ফোন করার সময়, এই অদ্ভুত কাজগুলো কি আপনিও করেন?

ফোন

মনে করুন, আপনি একজনাকে ফোন করেছেন। আপনার ভাগ্য ভালো থাকায় তিনি আপনার ফোন ধরলেন, কথাও বলছেন। তবে আপনি তার কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছেন না। দু’ একবার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে দেখলেন- নাহ, একেবারেই হচ্ছে না।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায়?” আপনি বললেন, “এই তো বাসায়।”

“এই ডানে যাও, দেখতে পাও না নাকি?” আপনি বুঝলেন, তিনি পাশের কাউকে বুঝি কিছু বলছে।

“আরে কথা বলছো না কেন?”

আপনি ব্যস্ত হয়ে বললেন, “হ্যালো, হ্যালো,  আমি কথা বলছি তো। শুনতে পাচ্ছেন? “

তখন দেখলেন ওদিকের আওয়াজটা অনেক কমে গেলো, অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর। অর্থাৎ ফোনের থেকে তার মুখ দূরে সরে গেছে।  তারপর শুনলেন, “এই, তুমি এদিকে আসো।”

একসময় শুনলেন, “এখন বলো, যা ঝামেলার মধ্যে আছি।”

আপনি অন্য কাউকে কিছু বলছে ভেবে চুপ করে থাকলেন, কিন্তু এবার আসলে আপনাকেই বলেছে।

ফোনে একেক মানুষ একেক রকম আচরণ করেন। সচরাচর তাদের সামনাসামনি আচরণের সাথে মিল থাকে। কিন্তু তা অন্যের কাছে কেমন লাগে তারা বুঝতে পারেন না।

কিছু ব্যতিক্রমী ফোনালাপ তার আগে বলে নেই। এ ক্ষেত্রে শুরুতেই একটা বিরাট অভিযোগ, “আপনাকে তো পাওয়াই যায় না? খুব ব্যাস্ত নাকি?”

তারপর আছে হড়বড় করে কথা শুরু করা, “মানুষ যে কি না! এর থেকে গরু ছাগলের সঙ্গে বাস করা ভালো। কি যে রাগ হচ্ছে!! পরশু রাত সাড়ে দশটায়….” বলে বিরাট একটা গল্প ফেঁদে বসা। আপনি কি করছেন, এখন কোথায়, অবসর আছে কিনা, সেসব প্রথমে জেনে নেওয়ার বালাই নাই।

এছাড়াও ফোন রাখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন কায়দা আছে। একজন হয়তো হুট করে কথা কমিয়ে দিলেন। প্রথমে দিকে, “তাই নাকি”, “ও আচ্ছা “, “হুমম”। শেষে এক অক্ষরের উত্তরে গিয়ে ঠেকলো,  “ও”।

তারপর ওপাশে আর কোনও শব্দ নেই।  যখন আপনার সন্দেহ হবে ওপাশের মানুষটি আছে কিনা, এবং ওপাশ থেকে যখন ঠান্ডা গলায় জানান দেবে “আছি”, তখন আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন এখন তিনি ফোন রাখতে চাইছেন।

কেউ কেউ আবার হুট করেই পাশের কারও সাথে কথা বলা শুরু করে দেয়। হয়তো কেউকে বলছে, “আরে দাঁড়াও  না? এই একটু, হয়ে গেছে, দুই মিনিট।”

অর্থাৎ তিনি ফোন রাখতে চাইছেন, কিন্তু আপনাকে সরাসরি বলছেন না।

কেউ আবার নিজের মনে কথা বলছেন, যেন বই বা অন্য কিছু পড়ছেন।

আরেকটি টেকনিক হলো, “আমার একটা জরুরি ফোন এসেছে, পরে ফোন করবো।” কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে কোনো ফোন কল আসে নি।

জোরে জোরে হাই তোলা, এমনকি আলগোছে ফোন কেটে দেওয়া, যেন নেটওয়ার্কের কারণে লাইন কেটে গেছে, সেগুলো টেকনিকও মানুষ ব্যবহার করে থাকে।

কথা ঠিক মতো শোনা না গেলে একেকজন একেক কাজ করেন। কেউ কেটে দিয়ে আবার করেন। কেউ জোরে জোরে চিৎকার করে কথা শোনানোর চেষ্টা করেন। কেউ আবার বলেন “আপনার ফোনে সমস্যা নাকি? আমারটা তো ঠিক আছে?” তারপর আছে, “একটু জোরে কথা বলেন”, আরও কত কী!

সমস্যাগুলো সবার জন্যে সমান। হয়তো ফোন রাখতে হবে, হয়তো কথা ঠিকমতো শোনা যাচ্ছে না। কিন্তু তার সমাধানের উদ্দেশ্যে টেকনিকের প্রয়োগটা ভিন্ন ভিন্ন। আর এ কারণেই একজনের ব্যক্তিত্ব আরেকজনের থেকে ভিন্ন হয়।  ব্যক্তিত্বের অনেকটাই বেড়ে উঠার প্রক্রিয়া এবং প্রশিক্ষণ থেকে এসেছে।

অনেক বড় ধরণের এবং জরুরি বিষয়ের প্রশিক্ষণ কোথাও দেওয়া হয় না। একটি পিরস্থিতিতে ঠিক কীভাবে কথা বলা উচিত? আমেরিকায় শিশুদের শিক্ষা দেয়া হয়, কেউ তাদের অনাকাঙ্খিতভাবে স্পর্শ করার চেষ্টা করলে বলতে হবে “ডোন্ট টাচ মি “। এক উত্তরেই বদ মানুষটি ঘায়েল। এই শিক্ষা না থাকলে, সে হয়তো চোখ মুখ লাল করে বসে থাকবে, অথবা মোচড়ামুচড়ি করবে। অথবা বড় জোর সেই মানুষটি থেকে সরে আসবে।  আমাদের বেশিরভাগ দৈনন্দিন এবং গতানুগতিক প্রশ্নের উত্তর কোনও না কোনওভাবে  মাথায় নথিবদ্ধ  করেছি। পরিস্থিতিতে মাথা সেই নথিবদ্ধ উত্তরকে বের করে নিয়ে আসে। তাই যদি হবে, খারাপ উত্তরটা ফেলে দিয়ে ভালো একটা উত্তর নথিবব্ধ করিনা কেন? অকাজের উত্তরগুলোকে কাজের উত্তর দিয়ে একবার প্রতিস্থাপন করলেই, বাকি জীবনের দীর্ঘ সময়টুকু খুব কাজে লাগবে।

যেমন, ফোন যদি রাখারই প্রয়োজন থাকে, কথা সংক্ষেপ করার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো, সরাসরি বলে ফেলা। ঘুরিয়ে বা তীর্যকভাবে ব্যাপারটা বোঝালে ফল ভালো হয় না। তাতেও মানুষটা বুঝলো ফোন রাখতে হবে, তবে খারাপ ভাবে বুঝলো। অনেকক্ষেত্রে অপমানিতও  বোধ করতে পারে।  তারপর হয়তো আপনার এই মুহূর্তে ফোন রাখা দরকার, তীর্যক ব্যাপারগুলো মানুষটা বুঝতে বুঝতে অনেক সময় লেগে যেতে পারে।  আপনার জরুরি কিছু থেকে থাকলে সেটাতেও দেরী হয়ে যাচ্ছে।

ফোন ধরে প্রথম দুয়েক মিনিট অন্য কিছু করা একেবারেই শোভন নয়। তেমনটা ঘটলে সময় চেয়ে নিন। অথবা ফোন না ধরাই উত্তম বিবেচনা। ফোন যে ধরতেই হবে তা নয়। গুরুত্বপূর্ণ মনে না করলে, বরং সময় নিয়ে পরে ফোন করাই ভালো। তবে সাথে সাথে একটা টেক্সট পাঠিয়ে, পরে ফোন দেওয়ার কথাটা জানিয়ে দিলে আরো ভালো হয়।

আশেপাশে কে আছে, সেটাও বিবেচনায় রাখা জরুরি। মানুষের ভিড়ে হেড়ে গলায় স্টক মার্কেটের আলোচনা করাটা নিশ্চয়ই অশোভন।

এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন চলেই আসে, কথা শেষ হলে কে আগে ফোন রাখবে? সচরাচর যে ফোন করেছে তারই রাখার কথা। কথোপকথন সংক্ষিপ্ত হলে সে সুযোগই দেওয়া উচিৎ।

ফোনে কথা পরিষ্কার শোনা না যাওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে।  নেটওয়ার্ক সমস্যা হতে পারে, সেক্ষত্রে “শুনতে পাচ্ছি না, আবার করছি” বলে কেটে দিয়ে আরেকবার চেষ্টা করা যায়। বাইরের আওয়াজ থাকলে, সেটা থেকে দূরে সরে গিয়ে কথা বলা। অন্যদিক থেকে সমস্যাটা হলে, “আপনার ওখানে ঘটঘট আওয়াজ কিসের?” না বলে, “কথা ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছি না” বলাটা অনেক শোভন।

ফোনে অনেক সময় মনে হয়, আওয়াজটা বুঝি ওপাশ থেকে আসছে। কিন্তু একটা শব্দ ফোন লাইন নিজেই তৈরী করে ফেলতে পারে। সেক্ষেত্রে এ পাশের মানুষ বলেন, আওয়াজ ওপাশ থেকে, ওপাশের জন বলেন, এপাশ থেকে। এই বিতর্কে না যাওয়াই ভালো। ফোন সেটেরও গোলমাল থাকতে পারে। সেটা ওদিকের না এদিকের, হলফ করে বলা যাবে না।

ফোন করে মানুষটিকে না পেলে, মিস কল দেখে তিনি প্রত্যুত্তর দেবেন সেই ভরসায় না থেকে, টেক্সট করা উচিত। অনেক কারণে নাম্বারটি তার ফোনে নাও উঠতে পারে, কিন্তু টেক্সট ম্যাসেজের নিশ্চয়তা অনেক বেশি।

ম্যাসেঞ্জারে, ভাইবারে, হোয়াটস আপে, বা অন্য এপে  অচেনা মানুষকে ফোন দিতে নেই। প্রয়োজন হলে টেক্সট পাঠান। চেনা মানুষকেও, যদি মানুষটি ব্যস্ত বলে আপনি জানেন, তাকে ফোন করার আগে টেক্সট পাঠান, তিনি ব্যস্ত কি না জেনে নিন।

ফেসবুকে একটি অচেনা মেয়ে আপনার বন্ধু হলো। আপনি খুশিতে ডগমগ হয়ে তাকে ফোন করলেন। সেটা বেশ গর্হিত একটা কাজ।  ছেলেকেও ফোন করলে গর্হিত। এফ বি ফ্রেন্ড হওয়া মানে নিছক একটা গ্রূপের সদস্য হওয়া। বড় জোর টেক্সট পাঠানো যেতে পারে। সরাসরি ফোন কবলে, সেই মেয়ে আপনাকে ব্লক করার সম্ভাবনা নিরানব্বই ভাগ, তা আপনার গলা যত মধুর হোক না কেন।

প্রোগ্রামিং এ একটা কথা আছে, ‘সিনক্রোনাস এবং এসিনক্রোনাস জব’।  সিনক্রোনাস জবে, অন্য কিছু আর করা যায় না।  সেই জব শেষ হওয়া পর্যন্ত কম্পিউটার স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকতে হয়। এসিনক্রোনাস জবে হলে, সেখানে জবটাও হচ্ছে আবার আপনি অন্য কিছুও করতে পারছেন। তার সাথে যদি তুলনা করি, ফোনে কথা বলা হলো সিনক্রোনাস জব। অন্য কোনও কিছু  প্রায় করা যায় না। টেক্সট, ইমেইল, এগুলো এসিনক্রোনাস।  পড়ার পর বেশ কিছু সময় ফেলে রাখা যায়, সাথে সাথে উত্তর দিতে হচ্ছে না। দরকার হলে ভেঙে ভেঙে, এক দু লাইন করে উত্তর দেওয়া গেলো।

ফোন লাইন কোনও কারণে কেটে গেলে কি করা উচিৎ? দু’জনেরই কর্তব্য আবার চেষ্টা করে দেখা। আরো ভালো হয়, একটি টেক্সট পাঠিয়ে বলে দেওয়ায় যে কোনও অজানা কারণে লাইন কেটে গেছে। কিছুই না বলাটা অনুচিত, এমনকি কথাবার্তা যদি প্রায় শেষ হয়ে গিয়েও থাকে। এতে ভুল বোঝার বিরাট অবকাশ রয়ে যায়। অপরপক্ষ মনে করতে পারে আপনি ইচ্ছে করেই লাইন কেটে দিয়েছেন। তবে একই সাথে দুজন চেষ্টা করতে গিয়ে দুদিকেই লাইন এনগেজ পাওয়া যাচ্ছে, সেটা আরেক সমস্যা।

আরও একটি বিষয়, আশপাশে যদি অন্য কেউ থাকে, তবে অপরপক্ষকে না জানিয়ে স্পিকার ফোন ব্যবহার করা অনুচিৎ। সেক্ষেত্রে আর কে শুনতে পাচ্ছে, সেটা শুরুতেই বলে দিতে হবে। কথা সাদামাটা হলেও, ব্যাপারটা অনুমতি নিয়ে করাই শ্রেয়।

অনেক দেশে গোপনে ফোনের  কথাবার্তা রেকর্ড করাটাও কিন্তু বেআইনি। যদি কোনও কারণে  করতেই হয়, তাহলে অপর  পক্ষের অনুমতি নিতে হবে,  বলতে হবে আমাদের কথাবার্তা রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে।

মোটকথা হলো, ফোন ধরার আগে ধরার মতো ফুরসৎ আপনার আছে কি না নিজেই বিবেচনা করে দেখবেন। যে কোনও কথা, অর্থাৎ ‘এখন কথা বলার সময় হচ্ছে না’, সেটা সরাসরি বলবেন। অন্য পক্ষের কুশলাদি ছাড়াও, তার হাতে সময় আছে কিনা সেটা জেনে নিন। পূর্ণ মনযোগ দিন। মনোযোগে  ব্যাঘাত ঘটলে ফোন রেখে দিন। ছাড়া ছাড়া কথা বলার থেকে তখনকার মতো ইস্তফা দেওয়াই ভাল।  আর ব্লেম করবেন না। কথাটা পাল্টিয়ে, ‘শুনতে অসুবিধা হচ্ছে’ সেটা বলুন। সমস্যা হয়তো লাইনে, অথবা আপনার ফোন সেটেই।

অন্যের সুন্দর ব্যবহারটা আমরা খুব সহজেই ধরে ফেলি, কিন্তু নিজে সেটা সহজে করে ফেলতে পারি না কেন, সেটাই বিস্ময়।

ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন ভুল সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading