অমুসলিম থেকে মুসলমান হওয়ার গল্প : ২য় পর্ব

Quran

দিলীপ কুমার যেভাবে হলেন এ আর রহমান

সুরের জাদুকর এ আর রহমানের সুরের ভক্ত নয়, এমন মানুষ খুব কমই আছেন। এই সুর সম্রাট ১৯৬৭ সালে ৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন চেন্নাইয়ের এক শৈব হিন্দু পরিবারে। রহমানের বাবা সুরকার আর কে শেখর তার নাম রেখেছিলেন আর এস দিলীপ কুমার। ১৯৮৮ সালে তার বয়স যখন ২১ বছর সে সময় তার বোন কঠিন এক অসুখে আক্রান্ত হন। জানা যায়, সে সময় আবদুল কাদের জিলানী নামে এক মুসলিম পীরের দোয়ায় তার বোন আশ্চর্যজনকভাবে সুস্থ হয়ে যান। এরপরই রহমানের গোটা পরিবার ইসলামের প্রতি ঝুঁকে যায়। গ্রহণ করেন ইসলাম। এস দিলীপ কুমারের নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় আল্লা রাখা রহমান। ১৯৯২ সালে মণিরত্মম পরিচালিত এক কফির বিজ্ঞাপনে জিঙ্গেল গেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। এরপর থেকে তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ২০১৪ সালে এই গানের রাজা ৪টি জাতীয় পুরস্কার, ১৫টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতেছিলেন। সে বছর ১৩৮টি নমিনেশনের মধ্যে ১১৭টিতেই পুরস্কার জিতে নিয়েছিলেন রহমান। এশিয়া মহাদেশের মধ্যে তিনিই প্রথম এক বছরে দুটি অস্কার জিতেছিলেন। এ আর রহমানের নামে কানাডার মরখমে একটি রাস্তাও রয়েছে।

দিলীপের ছেলেবেলা ছিল খুব অভাব ও কষ্টের। একটি রহস্যময় রোগে মাত্র নয় বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। ওই সময় সৃষ্টিকর্তার প্রতি দিলীপের ধারণা বদলাতে থাকে। পিতার চিকিৎসার জন্য অর্থের অভাব, তাঁর যন্ত্রণা, পরিচিত মানুষের তীব্র উদাসীনতা এবং সামগ্রিকভাবে সমাজের উপেক্ষা দিলীপকে খুব কষ্ট দেয়। আরো কষ্ট দেয়, বিশেষত বাবার মৃত্যুর দিনটি। ওই দিনেই তাঁর বাবার সঙ্গীত আয়োজনে প্রথম ছবিটি মুক্তি পেলেও তা তিনি দেখে যেতে পারেননি। এগুলো এতই বেদনাদায়ক ছিল যে আজো এ আর রহমান এ নিয়ে মুখ খুলতে চান না।

A R Rahman
এ আর রহমান

পিতা শেখর পেছনে রেখে যান তাঁর স্ত্রী কস্তুরী [এখন করিমা বেগম] এবং তিন কন্যা ও এক পুত্র। কাঞ্চনা [দিলীপের বড়] এবং বালা [এখন তালাত] ও ইশরাত। এই তিন বোন ও মায়ের সংসার চালানোর সব দায়িত্ব এসে পড়ে বালক দিলীপের ওপর। ১১ বছর বয়সে তিনি ইলিয়ারাজা সঙ্গীত দলে যোগ দেন কিবোর্ড প্লেয়ার রূপে। ইতোমধ্যে তিনি গিটার বাজানো শেখেন। এভাবে এ আর রহমান চূড়ান্তভাবে সঙ্গীতের ভূবনে ঢোকেন। তাকে সব রকম অনুপ্রেরণা ও সাহায্য দেন তার মা যিনি চেয়েছিলেন প্রয়াত স্বামীর পদাঙ্ক যেন ছেলে অনুসরণ করে।

গানের ভুবনে ঢোকার ফলে দিলীপের আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। যদিও তিনি খুব নামকরা দু’টি শিক্ষায়তনে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। এদিকে তাঁর প্রতিভায় অনেকে আকৃষ্ট হন এবং তাকে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিকে পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দেন। এখানেই ওয়েস্টার্ন ক্যাসিক্যাল মিউজিকে একটি ডিগ্রি আয়ত্ত করার পর তিনি ভারতে ফিরে আসেন। তখন তার স্বপ্ন পশ্চিমের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সাথে আধুনিক ইন্ডিয়ান সুরের সম্মিলন ঘটানো।

দিলীপ তখন অ্যাডভার্টাইজিং ফার্মে যোগ দেন এবং জিঙ্গেল [বিজ্ঞাপনী স্লোগান] লেখা এবং এতে সুর দেয়ায় মনোনিবেশ করেন। প্রায় পাঁচ বছর তিনি বিজ্ঞাপনী ব্যবসায়ে কাজ করেন। ওই সময় তিনি ইসলামী আধ্যাত্মিক গানের দিকে ঝোঁকা শুরু করেন। তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ যে মিউজিক অ্যালবামটি তিনি প্রকাশ করেন এর নাম ছিল ‘দিন ইসাই মালাই’। ইসলামী আধ্যাত্মিক গানের এই সঙ্কলনটি ছিল তামিল ভাষায়।

ঠিক এরপরই তার জীবনে দ্বিতীয় বারের মত নেমে আসে ঘোর অমানিশা। ১৯৮৮ সালে অর্থাৎ দিলীপের বয়স যখন একুশ তখন তাঁর বোনের গুরুতর অসুখ ধরা পড়ে। কোনো চিকিৎসাতেই কাজ হচ্ছিল না। সবাই যখন হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন তখন পরিবারের এক বন্ধুর উপদেশে তারা যান শেখ আবদুল কাদের জিলানি নামে মুসলিম পীরের কাছে। তার দোয়ায় অতি আশ্চর্যজনকভাবে দিলীপের বোন দ্রুত সেরে ওঠেন। পিতা ও বোনের অসুখের সময় সমাজের অবহেলা এবং তার বিপরীতে পীরের সদুপদেশ ও সাহায্য গভীরভাবে প্রভাবিত করে তরুণ দিলীপকে ধর্মান্তরিত হতে। তিনি ও তার পুরো পরিবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। দিলীপ কুমার হয়ে যান এ আর রহমান। কিন্তু পরে ইন্ডিয়ার তদানীন্তন শীর্ষ সুরকার নওশাদ আলী যিনি পশ্চিমি সঙ্গীতে পারদর্শী ছিলেন তার সংস্পর্শে যখন এ আর রহমান আসেন তখন তিনি উপদেশ দেন আবদুলটা বদলে ফেলে বিখ্যাত তবলা বাদক ‘আল্লাহ রাখা’র নামে এ আর রাখতে। আল্লাহ রাখা শব্দের অর্থ- খোদা যাকে রক্ষা করেন।

এ আর রহমান বলেন, ইসলাম আমাকে শান্তি দিয়েছে। দিলীপ রূপে আমি একটা হীনম্মন্যতায় ভুগতাম। এ আর রহমান হয়ে আমার মনে হয় পুনর্জন্ম লাভ করেছি। তাছাড়া এসব সাফল্যের জন্য এ আর রহমান সব কৃতিত্ব দেন সৃষ্টিকর্তাকে। তিনি বলেন, আমার মা আল্লাহর কাছে যেসব প্রার্থনা করেছেন তারই ফসল আমি। আমি যা তার কারণ হলো, প্রতিদিন সচেতন ও আন্তরিকভাবে পাঁচবার নামাজ পড়ি। আল্লাহ যা চান আমি তাই হবো। আমি তা জানি। তিনি আমাকে সবই দিয়েছেন। তিনি আবার সব কিছু নিয়েও নিতে পারেন। তাই যদি তিনি করেন তাহলে কোনো প্রশ্ন করব না, কোনো আপত্তি করব না। তাঁর সিদ্ধান্ত আমি মেনে নেবো। আল্লাহই আমার সব কিছু। তাঁর বিশাল সৃষ্টিযজ্ঞের একটি অতি ছোট অংশ আমি। তিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন একটি বিশেষ মিশনের জন্য। সেই মিশনটি অর্জন না করলে আমি পাপ করব। এটাই আমার একমাত্র বিশ্বাস। আমার কাছে এটাই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বের কোনো প্রলোভনই আমাকে নোয়াতে পারবে না। আমার জন্ম হয়েছে মিউজিকের জন্য। আমি মিউজিকের জন্যই বেঁচে আছি এবং শেষ পর্যন্ত মিউজিকের জন্যই বেঁচে থাকব। এটাই আল্লাহর ইচ্ছা। আমি শুধু এটুকুই জানি।

এ আর রহমান যেকোনো নতুন শহরে গেলে তার প্রথম দেখার জায়গা হলো কোনো মিউজিক স্টোর অথবা কোনো মসজিদ। আল্লাহর ওপর অগাধ আস্থা রহমানের। দিনে পাঁচবার নামাজ পড়ার সময় বের করবেনই তিনি। ক্যারিয়ার রমরমিয়ে চলার সময়েও একটা পুরনো অ্যাম্বাসাডর নিজে ড্রাইভ করে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন। ২০০৩ সাল পর্যন্ত তার ১০০ মিলিয়ন রেকর্ড এবং ২০০ মিলিয়ন ক্যাসেট বিক্রি হয়েছিল। এই হিসাব অনুযায়ী তিনি বিশ্বের বেস্ট সেলিং মিউজিক আর্টিস্টদের অন্যতম। চেন্নাইয়ে রেকর্ডিং স্টুডিও ছাড়াও এ আর রহমান ফাউন্ডেশন এবং কে এম মিউজিক কনজারভেটরি তৈরি করেছেন রহমান।

যে কারণে ইসলাম গ্রহণ করেন বক্সার মোহাম্মদ আলী!

 

বক্সার মোহাম্মদ আলী

ক্রীড়া জগতের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হেভিওয়েট হিসেবে খ্যাত মার্কিন পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা  মোহাম্মদ আলী। তিনবারের ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন এবং অলিম্পিক লাইট-হেভিওয়েট স্বর্ণপদক বিজেতা তিনি। তার অর্জনের তালিকা বেশ দীর্ঘ। স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড এবং বিবিসি ১৯৯৯ সালে  মোহাম্মদ আলীর নাম শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ঘোষণা করে। তাই বিশ্বজুড়ে মোহাম্মদ আলীর সুখ্যাতি ছিল অনেক। তিনি খেলার কোটে জয় ছিনিয়ে আনতে যেমন দুর্বার তেমনি মানবিক ধর্মীয় চিন্তা ও নৈতিক মূল্যবোধেও। ১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির লুইসভিলাতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তখন নাম রাখা হয় ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে জুনিয়র। বিশ্ব মানবতার প্রতি জেগে ওঠা মমত্ববোধ ধীরে ধীরে তাকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করে। ১৯৬৪ সালে তিনি ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন। আর তখন থেকেই তার ক্যারিয়ার তুঙ্গে উঠতে থাকে এবং তিনি মার্কিন মুসলিম তরুণদের আইকনে পরিণত হন।

এর কয়েক বছর পরই তার স্ত্রী বেলিন্ডার সঙ্গে আলীর ইসলামে ধর্ম গ্রহণের কারণ উল্লেখ করেন। যা এতদিন অজানাই ছিল। বেলিন্ডা বলেন, আলী নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছিল। তিনি অহঙ্কারী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি এমন ভাব করছিলেন যে নিজেকে সর্বশক্তিমান ভাবতে শুরু করলেন। তখন বেলিন্ডা তাকে বলেন, তুমি হয়তো নিজেকে সবচেয়ে মহান বা শক্তিশালী বলতে পার। কিন্তু তুমি কখনোই সর্বশক্তিমান আল্লাহর চেয়ে শক্তিশালী ও মহান নও, আর তা হতেও পারবে না।

এরপর বেলিন্ডা আলীকে বললেন, তিনি কেন মুসলমান হয়েছেন তা কাগজে লেখার জন্য। আলীও বাধ্য ছেলের মতো এক তা কাগজ ও একটি নীল কলম নিয়ে লিখতে বসে গেলেন। কাগজে আলী তার জন্মস্থান লুইসভিলে তার কৈশোরের দিনগুলো নিয়ে লেখেন। সেসময় তার নাম ছিল ক্যাসিয়াস ক্লে জুনিয়র।

আলী লেখেন, একদিন তিনি রোলার স্কেটিং রিঙ্ক চালিয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি কালো ব্লেজার স্যুট পরা একজনকে ন্যাশন অফ ইসলামের জন্য পত্রিকা বিক্রি করতে দেখেন। আলী ন্যাশন অফ ইসলাম এবং তার নেতা এলিজা মোহাম্মদ এর নাম আগেও শুনেছেন। কিন্তু কখনোই ওই গ্রুপে যোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করেননি। ওই গ্রুপটি কৃষ্ণাঙ্গদের বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং আত্মউন্নয়ন বিষয়ক প্রচারণা চালাতো।

আলী একটি পত্রিকা ভদ্রতার খাতিরে বেশ উদাসীনভাবে হাতে তুলে নিলেন। হঠাৎ সেখানের একটি কার্টুনের দিকে তার চোখ যায়। সেখানে একজন শেতাঙ্গ মালিক তার কৃষ্ণাঙ্গ দাসকে মারধর করে তাকে যিশুখ্রিস্টের কাছে প্রার্থনা করতে চাপ দিচ্ছে। সেই কার্টুনের মূলকথা ছিল, শেতাঙ্গরা জোর করে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর খ্রিস্টধর্ম চাপিয়ে দিচ্ছে।

আলী বলেন আমি ওই কার্টুনটি পছন্দ করি। এটি আমার ওপর এক ধরনের প্রভাব ফেলে। এবং আমার কাছে সেটি অর্থপূর্ণ মনে হয়। অবাক হওয়ার বিষয় হলো, আলী তার ইসলাম গ্রহণ করার পেছনে কোনো আধ্যাত্মিক বা পরমার্থিক কথা উল্লেখ করেননি। তারচেয়ে বরং তিনি বিষয়টি বাস্তবধর্মীভাবে তুলে ধরেন।

আলী বলেন, ওই কার্টুন তাকে সচেতন করে তোলে এবং তিনি বুঝতে পারেন তিনি স্বেচ্ছায় খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেননি। তিনি নিজে তার নাম ক্যাসিয়াস ক্লে রাখেননি। তাহলে কেন তাকে ওই দাসত্বের চিহ্নগুলো বহন করতে হবে? আর তিনি যদি তার ধর্ম এবং নাম না বহন করতে চান তাহলে কী পরিবর্তন তিনি আনতে পারেন?

১৯৬৪ সালে বক্সিংয়ে হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশীপ জেতার পর আল জনসম্মুখে ঘোষণা করেন তিনি নিজে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীন। তিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহ এবং শান্তিতে বিশ্বাস করি। আমি শ্বেতাঙ্গদের এলাকায় প্রবেশ করতে চেষ্টা করি না। আমি কোনো শ্বেতাঙ্গ নারীকে বিয়ে করতে চাই না। আমার বয়স যখন মাত্র ১২ ছিল তখনই আমাকে খ্রিস্টান বানানো হয়। কিন্তু তখন আমি বুঝতে পারিনি আমি কী করছি। আমি এখন আর খ্রিস্টান নই। আমি জানি আমি কোথায় যাচ্ছি। আমি সত্য কী তা জানি। তোমরা আমাকে যা বানাতে চাও আমাকে তা হতে হবে না। আমি যা হতে চাই সে ব্যাপারে আমি আজ মুক্ত।’

এলিজা মোহাম্মদ মারা যাওয়ার পর ন্যাশন অফ ইসলাম নিজেকে পুনর্গঠন করে। তখন আলী ইসলামের মৌলিক মতবাদ আঁকড়ে ধরেন এবং কোরআন পড়েন। পারকিনসনস রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর আলী লোককে বিনোদন দেওয়ার জন্য আর বক্সিং খেলতে পারছিলেন না। সেসময় কখনো কখনো তিনি তার ভক্তদের ডেকে ধর্মীয় আলোচনা করতেন। তিনি কুরআন ও বাইবেলের মধ্যে তুলনা করতেন। আলী বলতেন বক্সিংয়ের জন্য আল্লাহ তার ব্যাপারে ভাবিত নন। বরং তিনি ভালো মানুষ ছিলেন কিনা এবং বিশ্বাসী হওয়ার কারণে তার ওপর যেসব দায়-দায়িত্ব এসে পড়েছে সেসব পালন করেছেন কিনা সে ব্যাপারেই শুধু আল্লাহ ভাবিত।

আলীর ওই চিঠিটি তার স্ত্রী বেলিন্ডা- পরে যার নাম হয় খলিলাহ ক্যামাচো-আলী, তার কাছ থেকে আবিষ্কার করেছেন তার জীবনীকার জোনাথান ইগ। জোনাথান ইগ ‘আলী’ নামে মোহাম্মদ আলীর একটি জীবনি লিখছেন।

ধর্মযাজক থেকে যেভাবে মুসলিম হন মুহাম্মদ শরিফ

শিষ্ট ইসলাম প্রচারক মুহাম্মদ শরিফ শ্রীলঙ্কার অধিবাসী। তিনি একটি ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মযাজক আর মা রোমান ক্যাথলিক। মা তাঁকে একজন ধর্মযাজক হিসেবে গড়ে তোলেন। খ্রিস্টান পণ্ডিত হিসেবে কলম্বোর বহু ধর্মীয় সভায় বক্তব্য রাখেন। তিনি তাঁর শিক্ষাজীবনে এবং পরবর্তী সময়ে ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে খ্রিস্টীয় মতবাদে পরস্পরবিরোধী সংঘাত দেখতে পান এবং তাতে তাঁর সংশয় তৈরি হয়। ১৯৭০ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে তিনি পোপের কাছে তাঁর সমস্যাগুলোর কথা জানাতে থাকেন। কিন্তু পোপের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর তিনি পাননি। ছয় বছর পর তিনি রোমান ক্যাথলিকের সংস্পর্শ ত্যাগ করেন এবং প্রটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ে যোগ দেন। কিন্তু তারাও তাকে হতাশ করে।

এ সময় চাকরির সূত্রে তিনি সৌদি আরবের দাহরানে যান। সেখানে খ্রিস্টধর্ম প্রচারে সচেষ্ট হন। তিনি যখন ঈসা (আ.)কে মুসলিমদের কাছে তুলে ধরতেন তখন তারা বলত, ‘আমরা ইতোমধ্যেই ঈসা (আ.)কে গ্রহণ করেছি।’ মুসলমানের এই দাবী অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, মুসলিমরা ঈসা (আ.)কে একজন নবী হিসেবে বিশ্বাস করে। তবে তারা তাঁকে আল্লাহর পুত্র মনে করে না। তিনি জেনে আশ্চর্য হলেন, কুরআনে ঈসা (আ.) এর নাম ২৫ বার উল্লেখ করা হয়েছে অথচ মুহাম্মদ (সা.) এর নাম মাত্র চার থেকে পাঁচবার এসেছে।

মুহাম্মদ শরিফ রিয়াদ থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের মাজমায় চাকরি করতেন। তিনি একটি নতুন কাজ পেতে একজন পাকিস্তানি ইঞ্জিনিয়ারের দ্বারস্ত হন। ইঞ্জিনিয়ার একদিন শরিফকে তাঁর বাসায় রাতের খাবারে দাওয়াত দেন। শরিফ বাসার ড্রইংরুমে ইংরেজিতে অনূদিত কুরআনের একটি কপি দেখতে পান। কুরআনের ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ হয় এবং তা পড়তে থাকেন। পাকিস্তানি ইঞ্জিনিয়ার শরিফকে বলেন, ‘আপনি কুরআনের কপিটি উপহার হিসেবে নিতে পারেন।’

কুরআনের সুরা ‘ফাতিহা’ পাঠ করার পর তাঁর আগ্রহ বেড়ে যায়। কুরআনের দ্বিতীয় সুরা ‘বাকারা’তেই তিন তাঁর অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলেন। শরিফ বুঝতে পারলেন, নবী মুহাম্মদ (সা.) নতুন কোনো ধর্ম নিয়ে আসেননি; বরং তাঁর আনীত দীনেরই পূর্ণতা দান করেছেন তিনি। ইসলাম ঈসা (আ.)কে যথাযথ সম্মান দিয়েছে। দীর্ঘ অনুসন্ধান ও গবেষণার পর তাঁর সামনে ইসলাম সত্য ধর্ম প্রমাণিত হয়। ১৯৮৪ সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর স্থানীয় মুসলিমদের কাছ থেকে তিনি ইসলামের বিধি-বিধান শিখতে থাকেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় মসজিদের ইমাম তাঁকে বিশেষ সহযোগিতা করেন।

মুহাম্মদ শরিফের মতে, ইসলাম গ্রহণ করা ছিল তাঁর জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ইসলাম প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং এই কাজে প্রস্তুতি হিসেবে ইসলামের ওপর ব্যাপক পড়াশোনা শুরু করেন। প্রচুর পরিমাণ ইসলামী সাহিত্য সংগ্রহ করেন তিনি। বহুসংখ্যক মানুষ তাঁর মাধ্যমে সত্যের দিশা লাভ করে। শরিফ বলেন, ‘ইসলামী দাওয়াতি কাজের জন্য কোনো বিশেষ ধরনের লোক হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রত্যেক মুসলিমই একজন ইসলাম প্রচারক। মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে আমাদের তাই শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, উপস্থিত ব্যক্তিরা অনাগতদের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেবে। তাই ‘যদি আমরা মুসলমান হই তা হলে রাসুলের বাণী অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের কর্তব্য।’

মুহাম্মদ শরিফ একাধিক ভাষায় কথা বলতে পারতেন। সিংহলি, তামিল, উর্দু, হিন্দি, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, জার্মান, গ্রিক ও হিব্রু তার মধ্যে অন্যতম। তিনি মনে করতেন, ভাষাগত দক্ষতা দাওয়াতি কাজের জন্য আবশ্যক। মুহাম্মদ শরিফের প্রচেষ্টায় তাঁর মা-বাবা ও ভাইরা ইসলাম গ্রহণ করে।

শরিফ বলেন, রোমান ক্যাথলিকদের যে বাইবেল রয়েছে তার ৭৩টি সংস্করণ এবং অর্থোডক্সদের বাইবেল ৮০টি সংস্করণে বিদ্যমান। কিন্তু পবিত্র কুরআনের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর কোনো সংস্করণ নেই। তিনি বলেন, খ্রিস্টান, হিন্দু এবং বৌদ্ধদের ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মমতের ভিত্তিতেই তিনি আল্লাহর একত্ববাদ ও মুহাম্মদ সা. এর নবুওয়াত প্রমাণ করতে সক্ষম। হিব্রু ভাষায় লেখা ওল্ড টেস্টামেন্টে নবী মুহাম্মদ (সা.) এর নাম আছে। তিনি আরো দাবী করেন, বৌদ্ধ মতবাদের মৌলিক শিক্ষাও ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

মুহাম্মদ শরিফ বলেন, কুরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যা তার মূল কাঠামো ও বিষয় নিয়ে আজও অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। কুরআন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান উপহার দিয়েছে। কুরআনের শিক্ষা মানবজাতিকে মুক্তি দিতে পারে। তাই তিনি মুসলিম জাতিকে কুরআনের পথে মানুষকে দাওয়াত দেওয়ার আহ্বান জানান। [সূত্র : ইন্টারনেট]

গ্রন্থনা : এমদাদুল হক তাসনিম

নির্বাহী সম্পাদক : মাসিক ইসলামী বার্তা

অর্থ সম্পাদক : বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম

 নওমুসলিমদের ইসলামে ফেরার গল্পসমূহ জানতে যে বইগুলো পড়তে পারেন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading