বঙ্কিম ও ঈশ্বর: দুই চন্দ্রের লড়াই

SAVE_20210715_045522

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বড়দা শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে বড় বড় ডেকচিতে করে রান্না হচ্ছে। বাড়ির ছোট ছেলে শচীশচন্দ্রের বিয়ে বলে কথা! তার উপর বিয়ে হচ্ছে আরেক বড় সাহিত্যিক দামোদর মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে সুরেশ্বরীর সঙ্গে। এ তো যেনতেন বিয়ে নয়, তাই তো পাইকপাড়ার জমিদারদের কাছ থেকে শেরওয়ানি ধার করে এনে একেবারে রাজপুত্র সেজে এসেছেন। বিয়েবাড়িতে যা হয় আরকি, প্রচন্ড ভীড়। রাজপোশাক নষ্ট হয়ে যেতে পারে মনে করে শচীশচন্দ্র বাঁ হাত দিয়ে বিদ্যাসাগরকে সরিয়ে দিলেন। হুট করে এমন আচরণে থতমত খেয়ে বিদ্যাসাগর পিছনে সরে দাঁড়ালেন। তাঁর পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র। ভাইপোর এমন আচরণ দেখে তিনি তো রেগেই খুন, “তুমি জানো ইনি কে? ইনি বিদ্যাসাগর! এক্ষুণি ক্ষমা চাও।” কাকার ধমক খেয়ে মাথা হেঁট করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হলেন শচীশচন্দ্র। তবে বঙ্কিম কি সবসময়ই ঈশ্বরচন্দ্রকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানটা দিতেন?

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বঙ্কিমবাবু প্রায়ই ইংরেজিতে নানান বিষয়ে মন্তব্য-সমালোচনা করতেন। সেরকমই এক প্রবন্ধে লিখেছেন, “Vidyasagar has done nothing.”

১৮৭১ সালে বঙ্কিম ‘‘ক্যালকাটা রিভিউ’ পত্রে বেঙ্গলি লিটারেচার শীর্ষক প্রবন্ধে বিদ্যাসাগরের প্রতিভাকে অস্বীকার করেন। তাঁর মতে বিদ্যাসাগরের প্রতিভা ঈশ্বর গুপ্তের চেয়েও নিম্নস্তরের। ১৮৭২ সালে বঙ্কিম তাঁর নিজের সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার প্রথম বর্ষের ২য় সংখ্যায় (১২৭৯ জ্যৈষ্ঠ) ‘উত্তরচরিত’ নামক প্রবন্ধে বিদ্যাসাগরের উদ্দেশে বলেন, “ভবভূতি প্রসিদ্ধ কবি এবং তাঁহার প্রণীত উত্তরচরিত উৎকৃষ্ট নাটক, …আমরা বিদ্যাসাগর মহাশয়কে অদ্বিতীয় পণ্ডিত এবং লোকহিতৈষী বলিয়া মান্য করি, কিন্তু তাদৃশ কাব্যরসজ্ঞ বলিয়া স্বীকার করি না, যাহা হ‌উক, তাঁহার ন্যায় ব্যক্তির লেখনী হ‌ইতে এইরূপ সমালোচনার নিঃসরণ, অস্মদেশে সাধারণতঃ কাব্যরসজ্ঞতার অভাবের চিহ্নস্বরূপ। বিদ্যাসাগর‌ও যদি উত্তরচরিতের মর্যাদা বুঝিতে অসমর্থ হন, তবে যদুবাবু, মধুবাবু তাহার কি বুঝিবেন?”

এটিই বাংলা ভাষায় বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম সাহিত্য-সমালোচনা। এই প্রবন্ধে বঙ্কিম সম্পূর্ণ অনাবশ্যক কারণে বিদ্যাসাগরকে বাজেভাবে আক্রমণ করেন।

দু’জনে দুই ভিন্ন পরিবেশের পারিপার্শ্বিকতায় বেড়ে উঠলেও উভয়েই উনিশ শতকের রেনেসাঁসের আলোয় আলোকিত ছিলেন। বয়সের ব্যবধান ১৮ বছর হলে কী হবে, উভয়েই নিজ নিজ জায়গা থেকে সমানতালে সমাজের হয়ে কাজ করে গেছেন।

বঙ্কিমের নানান কথার জবাব বিদ্যাসাগর চুপ থেকেই দিয়েছিলেন

বিদ্যাসাগর শিক্ষাবিস্তার এবং সমাজ-সংস্কারমূলক নানা কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষভাবে পরিচালনা করলেও উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা বঙ্কিমচন্দ্র মূলত তাঁর লেখনশৈলীর মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের কল্যাণ সাধন করেছেন। তিনি তাঁর রম্যরচনায় নানানভাবে ইংরেজদের চাঁচাছোলা করতেন।

তারপরেও তাঁদের মধ্যে ছিল নানান বিরোধ। বিধবাবিবাহ প্রচলনের পাশাপাশি বিদ্যাসাগর বহুবিবাহ রোধে আন্দোলন করেছেন। বিদ্যাসাগর তাঁর প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি-তথ্যসংবলিত করে রচনা করেন বহুবিবাহ রোহিত হওয়া উচিত কি না এই বিষয়ক দ্বিতীয় পুস্তিকা। পুস্তিকাটি প্রকাশের পর রক্ষণশীল সমাজ তাঁর প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখানো শুরু করে; স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কঠোর সমালোচনা করে বঙ্গদর্শনে দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন: “বহুবিবাহ এদেশে যতদূর প্রবল বলিয়া, বিদ্যাসাগর প্রতিপন্ন করিবার চেষ্টা করিয়াছেন, বাস্তবিক ততটা প্রবল নহে। … বহুবিবাহ বিষয়ক দ্বিতীয় পুস্তকে যে ভাষা ব্যবহৃত হইয়াছে, তাহাতে ভদ্রসমাজে বিচার চলিতে পারে না। … যিনি ভদ্রলোকের ব্যবহার্য্য ভাষা ব্যবহার না করিয়া কটূক্তি করেন, তাহার সহিত বিচার করিতে ঘৃণা করি।”

কৃষ্ণকান্তের উইল‘ উপন্যাসে দেখা যায় বিধবা রোহিণীর প্রেমের অধিকার দিয়েও পরে তাকে হত্যা করান এবং নায়ক গোবিন্দলালকে ফিরিয়ে আনেন তার স্ত্রী ভ্রমরের কাছে। এ যেন বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ প্রচলনের আন্দোলনকে তিনি প্রকাশ্য সমালোচনা।

তাঁর আরেক উপন্যাস ‘বিষবৃক্ষ‘ এর নায়িকা সূর্যমুখী বলেছে, “ঈশ্বর বিদ্যাসাগর নামে কলিকাতায় কে নাকি বড় পণ্ডিত আছেন, তিনি আবার একখানি বিধবাবিবাহ বাহির করিয়াছেন। যে বিধবার বিবাহের ব্যবস্থা দেয়, সে যদি পণ্ডিত, তবে মূর্খ কে?”

একবারের ঘটনা, বর্ধমানের তারকানাথের বাড়িতে বিশাল ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। নিমন্ত্রণ করা হয়েছে বড় বড় সব মহিষীদেরকে। কারণ এই আয়োজনের রাঁধুনীও বেশ বড় মাপের একজন, স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর! নিজের হাতে রেঁধে-বেড়ে অতিথিদের ভাত, পাঁঠার ঝোল আর আম আদা পাঁঠার মেটের অম্ল রেঁধে খাওয়াবেন তিনি। নিমন্ত্রিতদের মধ্যে রয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্রও। তিনি অবশ্য জানতেন না রান্নাটা কে করেছেন। খেতে খেতে বঙ্কিম বলে উঠলেন, “এমন সুস্বাদু অম্ল তো কখনও খাই নাই।” তাঁর পাশে সঞ্জীবচন্দ্র মিটিমিটি হেসে বললেন, “হবে না কেন, রান্নাটা কার জানো তো, বিদ্যাসাগরের।” বিদ্যাসাগরও হাসি মুখে টিপ্পনী কাটতে ভুললেন না, “না হে না, বঙ্কিমের সূর্যমুখী আমার মতো মূর্খ দেখেনি।” বঙ্কিম কোনও উত্তর দেননি, তবে একটা হাসির রোল উঠেছিল।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর সকল বই পড়তে ক্লিক করুন

 

১৮৭৩ সালের ৩ জুলাই অমৃতবাজার পত্রিকা বিদ্যাসাগরকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, “বঙ্গদর্শন সম্পাদক নতুন লেখক, সুতরাং তাঁর সহস্র অপরাধ মার্জ্জনীয়; আমাদের ভরসা, তাঁর মত সুবোধ সম্পাদক আরো একটু শিক্ষিত হলে এ ভ্রমের পুনরাবৃত্তি হ‌বে না।’’

মজার ব্যাপার হলো, বঙ্কিম এই ‘বহুবিবাহ’ শীর্ষক প্রবন্ধটি অনেকদিন তাঁর কোনো গ্রন্থে সঙ্কলন করেননি। বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর পর ১৮৯২ সালে ‘বিবিধ প্রবন্ধ’-এর দ্বিতীয় ভাগে এই প্রবন্ধটি সংক্ষেপিত হয়ে সঙ্কলিত হয়। আর এর দ্বিতীয় ভাগে তিনি বলেন, ‘‘বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রণীত বহুবিবাহ সম্বন্ধীয় দ্বিতীয় পুস্তকের কিছু তীব্র সমালোচনায় আমি কর্তব্যানুরোধে বাধ্য হয়েছিলাম। তাহাতে তিনি কিছুটা বিরক্ত‌ও হয়েছিলেন। তাই আমি এ প্রবন্ধ আর পুনর্মুদ্রিত করি নাই।”

তার মানে কি তিনি মন থেকে নয়, সমাজের চাপে পড়েই বিদ্যাসাগরের বিপক্ষে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন? প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়৷

অবশ্য বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর পর তাঁর সম্পর্কে সুর পাল্টান বঙ্কিমচন্দ্র। ‘প্যারীচাঁদ মিত্রের রচনাবলী’র ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, “বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভাষা অতি সুমধুর ও মনোহর। তাঁহার পূর্বে কেহই এরূপ সুমধুর বাঙ্গালা গদ্য লিখিতে পারে নাই, এবং তাঁহার পরেও কেহ পারে নাই।” আরেক লেখায় তিনি বলেছেন, “বিদ্যাসাগর মহাশয়ের রচিত ও গঠিত বাংলা ভাষাই আমাদের মূলধন। তাঁরই উপার্জিত সম্পত্তি নিয়ে নাড়াচাড়া করছি।”

একবার বঙ্কিম সম্পর্কে ঈশ্বরের মতামত জানতে তাঁর এক সফরসঙ্গী তাঁকে জানায়, “জানো হে ঈশ্বর, বঙ্কিম দিনের বেলায় অফিসে যান, আর রাতে যান বাঈজি পাড়ায়।” এ কথা শুনে ঈশ্বর একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলেও সঙ্গীকে তা বুঝতে না দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘কি বলছো হে, এত কিছুর পরেও উনি বিষবৃক্ষ, রাজসিংহ, আনন্দমঠ এর মত উপন্যাস লিখছেন কি করে!  আমার তো একটা সেলফ তাঁর বইয়ে ভরে গেল। যাই বল তোমার কথা শুনে বঙ্কিমচন্দ্রেরর প্রতি শ্রদ্ধা আমার বেড়ে গেল। আমার তো শ্রদ্ধায় মাথা উঁচু হয়ে গেলো।” সঙ্গীর মুখে তখন আর কোনো কথা নেই।

সামাজিক কুপ্রথা ও ধর্মীয় গোঁড়ামি দূর করতে  বিদ্যাসাগরের চেষ্টার প্রতিবন্ধকতা ছিল তৎকালীন সমাজব্যবস্থা এবং সেই সমাজের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি, যাদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র অন্যতম। তাঁর ব্যক্তিগত আক্রমণের জবাবে বিদ্যাসাগর কখনো পাল্টা আক্রমণ করেননি।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে আরও জানতে ক্লিক করুন

 

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading