ড্যামকেয়ার তাজউদ্দিন আহমদ

তাজউদ্দিন আহমদ

“ প্রয়োজন ও সুবিধার দিকে সঙ্গতি থাকলে বিদেশী পুঁজিকে স্বাগত জানানো হবে, তবে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা ও পরিকল্পনা তৈরি করবে এ দেশের লোকেরা। পুঁজি বিনিয়োগের বদলে আমরা কোন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চাই না। ”

মনে হচ্ছে না কোন এক উন্নত দেশের ঝানু এক অর্থনীতিবিদের বাণী!  দু লাইনেই বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার ও সাধারণ জনগণের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীকেও সতর্ক করে দেয়া

পড়তে পারেন ড. মোঃ কামাল হোসেন এর লেখা ‘তাজউদ্দিন আহমদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা‘ বইটি !

যে এই দেশের উন্নয়ন করতে আসলে তাদেরও উন্নতি হবে কিন্তু ভিন্ন কোন উদ্দেশ্য থাকলে বরদাশত করা হবে না।  এরকম বক্তব্য তো সচ্ছল কোন দেশের পোড় খাওয়া কোন অর্থনীতিবিদই বলতে পারেন। না…আপনার ধারণা ভুল।  এই ড্যাম কেয়ার বক্তব্য দেয়া ড্যাম কেয়ার লোকটি তখন সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া একটি ড্যাম কেয়ার দেশের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন। বিশ্বব্যাংককে তুচ্ছ জ্ঞান করা তাজউদ্দিনের ভিশন খুব ক্লিয়ার ছিল। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিজের পায়ে দাঁড় করাতে চান। নয় মাসের একটি যুদ্ধ কেবল রক্তই নেয় নি, একটি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও ভঙ্গুর করে দিয়েছিল।  কিন্তু নয় মাসে যা ভাঙ্গে সেটি জোড়া তো আর নয় মাসে লাগে না। তিনি খুব দ্রুতই বুঝতে পারলেন যে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা তার নিতেই হবে। এই ড্যাম কেয়ার লোকটি বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন সভাপতি রবার্ট ম্যাকনম্যারার কাছ থেকে যতটুকু সুবিধা নেয়া সম্ভব নিয়ে রাখলেন। রবার্টও তাঁর বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে ক্লিয়ার ভিশন আর ড্যাম কেয়ার ভাব দেখে বলেই ফেললেন- Tajuddin Ahmed is the best finance minister I have ever seen”

ছবি সত্ত্বঃ এগিয়ে চলো

আরেকটু পিছিয়ে যাই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হবার পর তাজউদ্দীন আহমেদ ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দেন দুরুদুরু বুকে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে সংগঠিত হবার জন্য, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ও অস্ত্র সরবরাহের সাহায্য চাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ যান ভারতে। কিন্তু সেখানে প্রাথমিকভাবে আশ্বাস আর সমবেদনা ছাড়া কিছু না পাওয়ায় স্বাধীন দেশের সরকার ঘোষণার প্রয়োজন অনুভব করেন তিনি। এরপর তিনি দেশে এসে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার ঘোষণা করেন এবং আবার আমীরুল হোসেনকে  নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে যান। ড্যাম কেয়ার তাজউদ্দিন এবার বিনা প্রোটোকলে ভারতে প্রবেশ করবেন না বলে জানিয়ে দেন। একটি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিবেশী দেশের আমন্ত্রণ ও প্রোটোকল ছাড়া সে দেশে প্রবেশ করা তাঁর দেশের জন্য অসম্মানজনক হবে বলে তিনি জানিয়ে দেন। এরপর ভারতীয় বাহিনী তাকে ‘গার্ড অফ অনার’ দিয়ে ভারতে নিয়ে যায়।

পড়তে পারেন ‘মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক তাজউদ্দিন আহমদ‘ বইটি

রবার্টও তাঁর বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে ক্লিয়ার ভিশন আর ড্যাম কেয়ার ভাব দেখে বলেই ফেললেন- Tajuddin Ahmed is the best finance minister I have ever seen”

এবার অনেকখানি এগিয়ে যাই।
রিসালাদার মোসলেম তার দলকে নিয়ে কারাগার থেকে বের হচ্ছিলেন।  মাত্রই চার নেতাকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়েছে।  হঠাৎ তিনি শুনতে পেলেন ভেতর থেকে কে যেন মৃদু স্বরে পানি চাচ্ছে। তিনি ভেতরে ঢুকে দেখলেন তাজউদ্দিন আহমেদ তখনো জীবিত, ব্রাশফায়ারের গুলি তাকে কাবু করতে পারে নি বরং তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিয়েছে।  ড্যামকেয়ার তাজউদ্দিন শত্রুর কাছে পানি চাচ্ছেন, জানিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন তাঁর তৃষ্ণার কথা, পানি অথবা স্বাধীন-সুন্দর বাংলাদেশ দেখার।  বেয়নেটের খোঁচায় যখন তাঁর মৃত্যু হয় তখন থেকে প্রতিটি বাঙালি কেন তৃষিত হল না সেটাই আফসোস।  প্রতিটি বাঙালি কেন ড্যাম কেয়ার হল না সেটাই আফসোস।

পড়তে পারেন মুনতাসীর মামুন এর লেখা ‘তাজউদ্দিন আহমদ: এক তরুণের রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা (হার্ডকভার)‘ বইটি !

 

আরও পড়ুনঃ 

কিংবদন্তী জহির রায়হানের আত্মকাহিনী ও একটি অপমৃত্যু !

জাহানারা ইমাম – এক শহীদ জননীর গল্প !

একরোখা আহমদ ছফা’র ৭ টি সাহসী ঘটনা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বিখ্যাতদের চোখে যেমন ছিলেন!

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png