কৈশোরের টানাপোড়েন এবং বাবা-মায়ের করণীয়

কৈ শো র

কৈশোর জীবনের এক অদ্ভুত সময়। শৈশবের পর পর পৃথিবীটাকে যেন অন্যভাবে চেনা। আর টিনএজ তথা কৈশোরের এই সময়টা শেষ হবার আগেই তারুণ্য আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। সেই সময়টা নিয়ে লিখেছেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। মনে হয় লাখো কিশোর-কিশোরীরের তারুণ্যের যে হাতছানি তা উঠে এসেছে এই কয়েকটা লাইনেই।

আঠারো বছর বয়সে আঘাত আসে
অবিশ্রান্ত; একে একে হয় জড়ো,
এ বয়স কালো লক্ষ দীর্ঘশ্বাসে
এ বয়স কাঁপে বেদনায় থরোথরো।
তবু আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি,
এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে,
বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী
এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে।
এ বয়স জেনো ভীরু, কাপুরুষ নয়
পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে
এ বয়সে তাই নেই কোনো সংশয়-
এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।

যদিও কৈশোর বয়সসীমা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনার সময় চলে এসেছে। এত দিনের প্রতিষ্ঠিত ধারণা অনুযায়ী কৈশোর শুরু হয় ১৩ বছর বয়স থেকে। আর প্রাপ্তবয়সে পদার্পণ ঘটে ১৯ বছর বয়সে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, এই ধারণা পরিবর্তনের সময় চলে এসেছে। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সাময়িকী ল্যানসেট চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডলসেন্ট হেলথ-এ এ-বিষয়ক একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কৈশোর এখন শুরু হয় ১০ বছর বয়সে। আর তা ২৪ বছর বয়স পর্যন্ত স্থায়ী হয়। গবেষণা নিবন্ধটির মূল লেখক অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অবস্থিত রয়্যাল চিলড্রেনস হসপিটালের কিশোর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক সুসান সয়ার। তাঁর মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৈশোরের বয়সসীমা ১০ বছর থেকে ২৪ বছর হওয়াই যুক্তিযুক্ত। তবে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের সমাজবিজ্ঞানী জ্যান ম্যাকভারিশ এই তত্ত্বের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, কিশোর আর তরুণের কাছে সমাজের প্রত্যাশা আলাদা। এ ক্ষেত্রে তাদের সহজাত দৈহিক বৃদ্ধি অগ্রগণ্য নয়। কৈশোর ও বয়ঃসন্ধির এক ধোয়াশা যেন রয়েই যায়।

তবে টিনএজ থাকাকালীন দৈহিক যেসব পরিবর্তন দেখা যায় তা সবার চক্ষুগোচর হলেও মানসিক পরিবর্তনগুলো আড়ালে থেকে যায়। এই সময়টায় দেহের সঙ্গে সঙ্গে মানসিকভাবেও পরিণত হতে দেখা যায়। বয়ঃসন্ধিকালীন সময় তার মধ্যে অন্যতম। বয়ঃসন্ধিকাল ছেলে ও মেয়ে উভয়ের শরীর ও মনে নানা ধরণের পরিবর্তন ঘটে। এ সময়ে ছেলেমেয়েরা যেমন দ্রুত বেড়ে উঠতে থাকে। তেমনি তাদের চিন্তা চেতনায় দেখা দেয় ব্যাপক পরিবর্তন। ইউনিসেফের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা বিবিসির বলছে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩ কোটি ৬০ লাখ ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী। যারা এদেশের মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ। অথচ তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার দিকটি বাংলাদেশে এখনও উপেক্ষিত থেকে গেছে। নিচে আমরা বয়ঃসন্ধী ও কৈশোরকালীন সময়ে ছেলে মেয়েদের শারিরীক ও মানসিক জটিলতা নিয়ে আলোকপাত করবো।

দৈহিক পরিবর্তন

চিকিৎসকদের মতে, মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকাল, ছেলেদের চাইতে কিছুটা আগে শুরু হয়। এ বয়সে মেয়েদের উচ্চতা বাড়ে। শরীরের বিভিন্ন অংশ স্ফীত হয়। মাসিক শুরু হয়। তেমনি ছেলেদের ক্ষেত্রে, এসময় তাদের দেহের উচ্চতা দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে, গলার স্বর ভারি হয়ে আসে, কাঁধ চওড়া হয়, পেশী সুগঠিত হয়। মুখে দাড়ি-গোঁফ ওঠে। এই সময়ে ছেলেরা একটু বেশি ঘামে। বয়ঃসন্ধির এই সময়টা ছেলে মেয়ে উভয়ের প্রজনন ক্ষমতা বিকাশ হতে থাকে বলে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ হয়।

মানসিক টানাপোড়েন

এই সময়টায় বিশেষ ভাবে মনস্তাত্বিক পরিবর্তন হয়ে থাকে। সত্যিকার অর্থে কৈশোরকালীন এই সময় থেকে ছেলে-মেয়েদের আত্মপরিচয় গড়ে উঠতে শুরু করে। আত্মপরিচয় বলতে তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা তৈরি হয়। তার কী পছন্দ-অপছন্দ, সে কী চায়। এছাড়া নিজের জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম সম্পর্কে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। এবং তারা পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন মানুষ হিসেবে জীবনের এই পর্যায়ে আত্মপ্রকাশ করে।

বয়ঃসন্ধিকাল
BUY NOW

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার একটি সাক্ষাতকারে প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘শৈশবে তারা যেমন মা বাবা যা বলতো তাই করতো, তাই ভাবতো। কিন্তু এই সময়ে তারা স্বাধীনভাবে সবকিছু ভাবতে শুরু করে। সে কী পরবে, কী খাবে, কাদের সাথে মিশবে সেটা সে নিজে সিদ্ধান্ত নেয়। যা তার পরিবারের থেকে আলাদা হতে পারে। এজন্য বাবা মায়ের সাথে তাদের দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। ভালমন্দের একটা কনসেপ্ট তৈরি হয়, যদিও সেটাকে খুব পরিপক্ব বলা যাবে না।‘

নিজেদের শারীরিক পরিবর্তনও কিশোর-কিশোরীদের অন্তর্মুখী করে তোলে। তাই টিনএজ বা কৈশোরকালীন সময়ে কখনও তৈরি হয় বয়ঃসন্ধিকালের সংকট বা অ্যাডোলেসেন্ট ক্রাইসিস। রবীন্দ্রনাথ এদের নিয়েই লিখেছিলেন-

‘তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। শোভাও নাই, কোনো কাজেও লাগে না। স্নেহও উদ্রেক করে না, তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে। তাহার মুখে আধো-আধো কথাও ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্রগল্ভতা। …শৈশব এবং যৌবনের অনেক দোষ মাপ করা যায়, কিন্তু এই সময়ের কোনো স্বাভাবিক অনিবার্য ত্রুটিও যেন অসহ্য বোধ হয়।’

তবে ভাবার ব্যাপার হলো, বাবা-মায়েরা বেশিরভাগ সময় সন্তানের শারীরিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন। দৈনন্দিন পরিচ্ছন্নতা, অসুখ-বিসুখ নিয়ে তারা ভাবেন। সময়মতো ব্যবস্থা নেন। কিন্তু বেশিরভাগ সময় তারা সন্তানের মনের সমস্যাগুলো সহজে চিহ্নিত করতে পারেন না। অনেক সময় সামাজিক সংস্কারের কারণে মানতে চান না যে তাদের সন্তানের মনের রোগ হয়েছে। বিষয়টি লুকিয়ে রেখে সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তোলেন তারা। শরীরে কোনো রোগ না থাকলেও শারীরিক সুস্থতার জন্য যেমন প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করতে হয়, গোসল করতে হয়, সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হয়; তেমনি মনের সুস্থতার জন্য নিয়মিত মনের যত্ন নিতে হয়, মনকে তার ‘খাদ্য’ দিতে হয়, মনের ‘ব্যায়াম’ করতে হয় আর মনের জন্য ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে দূরে থাকতে হয়।

যদি বিপথে যায়?

এই সময়ে যেহেতু ছেলে মেয়েরা নিজেদেরকে স্বাধীনচেতা ভাবতে শুরু করে এবং আত্মপরিচয়ে বাড়তে চায়, তাই স্বাভাবিকভাবেই শৈশব থেকে চলে আসা নিয়ম ভঙ্গ হতে শুরু করে। এবং বাবা-মায়েদের কাছে মনে হয় ছেলে-মেয়ে তাদের নিজেদের ভালোটাই বুঝতে পারছে না। অপরদিকে কিশোর বা কিশোরী ভাবতে থাকে বাবা-মা তাদের নিজেদের খায়েশ সন্তানের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে এবং সন্তানের কোন ইচ্ছা তাদের কাছে গ্রহনযোগ্য হচ্ছে না। এই উভয়মুখী দ্বন্দ্বের কারণে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়, তাতে করে অনেক সময় কিশোর বয়সী ছেলে-মেয়েদের বিপথে যাবার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়।

বয়ঃসন্ধিতে থাকা ছেলে মেয়েরা ভীষণ কৌতূহলপ্রবণ হওয়ায় অনেক সময় তাদের বিপথগামী হওয়ার, মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়া, অযাচিত ঝুঁকি নেয়া বা অপসংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সেক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে। আবার এই বয়সটায় স্বাধীন আত্মপরিচয় গড়ে ওঠায় তারা সব কিছু নিয়ে ভীষণ সংবেদনশীল থাকে। তাই তাদের সঠিক পথে রাখতে পরিবারকে কৌশলী ভূমিকা রাখা দরকার।

কৈশোর বয়সে সন্তানের টানাপোড়েনে বাবা-মায়েদের কৌশলী ভূমিক পালন করার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরী। আমাদের সমাজে অনেক পিতা-মাতাই সেসময় কৌশলী না হওয়ায় সন্তান বিপথে চলে যায়। কিংবা বিপথে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা যায় না। মনে রাখবেন, মানসিক ভাবে তার পরিবর্তনের ফলে ছেলে-মেয়েরা তখন প্রচন্ড সংবেদনশীল হয়ে পরে। তাই আপনার সাধারণ একটি সিদ্ধান্ত বেশ জোড়ালোভাবে তার জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

ছবিঃ অন্তর্জাল

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার কৈশোরের টানাপোড়েনে ছেলে-মেয়েদের বিপথে যাওয়া থেকে রুখতে বাবা-মায়েদের বিশেষ কিছু করণীয় সম্পর্কে বলেছেন-

১. এক্ষেত্রে সন্তানের সাথে তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হওয়া বা কোনভাবেই গায়ে হাত তোলা যাবে না। এছাড়া তুলনা করা, ছোট করে কথা বলা যাবে না।

২. কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা যা বলবে তাই মেনে নিতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার কৌশলী হতে হবে।

৩. সন্তানের পছন্দ, অপছন্দের প্রতি সম্মান জানিয়ে সেটা বুঝিয়ে বলতে হবে। যেন তার আত্মসম্মানে আঘাত না আসে। আবার ভাল-মন্দের ব্যবধানটাও বোঝানো যায়।

৪. কিশোর বয়সী ছেলে মেয়েদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকতা হবে। এতে করে বোঝাপোড়া ভালো থাকবে।

৫. সন্তানদের একটু একটু করে ছাড়তে হবে। শিশুদের মতো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তার ব্যাগ চেক করা, মোবাইল চেক করা, ডায়রি খুলে পড়া এসব করা যাবে না। বন্ধুবান্ধবের ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্য করা যাবে না। তবে তারা কী করছে, কাদের সাথে মিশছে সেটা অন্যভাবে খেয়াল রাখতে হবে। না হলে তারা বাবা মার প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার জায়গাটা হারিয়ে ফেলবে।

বয়সন্ধীকালে করণীয় বিষয় সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

 

Zubayer Ibn Kamal

Zubayer Ibn Kamal

For the last half a decade, I have been writing stories, articles, features, and other content in various national level magazines. I am most interested in creative writing. I have read thousands of fiction books in the last few years. I have memorized the book of the last revelation of God. My day goes by reading books and thinking.

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading