পাঠকরা কি এখনও উপন্যাসে নিজেদের গল্প খুঁজে পান?

বদদকে

‘এখন আর কিইবা হয়, উপন্যাস হতো আমাদের সময়ে!’ –এরকম কথা বহু প্রবীনের কাছে শোনা যায়, যারা অন্তত কয়েক দশক আগের পাঠক, বর্তমান সাহিত্যের রসবোধ বেশিরভাগ সময়ই তাদেরকে স্পর্শ করতে পারে না। অন্তত এমন অভিযোগই দেখা যায়। এটা খুব স্বাভাবিকও বটে। দশকের পর দশক মানুষ পাল্টে যায়, সমাজ পাল্টে যায়, পাল্টে যায় সাহিত্যও। তাই হয়তো বলা হয়, যার বই মানুষ দশ বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে, তিনিই জনপ্রিয় লেখক। কারণ- দশ বছরে মানুষের রুচিবোধ সহ সমাজের অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়। এসব কিছুকে জয় করে যার লেখা দশকের পর দশক পাঠকরা পড়ে থাকেন, তিনি সুসাহিত্যিক না হয়ে পারেনই না!

কিন্তু তারপরেও সমসাময়িক সাহিত্য কিংবা লেখালেখি নিয়ে যেন অভিযোগের অন্ত নেই। ‘এর লেখায় ওর প্রভাব আছে’ কিংবা ‘ওর লেখা খুবই দুর্বল’, এসব কথা সমসাময়িক লেখকদের নিত্যদিনকার সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া প্রতি বছর সমানুপাতিক হারে বইয়ের নতুন নতুন লেখক আসায় সাধারণ পাঠক ও সাহিত্যবোদ্ধাদের মধ্যে একধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কিন্তু এত কিছুকে এক পাশে রেখে সহজভাবে আমরা এই প্রশ্ন করতেই পারি, এখনকার গল্প-উপন্যাসে পাঠকরা কি আদৌ নিজের জীবনের গল্প খুঁজে পান? চলুন তাহলে বেশ কয়েক দৃষ্টিতে প্রশ্নটির উত্তর ভাবা যাক।

প্রথমত, যদি ধরেও নিই পাঠকরা এখনকার উপন্যাসে নিজেদের গল্প খুঁজে পান না। স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায়, এর ফলাফল হবে বই-বিমুখ হয়ে যাওয়া। পুঁজিবাদের দৃষ্টিতে দেখলে বই বিক্রি কমে যাবে অনেক বেশি। অন্তত নতুন বই কেনা থেকে সমসাময়িক পাঠকরা নিজেদের হাত গুটিয়ে নেবেন। কিন্তু বাস্তব চিত্রে কি সেরকমই কিছু দেখা যায়? এখানে একটা বইয়ের উদাহরণ দিয়ে এই ‘জনপ্রিয় থিওরি’র ইতি টানা হবে। বইটা হলো, আনিসুল হকের লেখা উপন্যাস ‘মা’ । মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া আজাদ এবং তাঁর ত্যাগী মা’কে ঘিরে আবর্তিত বিভিন্ন ঘটনা এই বইয়ের উপজীব্য হয়ে উঠেছে। অথচ আমরা মুক্তিযুদ্ধকে পার করে প্রায় পঞ্চাশ বছরের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছি। সে হিশেবে একদম ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ‘অসংখ্য’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প ও উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। স্বাভাবিক অর্থেই মনে হতে পারে, এত বছর পর অন্তত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইকে পাঠক সেভাবে গ্রহণ করবার কথা নয়। কিন্তু অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে এই মা বইয়ের একশো তম মুদ্রণ ! এই বইগুলো তো এই প্রজন্মের ছেলে মেয়েরাই কিনেছে। তাহলে কি সত্যিই তারা বই কিনতে আগ্রহী নয়?

ধরে নিলাম, মুক্তিযুদ্ধের বইগুলো আমাদের হৃদয় থেকে নাড়া দেয় বলেই না হয় পাঠকরা একটু বেশিই গ্রহণ করেছে। তবে অন্য উদাহরণ দেয়া যাক। থ্রিলার সাহিত্যে বাংলাদেশে মৌলিক বইয়ের যাত্রা খুব বেশি দিনের নয়। বরং বাংলা সাহিত্যের থ্রিলারে ফেলুদা-ব্যোমকেশের পর সেরকম ধারাবাহিকভাবে কেউই কাজ করেননি। কিন্তু বাংলাদেশি লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ বইটি বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গ মিলিয়ে বিক্রি হয়েছে প্রায় এক লক্ষ কপি! অথচ বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৫ সালে। এই ক’বছরে লাখ কপি বইগুলো কি আমাদের প্রজন্ম কেনেনি? আমরা কি তাও এই প্রশ্ন তুলতে পারি, এখনকার পাঠকরা বই বিমুখ হয়ে গেছেন?

এবার তবে অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক। সত্তরের দশকে লেখালেখি শুরু করেছিলেন শহীদুল জহির। সেই যাত্রা থেমেছিলো তার মৃত্যুর পর ২০০৯ সালে। কিন্তু নব্বই দশকে শুরু করে এখন পর্যন্ত টানা লিখে যাওয়া একজন অদ্ভুত সুন্দর গল্পকার হলেন শাহাদুজ্জামান। ২০১৯ সালে প্রকাশিত ‘মামলার স্বাক্ষী ময়না পাখি’ বইটিতেও ফুটে উঠেছে তার মুন্সীয়ানা। অনেক পাঠকরা আবেগাক্রান্ত হয়ে বলেছেন, ‘মামলার স্বাক্ষী ময়না পাখি’ বইটি শাহাদুজ্জামানকে টিকিয়ে রাখবে বহু বছর। এছাড়াও বইটি জিতেছে ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই’ সম্মাননা। পাঠকদের কাছে গ্রহণযোগ্য এই বইটিতে কি তারা নিজেদের গল্প খুঁজে পেয়েছিলেন? প্রশ্নটা পাঠকদের উদ্দেশ্যেই তোলা রইলো।

সম্প্রতি লেখক ও গীতিকার লতিফুল ইসলাম শিবলী ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর লেখা আসমান বইটির পেপারব্যাক ভার্সনের জন্য লেখক অর্থ ছেড়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ নতুন প্রকাশিত বইটি থেকে কোনো অর্থ তিনি গ্রহণ করবেন না। আর তাই বইটির মূল্য হবে মাত্র একশো টাকার মধ্যে। বইটি ইতোমধ্যে প্রায় হাজার পাঁচেক কপি বিক্রি হয়েছে দ্রুত সময়ে। বইটির চাহিদা পাঠকদের মধ্যে তুঙ্গে থাকায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, পাঠকরা টাকার জন্য বই কিনতে পারবে না এটা হতে পারে না। তাঁর লেখা প্রত্যেকটি বই পাঠকনন্দিত হয়েছে। তাঁর লেখা উপন্যাস পাঠকদের কাছে হয়ে উঠেছে নিজের জীবনের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের একটি বাস্তব ‘টেক্সট’ হিশেবে। সর্বশেষ প্রকাশিত লতিফুল ইসলাম শিবলীর বই ‘রাখাল’ যেন পুরনো এক প্রথার মাধ্যমে বলে গেছে বর্তমানের নিষ্ঠুরতা। এটাই তো লেখকের শক্তি।

তবে বর্তমান সময়ের আরেকজন লেখক আসিফ নজরুলের উপন্যাস নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম কথা হয়। তাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ভূমিকায় বেশিরভাগ মানুষ দেখলেও তাঁর লেখা উপন্যাস সমাজ ও বাস্তবতার এক অনন্য প্রতীক বলেই সমালোচকরা বলে থাকেন। তাঁর লেখা সর্বশেষ উপন্যাস ‘ঘোর’ অনেক পাঠকের মন ছুঁয়ে গেছে। তাদের অনেকেই বলেছেন, রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে আসিফ নজরুল মূলত আমাদের সমাজের কথাই বলে গেছেন অকপটে। রকমারি ডট কমের রিভিউতে মুমতাজ নামের একজন লিখেছেন,

রাজনৈতিক উপন্যাস বলা যায় দুটোকেই। ‘ঘোর’ পড়ে অকারণ হাপুস নয়নে কান্না আসলো একটা জায়গায়। কিন্তু ঔপন্যাসিক হিসেবে আসিফ নজরুল জকির মত। যেন দৌড়ে শেষ করলেন, পড়া শেষ করে হাঁপাতে হচ্ছিলো। আকারে উপন্যাস, কিন্তু পড়তে হলো রণকাব্যের গতিতে এক বসায়, আর শেষটা একদম ছোট গল্পের মত।

মনে হয় না, এরপর নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন। পাঠকের বয়ানেই উঠে আসে, ‘উধাও’ কিংবা ‘ঘোর’ উপন্যাসগুলোর মতো বইগুলোতে তারা নিজেদের গল্প আদৌ খুঁজে পাচ্ছেন কিনা।

আরেকজন লেখকের কথা আপনাদের বলতে চাই। তিনি এই সময়ের লেখক। কিন্তু মাত্র তিনটে বই লিখে তিনি ডুব দিয়েছেন। তাঁর নাম রাজীব হাসান। ‘হরিপদ ও গেলিয়েন’ নামে তিনি প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রথম বই প্রকাশ করেন। বইটি সেবছরই শিশু সাহিত্যে ‘কালি ও কলম সাহিত্য সম্মাননা’ লাভ করে। পরের বছর তিনি লেখেন বৈচিত্র্যময় গাঠনিক এক উপন্যাস ‘আমাদের শহরে বাঘ এসেছিলো’। রাজীব হাসানের প্রথম বই ‘হরিপদ ও গেলিয়েন’ প্রচলিত শিশু সাহিত্যের বাইরে বেশ শক্তিশালী একটি কাজ। যেখানে বর্তমান লেখকদের কাছে শিশু সাহিত্যের আবেদন দিন দিন কমে আসছে, সেখানে তিনি বইয়ের যাত্রা শুরুই করেছিলেন শিশু সাহিত্য দিয়ে। এবং সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, শিশু-কিশোরের বাইরেও অনেক বয়সী পাঠকদের কাছে এটি ছিলো আক্ষরিক অর্থে মিষ্টি একটি গল্প। যা আমাদেরকে নিয়ে যায় ইউটোপিয়ান একটি সুন্দর ফ্যান্টাসি বাস্তবতায়। কিন্তু দিনশেষে গল্পটা যেন আমাদেরই হতে চায়।

তারপরের বছর ‘আমাদের শহরে বাঘ এসেছিলো’ উপন্যাসটি পূর্বের বইয়ের তুলনায় অপেক্ষাকৃত জটিল গদ্যে লেখা। বনের বাঘ যখন শহরে হানা দেয় তখন স্বভাবতই মানুষের মধ্যে যে ভীতির জন্ম দেয়, তার মধ্যে হারিয়ে যায় আমাদের আশেপাশে স্বভাবিকভাবে ঘুরতে থাকা কিছু বাঘের কথা। এমনই বেশ কয়েকটি গল্পের সূত্র এক স্থানে করে লেখা রাজীব হাসানের উপন্যাসটি যেন পাঠকদের নিজের গল্প বলে দেয়। পাঠক নিজেদের গল্প খুঁজে পায় একটি উপন্যাসেই বারংবার। এবং সবশেষ ২০১৯ সালে তার প্রকাশিত ‘বোকাবাবা ও কিডন্যাপার’ বইটির মাধ্যমে তিনি ফিরে গেছেন শিশু-কিশোর সাহিত্যে তাঁর মহিমায়। এই সময়ের লেখক রাজীব হাসানের শিশু সাহিত্যের সাথে সাথে সমাজের গল্প বলা উপন্যাসেও পাঠক যেন খুঁজে পায় নিজেদের। মাঝে মাঝে আঁৎকে ওঠে নিজেদের গল্প দেখে!

এসময়কার একজন ব্যতিক্রমধর্মী লেখকের কথা বলে লেখার ইতি টানছি। তাঁর নাম ওবায়েদ হক। সাহিত্য সমালোচকসহ যে কোনো পাঠকই যেন তার ব্যাপারে একটু ‘বায়াসড’। অথচ কোন বইয়ের ফ্ল্যাপে নেই তাঁর কোন ছবি অথবা পরিচয়। লেখক পরিচয়ের জায়গায় ছবিহীন কিছু সাদা অক্ষরে লেখা থাকে-

বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা উল্টিয়ে লেখকের পরিচয় পাওয়া সম্ভব নয় লেখক, যুবক নাকি বৃদ্ধ, শিক্ষিত নাকি অশিক্ষিত, ধনী নাকি গরীব , এগুলো অপ্রাসঙ্গিক লেখকের পরিচয় পাওয়া যাবে প্রথম এবং শেষ পৃষ্ঠার মাঝের পৃষ্ঠাগুলোতে

তাঁর লেখা উপন্যাস ‘তেইল্যা চোরা’ ইতিহাস বঞ্চিত নিচু শ্রেণির এক চোর এবং তার পরিবারের মুক্তিযুদ্ধ দেখার গল্প বলেছে। ওবায়েদ হকের লেখা আরেকটি উপন্যাস ‘নীল পাহাড়’ স্বতন্ত্রধারায় বলেছে আশির দশকের রাজনৈতিক সংকটে জীবনের টানাপোড়েন এবং কিছু হিংসা, ঘৃণা ও সত্য, যা ঘিরে আছে নীল পাহাড়কে। তাঁর লেখা অন্যতম আরেক উপন্যাস ‘জলেশ্বরী’ বইতে বিধৃত হয়েছে পিতার মৃত্যু রহস্যের জট খুলতে গিয়ে কাজল নামের এক যুবের জীবন বদলে যাওয়ার গল্প। এ যেন জীবনের অনন্য এক উপখ্যান, যার মধ্যে পাঠক ফিরে ফিরে পায় নিজেদের কথা।

দিনশেষে, যদি খোলা মনে এই প্রশ্ন করতেই হয় যে, এখনকার উপন্যাসে কি পাঠকরা নিজেদের গল্প খুঁজে পান? তবে মনে হয় উত্তরটা ইতিবাচকের দিকেই এগোয়।

সমকালীন উপন্যাসগুলো দেখতে ক্লিক করুন 

Zubayer Ibn Kamal

Zubayer Ibn Kamal

For the last half a decade, I have been writing stories, articles, features, and other content in various national level magazines. I am most interested in creative writing. I have read thousands of fiction books in the last few years. I have memorized the book of the last revelation of God. My day goes by reading books and thinking.

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Loading