পোস্টম্যানের পোস্টমর্টেমঃ আমাদের পরিচয় ছিলো না

আমাদের পরিচয় ছিলো না

প্রিয় কাসাফাদ্দৌজা নোমান,
সেদিন তোমার ফেসবুক স্ট্যাটাসে দেখলাম নাম নিয়ে বিপত্তির কথা। তোমার খটমট নামটিকে ছেটে ফেলে কাসা নোমান বা কাছা নোমান করে দেবার পরামর্শ দিয়ে অনেকগুলি লাইক এবং হাস্য প্রতিক্রিয়া বাগিয়ে নিয়েছিলাম। শেষবার যখন দেখেছি ৮৩ ছিলো। সেঞ্চুরি হয়েছে কি না দেখো তো! এসব কথা হয়তো বা তোমার “ভাল্লাগতেছে না”, ওকে তাহলে তোমার নতুন বইয়ের গল্পগুলি নিয়েই দু কথা বলা যাক! ভালো কথা, তোমার প্রথম গল্পটার নামই আবার “ভাল্লাগতেছে না”! ভাল্লাগতেছে না গল্পটা কিন্তু আমার ভাল্লাগছে বেশ। তোমার ট্র্যাকের বাইরের গল্প। চরিত্রগুলো পরিচিত, প্লটটাও পরিচিত। কিন্তু বলার ভঙ্গিটা অন্যরকম, সুন্দর। মুক্তগদ্যের মত। তুমি একসময় ব্লগে অনেক কিছু লিখেছো। পটকা ভাই সিরিজ, অণুকাব্য, কবিতা রিয়াল লাইফ জোক্স, গল্প ইত্যাদি! সেই সময়ে তোমার খুবই কম সাড়া পাওয়া একটা লেখা ছিলো ‘সুতো’। মনে আছে কি? ঐ লেখাটা পড়ার পর ইচ্ছে হচ্ছিলো একদিন অন্তত এই ঘরানার একটি গল্প লিখবে। “ভাল্লাগতেছে না” ঠিক ওরকম একটা গল্প। আমি তৃপ্ত।বইমেলা-২০১৮ তে প্রকাশিত কাসাফাদ্দৌজা নোমানের গল্পগ্রন্থঃ আমাদের পরিচয় ছিলো না ,

আমাদের পরিচয় ছিল না

BUY NOW

বইটির কিছু অংশ পড়ে দেখুন রকমারি ডট কম-এ
পরের গল্পটা- এ্যাডভান্সড ইংলিশ গ্রামারে আবার সেই পরিচিত তোমার দেখা। সরস বর্ণনা এবং সংলাপ, সম্পর্কের জটিলতা সব মিলিয়ে বেশ ভালোই এগুচ্ছিলো। বেশ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম পরিণতির জন্যে। মনে রাখার মত একটা সমাপ্তি দিতে পেরেছো বটে! গল্পটার শেষে যে অনুভূতিটা পেয়েছি তাকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন! মনে হয় এটা দুঃখের, মনে হয় সুখের, মনে হয় অপ্রাপ্তির, আবার মনে হয় এমন অনুভূতি নিয়ে দিগ্বিজয় করতে বেরুনো যায়। আসলে যে এটা কী!
তোমার প্রতিটা গল্পেই একটা এনগেজিং ব্যাপার আছে। জানতে ইচ্ছে হয়, এর পর কী হলো। কাহিনী এবং চরিত্র নির্মাণে একরকম প্রগলভ দক্ষতা আছে তোমার। মনে হয় যে লেখা এত সহজ! লিখে ফেললেই হলো আর কী! এই অলস অনায়াস ব্যাপারটা অর্জন করাটা বেশ কঠিন বৈ কি!

এর আগে ব্লগে তোমার অনেক গল্পই ভালো লাগে নি। এমনিতে তুমি যেকোন কিছুই খুব রসিয়ে বলতে পারো, কিন্তু একটা কাঠামোর মধ্যে এনে বলাতে হয়তো তোমার কিছুটা অনাগ্রহ ছিলো। এই বইয়ের গল্পগুলো পড়ে মনে হলো তুমি এখন বেশ আগ্রহ নিয়েই নিজের মত একটা কাঠামো বানিয়ে নিয়েছো। বিশেষ করে বলতে হয় তোমার শেষের পাঞ্চলাইনের কথা। “মোজাম্মেল ফিরে আসে নি” গল্পটির প্রসঙ্গ চলেই আসছে। বিয়ের দিন নিখোঁজ হওয়া এক যুবকের এই গল্পের ঘটনাক্রম বেশ আকর্ষণীয়। আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেছিলাম মোজাম্মেল ঠিক কী কারণে পালিয়ে গিয়েছিলো জানতে। তুমি যখন মোজাম্মেলকে ফিরিয়ে আনলে, মনে মনে অনেকরকম সম্ভাবনার ছক এঁকেছিলাম। কিন্তু তুমি করলেটা কী! সকল উত্তেজনা, আগ্রহ, কৌতূহলকে মাত্র একটি বাক্য দিয়ে ঘুরিয়ে দিয়ে গল্পের চরিত্রটাই পাল্টে দিলে। শেষ বলে একদম ফ্রি হিটে ছক্কা!

এই গল্পের সাথে মিল পাই শিরোনামের গল্পটির। “আমাদের পরিচয় ছিলো না”- এটাও একদম শেষ চালে পাশার দান উল্টিয়ে দেয়া গল্প।
তো এগুলি ছিলো তোমার এই বইয়ের উল্লেখযোগ্য দিক। এবার কিছু নিন্দেমন্দ করা যাক! প্রথমেই বলবো “আজ একটি বিশেষ রাত” গল্পটির একটা বিশাল প্লটহোলের কথা। এই গল্পের মূল চরিত্র মজিদকে যেভাবে তৈরি করেছো, তাতে পাঠক তাকে একজন অকর্মা এবং দরিদ্র মানুষ হিসেবেই কল্পনা করবে। যে কোন কাজ করে না, প্রতি রাতে মাতাল হয়, এবং শ্বশুরবাড়ির দয়ায় বেঁচে থাকে। সে যে সমাজের নিম্নশ্রেণীর অশিক্ষিত মানুষ, তা তার বউয়ের সাথে আলাপে বোঝা যায়। তাহলে এখন বলো, প্রতেবেশী ডিভোর্সি হিন্দু মহিলা অনিমার অফিসে গিয়ে সে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে আলাপ জমানোর চেষ্টা করবে, এবং অনিমা তাকে তার বাসায় দাওয়াত দেবার আহবান জানাবে সেটা কতটা যুক্তিসঙ্গত? অনিমার কথাবার্তা তো বেশ ছিমছাম, শুদ্ধ। নাহ এটা ঠিক যায় নি গল্পের সাথে।

নিয়োগপত্র গল্পটা সম্পর্কে বলতে হয়, প্রেডিক্টেবল এবং প্লেইন। মূল চরিত্রটি যখন তার নিয়োগপত্রটি চায়ের দোকানে রেখে একটু সামনে এগুলো, তখনই গল্পের পরিণতি বোঝা হয়ে গেছে। স্পয়লার দিচ্ছি বলে হতাশ হলে? নিশ্চিত থাকো বেশিরভাগ মানুষই বুঝতে পারবে এটা আগে থেকে। আর এই ট্রাজিক পরিণতির পর যে মাখা মাখা সংলাপ, তাও যথেষ্ট অসহনীয়!

সামগ্রিকভাবে যদি বলি, তোমার বইটা শেষ করার একটা তাড়া ছিলো আমার। বই রেখে অন্য কাজ করতে গেলে মনে হয়েছে যে একটা বই পড়ছিলাম, ওটা শেষ করা দরকার। সেন্স অফ হিউমার অনেকেরই থাকে, কিন্তু সেটাকে গল্পের ফর্মে সুন্দরভাবে সবাই ফেলতে পারে না। তুমি পারো। হুমায়ূন আহমেদের কিছুটা ছায়া পাওয়া যাও অবশ্য বর্ণনা এবং সংলাপে, তবে সেটা অন্যদের মত না যারা অন্ধভাবে অনুকরণ করে। তার ছায়া কিছুটা থাকলেও তোমার হিউমার, তোমার চরিত্র, তোমার গল্প তোমার মতই। সেটা নিয়ে আমার কোনো অবজেকশন নেই।

তবে তোমার গল্পের বিষয়বস্তু এবং চরিত্রগুলোয় বৈচিত্র কম। সম্পর্ক অথবা সম্পর্কহীনতা, বেকার যুবকের দিনলিপি, ভালো না লাগা ইত্যাদি ঘুরে ফিরে আসে। এই গল্পগুলোও অবশ্য বিভিন্ন আঙ্গিকে বলা যায়, প্রথম গল্পটা(ভাল্লাগতেছে না)’র মত বা আরো অন্য কোন ধারায়। তুমি চাইলেই পারো।
সময়টা উপভোগ করো নিস্পৃহ মাছের চোখে আর আমাদের দেখাতে থাকো বহুবর্ণা বায়োস্কোপ।

কাসাফাদ্দৌজা নোমান এর বই সমূহ

 

ইতি
হাসান ভাই

লিখেছেন হাসান মাহবুব, হাসান মাহবুব একজন লেট ব্লুমার! জন্ম ১৯৮১ সালে হলেও লিখতে শুরু করেন ১৯৯৮ সাল থেকে। প্রথমে পদ্য লিখতেন, পরে ঝুঁকলেন গদ্যের দিকে। মাঝখানে দু বছর লেখেন নি। তবে ব্লগে আসার পর থেকে লিখেই চলেছেন। প্রকাশিত বই- প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত (২০১২), আনন্দভ্রম (২০১৬), নরকের রাজপুত্র (২০১৭) এবং মন্মথের মেলানকোলিয়া (২০১৮)। প্রথম তিনটি গল্পগ্রন্থ, শেষেরটি উপন্যাস।

rokomari

rokomari

Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading