‘গুড প্যারেন্টিং’? সে আবার কী!

good parenting

বাংলায় ‘প্যারেন্টিং’ অথবা ‘গুড প্যারেন্টহুড’ শব্দের সঠিক প্রতিশব্দ পাওয়া যায় না। ‘অভিভাবক’ শব্দটি প্রায়ই ‘প্যারেন্টস’ শব্দটির কাছাকাছি হলেও সঠিক প্রতিশব্দ বলা যায় না। সে যাইহোক। যে শব্দই ব্যবহার হোক না কেন, আদতে মা-বাবা কোনোভাবেই শিশুর নিছক অভিভাবক নন; বরং তার চেয়ে বেশি কিছু। কাজের পৃথিবীর বয়স যতই বাড়ুক না কেন কিংবা সমাজ ও সংস্কৃতির যতই পরিবর্তন সাধিত হোক না কেন, শিশুদের বড় করে তোলার ক্ষেত্রে মা-বাবার বিকল্প নেই। যেহেতু এটি একটি গুরুদায়িত্ব, তাই সঠিক প্যারেন্টিং অনুশীলনও বেশ জরুরি। আমাদের উপমহাদেশে বাবা-মায়েদের মধ্যে শিশুদের শারীরিক ও মানসিকভাবে লালন-পালনের বিভিন্ন পদ্ধতি শেখার তেমন কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। তবে সময়ের সাথে সাথে অনেকেই এই বিষয়ে আগ্রহী হচ্ছেন। কাজেই সবকিছুর পরেও মা-বাবাকে শিশু লালন–পালনের বিভিন্ন বিষয় শিখতে হবে বৈজ্ঞানিকভাবে। মনে রাখতে হবে, মা-বাবা বাড়িতে যেভাবে শিশুকে ছোটবেলা থেকে বড় করে তুলবেন, ভবিষ্যতে শিশু সেভাবেই বড় হবে। কাজেই বাড়িটি হতে হবে শিশুর উপযোগী।

গুড প্যারেন্টিং করতে হলে কী কী বিষয় মাথায় রাখতে হবে?

আসলে বাচ্চার প্রতিটি পদক্ষেপ সজাগভাবে পর্যবেক্ষণ এবং তার সব রকম উন্নতির জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করাটাকেই গুড প্যারেন্টিং বলা চলে। আপনার শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশের দিকে সবসময় নজর রাখতে হবে। যদি আপনার শিশু ছোট থেকেই ‘জীবন মানে পরীক্ষায় ১০০ তে ১০০ পাওয়া’ বোঝে, তবে ভবিষ্যতে এটি সুন্দর জীবন গঠনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভারসাম্যহীন অতি চাপে সন্তানের জীবন থেকে জীবনটাই হারিয়ে যায়। সুতরাং নিজের সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বর্তমানকে ভুলে গেলে চলবে না। বর্তমান সময়ে আপনার শিশুর দৈহিক এবং মানসিক সুস্থ বিকাশের প্রতি আপনার খেয়ালন রাখতে হবে। মনে রাখবেন, আপনি যদি নিজের সন্তানের ব্যাপারে অন্যের কাছে  দুর্নাম করেন কিংবা সন্তানকে ভালো না বাসেন, তবে সেই সন্তান কখনও আপনাকেও মন থেকে ভালোবাসবে না!

BUY NOW

শিশু শিখবে আপনারই আচরণ 

শিশুরা যেহেতু অনুকরণপ্রিয় তাই আপনি তার সামনে যেরকমটা অনুশীলন করেন না কেন, শিশু তাই শিখবে। সেক্ষেত্রে শিশুর শেখার জন্য হলেও ইতিবাচক অনুশীলন জরুরি। আপনার সন্তান তার কোন সহপাঠী বা বন্ধুকে গালাগালি করলে তাকে কিছু বলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন- এই শিক্ষা কোথা থেকে পেলো? কেনই বা আপনার সন্তান অল্প বয়সেই আপনার কথা শুনছে না, অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে? আঘাত করে কিংবা বকাবকি করে সন্তানকে মানুষ করা যায় না। সন্তান প্রতিপালনে তাই আনতে হবে কৌশলগত পরিবর্তন। অথবা আপনি কৌশলগত ভাবে উদ্যোগী না হয়ে যদি ভাবেন, সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে তবু আপনি ভুল করছেন। কারণ এতে হিতে-বিপরীত হবার সম্ভাবনাই বেশি। সুতরাং ভালো প্যারেন্টিং অনুশীলনের কোন বিকল্প নেই।

ইন্টারনেটের দুনিয়ায় প্যারেন্টিং কোর্স কোনো ব্যাপারই নয় 

প্যারেন্টিং বিষয়ে সজাগ থাকা আজকাল কঠিন কিছু না। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় মুহূর্তেই পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানের প্যারেন্টিং কোর্স করতে পারবেন ঘরে বসেই। অসংখ্য ভালো বই পাওয়া যায়, যেগুলো আপনাকে গুড প্যারেন্টিং অনুশীলনে সর্বাত্মক সহায়তা করবে। আপনার নিজের সন্তানকে খুব ভালো ভাবে চিনতে হবে। তার চরিত্রের প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি জেনে তার সঙ্গে সেরকমভাবেই ব্যবহার করতে হবে। কারণ এ থেকেই সন্তান শিক্ষা নেবে। দরকার হলে সন্তানের সব অভ্যাস জেনে নিয়ে সন্তান ও নিজের জন্য করণীয় ও বর্জনীয় কাজের একটি তালিকা তৈরি করে ফেলুন।

ভালো প্যারেন্টিংয়ের জন্য ভালো প্যারেন্টস প্রয়োজন, অর্থাৎ আগে ভালো বাবা-মা হতে হবে। আপনি যদি আপনার সন্তানের জন্য একজন আদর্শ বাবা কিংবা মা না হতে পারেন তবে সন্তানের জন্য আপনার করা সবকিছুই বিফলে যেতে পারে। মনে রাখবেন, সন্তান যা চায় তাই দিতে পারার সামর্থ্য কিংবা সন্তানকে অনেক বড় কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে দিতে পারা মানেই আদর্শ বাবা-মা নয়। প্যারেন্টিংয়ের অনুশীলনের আগে নিজেকে আদর্শ অভিভাবক হিসেবে ঝালিয়ে নিতে হবে।

BUY NOW

অনুশীলনের জন্য কিছু প্যারেন্টিং টিপস:

১. বই পড়ার অভ্যাস

সম্ভব হলে আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী বাসায় লাইব্রেরি বানানোর চেষ্টা করুন। বাচ্চারা যেন সবসময় হাতের নাগালে বই পায়। বাচ্চাদের সামনে বই পড়ুন এবং ওদের পড়ে শোনান। পড়ার আগ্রহ এবং অভ্যাস দুটোই তাদের মধ্যে তৈরি করুন। জোর করে অভ্যাস নয়; বরং স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহন নিশ্চিত করুন।

২. নিজের কাজ নিজে করি

নিজের কাজ যে নিজে করতে হয় এটুকু মাথায় ঢুকিয়ে দিন। তার নিজের খেলনাগুলো রাখার জায়গায় বা নিজের বইপত্র, খাতা ইত্যাদি নিজেই নিজের ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখতে শেখান। এবং পানি আনার জন্য কিংবা দরজা খোলার জন্য সন্তানকে সবসময় নির্দেশ করবেন না। যেন সন্তান এটা মনে না করে যে, বাবা-মা নিজেই নিজের কাজটা ঠিকমতো করেন না।

৩. নিজের সিদ্ধান্ত নিতে দিন

অযাচিত ভাবে সন্তানের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করবেন না। এতে করে সে শিখে ফেলে অন্যের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা দোষের কিছু না। পরবর্তীতে আপনি যখন দুর্বল হবেন তখন আপনার সিদ্ধান্তকেও সে আমলে না নেয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তাছাড়া নিজের ভালো মন্দ বুঝতে হলে সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা বেশি জরুরি।

৪. খেলার সঙ্গী হোন

শিশুর হাতে স্মার্টফোন, গেমস কিংবা বিভিন্ন খেলনা দিয়ে চলে যাবেন না। তারা সঙ্গী চায়। মনে রাখবেন কোমলমতি ও আকারে ছোট হলেও সেও একটা মানুষ। তার হাতে কিছু ধরিয়ে দিলে ঘন্টার পর ঘন্টা এমনিতেই কাটিয়ে দিতে পারবে ব্যাপারটা এমন নয়। তার খেলার সঙ্গী হওয়ার চেষ্টা করুন। নিজে ইচ্ছে করে হেরে যান। তাকেও হারিয়ে দিন। বুঝিয়ে দিন হার-জিত জীবনে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

তোত্তোচান

BUY NOW

৫. শিশুর চলাচলের সীমানা সুনির্দিষ্ট করুন

বিশেষ করে পরিবারের বাইরে শিশুর চলাচলের সীমানা সুনির্দিষ্ট করুন। এবং তা বজায় রাখুন। শিশু কোথায় যায়, কাদের সাথে মেশে এসবের ব্যাপারে অভিভাবকের ভালো ধারণা রাখা জরুরি। সে যেন কোনদিন বন্ধুর বাসায় যাবার নাম করে অন্য কোথাও না যায়, এই মনোভাবটা শুরু থেকেই গড়ে তুলুন।

আরও দুটি বিষয় মনে রাখুন

  • শিশুকে কঠোর শাসনে রাখা এবং অতিরিক্ত স্বাধীনতা দেওয়ার মধ্যে নিরন্তর সমন্বয় রাখা প্রয়োজন। কখনও এই সমন্বয় সম্ভব না হলে কঠোর শাসনের চেয়ে প্রশ্রয় ভালো পদ্ধতি।
  • শিশু অকপটে ও নির্ভয়ে তার কথা বলতে পারে, পারিবারিক সম্পর্ক এবং আবহ সেভাবে তৈরি করুন। তার মানে এই নয় যে শিশুর কোনো নিজস্ব জগৎ থাকবে না। মা-বাবা শিশুর আশ্রয় ও সবচেয়ে কাছের মানুষ।

শৈশবের মানসিক সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতা পর্যাপ্ত পিতামাতার অনুশীলনের উপর নির্ভর করে, যাকে আমরা ‘পজিটিভ প্যারেন্টিং’ বলি। অর্থাৎ যত্ন, স্নেহ, সুরক্ষা, সমৃদ্ধি, ব্যক্তিগত সুরক্ষা এবং অহিংসার দৃষ্টিকোণ থেকে মঙ্গল অর্জন, তাদের স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যত গঠনে যথাযথভাবে উদ্যোগী হওয়া। বেশ কিছু ইতিবাচক অনুশীলন আপনার সন্তানের জন্য শেখার বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। ছোট কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে পজেটিভ প্যারেন্টিং অনুশীলন, আপনার সন্তানের অগ্রযাত্রায় ইতিবাচকভাবে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে।

প্যারেন্টিং সম্পর্কিত নির্বাচিত বইগুলো দেখুন

Zubayer Ibn Kamal

Zubayer Ibn Kamal

For the last half a decade, I have been writing stories, articles, features, and other content in various national level magazines. I am most interested in creative writing. I have read thousands of fiction books in the last few years. I have memorized the book of the last revelation of God. My day goes by reading books and thinking.

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading