খেলনা নাকি বই? শৈশবের শুরুটা কী দিয়ে হবে?

khelna naki boi

একটা সময় ছিল, যখন স্কুলের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে স্কুল কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা তিন গোয়েন্দার বই কিংবা শখের স্ট্যাম্প কেনার প্রতিযোগিতা করতো। এখন প্রেক্ষাপট পুরোপুরি উল্টে গেছে। এখন টাকা জমানোর প্রতিযোগিতা চলে ভিডিও গেমস কিংবা অলিতে-গলিতে সহজলভ্য ম্যাগাজিন আর সিডি কেনার জন্য।

বর্তমানে শিশুদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে মোবাইল ফোন। অনেক শিশুরাই আজকাল মোবাইলে কার্টুন দেখা ছাড়া খাবার খেতে চায় না। অথচ এই কার্টুন তাদের মানসিক গঠনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে মা-বাবাদের সতর্ক থাকা উচিৎ। কারণ শিশুরা এখন সহজেই মোবাইলের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে এবং চাইলেই আধুনিক মোবাইল ব্যবহার করে কুরুচিপূর্ণ বিজ্ঞাপন কিংবা পর্নোগ্রাফির মতো খারাপ ভিডিও পাচ্ছে। এক্ষেত্রে করণীয় কী?

শিশুর জন্মের পর প্রথম আট বছর তার বেড়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রথম তিন বছর অধিক গুরুত্বপূর্ণ তার বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য। এ সময় শিশুর মস্তিস্ক নমনীয় থাকে এবং দ্রুত বিকশিত হয়। শিশুর ভালো ও খারাপ অভিজ্ঞতাগুলো মস্তিস্কের বৃদ্ধির ওপর কড়া প্রভাব ফেলে। তাই এসময় শিশুর জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করার জন্য প্রয়োজন কঠোর সতর্কতা।

শিশুদের বিনোদনের সাথে দু’টি দিক সম্পর্কিত। এক. মানসিক বিকাশ এবং দুই. শারীরিক বিকাশ। সুস্থ শিশু বলতে শুধু শারীরিকভাবে সুস্থ শিশুকেই বোঝায় না; শারীরিক ও মানসিক উভয়ভাবে শিশুকে সুস্থ রাখতে হবে। সাধারণভাবে আমরা শিশুর শারীরিক বিকাশে যতটা মনোযোগ দিই, মানসিক বিকাশে ততটা মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করি না। কিন্তু মানসিকভাবে সুস্থ না হলে শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় করণীয় —

শিশুকে ভিডিও গেম থেকে দূরে রাখা

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিনিয়ত ভিডিও গেম খেললে শরীরে এক ধরণের হরমোন নিঃসরণ হয়। এতে শিশু সব কিছু নিয়েই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। বাবা-মায়ের অবাধ্য হয়ে যায়। মেজাজ খিটমিটে হয়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গেমিংয়ে আসক্ত ব্যক্তি মূলত অন্য সব কিছুর প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। এছাড়া কারো সঙ্গে মিশতে না পারা, ঘুম ও খাওয়া-দাওয়ায় অনিয়ম তো রয়েছেই। তাই আমাদের উচিত শিশুদের এধরণের খেলা থেকে যত দূর সম্ভব দূরে রাখা।

শিশুর জন্য সৃজনশীল খেলনা নির্বাচন

শিশুর পছন্দের তালিকায় প্রথমেই জায়গা করে নেয় খেলনা। শিশুরা সাধারণত খেলনা জিনিস পেলেই বেশি খুশি হয়। খেলনার সাথেই কাটে দিনের সবচেয়ে বেশি সময়। তবে শিশুর জন্য খেলনা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবার আগে ভাবা উচিত শিশুর বয়স কত? ‘শিশুর পছন্দ’ ও ‘বয়স উপযোগী খেলনা’ দুই বিষয়কে মাথায় রেখেই শিশুর জন্য খেলনা নির্বাচন করতে হবে। খেলনা দিয়ে সুন্দর কিছু সময় কাটানো যায়, আর যদি শিক্ষামূলক খেলনা দিতে পারেন তবে খুব ভালো হয়। সাধারণত দেখা যায়, খেলনা জিনিসটি নিয়ে বাচ্চারা কিছুদিন খেলে ভেঙে ফেলে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, অতি সাবধানী বাবা-মা খেলনাটি একটি শোপিসের মতো সাজিয়ে রাখেন, যেন বাচ্চার জন্য ধরতেও মানা। এটা মোটেও ঠিক নয়।

শিশুর খেলনা হতে হবে আবিষ্কারধর্মী, নাটকীয় ও সৃজনশীল। বয়সভেদে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ উপযোগী খেলনা নির্বাচন করতে হবে গুরুত্বের সঙ্গে। ঘরে ও বাইরে দুই জায়গায়ই খেলা যায় এমন খেলনা শিশুর মানসিক বিকাশে বেশি সহায়ক। শিশুকে এমন ধরণের খেলনা দিতে হবে, যা তার বুদ্ধি বিকাশে সাহায্য করে।

শিশুর জন্যে বয়স উপযোগী খেলনা

বয়স উপযোগী খেলনা
০-১ শিশুদের জন্য হাতের আঁকার অনুযায়ী খেলনা গাড়ি বা রঙচঙা বই, ফোম বা প্লাস্টিকের বিল্ডিং সেট কিনে দিতে পারেন। কেনার পূর্বে অবশ্যই খেলনার বয়সসীমা দেখে নিন।

এ বয়সে শিশুকে রঙিন খেলনা তুলে দিলে, রঙের বিষয়ে তার কৌতূহল ও ধারণা জন্মাবে।

১-৩ ধীরে ধীরে শিশু বড় হতে থাকে। এ বয়সে বল, পুতুল, লেগো সেট শিশুর জন্য উপযুক্ত খেলনা। পাশাপাশি শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য রঙ পেন্সিল ও ক্রেয়ন তুলে দিন।

এ বয়সে শিশুদের ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয়।

৩-৫ দলীয় খেলার প্রতি শিশুকে আগ্রহী করে তুলতে এ বয়সে প্লাস্টিকের ক্রিকেট সেট বা ফুটবল দেওয়া উচিত। এর সাথে বিভিন্ন রকম পাজল সেট দেওয়া যায়, যা শিশুর বুদ্ধির বিকাশে ভূমিকা রাখে।

বই পড়ায় উৎসাহী করা

বই জীবনীশক্তি সঞ্চার করে, মনের ক্ষুধা মেটায়, অন্তর্চক্ষু খুলে দেয়। বই শিশু মনের সুপ্ত ভাবনার বিকাশ ঘটাতে সহায়তা করে। জগতের ইতিহাস-ঐতিহ্য, নীতি-আদর্শ, কৃষ্টি-সভ্যতা, সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ তাবৎ জ্ঞান বইয়ের মধ্যে থাকে। বই মানুষের মনকে শীতল রাখে, মস্তিষ্ককে সচল রাখে, সহানুভূতিশীল ও আত্মনির্ভরশীল করে, বিষণ্ণতা দূর করে — আরও কত–কী! বাচ্চাদের জন্য তাই বই হতে পারে সর্বোৎকৃষ্ট উপহার। এক্ষেত্রে শিশুর জন্য এমন বই নির্বাচন করতে হবে, যা তাকে পড়তে উদ্বুদ্ধ করবে এবং নির্মল আনন্দের পাশাপাশি তাকে শিক্ষাও দেবে।

অল্প বয়সের বাচ্চাদের জন্য ছবিসহ গল্পের বই পাওয়া যায়, যেখানে প্রতিটি ছবির সঙ্গে খুব বেশি হলে কয়েকটি শব্দ দিয়ে গল্পটি বোঝানো হয়। বাচ্চারা পড়া শেখার আগেই এ ধরণের বই পেলে ছবি দেখেই গল্প বুঝে যায় এবং পড়া শেখার প্রতি তাদের এক আলাদা আগ্রহ জন্মায়। আর যদি বাচ্চা বড় বয়সের হয়, তবে তাকে মজার গল্প থেকে শুরু করে কুইজ বা বুদ্ধি খাটানোর বই দিতে পারেন। বই বাচ্চাদের আনন্দ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পড়ার অভ্যাস গড়তেও সাহায্য করে। শিশুরা গল্প শুনতে বেশ পছন্দ করে। তাদের বিভিন্ন নবীর গল্প শোনানো যায়। শিশুদের জন্য অনেক সুন্দর সুন্দর বই পাওয়া যায়। গল্পের বই পড়ার মাধ্যমে শিশুর মানসিক বিকাশ সাধন হয় এবং মনের ভাব প্রকাশের ক্ষমতা বাড়ে। এর ফলে শিশুরা জটিল শব্দ ও বাক্য সহজে বুঝতে পারে। এতে যেমন তার পড়ার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়, সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পায় শিশুর বুদ্ধিমত্তা।

  • ছবির বই

ছবি আঁকলে শিশুর বুদ্ধি বাড়ে শীঘ্র। ছবি আঁকা শিশুকে আরও মনোযোগী করে তোলে। শিশু যত ছোট থেকে ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহী হয়, তত বেশি বুদ্ধিমান হয়। ছবি আঁকলে শিশুর ধৈর্যের বিকাশ ঘটে। তাই যে কোনো বিষয়ে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে সে। এছাড়া শিশুর সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়।

একপাশে ছবি, আরেকপাশে সরল টানে তার অনুরূপ একটি আকৃতি। আপনার শিশুটির কাছে রং পেন্সিল বা ওয়াটার কালারের কমতি নেই। সুতরাং, এই আকৃতি সে রাঙিয়ে তুলবে কল্পনা আর সৃষ্টিশীলতার খেলায়। এই শক্তপোক্ত মোটা কাভারের ছবির বইয়ের যে কি শক্তি, তা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। সেটা সন্তানকে নিজের মতো বুঝে নিতে দিন, তার যেমন খুশি আঁকতে কি খেলতে ইচ্ছে হয়, করতে দিন।

  • ছেলেবেলায় আপনার পছন্দের বই

সময় তো বদলাচ্ছে! ‘জেনারেশন গ্যাপ’ বলে যে একটা কথা আছে, সেটাও মানতে দ্বিধা নেই কারো। সুতরাং, আপনার সন্তান আর আপনার পছন্দের মাঝে ফারাক থাকতেই পারে। তবুও কে জানে, ছেলেবেলায় রবিনহুডের কাহিনী পড়ে আপনার হয়তো শেরউড জঙ্গলের রাজা হওয়ার খায়েশ হয়েছিল আর ওদিকে আপনার বীরপুরুষ ছোট্ট ছেলেটিও হয়তো-বা মনে মনে তেমনটিই চায়! আপনার ছেলেবেলায় পড়া পছন্দের বইগুলো তাকে একবার দিয়েই দেখুন, দেখুন তার কেমন লাগে!

  • শিশুর ব্যক্তিত্বের সাথে মানানসই বই

একেক শিশুর চিন্তাভাবনা একেক রকম হয়। কোনো শিশু ছোটবেলা থেকেই বিরাট দার্শনিক, কেউ বা স্পোর্টসম্যান, কেউ বা আপন জগতে এক ছোট্ট রূপকথার রাজকুমারী। তাদের ব্যক্তিত্বের ধরনটা বোঝার চেষ্টা করুন। সেই অনুসারে তাকে বই এনে দিন। অনুসরণ করুন ‘যস্মিন দেশে যদাচার’ তত্ত্ব!

  • কবিতার বই

কবিতা হয়তো আপনার কাছে একঘেয়ে কিংবা অনর্থক হতে পারে, আবার চিন্তাশীল সাহিত্যের অনন্য বহিঃপ্রকাশের একক মাধ্যমও হতে পারে! সে যাই হোক না কেন, কবিতা কিন্তু শিশুদের জন্য খুবই দরকারি। কোন শব্দের সাথে কোন শব্দটা খাপ খায়, ভাষা কীভাবে হয় ছন্দময় — তার শিক্ষা শিশুরা কবিতা থেকেই সবচেয়ে ভালো নিতে পারে। একই সাথে চিন্তার জগতে ডুব দেওয়ার প্রশিক্ষণেও তাদের জন্য কবিতা আর তার ছন্দই সেরা।

  • মননশীল বই

ইন্টারনেটে সবই পাওয়া যায়, কিন্তু ইন্টারনেট কখনোই সবকিছু নয়। একটা শিশুর জন্য তো কখনোই নয়। দুনিয়াটাকে ঠিকঠাক চিনতে, জানতে আর জ্ঞানের বিচিত্র অপার জগত তার সামনে তুলে ধরতে তাকে ইতিহাস, জীবনীর মতো কিছু মননশীল বইয়ের সন্ধান দিন। কে জানে, সেখান থেকেই হয়তো তার আগামীর জীবনটা নির্ধারিত হয়ে যেতে পারে।

  • ডায়েরি

কারো লেখা ডায়েরি নয়, নেহাত ফাঁকা একটা নোটবুক। এই ফাঁকা বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো নিজের মতো করে ঠাসবুনোনির লেখায় পরিপূর্ণ করে তুলবে আপনার সন্তানটি। এই গল্প হবে তার নিজের গল্প, আপন জগতের আখ্যান, নিজেকে ধীরে ধীরে আবিষ্কার করার আর চিনে ওঠার যাত্রা। সুন্দর একটা নোটবুক কিনে দিন আপনার শিশুকে, এটি হতে পারে তার জন্য আপনার সেরা উপহার।

 সর্বোপরি, মনে রাখা উচিত, শিশুরা আসলে দামি জিনিস চায় না, তারা চায় তাদের পছন্দের জিনিস। আর পছন্দের জিনিসটা পেলেই তারা খুশি। তাই আপনার শিশুর জন্য এমন উপহার নির্বাচন করুন যা পেলে সে খুশিও হবে, আবার তা তার কাজেও লাগবে।

শিশুর জন্য উপহার হিসেবে বেছে নিতে পারেন:

প্রতিটি শিশু সোনার মানুষে পরিণত হোক — এ প্রত্যাশা।

শিশুদের জন্য যে বইগুলো আপনি সংগ্রহ করতে পারেন

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading