প্রবাসে করোনা কালের দিনলিপি-০১

c1_1921932

ভয়াবহ এক সময়। সারাক্ষণ আতঙ্ক, তটস্ত। কিছুক্ষণ পর পর গলা খাকড়ানি দিয়ে দেখি গলায় ব্যাথা আছে কিনা। কপালে হাত দিয়ে বুঝার চেষ্টা এই বুঝি জ্বল চলে এলো। আজব এক যন্ত্রণা মনকে অস্তির করে তুললো।

এখন কারণে অকারণে লবন আদা লেবুযোগে গরম জল আর চা কফি পানের মাত্রা বেড়ে গেছে। গত এক মাসে যে পরিমাণ পাণীয় হজম করেছি তা স্বাভাবিক সময়ে দুই তিন বছরে চলে যেত। কারণটা সহজ, সুস্থ থাকার প্রয়াস। আরো খোলাসা করে বললে বেঁচে থেকে সুন্দর ধরণীতে শ্বাস নেবার স্বার্থপরতা। আহারে মানুষ, জীবনকে কতইনা ভালবাসে। জনম জনম বেঁচে থাকার কতই না আকুতি। আত্মহননের কোন ঘটনা শুনলে কথাগুলো বিড়বিড় করে আউড়াই আমি। আরো বেড়ে যায় জীবনের প্রতি মমতা। এমনিতেই আমি নিজেকে বড্ড স্বার্থপরের মতো ভালিবাসি। নিজেকে ভালবাসতে কোন ফিলোসফি লাগে না। জীবন আমার যেন সরল সমীকরণ, জটিল বা দ্বিঘাত সমীকরণ না।

ব্যাংককে একা থাকি আমি। কাজ করি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায়। দুই সন্তান নিয়ে ঢাকায় থাকেন স্ত্রী। কিছু ভাববার আগেই ঢাকা ব্যাংকক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেল। সেই সাথে থাইল্যান্ডের বাইরে ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা এলো। মোটকথা নিজ দেশে স্ত্রী পরিজনের কাছে যাবার সব রাস্তাই আটকে গেল। আপাতত ব্যাংককে বন্দি জীবন। ব্যাংকক ছেড়ে এমনকি থাইল্যান্ডেরই অন্য কোন শহরে যাওয়া যাবে না। কর্তৃপক্ষের কড়া আদেশ। অমান্য করার সাদ্যি নেই। আইনে ভয় পাই। আইনের যেন বাধ্য ছাত্র আমি।

দেশে না যেতে পেরে প্রথম দিকে খারাপ লাগতো। এখন লাগে না। আমার মতো আরো অনেক প্রবাসী ভাই বোনদের কথা ভাবি। ওদের অনেকেই কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। চাকুরি নেই, বেতন নেই, দেশে টাকা পাঠাতে পারছে না। আরো কত না কষ্টে আছে প্রবাসীরা। আমার চাকুরি বা বেতনে সমস্যা নেই। ভাবি দেশে যেয়েই বা কি হবে। মাস শেষে ডলার দেশে পাঠাই। দেশের উন্নয়নে অবদান রাখি। দেশের জন্য এতটুকু কষ্ট তো সহ্য করা যায়। মার্চ মাস, স্বাধীনতার মাস। করোনা ভীতির মধ্যে যারা যারা বুকের রক্ত দিয়ে দেশটা স্বাধীন করলো, তাদের প্রতি বিনম্র শ্র্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে।

কষ্টটা অন্য জায়গায়। দেখছি অনেক রেমিটেন্স যোদ্ধাদের যৌক্তিক কারণ ছাড়া করোনার বাহক হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে, অপবাদ দেয়া হচ্ছে, অপদস্ত হতে হচ্ছে, এমনকি নিজের আপনজনও দূরে সরে যাচ্ছে। মনটা বিষন্নতায় ভরে যায়। স্ত্রী সন্তাদের দূরে রেখে এরা একাকী জীবনের বড় অংশ বিদেশে কাটাচ্ছে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের উন্নয়ন কাজ করছে। অথচ সোস্যাল মিডিয়াতে এসব রেমিটেন্স যোদ্ধাদের ছোট করার কিছু লোক লেগেই আছে। কেউ কেউ আবার ফেসবুকে লাইভে এসে প্রবাসীদের গালি দিয়ে মজা পাচ্ছে, করোনাকালীন বিনোদন বলতে পারেন। কিন্তু যাদেরকে ছোট করা হচ্ছে তারা এর কষ্ট বুঝতে পারেন।

ব্যাংককে আমার করোনাকালীন টেনশনের আরেকটা বড় কারণ ছিল। ছিল বললে ভুল হবে, এখনও আছে। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখি এনিয়ে। কথাটা নিজের স্ত্রীকেও বলেনি, টেনশন করবে বলে। উনি নিজেকে নিয়ে যতটা না টেনশন করেন, তার থেকে বেশি টেনশন আমাকে নিয়ে।

মার্চ মাসের ১ থেকে ৫ তারিখ পযর্ন্ত হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট আর তুরষ্কের ইস্তাম্বুল শহর ভ্রমণ করেছি। আনন্দ ভ্রমণ নয়, অফিসের দায়িত্ব পালনে সেখানে যাওয়া। তখনও থাইল্যান্ড, হাঙ্গেরি বা তুরষ্কে করোনা সেভাবে জেকে বসেনি। তবুও সতর্ক থেকেছি, মাস্ক পরেছি, হ্যান্ডসেক করেনি, অন্যদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। ঐ যে কথায় বলে সাবধানের মার নাই।

ছয় মার্চ তারিখে অফিস শুরু করলাম। চীন বা কোরিয়ে থেকে ফেরৎ আসলে অফিস আমাকে হোম কায়ারিন্টেনে পাঠাতো চৌদ্দ দিনের। হাঙ্গেরি আর তুরষ্ক ভ্রমণ করেছি বিধায় কোয়ারিন্টিনে থাকার সুযোগ হলো না। ব্যাংককের ডাউন টাউন সাথোনে আমার অফিস। অফিসে নিজের রুমে তবুও এক রকম সেল্প কোয়োরেন্টিন শুরু করলাম। সকাল নয় টায় ঢুকে ঠিক বিকেল পাঁচ টায় বের হয়ে আসি। আশে পাশে তাকাই না, পারত পক্ষে কারো সাথে কথাও বলি না। মিটিংগুলোতেও নানা অজুতে যোগ দেই না। লাঞ্চের প্যাকেটও সাথে নিয়ে আসি যাতে দুপুরে বের হতে না হয়। আমার অস্বাভাবিক আচরণে সহকর্মীরা একটু বিস্মিত হল। তাদের কেউ আবার গবেষণা শুরু করলো এরকম একটা সামাজিক মানুষ কেন হঠাৎ করে অসামাজিক হয়ে গেল!

ছয় মার্চ থেকে চৌদ্দ দিনের কাউন্ট ডাউন শুরু করে দিলাম। আমার স্ব-আরোপিত কোয়ারিন্টিন চলতে থাকলো। বিশ মার্চ আমি মুক্তি পাবো। আমার এক একটা দিন যেন এক মাসের সমান মনে হতে থাকলো। প্রতিদিন রাতে শোয়ার আগে ক্যালেন্ডারে এক একটি তারিখ কাটতে থাকলাম। স্বাভাবিক খাওয়া দাওয়া কমে গেল। কমলো ওজনও। সেই সাথে বার বার গলা আর কপালে হাত বোলানার বাতিকও বাড়তে থাকলো। সকালে উঠেই মনে হয় শরীরে জ্বর, আর গলা খুশ খুশ ভাব। যথারীতি শুরু হয় গরম জল থেরাপি। অদেখা অজানা করোনার কারণে পুরো জীবন যাত্রাই বদলে যেতে লাগলো।

বাসার পাশে সোয়ান ফ্লু স্ট্রিটের ফার্মেসি থেকে প্যানাডল আর থার্মোমিটার কিনে ফেললাম। সেই সাত সকালে দোকান খোলার সাথে সাথে। প্যানাডল আর থার্মোমিটার চাইতেই দোকানদার ভদ্র মহিলা আমার দিকে সন্দেহের দিকে তাকালেন। ভাবলেন আমি করোনা সন্দেহ একজন। দোকানে ঢুকতে পারলাম না। বাইরে থেকে প্যানাডল আর থার্মোমিটার নিয়ে বাসায় চলে আসলাম। মনে হলো আমি এক ধরনের করোনা রেসিজমের শিকার হয়েছি।

শুরু হলো জ্বর মাপার আরেক বাতিক। এনালগ থার্মোমিটার পড়তে কষ্ট হয়। এলোমেলো রিডিং আসে। হৃদকম্পন বেড়ে যায়। দৌঁড়ে গেলাম আবার ফার্মেসিতে। এবার কিনলাম উচ্চ দামে ডিজিটাল থার্মোমিটার। দামে কি আসে যায়, বেঁচে থাকাই বড় বিষয়, তাই দুই হাজার থাই বাথ নস্যি মনে হলো।

এর আগে কখনও ডিজিটাল থার্মোমিটার ব্যবহার করেনি। প্রতিবার ব্যবহারের সময় মনে হয় নিজেই নিজের কপালে শ্যূট করছি। তাপমাত্রা মাপার এ অদ্ভূত টেকনিকে আমার বেশ মজাই লাগছে। বার বার নিজের কপালে শ্যুট করছি। মাঝে মধ্যে কারণ ছাড়াই। আমার মনে হলে আমি এ ধরনের মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। চাপ সহ্যের বাইরে গেলে কি পাগল হয়ে যাবো? আমার স্ত্রী বাচ্চার কি হবে? বন্ধু, বান্ধব, ওদের সাথে কি আর দেখা হবে না? কিসব অদ্ভূত প্রশ্ন মনের মধ্যে বাসা বাঁধতে থাকলো।

এক সপ্তাহ পরে থাইল্যান্ডে করোনা চিত্র দ্রুত বদলাতে থাকলো বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই। সনাক্ত রোগির সংখ্যা বাড়তে লাগলো। ১২ মার্চ অফিসে কানঘুষা শুনলাম ব্যাংকক লক ডাউন হবে। আমি খুব একটা কর্ণপাত করলাম না। ঐ দিন অফিস শেষ করার ঠিক আগের মুহূর্তে আমার জার্মান সহকর্মী স্ভেন লিন্ডবার শশব্যস্ত হয়ে আমার রুমে ঢুকলো। সে লক ডাউনের খবর বিশ্বাস করেছে। জার্মান নেভাল ফোর্সের এই অফিসার দুনিয়ার সব রাখে, তবে বিশ্বাস করে না। কিন্তু স্ভে লক ডাউনের খবর সত্য মনে করছে।

-চলবে-

Ali Reza

Ali Reza

I have been working as a Programme Coordinator of the Regional Support Office (RSO) of the Bali Process. I achieved master’s degree in Development Studies from University of Melbourne, Australia and currently pursuing his Ph.D on social aspects of labour migration. Earlier I completed both my Bachelor (with Honours) and master’s degree in Applied Physics and Electronics from University of Dhaka, Bangladesh. I also attended a number short courses/training on Policy and Planning, Financial and Project Management in Singapore, India, South Korea, Thailand and United Kingdom. Since 1998, I have been working extensively in the public-sector Planning and Development under Ministry of Planning of the Govt. of Bangladesh. I got a wide range of experience in the field of project development, implementation and monitoring. The major areas of my interest of work are migration, remittance, social protection, reintegration, human security, skill development, etc. I was also closely involved in designing and implementing projects on migration sectors in Bangladesh with the technical and financial supports from World Bank, UN-Women, IOM, ADB, IDB and ILO. I have also published a number of books on Computer, travelogues. I am contributing articles in different journals and dailies. I am a regular contributor to monthly Computer Jagat.

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading