“মানুষই মানুষের গা ঘেঁসিয়া বসিয়া থাকে” – আহমাদ মোস্তফা কামালের পাঠ প্রতিক্রিয়ায় হাসান আজিজুল হক

Azizul Haque
হাসান আজিজুল হকের খুব ভিন্ন ধরনের একটি গল্প ‘সাক্ষাৎকার’। নানা সময়ে গল্পটি ফিরে ফিরে পড়ি আমি। যে ‘লোকটা গত শতাব্দীর কায়দামাফিক সূর্যাস্ত দেখছিল’ আর ‘তার চোখে ফুটে উঠেছিল তন্ময় কল্পনা’ তাকে ধরে নিয়ে যায় কতিপয় অচেনা লোক, তাকে ‘রহমান সাহেব’ সম্বোধনে শুরু হয় জেরা, যদিও তার নাম রহমান নয়, হুমায়ুন কাদির। তারা ঠিক কী জানতে চায় পুরো গল্পে তা পরিষ্কার হয় না, বোঝা যায় তারা তার কাছ থেকে একটি স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করছে, কিন্তু কিসের স্বীকারোক্তি তা-ও বোঝা যায় না, বরং তাদের মুখে শোনা যায়-
বুঝতে পারছি আপনি কিছুই স্বীকার করতে চান না। তাতে কিছুই এসে যায় না অবিশ্যি। কারণ আমরা সবই জানি কাজেই আর কিছু জানার নেই। কারণ আমরা কিছুই জানি না অতএব আর কিছুই জানার নেই।
বইটি দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন
এরকম পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা আর রহস্যময় আচার আচরণ পাঠককে বিমূঢ় করে তোলে। মনে হয়, যেন কোনো অ্যাবসার্ড নাটকের মহড়া চলছে (গল্পটি লেখাও হয়েছে অ্যাবসার্ড নাটকের ফর্মে)। পারম্পর্যহীন কথাবার্তার আরেকটি উদাহরণ দিই –
আমরা নিজেরা নিজেরা একতা আইন-শৃঙ্খলা, দাঁড়িয়ে বসে বা মাটিতে শুয়ে যদি তা কোনোদিন দেখিয়ে দিতে পারি একসঙ্গে একসঙ্গে যে যেখানে আছে ঠিকঠাক পরিকল্পনা ঘাসে ভিটামিন জনকল্যাণ বন্যা প্লাবন মহামারী বাঁধ দাও লবণ ঠেকাও যতোরকম চালবাজি রকবাজি ঠকবাজি নিলামবাজি জোতদারি মুনাফাখোরি খুন জখম রাহাজানি ভাবনাচিন্তা জাতীয় প্রেস দুই আর দুইয়ে চার আর সাতে ষোলো যার ফলে ছেষট্টি মোট নিশো তেত্রিশ কোটি দেশী বিদেশী চাল গম আটা সব মিলিয়ে সব।
হুমায়ুন কাদির এসব কথাবার্তা-জিজ্ঞাসাবাদ-আচার-আচরণ কোনোকিছুরই অর্থ উদ্ধার করতে পারে না, পারি না আমরাও। অবশেষে অজানা অপরাধে হুমায়ুন কাদিরের মৃত্যুদণ্ড হয়, এবং দণ্ড কার্যকর করার আগে তাকে দুমিনিট ভাববার সুযোগ দিলে সে ভাবে-
অনেককাল আগে একবার সবুজ ঘাসের মধ্যে শুইয়া আকাশের দিকে চাহিয়াছিলাম। উহার এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্ত দেখা গিয়াছিলো, উহা হালকা নীল ছিলো। পরে উহা চুম্বনের দাগের মতো মিলাইয়া যায়। ইহার পর মানুষের জগতে ফিরিয়া আসি – তাহাতে নোনা টক গন্ধ আছে এবং আক্রোশ ও ঘৃণা রহিয়াছে এবং ভালোবাসা ও মমতা রহিয়াছে। মানুষের জীবনে কোথায় অন্ধকার তাহার সন্ধান করিতে গিয়া আমি ঘন নীল একটি ট্যাবলেটের সন্ধান পাই – মানুষ যে সামাজিক, সে নিজের ইতিহাস জানিতে চাহিয়াছে, তাহাতে সর্বদাই অন্ধকার নর্তনকুর্দন করিতেছে। তবু আমি মানুষেরই কাছে প্রার্থনা জানাইব – কারণ মানুষেই মানুষের গা ঘেঁসিয়া বসিয়া থাকে – যদিও ওই দাগ দেখা যায় না। অসংখ্যবার সঙ্গম করিয়াও যেমন আমি নারীতে ঐ দাগ কখনো দেখি নাই। কোথাও কিছু পাই না বলিয়াই বাধ্য হইয়া আমি শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই প্রার্থনা ও আবেদন জানাইব। ইতিমধ্যে সব কিছু চমৎকার ঘটিয়াছে। অবশ্য অনেক কিছুই বাকিও রহিয়া গেল কারণ কিছুই শেষ হইবার নহে।
আমরা যে অ্যাবসার্ডিটির ভেতরে বাস করি, বিনা কারণে, অজানা অপরাধে আমাদের মৃত্যুদণ্ড হয়ে যায়, আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয় কিন্তু আমরা বুঝেই উঠতে পারি না যে, আমাদের কাছে আসলে কী জানতে চাওয়া হচ্ছে – তার একটি প্রতীকি উপস্থাপন রয়েছে এই গল্পে।
তবে সান্ত্বনা ওটুকুই – যা কিছুই ঘটুক না কেন, মৃত্যুমুহূর্তেও আমরা মানুষের কাছেই প্রার্থনা ও আবেদন জানাবো, কারণ মানুষই মানুষের সর্বশেষ আশ্রয়! কারণ ‘মানুষই মানুষের গা ঘেঁসিয়া বসিয়া থাকে!’

এক নজরে আহমেদ মোস্তফা কামাল। যাবতীয় বৈষয়িক সাফল্যের সম্ভাবনাকে নাকচ করে যিনি কেবল লেখালেখিকেই জীবনের সব স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছেন তিনি। পেশাগত জীবনের শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। বর্তমানে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। লেখালেখির শুরু নব্বই দশকের গোড়া থেকেই। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘দ্বিতীয় মানুষ’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। রকমারি ডট কম-এ দেখুন আহমাদ মোস্তফা কামালের রকমারি ডট কম- বেস্ট সেলার সকল বই।
রকমারি ব্লগ

রকমারি ব্লগ

Published 07 Nov 2018
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png