প্রোডাকটিভিটি বাড়াতে চান? দেখে নিন ৯টি টিপস!

productivity

তারেক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র। সবসময় নিজের এ্যাকাডেমিক পড়াশোনা নিয়েই মত্ত। এর বাইরে যেন আর কিছু ভাবতেই পারেন না। হঠাৎ করে লকডাউন শুরু। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। যদিও ক্লাস অনলাইনে চলছে, তবুও তার যেন মনে হয় তার অনেকটাই খালি সময় – বেকার সময়। অনেকেই অনলাইনে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কোর্স করে হাফ সেঞ্চুরি – সেঞ্চুরি হাঁকাচ্ছেন, কেউ বা খুঁজে নিয়েছেন পার্ট টাইম জব। অনেকেই আবার বাড়িয়ে চলেছেন নিজেদের স্কিলস, কেউবা লালন করছেন নিজের শৌখিন ইচ্ছাগুলো। এতো এতো প্রোডাকটিভিটি র ভিড়ে তারেক যেন দিশেহারা। মনে মনে ভাবে এটা করবে, ওটা শিখবে, ভেবেই চলে, কিন্তু ভাবনা শেষে আবার সেই একই প্রশ্ন – কিভাবে করবে? কোনটা করবে, আর কোনটাইবা করবে না? শুরুটাই বা কিভাবে হবে?

তারেক এর এই গল্পের সাথে হয়তো অনেকেরই বর্তমান অবস্থা মিলে যাবে। শুধু ছাত্র হিসেবে নয়, একজন চাকরিজীবী হিসেবে অথবা একজন হোম-মেকার হিসেবে প্রত্যেকটা মানুষই কখনও না কখনও প্রোডাকটিভিটি র লুপে পড়ে যায়।

তাহলে দেখা যাক কিভাবে এই প্রোডাকটিভিটি লুপ থেকে বের হওয়া যায়। আপনার কাছে প্রোডাকটিভিটি কী আসলে? প্রোডাকটিভিটি মানেই কি সারাদিন ধরে অঢেল কাজ করা বোঝায়? – নাহ! প্রোডাকটিভিটি মানে সারাদিন অঢেল কাজ করা নয়। প্রোডাকটিভিটি হলো – আপনি আপনার সময়কে কিভাবে সর্বোত্তম উপায়ে কাজে লাগাবেন। আমরা অনেক সময়ই হুট করে কিছু কাজ করে ফেলি। পরে আফসোস করি, কাজটা না করলেই হয়তো ভালো হত। আগে থেকেই পরিকল্পনামাফিক কাজ করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। আফসোসও কম হয়। প্রোডাকটিভিটি বাড়ানোর মূলমন্ত্র হচ্ছে, “ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না”।

আপনাদের সাথে আজ এমনই ৯ টি টিপস শেয়ার করবো, যা আপনার প্রোডাকটিভিটি বাড়াতে সাহায্য করবে –

পোমোডোরো টেকনিক

পোমোডোরো অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। এটি আবিষ্কার করেন ফ্রান্সিসকো কিরিল্লো নামে একজন। আজ থেকে প্রায় ৩৭ বছর আগে, অর্থাৎ ১৯৮০ সালে। এটি এমন এক পদ্ধতি যার সাহায্যে যে কোনো কাজই খুব দ্রুত এবং সহজে করা যায়।

আপনারা অনেকেই নিশ্চিতভাবে এই প্রোডাকটিভিটি হ্যাকের কথা শুনেছেন, তবে কিভাবে এটি আপনার প্রোডাকটিভিটিকে সুপারচার্জ করে তা কি জানেন? জাদুটি ঘটে এই টেকনিকটি বারবার ব্যবহারের পরে। এই কৌশলটি এতই শক্তিশালী যে একে আয়ত্ত করতে পারলে একসময় এটি আপনার কাজ করার অবিচ্ছেদ্য টেকনিক হিসেবে পরিণত হবে।

অনেকেই এই পোমোডোরো টেকনিক ব্যবহার করে সাফল্য পান । যা যা করবেন-

  • একটি কাজ বেছে নিন।
  • ২৫ মিনিটের জন্য কাজটি করুন।
  • ২৫ মিনিট শেষ হওয়ার পরে কাগজের একটি শীটে একটি চেকমার্ক দিন।
  • এবার ৫ মিনিটের একটি বিরতি নিন। (এটি ১ টি “পোমোডোরো” স্প্রিন্টের সমাপ্তি চিহ্নিত করে)
  • প্রতি ৪ টি পোমোডোরো স্প্রিন্টের পরে, আরও দীর্ঘ বিরতি নিন।
  • আপনার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটি সারা দিন ধরে চালিয়ে যান।

এই কৌশলটি আপনার যে কোনো কাজে  মনোনিবেশ ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করতে পারে।

একটি সময়সূচী অনুসরণ করুন

 বাড়িতে প্রোডাকটিভ থাকার দ্বিতীয় সবচেয়ে জনপ্রিয় উপায় হল – কাজের সময় নির্ধারণ।

আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অথবা অফিসে যে সময়সূচীটি মেনে চলতেন, ঐ একই সময়সূচীটি বজায় রাখতে নিজেকে উৎসাহিত করুন। একটি রুটিন অনুসরণ এর মাধ্যমে আপনার কাঠামোগত দক্ষতা এবং মনোনিবেশ ধরে রাখতে সফল হবেন।

এক্ষেত্রে কয়েকটি ধাপে কাজটি করতে পারেন –

  • প্রথম ধাপ – সারাদিন কী কী কাজ করবেন তার একটি লিস্ট তৈরি করুন।
  • পরবর্তী ধাপ হল – প্রসেসিং। যেমন ধরুন, একটি প্রজেক্ট জমা দিতে হবে। আপনার লিস্টে প্রজেক্টের পাশে সাবমিশনের তারিখটিও লিখে রাখতে হবে। সম্ভব হলে টাইমলাইন ধরে কাজের অগ্রগতিও থাকতে পারে।
  • কোন কাজটি কখন করবেন, কোনটি আগে, কোনটি পরে সেটি ঠিক মত সাজিয়ে নিন।
  • সবশেষে, কাজগুলো প্ল্যান অনুযায়ী ঠিকমত হয়েছে কি না তাও রিভিউ করতে হবে।

মাল্টিটাস্কিং বন্ধ করুন

প্রোডাকটিভিটি সর্বাধিক করার আগে আপনাকে প্রথমে যা করতে হবে তা হল – মাল্টিটাস্কিং বন্ধ করা। ব্যস্ত ব্যক্তিদের দীর্ঘ-প্রতিষ্ঠিত অভ্যাসগুলির মধ্যে এটি একটি – যারা একবারে একাধিক কাজ করেন বা কাজের মধ্যে স্যুইচ করে সময় বাঁচাতে মরিয়া হয়ে থাকেন।

দুঃখের বিষয়, মাল্টিটাস্কিং একটি মিথ্যা দক্ষতা যা আপনার সাশ্রয়ের চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করে। এবং অনেক গবেষণায় দেখা যায়, মাল্টিটাস্কিংয়ের ফলে মানুষের মনে বিস্তৃত নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

প্রতিটি দিনের জন্য একটি একক লক্ষ্য সেট করুন

 মাল্টিটাস্কিংয়ের কথা ভুলে যাওয়ার জন্য আপনাকে একক কাজে মনোনিবেশ করতে আপনার মনকে পুনরায় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এটি আমাদের ব্যস্ত – ডিজিটাল জীবন আমাদের করতে উত্সাহিত করে এমন সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধে যায়, তবে এই সমস্যার সমাধান একই ডিজিটাল প্রযুক্তিতেও রয়েছে, যা এটি আরও বাড়িয়ে তোলে।

এক্ষেত্রে আপনারা আপনাদের ওয়ার্ক-ফ্লোটি সংগঠিত করতে এবং আপনাদের মনোযোগ একটিমাত্র কাজে ধরে রাখতে ‘Serene’ নামে একটি অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন। এটি আপনাকে প্রতিটি কার্যদিবসের জন্য একটি একক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে উৎসাহিত করবে, যা ক্রমাগত পৃথক কাজে মনোনিবেশ করার ধারণাটিকে শক্তিশালী করে। আপনি প্রতিদিনের লক্ষ্যগুলি একাধিক টাস্ক বা কাজের সেশনে বিভক্ত করতে পারেন, যেখানে আপনি কেবলমাত্র নির্দিষ্ট কাজের জন্য বরাদ্দ সময়ের মধ্যে (এবং অন্য কিছুই নয়) কাজ করবেন।

মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায় এমন অ্যাপস / ওয়েবসাইটগুলি ব্লক করুন

 রেসকিউ টাইম দ্বারা পরিচালিত গবেষণা অনুসারে, ডিজিটাল কর্মীরা গড়ে প্রতি ৬ মিনিট অন্তর  তাদের ইমেল, ম্যাসেজ বা নোটিফিকেশান চেক করেন। আমাদের কাজের ধরণ এবং সামাজিক জীবনের ডিজিটাল প্রকৃতির জন্যই মূলত এধরনের অভ্যাসে সকলেই অভ্যস্থ। আর এই অভ্যাসের কারণে মানুষ প্রবল উদ্যমের সাথে কোনো কাজ শুরু করলেও স্বল্প সময়ের মধ্যেই মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। এক্ষেত্রে করণীয় – মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায় এমন সবকিছুই একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ রাখা। পোমোডোরো টেকনিক এ উল্লেখিত বিরতিতে আপনার ইমেল, ম্যাসেজ, নোটিফিকেশান চেক করে নিন যেন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিস হয়ে যাওয়ার ভয় ছাড়াই আপনি আপনার কাজে একান্ত মনোনিবেশ করতে পারেন।

নাবলতে শিখুন

 কিছু মানুষের পক্ষে না বলা খুবই কঠিন, তবে আপনি যদি সত্যিই আপনার প্রোডাকটিভিটির স্তরগুলোকে উন্নত করতে চান, তবে সর্বদা অন্যের কাজে ব্যস্ত থাকলে চলবে না।

অপ্রয়োজনীয় বাধ্যবাধকতার জন্য “না” বলতে ভয় পাবেন না। এত কোলাহল ও বিশৃঙ্খলাময় এমন একটি পৃথিবীতে, আপনাকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির জন্য জায়গা তৈরি করতে হবে। এর অর্থ হল – অযৌক্তিক প্রতিশ্রুতিগুলি ছাঁটাই করা এবং যতটা সম্ভব বিঘ্ন আপনি দূর করতে পারেন।

নিজের অগ্রাধিকারগুলি সম্পর্কে পরিষ্কার হয়ে এগুলি সঠিক ক্রমে সাজিয়ে নিন। এরপর আপনার তালিকার শীর্ষে থাকা কাজগুলি এবং প্রতিশ্রুতিগুলি থেকে শুরু করুন। আপনার অগ্রাধিকার এর বাইরে বাড়তি কিছু, যা আপনার কাজে বিঘ্ন ঘটায়, এমন সবকিছুকে “না” বলতে শিখুন।

খুব বেশি প্রযুক্তিতে ডুবে যাবেন না

আপনারা অনলাইনে খুঁজলে খুব সহজেই এমন অসংখ্য সফ্টওয়্যার সরঞ্জাম পাবেন যা আপনার প্রোডাকটিভিটি বাড়াতে সহায়তা করবে। তবে সফ্টওয়্যারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সকলের উচিত অন্তর্নিহিত বিপদটি চিহ্নিত করা।

আপনার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামগুলি ব্যবহার করুন, তবে নিশ্চিত করুন যে সেগুলো আসলেই আপনার প্রোডাকটিভিটির উন্নতি করছে। যেহেতু প্রযুক্তির এই যুগে সফ্টওয়্যার এবং অ্যাপস এর অভাব নেই, আপনাকে আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত সরঞ্জামটি বেছে নিতে হবে।

কাছাকাছি রাখুন একটি কলম এবং একটি নোটপ্যাড

 মানব-স্মৃতি কুখ্যাতভাবে অবিশ্বাস্য।

আপনি যদি যা কিছু করার দরকার তা মনে করেন এবং মনেই রেখে দেন, তবে নিশ্চিত থাকুন – আপনার অনেক কাজ অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। ঝুঁকি নেবেন না, যা মনে আসবে তা সাথে সাথে লিখে ফেলুন।

এক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারেন একটি পেন এবং প্যাড অথবা আপনার স্মার্টফোন এর কোনো অ্যাপ্লিকেশন। এটি একান্তই আপনার নিজস্ব পছন্দ।

সমস্ত অভ্যাস, সমস্ত কাজ এবং যে কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন তার ট্র্যাক রাখতে ব্যবহার করতে পারেন নানান অ্যাপ্লিকেশন। এক্ষেত্রে “Todoist” একটি জনপ্রিয় অ্যাপ।

  প্রাকৃতিক আলোর কাছাকাছি থাকুন

প্রোডাকটিভিটি বাড়াতে অন্যতম একটি হ্যাক – প্রাকৃতিক আলোর কাছাকাছি কাজ করা (যেমন সূর্যের আলো)। গবেষণায় দেখা যায় যে, সূর্যের আলোর সংস্পর্শে ঘুমের উন্নতি হয়, এর ফলে আপনার মন সতেজ থাকে এবং ফলস্বরূপ আপনার প্রোডাকটিভিটির মাত্রাও উন্নত হয়। সুতরাং আপনি যদি পারেন, তবে একটি জানালার কাছে বসে কাজ করতে চেষ্টা করুন (এক্ষেত্রে উন্মুক্তটি সবচেয়ে আদর্শ হবে)। ফলস্বরূপ, আপনি সতেজ মনে অধিক কর্ম উদ্দীপনা নিয়ে যে কোনো কাজে মনোনিবেশ করতে সফল হবেন। একঘেয়েমি দূর করতে পারবেন অনেকাংশে।

সর্বোপরি প্রোডাকটিভিটির পিছে ছুটতে ছুটতে নিজের কথা ভুলে গেলে চলবে না। নিজের যত্ন নিন। সুস্থ থাকুন। ভালো থাকুন। মনে রাখবেন, জীবনের যে ক্ষেত্রেই আপনি সফল হতে চান, আপনাকে নিজের যত্ন নিতে শিখতে হবে।

জনপ্রিয় আত্মোন্নয়নমূলক বইগুলো দেখতে ক্লিক করুন 

 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading