ব্যবসা ও খেলোয়াড়ের জীবনে আস্থা অর্জন কেন জরুরি : গবেষণা কী বলে ?

ব্যবসা ও খেলোয়াড়ের জীবনে আস্থা অর্জন

গবেষকরা ব্যবসায় আস্থার বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা করেছেন। তাদের মতে, কোনো ব্যবসা তার সেবাগ্রহীতা বা ক্রেতাদের কাছ থেকে বিশ্বাস হারালে তার জন্য খুবই ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ পরিকল্পনা পুনরায় তৈরি করতে হয়। লক্ষ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া ও প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায়ীর কাছে হেরে যাওয়ার চেয়ে থমকে না দাঁড়িয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করাটাই বুদ্ধির কাজ। এমতাবস্থায় কোম্পানি পুনরায় ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করতে কোন ধরণের পদক্ষেপ নিবে।

“ব্র্যান্ড পছন্দের সুযোগ রয়েছে এমতাবস্থায় কোনো ব্র্যান্ডের উপর আস্থা রাখা না গেলে তা ব্র্যান্ড পরিবর্তনের সুবিধা থাকার কারণে প্রত্যাখ্যাত হবে” বলে গবেষকরা মনে করেন। ২০১৮ সালে প্রকাশিত সীন পাইলট ডে চেনেসী-এর দ্য পোস্ট-ট্রোথ বিজনেস গ্রন্থে উক্ত ধারণাটি উঠে এসেছে। কোনো ব্যবসা ক্রেতাদের কাছে বিশ্বাস হারালে তার চরম মূল্য দিতে হয়। এরই মধ্যদিয়ে ব্যবসায়ের একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অন্যান্য পরামর্শদাতারা মনে করেন।

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বল-টেম্পারিং‘র ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের স্পন্সর হারিয়েছিলো। একইভাবে অনেক খেলোয়াড় তাদের স্পন্সর হারিয়েছিলো।
সম্প্রতি বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা (আইসিসি) সাকিব আল হাসানকে ক্রিকেট খেলায় এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে!
আইসিসির এই নিষিদ্ধ ঘোষণার সঙ্গে কেবল তার খেলা-ই জড়িত নয়। বরং তার পুরো পেশাজীবন বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখী হতে যাচ্ছে। তার এই ক্ষতি আর্থিক কিংবা ভাবমূর্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভবিষ্যত জীবনে তার উপর দর্শকদের আস্থার বিষয়টি।

খেলোয়াড়ের জীবনে আস্থা অর্জনবাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আইসিসি‘র নিষেধাজ্ঞা পেয়েছেন দুজন খেলোয়াড়।  আশরাফুল এ পথে পা বাড়িয়ে কলঙ্কিত হয়েছেন।  সাকিব তথ্য না সরবরাহ না করায় নিষিদ্ধ হয়েছেন।  নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন মোহাম্মদ আজাহার উদ্দিন, অজয় জাদেজা, হ্যানসি ক্রোনিয়ে, সেলিম মালিক, ক্রিস কেয়ার্নস, মোহাম্মদ আমির, মোহাম্মদ আসিফ, সালমান বাট।

পড়তে পারেন ‘সাকিব আল হাসান – আপন চোখে ভিন্ন চোখে (হার্ডকভার)‘ বইটি ।

আমাদের পেশাজীবনে আস্থা অর্জন করার খুবই অমূল্য সম্পদ। অর্থ উপার্জনের চেয়ে আস্থা অর্জন করা অনেক বেশি কঠিন। একবার কোনো কারণে হারালে তা পুনরায় অর্জন করা খুবই দুষ্কর বিষয় হয়ে পড়ে।  তাই পেশাজীবনে বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী, ভোক্তা, সেবাগ্রহীতা, সরকার সকলের কাছে আস্থা অর্জন করতে পারলে ব্যক্তির পেশাজীবন কিংবা ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান খুব দ্রুত উন্নতি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, সাকিবের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চুক্তি রয়েছে। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক শিশু তহবিল প্রতিষ্ঠান ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হিসেবেও কাজ করছেন। এছাড়া উবার, ইউনিলিভারসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার চুক্তি চলমান।  ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন যে, সাকিবের সঙ্গে এসব চুক্তি যে কোনো সময় প্রতিষ্ঠানগুলো বাতিল করতে পারে।

ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের নিয়ে লেখা বইগুলো পড়তে পারেন ।

ভবিষ্যতে সাকিব পুনরায় খেলায় ফিরতে পারেন। কিন্তু যে কোনো ধরণের ভুলভ্রান্তি ভবিষ্যতে তার জন্য অনেক বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দর্শক তার সামান্য ক্রটিকেও অনেক বড় করে দেখার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে পেশাজীবনে তিনি বড় ধরণের ক্ষতির সম্মুখীন হবেন, যা তার ক্রিকেট জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন হয়ে থাকবে। তবে তার অসাধারণ শক্তি ও দক্ষতা হয়তো ভুলিয়ে দিতে পারে তার কৃতকর্মের ফল।  সেটা অবশ্য ভবিষ্যত বলবে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের ব্যাংক খাতটি খুবই নাজুক অবস্থা পার করছে। তার মধ্যে সরকারি বেসরকারি সব ধরণের ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক, এনআরবি কমার্সিয়াল ব্যাংক, এবি ব্যাংক।  পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে যে, ১০ বছরে ব্যাংক খাতে ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকার কেলেঙ্কারি হয়েছে। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার খুইয়ে গেছে। যার মূল্য প্রায় ৮০৮ কোটি টাকা।

প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, গত ১০ বছরে জনতা ব্যাংক থেকে অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট ও থারমেক্স গ্রুপ মিলে ১১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা হাতিয়েছে। বেসিক ব্যাংক থেকে বের হয়ে গেছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা।  সোনালী ব্যাংক থেকে হল-মার্ক নিয়ে গেছে ৩ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা।  বিসমিল্লাহ গ্রুপ নিয়েছে ১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া রিজার্ভ চুরির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে হারিয়েছে ৬৭৯ কোটি টাকা। নতুন প্রজন্মের এনআরবি কমার্শিয়াল ও ফারমার্স ব্যাংক থেকে লোপাট হয়েছে ১ হাজার ২০১ কোটি টাকা। এবি ব্যাংক থেকে পাচার হয়েছে ১৬৫ কোটি টাকা।

যোগাযোগ বিষয়ক বিপণন প্রতিষ্ঠান এডেলম্যান আস্থার অবস্থা নিরূপণ করতে বৈশ্বিকভাবে বাৎসরিক একটি পরীক্ষা পরিচালনা করে। ২০১৮ সালের গবেষণায় দেখা গেছে যে, গণমাধ্যম, সরকার, ব্যবসায় ও বেসরকারি সংগঠন এই ৪ ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমাগতভাবে আস্থার দিক থেকে অবনতির দিকে এগিয়ে গেছে।

২০১৮ সালের জুলাই মাসে ডেলইয়েট (বিশ্বে হিসাব বিষয়ক বৃহৎ ৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম) অস্ট্রেলিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ইন্ডাস্ট্রির প্রতিবেদনে অস্ট্রেলিয়ার ২ হাজার ভোক্তার উপর পরিচালিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।

এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, অস্ট্রেলিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ইন্ডাস্ট্রি ‘ডুবে গেছে’ (ট্যাকেন এ ডিভ)।  প্রতিবেদনের বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো। ভোক্তাদের ৩২ শতাংশের বক্তব্য হলো যে, ফাইন্যান্স ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে তাদের আস্থা গত ১২ মাসে হ্রাস পেয়েছে। ২৫ শতাংশ ভোক্তা ফাইন্যান্সিশিয়াল সেবা শিল্পের উপর আস্থা রাখে না এবং ৪৭ শতাংশ ভোক্তা তাদের ফাইন্যান্সিশিয়াল সেবা সরবরাহকারীদের উপর আস্থা রাখতে পারছে না।

ব্যবসা ও খেলোয়াড়ের জীবনে আস্থা অর্জন চিত্রআস্থা হারানো মানে কর্মকর্তা ও বিক্রেতার বিশ্বাসযোগ্যতার হ্রাস পাওয়া। বিশ্বাস পুননির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যয়টুকু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তার পরিমাণ খুবই বড়। গত বছরের শেষের দিকে অধিকাংশ বৃহদাকার ব্যাংকগুলো তাদের মুনাফা তুলে নিলো। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যান্ডু থরবার্ন বলেছেন যে, “বর্তমানে আমাদের কর্মকর্তাদের আস্থা ফেরাতে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে সেবাগ্রহণকারীদের উপর বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। আস্থা অর্জন করা গেলে ব্যবসা আরো দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব।” এক্ষেত্রে ব্যাংকের মাসিক ব্যয় ২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

কতিপয় ক্ষেত্রে আস্থা হারানোর বিষয়টি গোপন করার সুযোগ নেই, যা খুব দ্রুত ও মারাত্মকভাবে ক্ষতি নিয়ে আসতে পারে। আমেরিকার এয়ারলাইনসের কর্মকর্তারা যাত্রীদের জোরপূর্বক বের করার চিত্রটি সামাজিক মাধ্যমে উঠে আসলে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো ক্ষতির স্বীকার হতে হয়েছিলো।
প্রায় ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, আস্থা হারানোর ততক্ষণাত তার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়ে এবং কোম্পানিতে বিভিন্নভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে ধীরে ধীরে দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্র্যান্ডের খ্যাতিকে বিসর্জন দিতে হয়।

পাদটিকাঃ 

ব্যবসা ও খেলোয়াড়ের জীবনে আস্থা অর্জন ৩
যোগাযোগ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ গেব্রিয়েলে ডল্যান

গেব্রিয়েলে ডল্যান দ্য সিইও ম্যাগাজিন-এ উক্ত প্রবন্ধটি লিখেছেন। ডল্যান যোগাযোগ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। ব্যবসায়গল্প নির্মাণে একজন চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি বিশ্বব্যাপী খ্যাতিলাভ করেছেন। এছাড়া একজন বক্তা ও পরামর্শদাতা হিসেবে তার বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। উক্ত লেখার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে লেখাটি স্বল্প পরিসরে পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত।


সূত্র:
১. https://www.theceomagazine.com/business/management-leadership/losing-trust-in-business/
২. প্রথম আলোতে সম্প্রতি সাকিব আল হাসান নিয়ে প্রকাশিত মতামত

 

আরও পড়ুনঃ 

বিশ্ব পাল্টে দেয়া ১৩ জন ব্যবসায়ী নেতা

ব্যবসায় টিম পরিচালনার ক্ষেত্রে কীভাবে চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখবেন

ব্যবসা শুরুর আগে উদ্যোক্তাদের অবশ্যপাঠ্য ৭ টি বই

ব্যর্থতার সঙ্গে লড়তে উদ্যোক্তাদের ১০ কৌশল

rokomari

rokomari

Published 29 Jan 2018
Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png