৮ বছর ধরে লিখিত হয়েছে যে বই!

হাবিবুর রহমান রচিত ঠার ভাষার গবেষণাগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা
thar bede jonogoshthir vasa, feature image

“এই সিঙ্গা লাগা—ই, সাপ খেলা দেখাই—ই, দাঁতের পােকা ফেলা—ই, বাতের ব্যথা সারা—ই…” 

এমন দৃশ্য গ্রামবাংলায় একসময় বেশ স্বাভাবিক বিষয় ছিল। উক্ত কথাটি বলে বলে চৈত্রের দুপুরে বাতের ব্যথা সারানোর তাবিজ কিংবা ওষুধ বেচতে বেচতে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াত তারা। মাথায় বোঁচকা আর কোলে কাপড় দিয়ে বাঁধা থাকতো ছােট শিশু। অল্প বয়েসীরা ভয় আর বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকতো তাদের দিকে। শোনা যেত তারা নাকি তন্ত্র-মন্ত্রও জানে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছেন, কাদের নিয়ে কথা হচ্ছে? হ্যাঁ, বাংলা সিনেমায় বহুল উপস্থাপিত, বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেদে সম্প্রদায়ের কথাই বলছি। ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়াছে, আসি আসি বলে জোসনা ফাঁকি দিয়াছে’, শুনতে যত ভালো লেগেছে, যত মুনাফা করা গেছে তাদের নিয়ে সিনেমা বানিয়ে, বাস্তব জীবনে এই প্রান্তিক মানুষগুলো কি ততোটা মূল্যায়ন পেয়েছে? এই প্রশ্নই তাড়িত করেছে জনাব হাবিবুর রহমানকে।

বাংলাদেশের একটি অনগ্রসর জনগােষ্ঠী বেদে সম্প্রদায়। আদিতে তারা গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে সাপ ধরা, সাপের খেলা দেখানাে, জাদুবিদ্যা প্রদর্শন ইত্যাদি সূত্রে প্রাপ্ত অর্থ বা দ্রব্যাদির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করলেও তাদের সেই উন্মুল জীবন বর্তমানে লক্ষণীয় নয়। তারা এ দেশের স্থায়ী বাসিন্দা। অনেকের ভােটাধিকারও রয়েছে। বেদে সম্প্রদায় সাধারণত ঢাকার সাভার, মুন্সীগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, জয়দেবপুর, হাটহাজারী, মিরসরাই, তিনটুরী, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, চান্দিনা, এনায়েতগঞ্জ, ফেনীর সােনাগাজীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের বেদে জনগােষ্ঠীর শতকরা ৯৯ জনই মুসলিম এবং শতকরা ৯০ ভাগ নিরক্ষর। গােত্র পরিচয়ে তারা শ্রেণিবিভক্ত, যেমন মালবেদে, সাপুড়িয়া, বাজিকর, সান্দার, টোলা, মিরশিকারী, বরিয়াল সান্দা ও গাইন। বেদে জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে হাবিবুর রহমান তাদের আনন্দ-বেদনা, জীবনের যাতনাগুলোকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। তাদের সংস্কৃতির প্রাণ বিলুপ্তপ্রায় ‘ঠার ভাষা’কে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াসে উদ্যোগ নেন ‘ঠার, বেদে জনগোষ্ঠীর ভাষা’ বইটি লেখার। আর এই পূর্ণাঙ্গ বেদে ভাষার বইটি লিখতে তাঁর লেগে গেছে আটটি বছর!

লেখকের ভাষায় এই বই রচিত হওয়ার পটভূমিটুকু এরকম–

“২০১১ সালের কথা। আমি তখন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার। আমার অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি ছিল মাদক নিয়ন্ত্রণ। কাজের অগ্রগতি বােঝার জন্য আমি নিয়মিত সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যবৃন্দ এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছ থেকে হালনাগাদ খবরাখবর নিতাম। সাভার থানা এলাকার বিষয়ে তেমনি এক পর্যায়ে সাংবাদিকরা আমাকে জানালেন চিহ্নিত স্থানগুলােতে মাদকের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ হয়েছে কিন্তু বেদেপল্লিতে বেড়েছে। সহকর্মী পুলিশ কর্মকর্তাদেরও একই মত। আমি বিষয়ের কারণ ও গভীরতা জানতে চাইলাম। জানলাম, অন্যান্য এলাকায় পুলিশি তৎপরতায় মাদকের অবৈধ কারবার কঠিন হওয়ায় বেদেপল্লি হয়ে উঠেছিল মাদকের অভয়াশ্রম। এর কারণ হিসেবে পুলিশ কর্মকর্তাগণ জানান যে, বেদেপল্লিতে অভিযান পরিচালনা করা কিংবা সেখান থেকে গ্রেফতার করা অনেকটা অসম্ভব ব্যাপার। পাকা রাস্তা না থাকায় গাড়ি ঢুকতে পারে না। পুলিশ গেলে বেদেপল্লির নারী-বৃদ্ধ-শিশু একত্রে পুলিশকে প্রতিহত করে। এসব কারণে পুলিশ সদস্যরাও অনেকটা নিরুপায়।

“এসব জানার পর আমি বেদেপল্লীর গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপের ইচ্ছা পােষণ করি। তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার  জনাব মাে. রাসেল শেখের। ব্যবস্থাপনায় একদিন ১৭ জন গােত্রপ্রধানের সঙ্গে আলাপের সুযােগ হয়। জানতে পারি যে জীবিকা নির্বাহের সনাতন পদ্ধতি (তাদের ভাষায় গাওয়াল করা; অর্থাৎ শিঙা লাগানাে, সাপের বিষ নামানাে, সাপ খেলা দেখানাে, নানা রােগের চিকিৎসা, বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রয় ইত্যাদি) ব্যবহার করে সময়ের বাস্তবতায় তাদের জীবন সংগ্রামে টিকে থাকা বেশ কঠিন। বিশেষ এক সংস্কৃতির ধারক এই সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় জনগােষ্ঠীর পথবিচ্যুত মানুষগুলাে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়ােজনীয় জীবিকা না পেয়ে এই বিপথে পা বাড়িয়েছে।

ঠার , বেদে জনগোষ্ঠীর ভাষা / হাবিবুর রহমান
BUY NOW

“ঐতিহ্যগতভাবে বেদেরা নৌকাকেন্দ্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। গত কয়েক দশকে দেশের সার্বিক যােগাযােগব্যবস্থার উন্নতি ও নদী-নালার নাব্যতা কমে যাওয়ার ফলে তাদের জীবনব্যবস্থাও পাল্টে যাচ্ছে। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়ন, সহজলভ্যতা ও প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারে বেদে জনগােষ্ঠীর পূর্বপুরুষের তথাকথিত তাবিজ-কবজ ও ভেষজ চিকিৎসা পেশা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ফলে এই জনগােষ্ঠীর বেশিরভাগই নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। জীবিকার তাগিদে তারা মাদক ব্যাবসার সঙ্গে যুক্ত হয়। সাপের ঝাঁপি নিয়ে চলে যায় টেকনাফ, ফিরে আসে ইয়াবা নিয়ে। প্রতিটি সাপের ঝাপিতে তারা ১০-২০ হাজার ইয়াবা বহন করতে পারে। এভাবে তাদের জীবন চলছিল। আমি তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে পারলে মাদক ব্যাবসা ছেড়ে দেবে কি না, জিজ্ঞেস করলে তারা এক বাক্যে রাজি হয়। বেদে জনগােষ্ঠীর সঙ্গে সেই থেকে আমার জানাশােনা।

বাংলাদেশের একটি বেদে পল্লী
বাংলাদেশের একটি বেদে পল্লী

“বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব মানুষ সমাজে অস্পৃশ্য ও সুবিধাবঞ্চিত। এই হতদরিদ্র ও নিষ্পেষিত মানুষেরা মানবেতর জীবনের বেদনাভরা ছােট-ছােট গল্প আমার মনে দাগ কাটে। বেদে জনগােষ্ঠীর ক্ষয়িষ্ণু জীবনযাত্রার মানােন্নয়নের ভাবনাটি আমার মনে জোরালােভাবে গেঁথে যায়। আমার জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল তাদের আস্থা অর্জন করা। শুরুর দিকে তাদের অনেকেই আমার উৎসাহী মানসিকতা ও বিভিন্ন সহযােগিতাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে সন্দেহ করছিল। বিষয়টি বুঝতে পেরে প্রতিকূল পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবে নিই। এই দূরত্ব ঘােচাতে আইনের পােশাকের বাইরেও আমি যে তাদের মতােই রক্ত-মাংসের একজন মানুষ, আমার কথায় ও কাজে তা বােঝানাের চেষ্টা করি। তারাও আমাকে একটু-একটু করে বিশ্বাস করতে শুরু করে। আর সেই সময় থেকেই দূরত্বের শেকল ভেঙে আমাকে তাদেরই একজন ভাবতে শেখানাের চেষ্টাটিও সহজ হয়ে যায়।

“শুধু সাভার নয়; মুন্সীগঞ্জ, পটুয়াখালীর চরমােন্তাজ, নাটোর, নােয়াখালী, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ঝিনাইদহ, শেরপুর, সুনামগঞ্জসহ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এই জনগােষ্ঠীর নিষ্প্রভ আলােয় নিমজ্জিত মানুষগুলাে নিজেদের জীবনকে নতুনভাবে সাজাতে উদ্বুদ্ধ হয়। ইতােমধ্যে আবিষ্কার করি যে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার পাশাপাশি থেকেও তারা এক ব্যতিক্রমী সমাজের উত্তরাধিকার, যা আমাদের অগােচরেই আজও বহন করে চলেছে।

“বেদে জনগােষ্ঠীর সমাজব্যবস্থায় উপার্জনের দায়িত্ব নারীদের। ঐতিহ্যিক পেশার বিকল্প কর্মসংস্থানের ভাবনায় নারীদের প্রশিক্ষিত জনগােষ্ঠী হিসেবে গড়ে তােলার কাজ শুরু করি। আমার ভাবনায় ছিল তাদের সমস্যা তারা নিজেরাই চিহ্নিত করুক এবং সমাধানের রাস্তা বা বিকল্প কর্মসংস্থান কী হতে পারে সেটা তারাই ঠিক করুক। সমাজের দৃষ্টিতে অস্পৃশ্য এই আত্মপ্রত্যয়ী মানুষগুলাের ভালাে থাকার আকুতি আমাকে সেদিন আবেগাপ্লুত করেছিল। তাদের কথা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি এবং কঠোর আইন প্রয়ােগের পরিবর্তে দীর্ঘদিনের গ্লানিময় জীবন থেকে তাদের বের করে আনার প্রতিজ্ঞা আমার মনে সুদৃঢ়ভাবে জেগে ওঠে।

বেদে জনগােষ্ঠীর সমাজব্যবস্থায় উপার্জনের দায়িত্ব নারীদের
বেদে জনগােষ্ঠীর সমাজব্যবস্থায় উপার্জনের দায়িত্ব নারীদের

“এরপর আমার নিকটজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে বেদে জনগােষ্ঠীর জীবনমানােন্নয়নের নানা কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলােচনা করতে থাকি। অনেকেই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন। তাদের সকলের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও অনুপ্রেরণায় প্রতিষ্ঠা করি উত্তরণ ফাউন্ডেশন। তাদের সনাতন পেশা বিবেচনা করে সর্বপ্রথম বেদে নারীদের জন্য ‘উত্তরণ ফ্যাশন’ নামের একটি বুটিক হাউজ চালু করি। পরবর্তীকালে আরও বেশি সংখ্যক নারীর কর্মসংস্থানের জন্য উত্তরণ ফ্যাশন ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করি। পাশাপাশি পুরুষদের গাড়ি চালানাের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। এছাড়া বেদে শিশুদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম, মাদকবিরােধী কর্মকাণ্ড, বাল্যবিবাহ বিরােধী প্রচারাভিযানসহ নানাবিধ সামাজিক ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ করি। তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়ে শুরু হয়। ধীরে ধীরে পুরুষেরাও কর্মসংস্থানের দিকে এগিয়ে আসে। এখন তাদের অনেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে, কেউ প্রশিক্ষিত চালক আবার কেউ ব্যাবসায়ী।

“বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমানােন্নয়নে গৃহীত প্রতিটি পদক্ষেপই ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সামাজিক যােগাযােগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়। সবার অনুপ্রেরণায় উৎসাহী হয়ে এ কার্যক্রমকে আরও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক এগিয়ে নিতে থাকি। তবে সহজেই অনুমেয় যে একটি জনগােষ্ঠীর উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত যুগ যুগ ধরে অভ্যস্ত রীতিনীতি বদলানাে সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সে সময়ে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আয়ােজিত বিভিন্ন সভায় বেদে প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের রীতি চালু করি। হঠাৎ একদিন লক্ষ করি যে সভায় আসা বেদেরা নিজেদের মধ্যে একটি ভিন্ন ভাষায় কথা বলছে, যা আমাকে কৌতূহলী করে তােলে। আমি তাদের মধ্যে থেকে পূর্বপরিচিত একজনের কাছে তাদের ভিন্ন ভাষার রহস্য সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি জানান যে, বেদেরা নিজেদের মধ্যে কথােপকথনের সময় একটি স্বতন্ত্র ভাষা ব্যবহার করে থাকে, যাতে অন্যরা তাদের কথাবার্তা বুঝতে না পারে। তাদের এই ভাষার কোনাে বর্ণ বা লিপি নেই। এটি একটি কথ্য ভাষা। এ ভাষাকে তারা ‘ঠার’ বা ‘ঠের’ ভাষা বলে থাকে।

“বেদে জনগােষ্ঠীর জীবন মানােন্নয়ন করতে গিয়ে তাদের  নিজস্ব ভাষার অস্তিত্ব ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতি আমাকে আরও আগ্রহী করে তােলে। সেই থেকে তাদের ব্যবহৃত ‘ঠার’ ভাষা সম্পর্কে বিশদভাবে জানার চেষ্টা করি। প্রাথমিক পর্যায়ে ঠার ভাষা সংগ্রহের ক্ষেত্রে ঠারভাষীদের নিকট থেকে তথ্য প্রদানে অনাগ্রহ ও বাধার সম্মুখীন হতে হতাে। বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযােগিতা করার কারণে বেদে জনগােষ্ঠীর আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করার পর এক পর্যায়ে তাদের মাতৃভাষা ঠার সম্পর্কে আমাকে সঠিক তথ্য প্রদান করে। একটি ম্রিয়মানপ্রায় জনগােষ্ঠীর বিলুপ্তপ্রায় ভাষা উদ্ধার ও সংরক্ষণের তাগিদ থেকে ‘ঠার’ ভাষা সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত একে একে লিপিবদ্ধ করতে থাকলাম। ভাষাবিজ্ঞানের ছাত্র বা গবেষক না হয়েও এই ভাষাটিকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের চেষ্টা অব্যাহত রাখি। কৌতূহলী মানসিকতা থেকে ‘ঠার’ ভাষা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুবাদে ‘ঠার’ ভাষার একটি পূর্ণাঙ্গ বই রচনার পরিকল্পনা করতে থাকি।

বেদে সাপুড়ে
বেদে সাপুড়ে

“প্রাথমিক তথ্যের সূত্র হিসেবে ঢাকা জেলার অন্তর্গত সাভারের পােড়াবাড়ী, কাঞ্চনপুর, জামসিং ও অমরপুরে বসবাসরত বেদে জনগােষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনে নিজস্ব ব্যবহৃত শব্দগুলাে যথাসাধ্য সংগ্রহ করি। একইভাবে বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে বসবাসরত বেদে জনগােষ্ঠী তথা মুন্সীগঞ্জ জেলার সদর থানাধীন মিরকাদিম, লৌহজং থানাধীন খড়িয়া, কনকসার ও গােয়ালিমান্দ্রা এবং সুনামগঞ্জ, নােয়াখালী, যশাের, ঝিনাইদহ, মাদারীপুর, শেরপুর, বরিশাল, শরীয়তপুর ও নাটোর জেলায় মাঠ পর্যায়ের জরিপ পরিচালনা করে ‘ঠার’ ভাষার খুঁটিনাটি তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ ও আয়ত্ত করি।”

উল্লেখ্য, লেখকের এই কাজে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের উপদেশ-পরামর্শ ও অন্যান্য সহযোগিতা বইটিকে সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করেছে। বইটি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ রিভিউ দেখে নিই।

জাতীয় অধ্যাপক  ড. রফিকুল ইসলাম বইটি সম্পর্কে বলেন,

‘ঠার, বেদে জনগােষ্ঠীর ভাষা’ গ্রন্থটি ভাষা গবেষণার জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। প্রান্তিক কোনাে জনগােষ্ঠীর ভাষা নিয়ে এমন কাজ বিরল । বেদেদের যে একটি স্বতন্ত্র ভাষা আছে, সেই বার্তাটুকুই হয়তাে আমরা অনেকে জানি না। লেখক হাবিবুর রহমান সেই অজানা ভাষার সঙ্গে আমাদের কেবল পরিচয়ই ঘটাননি, বরং সেই ভাষার অন্তর্নিহিত সূত্রের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। ঠার ভাষাকে লেখক বিশ্লেষণ করেছেন ভাষাবিজ্ঞানের আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে। বাংলা ভাষার সঙ্গে একপ্রকারের প্রচ্ছন্ন তুলনা গ্রন্থটিকে নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের কাছে সহজেই বােধগম্য করে তুলবে। বিরল এক প্রচেষ্টার অগ্রনায়ক হিসেবে লেখক এবং তার এই গ্রন্থখানা চিহ্নিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট-এর সাবেক মহাপরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক (অব.) জীনাত ইমতিয়াজ আলী বলেন,

হাবিবুর রহমান এ দেশের বেদে সম্প্রদায়ের জীবনাশ্রয়ী অনবদ্য যে গ্রন্থটি রচনা করেছেন তার বইয়ের শিরােনাম ‘ঠার : বেদে জনগােষ্ঠীর ভাষা’। পেশায় তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এ জাতীয় কাজে অভিনিবিষ্ট থেকে তা রচনা করা সহজ নয়। কিন্তু সেই প্রায়-অসম্ভব কাজ তিনি সম্পন্ন করেছেন। তার শ্রম ও নিষ্ঠা প্রশংসনীয়। বইটি মােট ১০টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। আমার বিশ্বাস, এ গ্রন্থ কৌতূহলী পাঠকের সমাদর লাভ করবে। আমি লেখকের শ্রম ও নিষ্ঠা বিশেষভাবে স্মরণ করে তার দীর্ঘায়ু ও সাফল্য প্রত্যাশা করছি।

কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন,

বাংলাদেশে বেদে সমাজ নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি আছে, বিদ্বেষও আছে। তারা প্রান্তবাসী, তাদের দশ হাত দূরে। রাখতে শুধু ভদ্ৰশ্রেণি নয়, পল্লিসমাজও পছন্দ করে। তাদের পরিযায়ী জীবনযাত্রা সুস্থির, গৃহকেন্দ্রিক জনগােষ্ঠীর নিশ্চয়তা প্রত্যাশার সঙ্গে বিরােধে যায়, সেজন্য তাদের নিয়ে একটা অস্বস্তিও জনমনে আছে। সাপের খেলা দেখানাে অথবা লােকচিকিৎসা দেওয়া এবং এ রকম কিছু গৌণ কাজের মধ্যেই মােটামুটি তাদের কর্মপরিধি সীমাবদ্ধ। অথচ তাদের বসবাস কৌম সমাজে, নারীদের অবস্থান সেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত, তাদের নৈতিক-নান্দনিক বােধ, সৃষ্টিশীলতার চর্চা এবং একটি ভাষা আছে, যা ঠার বা ঠের বলে পরিচিত। বেদেদের জীবনের ভেতরে খােলামন নিয়ে উঁকি দিলে একটি ছবি দেখা যাবে। যদিও খুব কম মানুষই সেই চেষ্টা করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এই কাজটি দরদ নিয়ে, নিষ্ঠার সঙ্গে করেছেন হাবিবুর রহমান। তিনি দীর্ঘদিন থেকে এই জনগােষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশা মােচন ও তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনের মূলধারায় নিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করে আসছেন। বস্তুগত সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি হাবিবুর রহমান বেদেদের ভাষা নিয়ে গবেষণা করে  ‘ঠার: বেদে জনগােষ্ঠীর ভাষা ‘গ্রন্থটি রচনা করেছেন। ঠার ভাষার সঙ্গে আরাকানি, মনতং নৃ-গােষ্ঠীর ভাষার অনেক মিল, তবে মিলটা বাংলা। ভাষার, বিশেষ করে এর আদিরূপ প্রাকৃতের সঙ্গে বেশি। হাবিবুর রহমান ভাষাবিজ্ঞানের সূত্রগুলাে মেনেই লিখেছেন বইটি, যার ফলে তাঁর গবেষণার একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও তৈরি হয়েছে। ঠার ভাষার বহুল প্রচার হােক, যাতে বেদেদের সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।

পরিশেষে বলা যায়, ঠার ভাষার যেহেতু আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত কোনাে উপাদান নেই, সেহেতু ভবিষ্যতে বেদে জনগােষ্ঠী ঠার ভাষা পড়া, বলা, লেখার জন্য এবং রীতিবদ্ধ ভাষারীতি জানার জন্য এই বইটি ব্যবহার করতে পারবে। গ্রন্থটি ভাষা গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে ব্যবহৃত হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বেদে জনগােষ্ঠীর ব্যবহৃত ঠার ভাষা পূর্ণরূপে ও স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য এই গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যায়।

আরও পড়ুন-ঢাকাইয়াদের খাবার প্রীতি, শত বছরের ঐতিহ্যের ইফতারি আইটেম

বইটি সম্পর্কে আরও জানতে ক্লিক করুন 

হাবিবুর রহমানের অন্যান্য বই দেখুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading