বিদায় শেখ আবদুল হাকিম!

aaa

ষাটের দশকে যখন এই অঞ্চলে চলছে তরুণদের মধ্যে মানসিক টানাপোড়েন তখনই এগিয়ে এসেছিলেন কিছু মানুষ। পুরো পৃথিবীর সাহিত্যের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা অদ্ভুত সেসব রোমাঞ্চগুলোকে এই অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের কাছে উন্মুক্ত করেছিলেন কেউ কেউ। সেই সময়ে ক্ষুদ্র পরিসরে বিভিন্ন বাধা বিপত্তির মধ্যেও কালো ও নিউজপ্রিন্ট কাগজে ছাপিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে দিয়ে অন্যরকম এক দুনিয়ার সন্ধান দিয়েছিলেন কিছু গুনী মানুষ। যার মধ্যে শেখ আবদুল হাকিম একজন।

১৯৪৬ সালের দেশভাগ হবার বছরটায় তার জন্ম। ভারতের পশ্চিবঙ্গের হুগলি জেলায় জন্ম নেয়া এই ব্যক্তিটি যে সম্পূর্ণ নতুন একটি দেশের সাহিত্য ও লেখালেখির জন্য বেশ জোড়ালো ভূমিকা পালন করবেন তা কি কেউ জানতো? বাবা শেখ আবদুর রফিকের ঘরে সবমিলিয়ে পেয়েছিলেন পাঁচ ভাই আর তিন বোনকে। সে বছর দেশভাগের পর তারা পরিবারসমেত ঢাকা চলে আসেন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ ষাটের দশকে শেখ আবদুল হাকিম পেশাদার লেখক হিসেবে আবির্ভূত হন। যুক্ত হন সেবা প্রকাশনীর সঙ্গেও। এই প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে জনপ্রিয় কাজগুলো যেমন ‘মাসুদ রানা সিরিজ’ অথবা ‘কুয়াশা’ ইত্যাদি উপন্যাস সিরিজের অনেকগুলো বইয়ের নেপথ্যে ছিলেন তিনি। শেখ আবদুল হাকিম সেবা প্রকাশনীর পাঠকপ্রিয় গোয়েন্দা কাহিনি ‘মাসুদ রানা‘ সিরিজের ২৭১টির এবং ‘কুয়াশা’ সিরিজের ৫০টি বইয়ের নেপথ্য লেখক। ‘মাসুদ রানা’ ও ‘কুয়াশা’ সিরিজ ছাড়াও রোমান্টিক, অ্যাডভেঞ্চার-সহ নানান স্বাদের বই উপহার দিয়েছেন এই লেখক।

মাসুদ রানা বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক কাজী আনোয়ার হোসেন সৃষ্ট একটি কাহিনী-চরিত্র। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ধ্বংস পাহাড় নামের প্রথম গ্রন্থটি থেকে শুরু করে সেবা প্রকাশনী থেকে মাসুদ রানা সিরিজে এই চরিত্রকে নিয়ে চার শতাধিক গুপ্তচরবৃত্তীয় কাহিনীর বই প্রকাশিত হয়েছে। সিরিজের প্রথম দুইটি বই মৌলিক হলেও পরবর্তীতে ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার বইয়ের ভাবানুবাদ বা ছায়া অবলম্বনে রচিত হওয়া বইয়ের আধিক্য দেখা যায়। মাসুদ রানার চরিত্রটিকে মূলত ইয়ান ফ্লেমিংয়ের সৃষ্ট জেমস বন্ড চরিত্রটির বাঙালি সংস্করণ হিসেবে সৃষ্টি করেছিলেন লেখক। কিন্তু বর্তমানে সিরিজটি বাংলা বই এর জগতে স্বকীয় একটি স্থান ধরে রেখে পথ চলছে। মাসুদ রানার অধিকাংশ কাহিনীই বিভিন্ন বিদেশী লেখকের বই থেকে ধার করা। এলিস্ট্যার ম্যাকলীন (Alistair MacLean), রবার্ট লুডলাম (Robert Ludlum),  জেমস হেডলি চেজ  (James Headley Chase), উইলবার স্মিথ (Wilber Smith), ক্লাইভ কাসলার (Clive cussler), ফ্রেডরিক ফরসাইথ (frederick forsyth) সহ বহু বিদেশী, বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্যিকের লেখা কাহিনী থেকে ধার করে মাসুদ রানার কাহিনী লেখা হয়।

উনিশশো ছেষট্টি সাল থেকে সেবা প্রকাশনীতে লেখক হিসাবে যোগ দেন শেখ আবদুল হাকিম। অবশ্য ততদিনে তিনি তার প্রথম উপন্যাস ‘অপরিণত প্রেম’ বই আকারে প্রকাশ করে ফেলেছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে ছিলেন প্রায় চল্লিশ বছর। সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে যুক্ত থাকা অবস্থায় তিনি মাসিক ‘রহস্য পত্রিকা’র সহকারী সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন। যেই পত্রিকাটি এখনও নিয়মিত প্রকাশিত হয়।

শেখ আবদুল হাকিম তার অনুবাদ বইগুলোর জন্যও বিখ্যাত। বেশিরভাগ সময়ই বিশ্ব সাহিত্যের দারুণ সব বইগুলোকে দেশে প্রথমবারের মত অনুবাদ করতে দেখা গেছে তাকে। এছাড়াও অনুবাদ সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্রতা দেখাতে পেরেছিলেন তিনি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে এরিক মারিয়া রেমার্কেরদ্য ব্ল্যাক অবিলিস্ক‘, ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট‘, ভিক্টর হুগোর ‘দ্য ম্যান হু লাফস‘, জুলভার্নের ‘আশি দিনে বিশ্বভ্রমণ‘, মার্ক টোয়েনের ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব হাকলবেরি ফিন‘, মেরি শেলির ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন‘, আলেকজান্ডার দ্যুমার ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স‘, ডগলাস ফ্রাঞ্জ ও ক্যাথেরিন কলিন্সের ‘দ্য ম্যান ফ্রম পাকিস্তান: নিউক্লিয়ার স্মাগলার আবদুল কাদির খান’ এবং কেন ফলেটের ‘দ্য ম্যান ফ্রম সেন্ট পিটার্সবার্গ’-এর বাংলা ‘আততায়ী‘।

গত বছরের শুরু দিকে প্রথমবারের মত শেখ আবদুল হাকিমের সঙ্গে সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার কাজী আনোয়ার হোসেনের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। পূর্বে প্রকাশিত মাসুদ রানা সিরিজের প্রায় ২৬০টিরও বেশি বইয়ের লেখক স্বত্ব দাবি করেন শেখ আবদুল হাকিম। পরবর্তীতে কপিরাইট অফিসের হস্তক্ষেপে শেখ আবদুল হাকিমকে এসব বইয়ের লেখক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। যদিও উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে প্রথম দিকে এই রায় এক মাস স্থগিত রাখা হয়। এবং এই মামলার পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া এখনও চলছিলো। মহামারীর এই অদ্ভুত সময়ে এবং লেখকস্বত্ব সম্পর্কিত আইনি জটিলতা চলার মাঝেই বিদায় নিলেন গুনী এই মানুষটি।

শেখ আবদুল হাকিম অনুবাদের বাইরেও অনেক মৌলিক বইও রচনা করেছেন। তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে টেকনাফ ফর্মুলা, জুতোর ভেতর কার পা, জল দাও জল, মুঠোর ভেতর তেলেসমাতি, ঋজু সিলেটীর প্রণয়, আতংক, সোমালি জলদস্যু, আইডিয়া, তিতলির অজানা, লব্ধ সৈকত, জ্যান্ত অতীত, তাহলে কে?, চন্দ্রাহত, সোনালি বুলেট, কামিনী প্রভৃতি। এ ছাড়াও কয়েক খণ্ডে প্রকাশ হয়েছে তার লেখা ‍উপন্যাস সমগ্র।

বেশ অনেকদিন ধরে তিনি ব্রংকাইটিসে ভুগছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে একাধিকবার হাসপাতালেও নেয়া হয়েছিলো। পরবর্তীতে অবস্থার খানিকটা উন্নতি হলে তাকে বাসায় আনা হয়। লেখক ও অনুবাদক শেখ আবদুল হাকিমের মেয়ে সাজিয়া হাকিমের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমগুলো বলেছে, ২৮ আগস্ট ২০২১ তারিখ সকালেও কথাবার্তা বলেছিলেন তিনি। কিন্তু দুপুরের দিকে তার স্বাস্থ্যের অবস্থা আকস্মিকভাবে খারাপ হতে থাকে। এবং কিছুক্ষণ পরই তিনি মৃত্যু বরণ করেন।

ষাটের দশকে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার আগে এবং স্বাধীন হবার পরের প্রায় কয়েক দশক শেখ আবদুল হাকিমের হাত ধরে বিভিন্ন শ্রেণী, পেশা ও বয়সের পাঠকরা সাহিত্যের নতুন এক অঞ্চলের সন্ধ্যান পেয়েছিলো। এই সময়ে এসেও পূর্বের শেখ আবদুল হাকিমের লেখা উপন্যাসগুলো তৃপ্তি দিয়ে যাচ্ছে অনেক পাঠকদের। এই গুনী মানুষটি হয়তো পার্থিব পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু রেখে গেছেন অসংখ্য গল্পের ভান্ডার যা টিকে থাকবে বছরের পর বছর।

শেখ আব্দুল হাকিমের সকল বই দেখতে

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading