অনলাইন সাংবাদিকতা নিয়ে কিছু কথা

2021-10-16 অনলাইন সাংবাদিকতা – নাসির আহমাদ রাসেল 1

মুদ্রিত পত্রিকার দিন কি শেষ? এ প্রশ্ন আসবে এ কারণে যে মানুষ এখন অনেক বেশি অনলাইন পত্রিকা নির্ভর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ফেসবুকেই এখন প্রতি মুহূর্তের সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন ওয়েব পত্রিকার লিংক থেকে নানা রকম তথ্য ও ছবি পাওয়া সহজ হয়ে গেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সরকার অনলাইনকে অনেক সহজ ও সময়পোযোগী করে দেওয়ায় তথ্য প্রযুক্তি খাতে ঘটেছে ব্যাপক বিপ্লব।

প্রায় পাঁচশ বছরের পুরনো এই সংবাদপত্রের ইতিহাস খ্রিস্ট জন্মেরও আগের। ১৪০০ সালে ছাপার মেশিন আবিষ্কারের আগেও হাতে লেখা সংবাদপত্রের অস্তিত্ব ছিল। তবে ১৬৬৪ সালে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয় পৃথিবীর সর্বপ্রম সত্যিকারের আধুনিক সংবাদপত্র ‘লন্ডন গ্যাজেট’। ১৭৮০ সালে প্রকাশিত ‘ক্যালকাটা গ্যাজেট’ বা ‘হিকিস বেঙ্গল গ্যাজেট’ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সংবাদপত্র। যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের পর সর্বপ্রম সাধারণ মানুষের হাতে আসে ‘সংবাদপত্র’ নামক ধনী মানুষদের এই বিলাস সামগ্রীটি। ১৮ শতাব্দীতে বড় বড় ছাপার যন্ত্র উদ্ভাবন, টেলিগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কার, সংবাদপত্রে প্রথমবারের মতো ছবি বা ফটোগ্রাফ ব্যবহারের সুযোগ সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তাকে আকাশচুম্বী করে তোলে। যে কারণে ১৮৯০ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত সময়কে বলা হয় ‘গোল্ডেন এজ অব প্রিন্ট মিডিয়া’।

পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পরিবর্তিত হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক যাপিত জীবন। বদলে যাচ্ছে চিন্তা, রুচি আর দীর্ঘদিনের চলমান অভ্যাস। জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাছে সংবাদপত্র বা সাংবাদিকতার সনাতনী ধারাও। ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে আগামী দিনের সাংবাদিকতা। খবর জানতে এখন আর কাগুজে সংবাদপত্রের জন্য অপেক্ষা করে না মানুষ। দ্রুত খবর জানতে আশ্রয় নেয় ইন্টারনেটের। বাংলাদেশেও প্রায় সব শীর্ষ সংবাদপত্র এখন প্রিন্ট কপির পাশাপাশি অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করছে। প্রিন্ট মিডিয়া ছেড়ে অনলাইন মিডিয়ার দিকে ঝুঁকছে পাঠক। বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয়ও হয়ে উঠছে অনলাইন পত্রিকা বা সংবাদ সংস্থাগুলো।

মূলত ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যমকেই অনলাইন সংবাদমাধ্যম বলা হয়। যে কারণে ইন্টারনেটভিত্তিক সাংবাদিকতাই অনলাইন সাংবাদিকতা। ২০১১ সালের আগস্টে একটি মার্কিন ওয়েব গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে একশ কোটিরও বেশি ওয়েবসাইট রয়েছে। যার ১০ ভাগেরও বেশি ওয়েবসাইট সংবাদসংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ প্রায় সাতশ কোটি মানুষের এ পৃথিবীতে প্রতি সাতজনের জন্য একটি ওয়েবসাইট এবং প্রতি ৭০ জনের জন্য একটি অনলাইন পত্রিকা রয়েছে।

১৯৬৯ সালে সর্বপ্রম বিবিসি ভিডিওটেক্সট নামে একটি ইন্টার-অ্যাকটিভ মিডিয়া চালুর চেষ্টা করে। ওই সালেই নিউইয়র্ক টাইমস একটি অনলাইন তথ্যভা-ার তৈরি করে। ১৯৭৪ সালে ‘নিউজ রিপোর্ট’ নামে সর্বপ্রম অনলাইন সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। যেটি ইউনিভার্সিটি অব ইলিনস (University of Illinois)-G PLATO system (Programmed Logic for Automated Teaching Operations) ব্যবহার করে ব্রুস প্যারেলো চালু করেন। পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু সংবাদপত্র মুদ্রিত সংখ্যার পাশাপাশি অনলাইন সংস্করণ চালু করে। যার মধ্যে ১৯৯১ সালে চালু হওয়া দ্য উইকেন্ড সিটি প্রেস রিভিউ পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে। তবে সত্যিকারের অনলাইন সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু হয় সাউথপোর্ট রিপোর্টার নামে ২০০০ সালে যুক্তরাজ্যে।

অনলাইন সাংবাদিকতা সহজ হলেও এটি একটি চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। কেননা সঠিক সংবাদ সবার আগে পরিবেশন করাটা কিন্তু সহজ কাজ নয়। তাই যারা অনলাইন সাংবাদিকতা করতে আগ্রহী তাদের এ বিষয়ে সম্মুখ ধারণা থাকা অবশ্যক। সে কথা বিবেচনা করেই লেখক নাসির আহমেদ রাসেল লিখেছেন ‘অনলাইন সাংবাদিকতা’ বইটি। তিনি নিজেও একজন সাংবাদিক।

BUY NOW

ভারতীয় উপমহাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো নেপাল। ভৌগোলিক অবস্থার কারণে সেখানে অনলাইন সাংবাদিকতা প্রচুর উন্নতি লাভ করেছে। নেপালের রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে অনলাইন সাংবাদিকতা ব্যাপক কার্যকরি ভূমিকা রেখেছিল। সে সময় নেপাল সরকার সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করেছিল। সেই সাথে নিষিদ্ধ ছিল অনলাইনে সংবাদ পরিবেশনও। কিন্তু সংবাদকর্মীরা তাতে দমে যাননি। তারা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলোকে টুকরো টুকরো করে সেন্সরশিপকে ফাঁকি দিয়ে ঠিক সময়ে ঠিক স্থানে পরিবেশন করতে পেরেছিলেন। এতে সংবাদ পরিবেশনের ক্লাসিক দিকটি ফুটে উঠেছে।

২০১১ সালের আগস্টে একটি মার্কিন ওয়েব গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে একশ কোটিরও বেশি ওয়েবসাইট রয়েছে। যার ১০ ভাগেরও বেশি ওয়েবসাইট সংবাদসংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ প্রায় সাতশ কোটি মানুষের এ পৃথিবীতে প্রতি সাতজনের জন্য একটি ওয়েবসাইট এবং প্রতি ৭০ জনের জন্য একটি অনলাইন পত্রিকা রয়েছে। বিশ্বব্যাপী অনলাইন সংবাদপত্রের এই জয়জয়কার নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে মিডিয়া সম্রাট রুপার্ট মার্ডক বলেন, ‘ইন্টারনেট পাঠকদের অনেক বেশি ক্ষমতা দিয়েছে।’ হাফিংটন পোস্টের সম্পাদক আ্যারিয়ানা হাফিংটনের মতে, ‘এটি সংবাদপত্রের জন্য দুঃসময় হলেও সংবাদ ক্রেতাদের জন্য সুসময়।’

অনলাইন সংবাদ সংস্থাগুলো নিজস্ব ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে খুব কম সময়ের মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করে থাকে। সেই সঙ্গে গ্রাহকদের কাছে সংবাদ সরবরাহের মাধ্যম হিসেবেও ইমেইল এবং ওয়েব পোর্টাল ব্যবহার করে। নিজস্ব ওয়েব পোর্টালে সবার আগে সর্বশেষ নির্ভরযোগ্য এবং সাধ্যানুযায়ী বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করাই অনলাইন সংবাদ সংস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য। বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী অনলাইন সংবাদ সংস্থাগুলো প্রতিমুহূর্তে ঘটে যাওয়া ঘটনার আপডেট সংবাদ প্রকাশ করে। সেই সঙ্গে ঘটনার ফটোগ্রাফি এবং ভিডিও ক্লিপও প্রকাশ করে থাকে সংস্থাগুলো।

সর্বপ্রথম ২০০৪ সালে বাংলাদেশে অনলাইন সংবাদ সংস্থার যাত্রা শুরু হয়। ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে শুধু ইংরেজি ভার্সনে সংবাদ প্রকাশ ও সরবরাহ শুরু করে দেশের প্রথম অনলাইন সংবাদ সংস্থা বিডিনিউজ২৪.কম। যার স্বপ্নদ্রষ্টা, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক সাংবাদিক আলমগীর হোসেন। তার হাত ধরেই এ দেশীয় সাংবাদিকতায় এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা একটি নতুন যুগে প্রবেশ করে। বিশ্বব্যাপী স্বকীয়তা নিয়ে উপস্থাপিত হয় বাংলাদেশ। যে কারণে আলমগীর হোসেনই বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার জনক।

অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রকারভেদ করছেন লেখক এভাবে- সংবাদ প্রকাশ বা উপস্থাপনার বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে আট ভাগে ভাগ করা যায়। ১. অনলাইন পত্রিকা, ২. অনলাইন সংবাদ সংস্থা, ৩. দৈনিক পত্রিকা বা টেলিভিশন চ্যানেলের অনলাইন সংস্করণ। (যেখানে দৈনিকের মুদ্রিত সংখ্যার বিষয়াবলি এবং চ্যানেলের নিয়মিত অনুষ্ঠানাধি ছাড়াও প্রতিমুহূর্তে ঘটে যাওয়া ঘটনার তাৎক্ষণিক আপডেট সংবাদ প্রকাশিত হয়), ৪. সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক ও ষন্মাষিক পত্রিকার মুদ্রিত সংখ্যার অনলাইন সংস্করণ, ৫. ই-ভার্সন, ডিজিটাল ভার্সন, ই-নিউজপেপার বা ইলেকট্রনিক নিউজ পেপার, ৬. সফট কপি নিউজ শিট, ৭. অনলাইন রেডিও এবং ৮. অনলাইন টেলিভিশন।

তবে এ বইয়ের আলোচনার বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের অনলাইন সংবাদ সংস্থা। অনলাইন সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাৎক্ষণিক সংবাদ পরিবেশন। যে কারণে যেকোনো সংবাদ দ্রুত পেতে আগ্রহভরে ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যমেরই আশ্রয় নিচ্ছেন সংবাদপিপাসুরা। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। দেশের সকল ইউনিয়ন পরিষদে স্থাপিত হয়েছে তথ্যকেন্দ্র। কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট সংযোগসহ তথ্যপ্রযুক্তির সকল সুবিধা সেখানে রয়েছে। গ্রামে বসেই স্থানীয় সংবাদসমূহ খুব সহজে সরবরাহ করছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। ফলে কার্যকর হয়ে উঠছে তৃণমূল সাংবাদিকতা। ইন্টারনেটের কল্যাণে মুহূর্তেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে তৃণমূলের খবর।

বইটির সূচিপত্রে রয়েছে- অনলাইন সাংবাদিকতা, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রকারভেদ, আপনি যখন সাংবাদিক, অনলাইন সংবাদ সংস্থার সম্পাদকদের সাক্ষাৎকার, অনলাইন সংবাদমাধ্যম পরিচালনার আইন-কানুন, অনলাইন সংবাদ সংস্থার পদ-পদবি, দায়িত্ব ও বেতন কাঠামোসহ আরো অনেক গুরুপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে বইটিতে। অনলাইন সাংবাদিকতার বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে বইটির বিভিন্ন লেখায়। আরও তথ্য প্রযুক্তির নির্ভর আগামী সময়ে নিজেকে সেইভাবে তৈরি করতে বইটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

সাংবাদিকতার আরও খুঁটিনাটি জানতে ক্লিক করুন 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading