কৃষিতে মুসলিম সভ্যতার অবদান সম্পর্কে কতটুকু জানেন?

জল, সেচ ও আবাদের ক্ষেত্রে মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার
1001 inventions of muslim feature image

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা আমাদের খাদ্যের উৎস থেকে অনেকটাই দূরে বসবাস করি। অতীতে অধিকাংশ মানুষই কৃষিকাজ করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করত। তবে এখন খুবই কম মানুষ কৃষি খাতে কাজ করে কিংবা নিজেকে কৃষির সঙ্গে জড়িত রেখেছে। বর্তমানে আমরা যখন যা চাইছি, তাই পাচ্ছি। পাশের একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর অথবা সুপারমার্কেটে গেলেই বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন খাবার পেয়ে যাই; তা হােক আমেরিকার স্ট্রবেরি, নিউজিল্যান্ড থেকে আসা ভেড়ার মাংস অথবা আর্জেন্টিনা থেকে আসা গরুর মাংস। মানুষকে আর আগের মতাে গ্রীষ্মকালের আম অথবা শীতকালের সবজি বাজারে পেতে অপেক্ষা করতে হয় না, শুধুমাত্র সুপারমার্কেটের পরবর্তী শেলফে ঢুঁ মেরে এলেই হয়। স্থানীয় ঋতুর চিন্তা না করে বিশ্বের অন্য প্রান্ত থেকে খাদ্যের আমদানি নতুন কিছুই নয়। যা সত্যিকার অর্থে নতুন; তা হলাে— বর্তমান সময়ের মানুষরা স্থানীয় এলাকায় এগুলাের চাষ করে অন্য দেশ থেকে বিমানে করে উড়িয়ে আনাচ্ছে। নবম শতাব্দীতে মুসলিম কৃষকরা নতুন নতুন উদ্ভাবন করতে শুরু করেছিল। তারা বিশ্বের প্রতি প্রান্ত থেকে নতুন নতুন ফলমূল সংগ্রহ করে চাষাবাদ আরম্ভ করেছিল। তারা তখন এমন সব ফলমূল আনা শুরু করেছিল স্থানীয়রা আগে যেসব কখনাে দেখেনি। তারা তাদের সেচের উন্নয়নবিদ্যা এবং বৈশ্বিক জ্ঞানকে ব্যবহার করে বিভিন্ন ফল ও ফসল নিজেদের খামারেই চাষ করতে শুরু করেছিল । এতে করে তারা খাদ্যাভ্যাসে নতুন এক বৈচিত্র্য আনতে সক্ষম হয়েছিল।

বৈশ্বিক জ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি

ইসলামিক স্বর্ণযুগে ভ্রমণকারী মুসলিমদের আধিপত্য ছিল । জ্ঞানপিপাসু মুসলিমরা বৈশ্বিক জ্ঞানের খোঁজে সারাক্ষণ তাদের চিরপরিচিত দুনিয়ায় ঘুরে বেড়াত। এই জ্ঞানের খোঁজে তারা বৈরী পরিবেশ, খারাপ আবহাওয়া, প্রতিকূল অবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মােকাবিলা করে এগিয়ে চলত। এসময় তারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যায় এবং সেখানকার কৃষি কৌশলগুলােও আয়ত্ত করে। মুসলিম বিজ্ঞানীদের একটি ভালাে গুণ ছিল— যেসব জ্ঞান তারা আয়ত্ত করত; বই আকারে সেগুলাে লিখে রাখত । মার্কিন ইতিহাসবিদ এস পি স্কট ১৯০৪ সালে বলেছেন, মুসলিমদের রচিত বইগুলাে ছিল অতীত ও বর্তমানের সংস্কৃতি এবং কৃষিজ্ঞান ও কৌশলের এক অনন্য মিশ্রণ । তাদের এসব বইয়ের প্রভাব পূর্ব থেকে শুরু করে মাগরিব (উত্তর আফ্রিকার একটি অঞ্চল) এবং আন্দালুসিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর অধ্যাপক এন্ড্রিউ ওয়াটসন বলেছেন, প্রায় তিন থেকে চার শতাব্দী ধরে মুসলিম বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ ছিল এবং তারা নতুনত্বকে পছন্দ করত। এমনকি তারা নতুন জিনিস মিলিয়ে আরও নতুন কিছু উদ্ভাবন করত। আচরণ, সামাজিক গঠন ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, অবকাঠামাে, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন সবকিছুই এতে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। শুধুমাত্র কৃষি খাত নয়; অর্থনীতির অন্যান্য শাখা-প্রশাখা এবং প্রায় সবকিছুই নতুনত্বের ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত হয়েছে।

মূলত ভারত থেকে আসা তুলা একসময় সিসিলি ও আন্দালুসের প্রধান ফসল হিসেবে উৎপাদিত হত।
মূলত ভারত থেকে আসা তুলা একসময় সিসিলি ও আন্দালুসের প্রধান ফসল হিসেবে উৎপাদিত হত।

এক অঞ্চলের বৈচিত্র্য থেকে আসা এই বিশাল জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মুসলিমরা উন্নত কত ঘােড়া ও ভেড়া পালন করতে শেখে এবং সর্বোৎকৃষ্ট বাগান ও উদ্ভিজ্জ বাগান করতে শুরু
তৎকালীন মুসলিমরা জানত— কীভাবে কীটপতঙ্গের কাছ থেকে নিজেদের ফসলকে রক্ষা তত হয়। তারা আরও জানত— কীভাবে জমিতে সার দিতে হয় এবং কীভাবে একটি গাছের ল আরেকটি গাছে লাগিয়ে নতুন উদ্ভিদ উদ্ভাবনের জন্য গাছের কলম এবং গাছপালা ক্রস
করতে হয়।

নতুন ফসল

প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কৃষকরা প্রধানত শীতকালে ফসল ফলাত। এই ফসল প্রতি দুই বছরে একবার ফলত। ঠিক এরপর আন্দালুসিয়ান মুসলিমরা এই অঞ্চলে আসেন এবং স্থানীয়দের বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলানাের পদ্ধতি শিখিয়ে দেন।

লেবুজাতীয় গাছ, খেজুর ও ডুমুর- মুসলিমরাই দক্ষিণ ইউরোপে প্রচলিত করেছিল।
লেবুজাতীয় গাছ, খেজুর ও ডুমুর- মুসলিমরাই দক্ষিণ ইউরোপে প্রচলিত করেছিল।

কৃষির অনেক পদ্ধতিই এসেছে তৎকালীন ভারত অঞ্চল থেকে। পদ্ধতিগুলাে স্থানীয় মুসলিমদের মাঝে বেশ সাড়া ফেলে। যদিও এসব কৃষি পদ্ধতিগুলাের জন্য প্রয়ােজন ছিল উষ্ণ বা গরম আবহাওয়া, যা গ্রীষ্মকালে পাওয়া যেত। তবে অল্পবৃষ্টিসহ শুষ্ক মাসও ছিল। মুসলিমরা উন্নত সেচ পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে প্রতিবছর চারবার ফসল ফলাতে সক্ষম হয়েছিল। উপকূলীয় অঞ্চলের ফসল (যেমন— কলা) উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলেও জন্মানাে সম্ভব হয়েছিল।

এ ছাড়াও নতুন নতুন ফসলের মধ্যে ছিল— ধান, লেবুজাতীয় ফল, জাম, পিচ, বরই, পাম, রেশম, বাদাম, তুলা, আর্টিচোকস, বেগুন, জাফরান এবং আখসহ বহু কিছু। স্পেনের আখের সাথে জনসাধারণকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মুসলিমরা এই আখ ইথিওপিয়া এবং যানযিবারে নিয়ে যায়। বর্তমানে এই দুই দেশের আখ খুবই বিখ্যাত। তৎকালে কৃষি খাতে আরও উন্নতি সাধিত হয়েছিল। জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল রেশম শিল্প। শণ পাতার চাষ শুরু হয়েছিল এবং লিনেন রপ্তানি করা শুরু হয়েছিল । বন্য ঘাস হিসেবে পরিচিত এস্পার্টো ঘাস দিয়ে বাস্কেট, ম্যাট এবং পাত্র বানানাের পদ্ধতিও আবিষ্কৃত হয়েছিল ।

দশম শতাব্দীর একজন মুসলিম ভ্রমণকারী এবং ইতিহাসবিদ আল-মাসুদি কমলা ও লেবুজাতীয় ফলের গাছের ব্যাপারে লিখেছেন, ‘এই কমলা লেবুর গাছ- শাজার আল-নারাঞ্জ এবং লেবুজাতীয় ফলের গাছ— আল-উজ আল-মুদাওয়ার মূলত ভারত থেকে ৯১২ সালের (হিজরি ৩০০ সালে) দিকে আনা হয় এবং সর্বপ্রথম ওমানে রােপণ করা হয়েছিল। সেখান থেকে  এগুলােকে ইরাক এবং সিরিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে এগুলাে টারটাস এবং অন্যান্য সিরীয় শহরে খুবই পরিচিত গাছে পরিণত হয়।

অল্প সময়ের ব্যবধানে এগুলাে অ্যান্টিওক থেকে শুরু করে প্যালেস্টাইন এবং মিশরে ছড়িয়ে পড়ে। এ রকম গাছের দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠার প্রধান কারণ ছিল– এই গাছ নিয়ে মানুষের কৌতূহল । এমন একজন কৌতুহলী মানুষ ছিলেন প্রথম আব্দ আল-রহমান। আল-আন্দালুসে থাকাকালীন নিজের বাড়ি ফেরার আকুলতা ঘােচাতে এই এলাকাটিকে সিরিয়ায় নিজের বাসার মতাে বানাতে সেখানে খেজুরসহ নানা ধরনের গাছ লাগিয়েছিলেন তিনি। দামেস্কের  প্রধান বিচারপতি মুয়াইয়া ইবনে সালিহ নতুন প্রজাতির ডালিমের প্রচলন করেন। এ ছাড়াও সাফার নামক আরেক জর্ডানিয়ান সৈন্য একটি ডুমুর নিয়ে মালাগা অঞ্চলে তার নিজের জমিতে লাগান, যা সেই এলাকাতে বেশ আলােচিত বিষয় হয়ে ওঠে। এরপর সেই ডুমুর গাছ থেকে বীজ নিয়ে সাফার অন্যান্য জায়গায় লাগান। তার নামানুসারে ডুমুরের প্রজাতির নাম হয় সাফির।

সাফার নামক আরেক জর্ডানিয়ান সৈন্য একটি ডুমুর নিয়ে মালাগা অঞ্চলে তার নিজের জমিতে লাগান, যা সেই এলাকাতে বেশ আলােচিত বিষয় হয়ে ওঠে।
সাফার নামক আরেক জর্ডানিয়ান সৈন্য একটি ডুমুর নিয়ে মালাগা অঞ্চলে তার নিজের জমিতে লাগান, যা সেই এলাকাতে বেশ আলােচিত বিষয় হয়ে ওঠে।

নতুন ভূমির মালিকানা পদ্ধতি

খাদ্য উৎপাদনের হার বৃদ্ধি পাওয়ার আরেকটি বড় কারণ ছিল তৎকালে নতুন ভূমির মালিকানা পদ্ধতি আবিষ্কার। কৃষকরা জমিদারের অধীনে কাজ না করে নিজেরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারত এবং এতে করে তারা মুসলিম উম্মাহ ও নিজেদের উন্নতি সাধন করতে সক্ষম হয়েছিল । শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত না করলে তা কখনাে সামাজিক ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটায় না। যে কোনাে ব্যক্তি নিজের ইচ্ছেমতাে নিজের জমি বিক্রি, বন্ধক অথবা ধার দিতে পারত এবং যে কেউ জমি কিনতেও পারত ।

কৃষি খাত থেকে শুরু করে শিল্প, বাণিজ্য এবং একজন কর্মচারীকে কাজে রাখার মতাে যে কোনাে গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনে দুই পক্ষের কাছেই লিখিত এবং স্বাক্ষরিত একটি করে নথি থাকত। যারা শারীরিক শ্রম দিয়ে জমিতে কাজ করত; তাদের সেই শ্রমের বিনিময়ে ফসলের ওপর একটি অংশের অর্থ দিয়ে দেওয়া হতাে। অতীতের বেশকিছু দলিল থেকে দেখা যায় মাঝে মাঝে শ্রমিকরা তাদের শ্রমের বিনিময়ে অর্ধেক ফসলও পেয়েছে।

কৃষি খাতে সংযােজিত এই নতুনত্বের কারণে জীবনযাত্রার মান অধিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং বছরজুড়ে সবসময়ই তাজা ফল ও সবজি পাওয়ার ব্যবস্থা চালু ছিল। লেবুজাতীয় ফল ও জলপাইয়ের চাষ সে সময়কার খুব স্বাভাবিক দৃশ্য ছিল । অধিক পরিমাণ ফলমূল চাষ করার জন্য মাটির উর্বরতা নষ্ট হলেও কৃষি কৌশল, কবুতরের মল এবং উন্নত সেচের কারণে জমির উর্বরতা ঠিক থাকত।

পশু-পাখি লালন-পালনে কৃত্রিম বিভিন্ন কৌশল ব্যবহারের ফলে পশু-পাখির জাত উন্নত হয়েছিল। তৎকালে প্রধানত ঘােড়া ও উট বেশি পালন করা হতাে। মুসলিমদের আবিষ্কৃত বিভিন্ন কৌশল ব্যবহারের ফলে উন্নতজাতের ঘােড়া ও শক্তিশালী উটের প্রজাতি আবিষ্কার সম্ভব হয়েছিল। এই উট সাহারা মরুভূমিতে চলাচলকারী ক্যারাভানগুলােতে ব্যবহৃত হতাে। পশু থেকে পাওয়া মাংস, দুগ্ধ এবং চামড়াকে বিলাসবহুল পণ্য ও খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতাে। মুসলিমদের এসব নতুন নতুন আবিষ্কার ও কৌশলের কারণে এগুলাে অধিক হারে পাওয়া যেতে লাগল। এতে করে সাধারণ মানুষরাও মাংস খাওয়ার এবং চামড়া ব্যবহারের সুযােগ পেত। খুব অল্প সময়েই তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া এবং মরক্কোর মাগরেব অঞ্চলে তৈরি করা উচ্চমানের পণ্য সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করতে সক্ষম হয় ।

কৃষি কাজের সরঞ্জাম—নির্দেশিকা

যে কোনো বাগান অথবা ফসলের বাম্পার ফলনের জন্য দুটি বিষয় জরুরি—যত্ন এবং প্রকৃতির সঠিক ভারসাম্য। মাটি, পানি এবং মানুষের হস্তক্ষেপ বা যত্ন-পরিচর্যা– এই তিনটি সঠিক অনুপাতে প্রয়ােগ করলে ভালাে ফলন পাওয়া সম্ভব । মাটি এবং অন্যান্য গাছপালা ধ্বংস না করে সর্বোচ্চ ফসল পাওয়ার জন্য কৃষি নিয়ে গবেষণা চালাতো তৎকালীন স্প্যানিশ মুসলিমরা। তাদের এই গবেষণার মধ্যে অন্যতম ছিল মাটির রসায়ন এবং মাটির ক্ষয় । শত শত বছর আগে মুসলিম বিজ্ঞানীরা এই গবেষণায় সফলতা পান ।

মুসলিমদের চাষাবাদ ছিল অনেক কৌশলী ও কল্যাণকর প্রক্রিয়ার— যার কারণে এগুলাে প্রকৃতির কোনাে ক্ষতি করত না এবং তাদের এসব পদ্ধতি-প্রক্রিয়া ছিল খুবই উৎপাদনশীল। মুসলিম কৃষিবিদদের রচিত কৃষিবিষয়ক বইয়ে সকল পদ্ধতির কথা বিস্তারিতভাবে লেখা ছিল। সেই বইগুলােতে লেখা ছিল— কীভাবে হাল দিয়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা যায়, কীভাবে মাটি কাটতে হয় এবং কীভাবে সেচ দিতে হয় । মাটি এবং পানি দুটোই মান অনুসারে পৃথক করে রাখা হতাে। টলেডাের আমিরের মালি ইবনে বাসাল ১০৮৫ সালে একটি বই লিখেছিলেন; যার নাম ছিল— বুক অব অ্যাগ্রিকালচার’। বইটিতে ১০ রকম মাটির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতিটি মাটির গুণাগুণ ছিল পৃথক পৃথক ।

মুসলিম বিজ্ঞানী আল-বিরুনি রচিত ১৪ শতকের 'ক্রনোলজি অব এ্যানশিয়েন্ট নেশন' বইয়ের ছবিত দেখা যাচ্ছে- একজনের নির্দেশনায় আরেকজন জমিতে কাজ করছে।
মুসলিম বিজ্ঞানী আল-বিরুনি রচিত ১৪ শতকের ‘ক্রনোলজি অব এ্যানশিয়েন্ট নেশন’ বইয়ের ছবিত দেখা যাচ্ছে- একজনের নির্দেশনায় আরেকজন জমিতে কাজ করছে।

তিনি এও লিখেছিলেন, অনাবাদী জমিতে জানুয়ারি এবং মে মাসের মধ্যে চার বার চাষ করা উচিত। এ ছাড়া কিছু কিছু নির্দিষ্ট জমিতে তিনি দশবার হাল চড়ানাের পরামর্শও দিত। উদাহরণস্বরূপ, ভূমধ্যসাগরের উপকূলে লাগানাে তুলা ফসলের জমি ।
১২ শতাব্দীর স্পেনের মুসলিম উদ্ভিদবিজ্ঞানী ইবনে আল-আওয়্যাম গ্রিক, মিশরীয় এবং পারস্য পণ্ডিতদের বিভিন্ন গবেষণা একত্রিত করে ‘দ্য বুক অব অ্যাগ্রিকালচার’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন। তার লেখা এই বইটিতে কৃষি এবং পশুপালনের ওপর ৩৪টি অধ্যায় ছিল। এ ছাড়া এই বই ৫৮৫টি ভিন্ন ভিন্ন উদ্ভিদ, ৫০টিরও বেশি ফলের গাছ, সার দেওয়ার পদ্ধতি, মাটি ও ফসলের নেওয়ার কৌশল, ফসলের রােগব্যাধি, সেচ দেওয়া, গাছের কলম করা এবং মৌমাছি লালনপালনসহ বহু কিছু নিয়ে লেখা ছিল । কত প্রকার জলপাই রয়েছে? কীভাবে গাছ বড় করতে হয়? গাছের রােগব্যাধি নির্মূলে কী কী করতে হয়? কীভাবে জলপাইয়ের তেল আহরন ও পরিশােধন করতে হয় ইত্যাদি সব বিষয়ে কৃষকরা যা খুঁজত এ বইটিতে সবই পেত । বইটিতে জমিতে হাল চড়ানাে নিয়ে একটি অধ্যায় ছিল—– যেখানে হাল চড়ানাের কৌশল, কতদিন পর পর হাল চড়াতে হয়, কখন বীজ বুনতে হয়, কীভাবে ফসলের যত্ন নিতে হয়, কতদিন পর পর পানি দিতে হয়— সবকিছুই লেখা ছিল । বৃহৎ কলেবরের এ বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর ১৮ শতাব্দীর শেষ ও ১৯ শতাব্দীর মাঝামাঝি কৃষকদের ভুল করার মাত্রা কমে যায় এবং ফলন বৃদ্ধি পায়।

ক্যালেন্ডার অব কর্ডোভা

কৃষি খাতে আরেক চমৎকার উদ্ভাবন ছিল— ৯৬১ সালে প্রকাশিত ‘ক্যালেন্ডার অব কর্ডোভা’। এই বিখ্যাত ক্যালেন্ডারে প্রতিমাসে আলাদা করে কিছু কাজ এবং সময়সীমা দেওয়া ছিল । উদাহরণস্বরূপ, মার্চ মাসে ফিগ (ডুমুর) গাছকে কলম করা লাগত এবং তখনই খাদ্যশস্যের বীজ বুনতে হতাে। এটি ছিল আখ গাছ লাগানাের সময় এবং বছরের প্রথম গােলাপ ফুল তােলার সময়। এ সময়ে কোয়েল পাখির আগমন হতাে, রেশমি পােকা তাদের শক্ত আবরণ থেকে বেরিয়ে আসত এবং মুলেট (পারশে) মাছ নদীর কাছাকাছি চলে আসত । এ মাসটি শসা, তুলা এবং জাফরান গাছ লাগানাের আদর্শ সময় ।

এই মাসে সরকার থেকে ঘােড়া কেনার জন্য প্রাদেশিক কর কর্মকর্তাদের আদেশ পাঠানাে হতাে। এ ছাড়া এসময় পঙ্গপালের আগমন ঘটত এবং এদের নির্মূল করতে কাজ করত সরকার। এ মাসে চুন এবং মারজোরাম উৎপাদন করা হতাে এবং এ ঋতুটি ছিল পাখিদের প্রজনন ঋতু।

এমনকি পৃথকভাবে ফসলের ওপরে নজরদারি রাখার বিষয়টিও সংকলিত হয়েছিল এতে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- ধান চাষ করার ক্ষেত্রে ইবনে বাসসাল এমন জমি ব্যবহার করতে বলেছিলেন; যা উদীয়মান সূর্যের আলো পায়। এ ছাড়া জমির মাটিতে সার দিয়ে উর্বরতা বৃদ্ধির কথাও বলা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি এবং মার্চের মধ্যেই ধানের চারা লাগানাের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একটি নির্দিষ্ট জমিতে কতটুকু চারা বুনতে হবে তাও উল্লেখ করে দিয়েছেন ইবনে আল-আওয়্যাম । চারা গাছে পানি দেওয়া সম্পর্কেও বিস্তারিত আলােচনা করেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, ধানের চারা লাগানাের আগে খেয়াল রাখতে হবে, যেন জমি পুরােপরি পানিতে তলানাে থাকে। এরপর যখন মাটি সেই পানি শুষে নেবে, তখনই বীজ বুনতে হবে এবং এরপর আবার জমিকে পানিতে তলিয়ে দিতে হবে।

পানি সরবরাহ

কল্পনা করুন— আধুনিক সময়ে আপনি কলে পানি পাচ্ছেন না এবং কয়েক মাইল দূরে হেঁটে গিয়ে আপনাকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কাজটা নিশ্চয়ই খুব কঠিন হবে, তাই না! ৮০০ বছর আগে পাম্প বা পানি উত্তোলন যন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে এটিই ছিল সকল প্রাচীন মুসলিমদের নিত্যদিনের কাজ। তৎকালে মুসলিমরা পানি সংরক্ষণ ও উত্তোলনের জন্য নিজেদের এবং পূর্বের সভ্যতার জ্ঞান আহরণ করে নতুন নতুন সব যন্ত্র বানিয়েছিল। প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে আগে থেকেই শ্যাডুফ (পানি উত্তোলক যন্ত্র) ছিল । শ্যাডুফ হলাে— একধরনের দুই খুঁটি বিশিষ্ট যন্ত্র; যার মাঝখানে বসানাে থাকত প্রাচীন কপিকল । এগুলাে এখনাে মিশরে ব্যবহৃত হতে দেখা যায় ।

খ্রিস্টপূর্ব ১০০ সাল থেকেই খরস্রোতা পানির উৎস থেকে জমিতে পানি দেওয়ার জন্য ওয়াটার হুইল বা নরিয়া ব্যবহার করা হতাে। রােমান লেখক, স্থপতি এবং প্রকৌশলী ভিট্রুভিয়াস তার বিভিন্ন রচনায় এই ওয়াটার হুইলের কথা উল্লেখ করেছেন। যেকোনাে ওয়াটার হুইলের মতােই এগুলাে রিম প্যাডেলের মাধ্যমে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারত এবং নদীর পানি সংগ্রহ করে উপরের একটি ট্যাংকে জমা করতে পারত; যদিও রােমান এবং পার্সিয়ানরা এই ওয়াটার হুইল আগে থেকেই ব্যবহার করত; তবুও মুসলিমরা এই যন্ত্রের নকশায় বেশকিছু উন্নতি সাধন করেছিল ।

সপ্তম শতাব্দীর শেষের দিকে বসরা অঞ্চলে একটি খাল খননের সময় প্রথম মুসলিমদের দ্বারা এই নরিয়া পদ্ধতি আবিষ্কারের কথার উল্লেখ পাওয়া যায়। সিরিয়ার হামার অরােন্তেস নদীতে এরকম একটি নরিয়া এখনাে রয়েছে; যদিও তা এখন আর ব্যবহার করা হয় না। এগুলাের চাকাগুলাে বৃহৎ আকারের ছিল— যার মধ্যে সবচেয়ে বড়গুলাের ব্যাস হতাে প্রায় ২০ মিটার এবং এগুলাের রিম ১২০টি আলাদা খােপে ভাগ করা হতাে। স্পেনের মুরসিয়াতে অবস্থিত নরিয়াগুলাে এখনাে সচল রয়েছে। যদিও সেগুলাের আসল চাকা পাল্টে নতুন স্টিলের চাকা লাগানাে হয়েছে।

সিরিয়ার হামার অরােন্তেস নদীতে এরকম একটি নরিয়া এখনাে রয়েছে।
সিরিয়ার হামার অরােন্তেস নদীতে এরকম একটি নরিয়া এখনাে রয়েছে।

তা ছাড়া মুরিশ সিস্টেম (প্রত্যেকে যাতে তাদের উপলব্ধ পানির ন্যায্য অংশ পায় তা নিশ্চিত করার জন্য মুরদের স্পেন ও উত্তর আফ্রিকায় বসবাস করা আরবীয় যাযাবর দ্বারা প্রথম উদ্ভাবিত একটি জটিল গাণিতিক মডেল। এই পদ্ধতিতেও সুইসগেট খােলা বা বন্ধ রাখার ব্যবস্থা ছিল এবং পানির সুষম বণ্টন করা যেত) প্রায় আগের মতােই রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এখনাে বহু নরিয়া রয়েছে এবং তুলনা করলে দেখা যাবে এগুলাে আধুনিক পাম্পের চেয়ে কোনাে অংশেই কম না । অধিকাংশ মুসলিম প্রযুক্তিবিদ বুঝে ফেলেছিলেন— পানি এবং পশুর শক্তি ব্যবহার করে কাজের পরিমাণ বাড়ানাে সম্ভব । দুজন প্রতিভাবান মুসলিম প্রকৌশলী ছিলেন আল-জাজারি এবং তাকি আল-দ্বীন। দুজনই বহু রকমের গবেষণা চালিয়েছিলেন। যার ফলে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র আবিষ্কার হয়েছিল— যা বর্তমানে আমাদের আধুনিক সময়ে এক বিশাল প্রভাব ফেলছে।

আল জাজারির আবিষ্কৃত পানি উত্তোলক যন্ত্র, যা চালিত হত পশুর শক্তি দিয়ে।
আল জাজারির আবিষ্কৃত পানি উত্তোলক যন্ত্র, যা চালিত হত পশুর শক্তি দিয়ে।

আল-জাজারি তুরস্কের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে বাস করতেন। দিয়ারবাকিরের আরতুকিদ রাজা ১১৮০ সালে তাকে রাজকীয় কাজে নিয়োগ দিয়েছিলেন। একজন দক্ষ নকশাকার ও প্রকৌশলী হওয়াতে তিনি এমন যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন- যা কোনো কষ্ট করা ছাড়াই বিপুল পরিমাণ পানি উত্তোলন করতে পারত।

আল জাজারির ঘূর্ণমান পাম্প

আল-জাজারি পাঁচটি পানি উত্তোলন যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন। তার মধ্যে দুটো ছিল শ্যাডুফের উন্নত সংস্করণ এবং আরেকটিতে পশুর ব্যবহার বাদ দিয়ে গিয়ার ও পানির শক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল । ক্র্যাঙ্কশ্যাফট আসার পর তিনি পানির শক্তি ব্যবহার করা স্বয়ংক্রিয় একটি পাম্প বানিয়েছিলেন । এটিতে কগ-হুইল, কপার পিস্টন, সাকশন ও ডেলিভারি পাইপ এবং ওয়ানওয়ে ক্ল্যাক ভালব সংযুক্ত ছিল। এই পাম্পটি সেচ এবং গৃহস্থালির কাজে ব্যবহারের জন্য প্রায় ১২ মিটার উপরে পানি তুলতে পারত। এটি ছিল ডাবল অ্যাক্টিং পিস্টনের সবচেয়ে পুরনাে উদাহরণ এবং এখানে একটি পিস্টনে পানি ঢুকলে আরেকটি দিয়ে পানি তােলা হতাে। আল-জাজারি এই যন্ত্রটিকে আরও উন্নত করে পুরােপুরি স্বয়ংক্রিয় করে তুলেছিলেন।

আল জাজারির ঘূর্ণমান পাম্প
আল জাজারির ঘূর্ণমান পাম্প

তাকি আল-দ্বীনের ছয় সিলিন্ডারের পাম্প

১৬ শতাব্দীর আরেক প্রতিভাবান প্রকৌশলী ছিলেন অটোমান প্রকৌশলী তাকি আল-দ্বীন ইবনে মারুফ আল-রশিদ। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর ‘দ্য সাবলাইম মেথডস অব স্পিরিচুয়ালস মেশিন্স’ নামের বইটি লিখেছেন তিনি। পানির পাম্পের বিষয়ে লেখার পাশাপাশি তিনি বাষ্পীয় ইঞ্জিনের বেশকিছু কাজ করার প্রাথমিক ধারণার ওপর আলােকপাত করেছিলেন । বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার হওয়ারও প্রায় একশ বছর আগে এসব বিষয় নিয়ে লিখেছেন তাকি আল-দ্বীন। তার ছয় সিলিন্ডারের পাম্প এবং পানি উত্তোলন যন্ত্র মূলত কাগজ বানানাের ইতিহাসের ওপর একটি গবেষণার অংশ। তার এই পাম্পে ব্যবহৃত পিস্টনগুলাে ছিল কাগজ তৈরিতে ব্যবহৃত হাতুড়ির মতাে দেখতে এবং এগুলাে কাগজের মণ্ডা তৈরি ও ধাতুর পাত পেটানাের কাজে ব্যবহার করা যেত। তাকি আল-দ্বীন তার পাণ্ডুলিপিতে এই পাম্পের কাজ করার পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। এই ছয় সিলিন্ডার পাম্পে একটি দীর্ঘ আনভমিক অক্ষ বা ক্যাম শ্যাফটের সাথে একটি ওয়াটার হুইল সংযুক্ত থাকে এবং এটা ছয়টি হাতলবিশিষ্ট হয়ে থাকে। নদীর পানি এই হাতলগুলােকে ধাক্কা দেয় এবং এতে করে চক্রাকার ওয়াটার পাম্পটি ঘোরে।

তাকি আল-দ্বীনের ছয় সিলিন্ডারের পাম্প
তাকি আল-দ্বীনের ছয় সিলিন্ডারের পাম্প

এমন একটি সময়, যখন মানুষ যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল না, তখন এরকম কিছু আবিষ্কার পুরাে সমাজকে পরিবর্তন করে দেয়। যদিও তৎকালে এ যন্ত্রগুলাে খুব একটা বানানাে হতাে না— তবুও অধিকাংশ শহরেই একটি পানির পাম্প ছিলই। মানুষকে আর পানির পাত্র নিয়ে ঘােরাঘুরি করতে হত না অথবা শ্যাডুফ থেকে পানি নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতাে না। বরং তারা একটি পানির ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে কল থেকে এই মূল্যবান তরলটি সংগ্রহ করত, ঠিক যেভাবে আমরা বর্তমান সময়ে কল থেকে পানি সংগ্রহ করি ।

তথ্যসূত্র- মুসলিম সভ্যতার ১০০১ আবিষ্কার

আরও পড়ুন- আল হামরা : গৌরব, ঐতিহ্য আর বিশ্বাসঘাতকতার স্মারক

মুসলিম সভ্যতার ১০০১ আবিষ্কার বইটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে 

সভ্যতার ইতিহাস নির্ভর বইগুলো দেখুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading