাই বেশ কমই থেকে যায়। নিভৃতে সিরিজ এর তৃতীয় উপন্যাস ‘নারীরণ্য’ এর প্রকাশকাল অক্টোবর ২০২১। এটি বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম কোনো লেখকের এক শিরোনামে ভিন্ন প্রচ্ছদে কবিতা ও উপন্যাসের বই। বইয়ের এক দিক থেকে উপন্যাস। অন্যদিক থেকে কবিতা। পাঠক যেকোনো দিক থেকেই বইটি পড়া শুরু করতে পারবেন। এই উপন্যাসে কী থাকছে? কতটুকু জানা যাবে নিভৃতেকে?

কী রহস্য লুকিয়ে আছে নিভৃতের নিভৃত জীবনে?

রিয়াজ ফাহমীর সকল উপন্যাস দেখতে 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading