বাবাকে নিয়ে লেখা- শামীম আহমেদ

Baba K Niye_Shamim

………………………………

আমাদের বাবারা

এক

আমরা তখন খুলনায় থাকি। সোনাডাঙ্গা, খালিশপুর, বয়রা। বাসা ভাড়া, স্কুলের দূরত্ব – নানা হিসেব কষে বসবাস। আমার বয়স কত হবে, হয়ত ৭-৮ বছর। তখন স্কুলে যাই। আব্বা সরকারি কর্মকর্তা। সারাদিন অফিস করে বাসায় আসেন। আমি ছোট কাল থেকেই খানিকটা রাগি রাগি, ‘ঘাড়-ত্যাড়া’ যাকে বলে! আব্বা কোন কারণে বকা দিলে রাগ করে ঘাড় বাঁকা করে আব্বার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। যতই ধমক দিক চোখ আর সরাই না! এত বড় সরকারি কর্মকর্তা, সবাই তার ভয়ে তটস্থ; অথচ এত ছোট ছেলে তার কথা শোনে না, বড়ই চিন্তাযুক্ত বিষয়। আব্বা একটা প্রস্তাব দিলেন। আমরা প্রতি সপ্তাহে নিউ মার্কেটে যাই বাজার করতে। আমি যদি এখন থেকে নিয়মিত আব্বার কথা শুনি, চোখে চোখ রেখে তর্ক না করি তবে প্রতিবার নিউ মার্কেটে গেলেই আমাকে একটা করে রসগোল্লা খেতে দেয়া হবে আর কিনে দেয়া হবে একাধিক দেশ-বিদেশের ডাক-টিকিট। আমি প্রস্তাবে রাজি হলাম, আমাদের আপাত যুদ্ধের সাময়িক অবসান।

দুই

আব্বা আর আমি একদিন নিউ মার্কেটে বাজার করতে যাচ্ছি। রিমুদের বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছে আমাদের রিকশা। রিমু আমার সাথে পড়ে, খুলনার সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী-পুত্র। বিরাট এলাকাজুড়ে তাদের বাড়ি, একটু পর পর বাড়ির পাশের রাস্তায় গতিরোধক। হঠাৎ করেই গতিরোধকের ওইদিকে একটা গাড়ি থেমে গেলে আমাদের রিকশাওয়ালাও জোরে ব্রেক করে, আমি আর আব্বার প্রায় ছিটকে পড়ার দশা।

বাসায় ফিরলাম। সেদিন রাত থেকে আব্বার কোমরে ব্যথা। তারপরের দিন বাগেরহাটসহ আরও ৩/৪টা জেলা সফরে বের হলেন। সাতদিন পর যখন ফিরলেন তখন পুরা বিছানায় পড়লেন, নড়াচড়া করতে পারেন না। একমাস এই অবস্থা চলার পর ঢাকায় এসে ডাঃ রশিদ সাহেবকে দেখালে তিনি বললেন কোমরে মেজর অপারেশন করতে হবে, সুস্থতা নিশ্চিত নয়। আমাকে আর আমার বোনকে ফেনীর নানাবাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হলো। আব্বার অপারেশনের একমাস পর আমরা খুলনায় ফিরলাম।

আব্বা তখন প্রচন্ড হতাশাগ্রস্থ অবস্থায় সরকারি গাড়ির সামনের সিট পুরো হেলিয়ে তাতে চড়ে অফিসে যান, অফিসের সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপর বিছানা পেতে বালিশে শুয়ে অফিস করেন। আমরা তখন বিভ্রান্ত, বাবাকে আর ফিরে পাবো? অনিশ্চিত ভবিষ্যত। পুরো খুলনা শহরে আব্বাকে চিনে গেছে; আব্বাকে দেখলেই বলত “ওই যে ‘শুয়ে শুয়ে আংকেল’ অফিসে যায়”। বহুবছর ধরে ধীরে ধীরে আব্বা মোটামুটি সুস্থ হয়ে ওঠেন। আমাদের সেইসব দিন, ছায়ার মতো আমাদের সঙ্গী হয়ে থাকে।

তিন

আব্বা প্রতি শুক্রবার আমার আর বোনের পরীক্ষা নিতেন। জুম্মায় যাবার আগে প্রশ্নপত্র তৈরি করে আম্মার কাছে রেখে যেতেন। নামাজ শেষে দুপুরের খাবার শেষ করে আমাদের তিন ঘন্টার পরীক্ষা। দুইটা থেকে পাঁচটা। পরীক্ষা শেষে মূল্যায়ন। পরীক্ষায় শতকরা নব্বই শতাংশ নম্বর পেলে পাস, অর্থাৎ পরবর্তী একসপ্তাহ বন্ধুদের সাথে খেলার অনুমতি, নাহলে বন্ধ। আমার চাইতেও আমার বন্ধুরা থাকত উৎকণ্ঠিত, পরীক্ষায় নব্বই পেয়েছি তো? এই কড়া নিয়ম-কানুনে আমাদের বেড়ে ওঠা।

ক্লাস সেভেনে ওঠার পর পাটিগণিতের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম তিনটি অংকের সমাধান দিতে পারলেন না আব্বা। সেদিন থেকে আমার পড়ালেখার দায়িত্ব আমার। আব্বা ঢাকা মেডিকেল থেকে পাশ করা ডাক্তার। বলাই বাহুল্য গণিতের চাইতে জীববিজ্ঞানেই তার দক্ষতা বেশী।

চার

ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ। ঢাকা কলেজ, নটর ডেম কলেজ দুটোতেই চান্স পেয়েছি। সারা জীবনের স্বপ্ন ঢাকা কলেজে পড়ব, ভর্তি হলাম। আব্বার মুখ কালো। ঢাকা কলেজে রাজনীতি, ছেলে নষ্ট হয়ে যাবে (নষ্ট হবার যে কিছু বাকি নাই, তা বলাই বাহুল্য!)। দুই তিনদিন গেল, আব্বার রাগ আর পড়ে না। তিনদিনের মাথায় নটর ডেম কলেজে ভর্তি হলাম। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাবাকে খুশী করার জন্য নেয়া জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত।

পাঁচ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে পড়ি। থাকি ইস্কাটন গার্ডেনের ফাল্গুনী নামক সরকারি বাসভবনে। শুক্রবার। আম্মাকে বললাম রান্না করার দরকার নাই, ভিকারুন্নিসার পাশের ফখরুদ্দিন থেকে বিরিয়ানি নিয়ে আসি। আব্বা নামাজে, আমি বিরিয়ানি নিয়ে ফিরছি। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের প্রশ্বস্ত রাস্তায় গাড়ির রেইস করছে তিন ছেলে, আমাদেরই বয়স। লেডিস ক্লাবের সামনে তারা প্রচন্ড জোরে আমার রিকশা মুখোমুখি মেরে দিল। আমার মনে পড়া শেষ স্মৃতি আমি দু’তিন তলা সমান উচ্চতায় উঠে গেছি, আর কিছু মনে নাই। যখন চোখ খুললাম আমি লেডিস ক্লাবের গেটে পড়ে আছি। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সব। শরীর নাড়াতে পারছি না। লোকজন ফিসফাস করছে। এমন সময় আমাকে চোখ খুলে পাশ ফিরতে দেখে পাশের মুদি দোকানদার চিৎকার করে উঠল ‘আরে ভাইয়া তো ফাল্গুনীর ভাইয়া’, তাড়াতাড়ি খবর দেন। আম্মাকে খবর দেয়া হলো, আমাকে রিকশায় তুলে মসজিদে নেয়া হলো। মাইকে ঘোষণা দিয়ে আব্বাকে বের করে আমাকে ভর্তি করা হলো হলি ফ্যামিলিতে। মাইনর সার্জারির পর ডাক্তাররা আব্বাকে বলল, “স্যার বাইরের ইঞ্জুরি নিয়ে চিন্তা করেন না, দোয়া করেন যাতে ইন্টারনাল হেমোরেজ না হয়। বাসায় নিয়ে যান স্যার, এখানে আর কিছু করার নাই।” সেবার বেঁচে গেলাম। বাবার ভালোবাসা কী আরেকবার জানলাম।

ছয়

ইফতারির পর লিখতে বসেছি। আব্বা আম্মা বউ মেয়েসহ ইফতার সন্ধ্যা। এখন মেয়ে টানাটানি করছে, নানুর বাসায় বেড়াতে যাবে, আর লেখা যাবে না, উঠতে হবে। এই মধ্যবয়সে এসেও বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হইনি একবিন্দুও। আল্লাহর অশেষ রহমতে আব্বা আমাদের মাঝে আছেন; আমার পরে এখন আমার মেয়েও আব্বার ভালোবাসায় আপ্লুত। সারাজীবন আব্বা-আম্মার ভালোবাসায় ভেসেছি, এখন ভাসছে আমার মেয়েও। নিজেকে বাবা হিসেবে আমার বাবার কাছে অত্যন্ত ক্ষুদ্র, রিক্ত মনে হয়। তবে সেই মনে হওয়ায় কোন গ্লানি নাই।

আমাদের বাবারা শুধু বাবা না; দাদা, নানা হিসেবেও বাবার চাইতে বেশী বেশী হয়ে আছেন, থাকবেন।

আমার বাবা, আমাদের বাবারা বেঁচে থাকুন, সুস্থ থাকুন।

-শামীম আহমেদ

………………………………………

পেশায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ শামীম আহমেদ লেখালেখি করছেন দুই যুগেরও বেশী সময় ধরে। দেশের শীর্ষস্থানীয় সকল বাঙলা এবং ইংরেজী পত্রিকায় উন্নয়ক বিষয়ক কলাম লিখছেন নিয়মিত। তার তিনটি কবিতার বই ‘একফোঁটা বৃষ্টি হতে যদি’, ‘যে প্রহর কুয়াশার কাছে ঋণী’ এবং ‘নিমিষেই নিষিদ্ধ তুমি’ পেয়েছে পাঠকপ্রিয়তা। গল্প লিখছেন অনেকদিন ধরে, প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। এবারের ঈদে সাহিত্য পত্রিকা শব্দঘর এবং দৈনিক পত্রিকা ভোরের কাগজের ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে তার দুটি গল্প। প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘অদ্ভুত ইংগিত আশে ঈশ্বর থেকে’ প্রকাশের পূর্বেই সমালোচকদের আলোচনায় ঠাঁই করে নিয়েছে।

rokomari

rokomari

Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading