মুসলিম পাঠকদের জন্য ২টি গুরুত্বপূর্ণ বই

মো. সিরাজুল ইসলাম এফসিএ রচিত 'সুন্নাত প্রতিদিন' ও 'মরুর পথে' বই আলোচনা
two important books for muslims

ইসলাম শুধুমাত্র একটি ধর্মই নয় এটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। একজন মুসলিমের জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত আবর্তিত হবে ইসলামের আলোকে। আর এতেই সাফল্য নিহিত। আমাদের জীবন ব্যবস্থা কেমন হবে তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর মাধ্যমে শিখিয়েছেন। নবী মুহাম্মদ (সা) এর প্রতিটি কথা, কাজ, আদেশ ও সম্মতিকে আমরা সুন্নাত বলে জানি। যা তিনি নিজে করেছেন, অন্যকে করতে উৎসাহিত করেছেন, কোন কাজ যা তিনি করতে নিষেধ করেছেন বা কেউ করলে অপছন্দ করেছেন, এমন সবই নবীর সুন্নত। অর্থাৎ, সুন্নাত হল সেই মূল আদর্শ যা আল্লাহ্ তা’আলার নির্দেশে রাসূল করীম (সা) নিজে তাঁর বাস্তবজীবনে দায়িত্ব পালনের বিশাল ক্ষেত্রে অনুসরণ করেছেন; অনুসরণ করার জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে রেখে গেছেন দুনিয়ার মানুষের সামনে।

নবীর সুন্নাতকে অনুসরণ করতে স্বয়ং আল্লাহ্ কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন-

“এবং রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত হও।” (৫৯:৭)

সুন্নাত প্রতিদিন 

নবী করীম (সা) এর সুন্নাত সম্পর্কে জানতে ‘সুন্নাত প্রতিদিন’ বইটি সহজ এবং অবশ্য পাঠ্য। বইটিতে বিভিন্ন হাদীস ও গুরুত্বপূর্ণ কিতাব হতে সংগৃহীত প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুন্নাত সংযোজন করা হয়েছে। প্রতিটি সুন্নাত সংগ্রহের উৎসও উল্লেখ করা হয়েছে। সুন্নাত অনুযায়ী জীবন গঠনে উদ্বুদ্ধ করতে বইটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

বইয়ের শুরুতে আছে সুন্নাত, এর গুরুত্ব, আল কুরআনে সুন্নাত পালনের নির্দেশিকা, হাদীস শরীফে সুন্নাত অনুসরণের নির্দেশ, সুন্নাত অনুসরণের পদ্ধতি, কোন কাজে বিশুদ্ধ নিয়তের গুরুত্ব। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে দৈনন্দিন আমল, ইসলামী নিয়ম-নীতির উপর আলোকপাত করেছেন।

সুন্নাত প্রতিদিন
BUY NOW

একজন ব্যক্তির দিন শুরু হয় ঘুম থেকে ওঠার মাধ্যমে। তারই ধারাবাহিকতায় পরিষ্কার পরিচ্ছন হয়ে অযু করে নামায পড়া দিয়ে শুরু করে সারাদিন পরিচালিত হয় বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে। তাই ঘুম থেকে উঠে সুন্নাত পালন করতে হবে। ‘সুন্নাত প্রতিদিন’ বইতে ঘুম থেকে উঠে পালনীয় সুন্নাত, বাথরুমে প্রবেশ ও বের হবার সুন্নাত, মিসওয়াক করার সুন্নাতী পদ্ধতি, অযু-গোসল, পোশাক-পরিচ্ছদ, জুতা পরার সুন্নাত বলা হয়েছে। এরপর এসেছে নামায। নামাযের আদব, সুন্নাত, নিষিদ্ধ সময়, নামাযের মধ্যে সাধারণ ভুলত্রুটি, কাতার, ইকামাত, তাকবীরে তাহরিমা, কিয়াম, কিরাত, রুকু, সিজদাহ, বৈঠক, সালাম, মুনাজাত সবকিছুর পালনীয় ও বর্জনীয় দিক তুলে ধরেছেন। এরপর বিভিন্ন নামায যেমন, এশরাক, চাশত, আউওয়াবীন,তাহাজ্জুদ, সালাতুত তাসবীহ, সালাতুল হাজত, জুমুআর নামায ইত্যাদি এবং জুমুআর দিনের সুন্নাত, আমল, রমযান,ই’তেকাফ, শবে ক্বদর, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, হজ্জ, যাকাত ও সদকার সুন্নাত সমূহ উল্লেখ করেছেন।

পরবর্তী বিষয় সমূহে একজন মুসলিমের দৈনন্দিন কাজকর্মের সুন্নাত বর্ণনা করেছেন। ঘরে প্রবেশ, খাদ্য, পানীয়, চিকিৎসা পদ্ধতির সুন্নাত। বিবাহ, তালাক, দাম্পত্য জীবনের সুন্নাতী কাজ, চুল-গোফ-দাড়ির সুন্নাত। ঘুমানোর আগে পালনীয় সুন্নাত, চলাচল, মজলিস, কথাবার্তা, মেহমানদারি, আচার-আচরণ, বিপদ-আপদ, সুখ-সমৃদ্ধির সুন্নাত, মুমূর্ষকালে ও মৃত্যুর পর করণীয়, দাফন-কাফন, জানাযার সুন্নাত বর্ণিত হয়েছে।

শুধু ব্যক্তি জীবনের সুন্নাতই নয়, এ বইতে লেখক সংযোজন করেছেন প্রতিবেশীর অধিকার, দান-খয়রাত, মাতা-পিতার অধিকার, এতিম অসহায়দের অধিকার, অমুসলিমদের, এমনকি পশু-পাখি ও জীবজন্তুর অধিকার। এছাড়াও রাষ্ট্রব্যবস্থা, জনসেবা, বিচার ব্যবস্থার সুন্নাতী পদ্ধতি। নিত্য প্রয়োজনীয় বিবিধ সুন্নাত এবং শেষ করা হয়েছে কুরআন খতমের সুন্নাতী তরিকা দিয়ে। রাসূলুল্লাহ (সা), ইবনে আমর রাযি. কে বলেন-

“প্রত্যেক মাসে কুরআন খতম কর।” (সহীহ বুখারি: ১৯৭৮)

আপাত দৃষ্টিতে সাধারন মানুষের কাছে প্রতি মাসে কুরআন খতম করা কঠিন মনে হলেও লেখক এতে দিয়েছেন ছোট্ট একটি টিপস, যার মাধ্যমে সহজেই প্রতিমাসে কুরআন খতম দেয়া যাবে ইন শা আল্লাহ্।

মরুর পথে 

রাসূল (সা) এর জীবন ও ইসলাম নিয়ে লেখক মোঃ সিরাজুল ইসলাম এফসিএ’র আন্তরিক প্রয়াস ‘মরুর পথে’ কাব্যগ্রন্থটি।

রাসুলের (স) স্মৃতির স্পর্শ পেতে
বেলা অবেলা ঘুরি মরুর পথে
কত গ্রীষ্ম শত বর্ষা কত মরুঝড়
উড়িয়ে নিয়েছে এখানের মাটি
হাজার বছর পরে তারি খোঁজে হায়
আমি সেই মরুপথে হাঁটি।

৫২টি বাংলা কবিতা ও একই কবিতার ইংরেজি অনুবাদ এই মোট ১০৪ টি বাংলা-ইংরেজি দ্বিভাষার কবিতা ঠাঁই পেয়েছে গ্রন্থটিতে।

মরুর পথে
BUY NOW

ইসলামের প্রাথমিক ও পূর্ব যুগে আরবে কবিতার ব্যাপক প্রচলন ছিল। সাহাবিদের মধ্যে অনেকের কবিতা রাসূল (সা) পছন্দ করতেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কবি হাসান বিন ছাবিত (রা)। তাঁর কবিতা ছিল ধারালো তরবারির মতো। তিনি কবিতা লেখার পুরস্কার হিসেবে জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। রাসূল (সা) মুসলিম কবিদের কবিতা ভালবাসতেন এবং গুরুত্ব দিতেন। মুসলিম কবিরাও তাঁদের শাণিত কবিতার মাধ্যমে ইসলাম প্রচারে সহায়তা করেছেন এবং বিভিন্ন যুদ্ধের সময় কবিতা লিখে যুদ্ধ জয়ে সাহাবাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন।

‘মরুর পথে’র প্রথম কবিতা ‘তুমি রহমান তুমি রহিম’ সর্বশক্তিমান স্রষ্টা, এক ও অদ্বিতীয় মা’বুদ আল্লাহ্র প্রতি নিবেদন করে লেখা।

হে আল্লাহ্ তুমি রহমান! তুমি রহিম!
ক্ষমা করো হে দয়াময় তুমি অনন্ত অসীম।
তুমি অতুলনীয়, তুমি পথ প্রদর্শক, তুমি আল মাতিন
সব শক্তির অধিকারী, চিরস্থায়ী তুমি মহান রাব্বুল আলামিন।

বাকি কবিতা সমূহতে মূলত হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জন্ম, শৈশব-কৈশোর, শৈশবে সিনাচাক, যৌবনে হেরা গুহায় ধ্যান, আল-কুরআন অবতরণ, মিরাজ, তায়েফে ইসলাম প্রচার করতে যেয়ে নবী (সা) এর কষ্ট, উহুদের যুদ্ধ, বিদায় হজ্ব প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী উঠে এসেছে। মরুর বুকে চাঁদ কবিতায় প্রিয়নবীর আগমনী বার্তা দিয়েছেন আলোর উপমায়-

দীপ্যমান আলোয় উজ্জ্বল করে বিশ্ব চরাচর
ধরার বুকে নেমে আসল আসমানের চাঁদ
ঐশী বাণীতে নির্দেশিত মা আমিনা
আদরের শিশুপুত্রের নাম রাখলেন
প্রশংসিত বা মুহাম্মদ (স)

শুধু মুহাম্মদ (সা) নয়, এ কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে নবীজীর পরম আত্মীয়, প্রিয় সাহাবা প্রমুখ ব্যক্তিত্বের জীবন কথাও। নবীজীর প্রাণপ্রিয় স্ত্রী হযরত খাদীজা (রা.), চাচা আমীর হামজা (রা), উহুদ যুদ্ধের মহাবীর সাহাবা আবু দুজানাকে নিয়ে লিখেছেন আলাদা আলাদা কবিতা।

উপর্যুক্ত বিষয়াবলী ছাড়াও ‘মরুর পথে’ কাব্যগ্রন্থে লেখকের হজ্বের স্মৃতিকথাও ফুটে উঠেছে। মিনা, আরাফা, মুজদালিফায় কাটানো সময়, জামারাতে পাথর নিক্ষেপ, মসজিদে নববীর চত্বর, রাসূল (সা) এর রওজা মোবারকে পার করা মুহুর্তগুলো শব্দের বুননে বুননে হয়েছে চিত্রময়। কাব্যের মুর্ছনায় নবি মুহাম্মদ (সা), তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, ইসলামের ঐশর্যমন্ডিত নানা ঘটনা সমূহ জানতে ‘মরুর পথে’ বইটি হতে পারে অনুপম সংগ্রহ।

লেখক পরিচিতি 

বর্তমান বাংলা লেখালেখির জগতে মো. সিরাজুল ইসলাম এফসিএ বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন। সাহিত্য, নিরীক্ষাধর্মী উভয় শাখাতেই তাঁর স্বতঃস্ফুর্ত বিচরণ। একদিকে উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, কবিতা লিখছেন অন্যদিকে উদ্যোক্তা বিষয়ক বই, প্রবন্ধ, ইসলাম ধর্মীয় নানা দিকনির্দেশনা মূলক বইও তিনি লিখেছেন।

দক্ষিণ বাংলার সীমান্তে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের কোলে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানার আটুলিয়া গ্রামে ১৯৭৬ সালের ২০শে আগষ্ট মো. সিরাজুল ইসলাম এফসিএ জন্মগ্রহন করেন। ১৯৯২ সালে এসএসসি পাশ করার পরে তাঁর লেখালেখির জগতে প্রবেশ। তিনি ১৯৯৮ সালে হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভের পর ২০১১ সালে Chartered Accountant হিসাবে Qualified হন এবং ২০১৬ সালে FCA ডিগ্রী লাভ করেন। বর্তমানে পেশাদার Fellow Chartered Accountant(FCA) হিসাবে কর্মরত।

তিনি তাঁর পেশাগত জীবন যেমন দক্ষতার সাথে পরিচালনা করে আসছেন তেমনি সাহিত্যিক হিসেবেও সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন। রোহিঙ্গা জীবনের গল্প ‘সীমান্তের ওপারে’ উপন্যাসের জন্য তিনি অমর সাহিত্য সন্মাননা- ২০১৮ লাভ করেন। এ. কাদের ফাউন্ডেশন কর্তৃক ‘শিশির ভেজা পথ’ উপন্যাসের জন্য বিশেষ সাহিত্য পুরস্কার-২০১৭ লাভ করেন। সেই সাথে ‘শিশির ভেজা পথ’ উপন্যাসে এইড্স নিয়ে জনসচেতনতায় অবদান রাখার জন্য সাউথ আটুলিয়া চ্যারিটি ফাউন্ডেশন কর্তৃক বিশেষ সাহিত্য পুরস্কার-২০১৭ পদকে ভূষিত হন। এছড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান স্বরূপ অতীশ দীপঙ্কর গবেষণা পরিষদ কর্তৃক অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক-২০১৯ পদকে ভূষিত হন। মহাত্মা গান্ধী গবেষণা পরিষদ কর্তৃক মহাত্মা গান্ধী পিস অ্যাওয়ার্ড-২০১৮ অর্জন করেন। ওমর সিরাজ জি কিউ ফাউন্ডেশন কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক-২০১৮ লাভ করেন।

আরও পড়ুন-কুরআন শরীফ কী দেখে কিনবেন?

মো. সিরাজুল ইসলাম এফসিএ’র লেখা অন্যান্য বই দেখুন 

বেস্টসেলার ইসলামী বইগুলো দেখুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading