সুমন্ত আসলামের শেকড়, তার বাউন্ডুলে সিরিজ।

সুমন্ত আসলাম

সে অনেকদিন আগের কথা। আমাদের একজন বাউন্ডুলে লেখক ছিলেন। লেখক বাউন্ডুলে কি না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না অবশ্য, তবে তিনি বাউন্ডুলে নামে একটা সিরিজ লিখতেন। প্রতি সোমবারে তা ছাপা হতো পত্রিকার পাতায়। আমরা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে থাকতাম। পড়তে পড়তে আমাদের মনে হত এই লেখকের কাঁধে নিশ্চিতভাবেই একটি ঝোলা আছে। তিনি খালি পায়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ান, আর মানুষ দেখেন। তিনি মানুষের যন্ত্রণাকে ধারণ করতে পারেন, মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তা তার চাবুক কলাম লাগতো স্লোগানের মত। মিলেনিয়ামের ঊষালগ্নের সেই সময়টায় আমাদের প্রাত্যহিক দিনলিপির অনিবার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছিলো তার কলাম। লেখকের নামটা অনেকেই হয়তো অনুমান করতে পারছেন। তার নাম সুমন্ত আসলাম। তার বাউন্ডুলে সিরিজ ছাপা হত প্রথম আলোর রম্য ম্যাগাজিন আলপিনে।

দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে এরপর। আলপিন বন্ধ হয়ে গেছে। সুমন্ত আসলাম প্রথম আলো ছেড়েছেন। মুদ্রিত পত্রিকার জায়গা নিয়েছে সোশাল মিডিয়া, কিন্তু হৃৎকলম দিয়ে যা একবার লেখা হয়ে যায়, তা কি মোছা যায় কখনও? সুমন্ত আসলামের ‘বাউন্ডুলে’ সিরিজও তাই মুছে যায় নি।

সুমন্ত আসলামকে শুধুমাত্র বাউন্ডুলে সিরিজ দিয়ে মূল্যায়ন করা অনুচিত কাজ হবে। কারণ এছাড়াও তার বইয়ের সংখ্যা কম না। তিনি লিখছেন কিশোর উপন্যাস, লিখেছেন প্রেমের গল্প, লিখেছেন রম্য রচনা। তবে বাউন্ডুলের আবেদন এতটাই অপ্রতিরোধ্য, যে অন্য লেখাগুলির প্রতি কিছুটা অবহেলা করলে লেখক নিজেও হয়তো বা মন খারাপ করবেন না খুব একটা!

baundule
বাউণ্ডুলে সিরিজ

বাউন্ডুলে সিরিজে আপনি পাবেন হরতালের আগুনে পুড়ে যাওয়া মিমকে, যে পরবর্তী জীবনে কুকুর বা শেয়ালের পেটে জন্ম নিতে চায়। বাউন্ডুলে সিরিজে আপনি পাবেন একজন ক্লান্ত বঙ্গবন্ধুকে, যিনি তার আদর্শের পতন হতে দেখে বিষণ্ণ হন। বাউন্ডুলে সিরিজে পাবেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিংয়ে শেয়াল দেয়ার সেই ন্যাক্কারজনক ঘটনা এবং তার ব্যাঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া। শেয়ালের মাংস খেয়ে গভীর রাতে শেয়ালের মত হুক্কা হুয়া রবে ডেকে উঠছে একজন যুবক, দৃশ্যটা কল্পনা করুন একবার!

সুমন্ত আসলামের বাউন্ডুলে সিরিজটিকে বলা যায় সংবাদের পাতার খবরের অলংকৃত সংস্করণ। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বলা হলো “খুন বেড়েছে, কিন্তু অপরাধ বাড়ে নি”, এই খবর আপনি পত্রিকায় পড়েছেন। তারপরেও কেন সুমন্ত আসলামের কলামে আবার পড়বেন? কারণ তিনি এর সাথে নতুন ঘটনা, উপমা, দৃশ্যকল্প মিলিয়ে এমন এক আবহ তৈরি করবেন, যা আপনার ভেতরে বুনে দেবে বারুদের বীজ!

তার চোখ এবং মন অসাধারণ পর্যবেক্ষক। কোন ঘটনা তার চোখ এড়ায় না। ঘটনার সাথে ঘটনার মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি তৈরি করেন নতুন মাত্রা। উদাহরণ দেয়া যাক! বাংলাদেশের কোন এক জেলায় কোন এক পাষন্ড একবার কলা খাওয়ানোর নাম করে একটি হনুমানকে ধরে নিয়ে এসে প্রচণ্ড নির্যাতন করে। হনুমানের দল এর প্রতিবাদে শুরু করে ভাংচুর এবং অবরোধ। প্রায় একই সময়ে মিরপুরে জুম্মার নামাজ পড়ে ফেরার পথে গুলি করে হত্যা করা হয় প্রিন্স বেকারির অন্যতম স্বত্তাধিকারীকে। হনুমানরা প্রতিবাদ করতে পারে, কিন্তু মানুষ করে পলায়ন। সুমন্ত আসলামের লেখায় আপনি সন্ধান পাবেন এই গ্লানিময় বোধের। আমাদের ঝিমিয়ে পড়া মন এবং মানসকে উজ্জীবিত করার জন্যে তিনি লিখে যাচ্ছেন ক্রমাগত।

বাউন্ডুলে কথন তো অনেক হলো। তার তৈরি অন্যান্য চরিত্র এবং গল্পের কথা বলা যাক এবার! দন্ত্যন রুহমানকে নিয়ে কথা হতে পারে।  ভবঘুরে, উদাস একটি চরিত্র, যার আসল নাম নজির রহমান। তার ভালোমানুষ নানার নামে এই নাম রেখেছিলেন তার মা। যেন সে নানার মত ভালোমানুষ হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সে হয়ে ওঠে ডানপিটে এবং চঞ্চলমতি, যার জীবনটা মোটেও গোছানো নয়। এজন্যে সে তার নাম পালটে ফেলে, যেন নানার নামের অসম্মান না হয়। একটু কি হুমায়ূন আহমেদের হিমুর মত লাগছে? তা লাগতেই পারে, হুমায়ূন আহমেদ বিশাল। তার ছায়া সুদূরবিস্তৃত। সেই ছায়া কেউ নিতেই পারে! তবে প্রকাশে, চলনে, বলনে দন্ত্যন রুহমান যতটা না হিমুর মত তার চেয়ে অনেক বেশি সুমন্ত আসলামের বিখ্যাত বাউন্ডুলে সিরিজের কথকের মত। এভাবে পড়ে দেখতে পারেন সাচ্ছন্দ্যে! এই চরিত্রটিকে নিয়ে সুমন্ত আসলাম লিখেছেন একাধিক বই। আরো বেশি কেন লিখছেন না এই অনুযোগ জানাতেই পারেন তাকে!

dw
BUY NOW

সুমন্ত আসলামের বইয়ে তরুণীরা কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে এসেছে বারবার। বাবা-মেয়ের মধুর সম্পর্ক, হারানোর যাতনা, এসব দৈনন্দিন বিষয়ের পাশাপাশি তিনি লিখেছেন আরো জটিল এবং অন্ধকার রূপ নিয়েও। “অথচ আজ বসন্ত” পড়লে নুপূরের জন্যে আপনার মন খারাপ হবে। সেধে সেধে মন খারাপ করার কোন কারণ নেই, তারপরেও যে মানুষ কেন ভালোবাসে!

তার আরেকটি জনপ্রিয় সিরিজ হলো পাঁচ গোয়েন্দা। সাবাব, রাফিন, অর্চি, জুহামদের অভিযান আপনাকে ছেলেবেলায় নিয়ে যাবে আবার! মনে পড়ে যেতে পারে লুকিয়ে বই পড়ার সেই দিনগুলির কথা। আচ্ছা, এখন এইসব গোয়েন্দা সিরিজ লেখা একদম কমে গেছে কেন বলুন তো? সুমন্ত রহমানও বহুদিন লিখছেন না। বয়স বাড়ছে?

ছোটদের এ্যাডভেঞ্চার যদি আপনার পছন্দ না হয়, তাহলে ফাঁসির দড়ির কাছে গিয়ে থমকে যাওয়া রাশিকের নয়জনকে খুন করার ইচ্ছা হলো কেন হঠাৎ সেই কাহিনী নিশ্চয়ই শিহরিত করবে আপনাকে ‘দহন’ উপন্যাসে।

গল্প যে তিনি চমৎকার লিখতে পারবেন, তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় বাউন্ডুলে সিরিজেই। তার প্রথম প্রকাশিত বই ‘স্বপ্নবেড়ি’ও কিন্তু গল্পেরই! ৯৬ এর মেলা মাত করা এই বইটি এখন খুঁজে পাওয়া ভার। তবে খুঁজে পেলে অবশ্যই পড়া উচিত আপনার! পড়তে পারেন সাম্প্রতিক গল্পগ্রন্থ “বীভৎস”।

এবারের বইমেলায় তার একদম তরতাজা নতুন বই “প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন চা খেতে আসেন আমাদের বাসায়” সম্পর্কে বেশি কিছু বলা ঠিক হবে না, তবে বইমেলার অন্যতম অন্যরকম উপন্যাস হিসেবে এটি যে জায়গা করে নেবে, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই!

ffd
BUY NOW

বাউন্ডুলে” সুমন্ত আসলাম অবশ্য ঠিক বাউন্ডুলে নেই এখন আর। সংসার পেতেছেন গুছিয়ে। বাবা হয়েছেন। তবে বাউন্ডুলে নামটা উচ্চারিত হলে সুমন্ত আসলামের কথা মনে আসবেই! এমনই হয়। সময়ের পরিক্রমায় জীবনধারা বদলে যায়, লেখকের মৃত্যু হয়, কিন্তু সুমন্ত আসলাম এখনও বেঁচে আছেন স্ব মহিমায় লেখক হিসেবে। বইয়ের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। এতগুলি বইয়ের সবগুলিই যে কালোত্তীর্ণ বা মানোত্তীর্ণ হবে তা আশা করা ঠিক নয়। আমরা আশা করতে পারি তিনি বাঁচবেন লেখার মধ্যেই, এবং সেটাই তিনি করছেন।

তার বইয়ে পুরোনো কলমযোদ্ধাদের জন্যে আক্ষেপ দেখা যায়, যারা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। এমন অনেক বন্ধুকে তিনি বই উৎসর্গ করেছেন, মিনতি জানিয়েছেন লেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্যে। কারণ সুমন্ত আসলাম লেখাকে ভালোবাসেন। লেখার মধ্যেই বাঁচতে চান।

শেষ করার আগে আবার শেকড়ে ফেরা যাক। সুমন্ত আসলামের শেকড়, তার বাউন্ডুলে সিরিজ।

একটি লোককে বেঁধে রাখা হয়েছে। সে কোন একটি কথা বলেছিলো, যা তাদের কাছে খুবই অন্যায্য কথা মনে হয়েছে। তারা হাতুড়ি বাটাল নিয়ে প্রস্তুত। কথাটি তুলে না নিলে প্রচণ্ড আঘাতে জর্জরিত করা হবে তাকে। লোকটি ভয় পেলো না। সে তার কথা তুলে নেবে না। তাকে আঘাত করা হলো। হাত ভেঙে চুড়ে দেয়া হলো। সে আর কারো হাতে হাত রাখতে পারবে না। তবুও সে অটল, তার কথা প্রত্যাহার করবে না। আমরা জানি না সে কী বলেছিলো, কী প্রত্যাহার করতে বলা হচ্ছে। তবে অত্যাচার করার সময়ও তার শুভচিন্তা এবং বোধ দেখে আমরা অবলীলায় তার পক্ষ নিয়ে নেই। শেষ পর্যন্ত সে করুণতম পরিণতির সম্মুখীন হয়, তবে কথা প্রত্যাহার করে নেয় না।

সুমন্ত আসলামের প্রতিও আমাদের এই অনুরোধ, যত বিপদ আসুক, আপনার শুভচিন্তা, শুভবোধকে বন্ধ করবেন না।

বাউন্ডুলে সুমন্ত আসলাম, আপনি লেখা থামাবেন না।

সুমন্ত আসলামের বইসমূহ 
Rokomari Editor

Rokomari Editor

Published 05 Dec 2018
Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading