বিখ্যাতদের চোখে যেমন ছিলেন বঙ্গবন্ধু

1

শেখ মুজিবুর রহমান, জন্ম ১৭ মার্চ ১৯২০ সালে, গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায়। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট ঘাতকদের গুলিতে সপরিবারে নিহত হন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই বাঙালি। বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি তিনি। শেখ মুজিব ভারতীয় উপমহাদেশের এক অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বাঙালীর অধিকার রক্ষায় ব্রিটিশ ভারত থেকে ভারত বিভাজন আন্দোলন এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা রাখেন তিনি। তিনি আমাদের জাতির জনক। জনসাধারণের কাছে তিনি ‘শেখ মুজিব’ এবং ‘শেখ সাহেব’ নামেই বেশি পরিচিত। তাঁর উপাধি বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম তুলে ধরতে রচিত হয়েছে অজস্র সাহিত্যকর্ম, বানানো হয়েছে অগণিত ডকুমেন্টারি। সেসব থেকেই এই প্রবাদতুল্য মানুষটি সম্পর্কে আমরা জানতে পারি। কিন্তু বিখ্যাতদের চোখে কেমন ছিলেন তিনি? তাদের দৃষ্টিতে বাংলার গণমানুষের এই বন্ধু ঠিক কতটা বিশাল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন? মানুষ হিসেবেই বা তারা কীভাবে দেখেছে বঙ্গবন্ধুকে?

প্রিয় পাঠক, আজকের এই লেখায় আমরা আপনাদের জানাব ঠিক সেই বিষয়গুলোই।

ফিদেল কাস্ত্রো

ফিদেল কাস্ত্রো; কিউবার বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা ও রাজনীতিবিদ। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন দেশটির রাষ্ট্রপতি। ২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর ৯০ বছর বয়সে স্বদেশেই মৃত্যুবরণ করেন এই নেতা।

শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।

আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব এবং সাহসিকতায় তিনিই হিমালয়।

ইয়াসির আরাফাত

ফিলিস্তিনের বেশ জনপ্রিয় এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইয়াসির আরাফাত। ১৯৬৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের সভাপতি এবং ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল অথোরিটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

ইয়াসির আরাফাত

আপোষহীন সংগ্রামী নেতৃত্ব আর কুসুম-কোমল হৃদয় ছিল মুজিব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।

ইন্দিরা গান্ধী

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইন্দিরা গান্ধী। এখন পর্যন্ত এই আসনে বসা দেশটির একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রীও তিনিই। ইন্দিরা গান্ধীর আরেকটি পরিচয় হলো তিনি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর কন্যা।

শেখ মুজিব নিহত হবার খবরে আমি মর্মাহত। তিনি একজন মহান নেতা ছিলেন। তার অনন্যসাধারণ সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার জনগণের জন্য প্রেরণাদায়ক ছিল।

হুমায়ুন আজাদ

বহুবিধ গুণে গুণান্বিত হুমায়ূন আজাদ ছিলেন একাধারে একজন ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক, অধ্যাপক, কবি ও ঔপন্যাসিক। প্রথাবিরোধিতা ও বহুমাত্রিকতা তার লেখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট।

হুমায়ূন আজাদ

“শেখ মুজিব দৈহিকভাবেই মহাকায় ছিলেন। সাধারণ বাঙালির থেকে অনেক উচুঁতে ছিলো তার মাথাটি। সহজেই চোখে পড়তো তার উচ্চতা। একাত্তরে বাংলাদেশকে তিনিই আলোড়িত- বিস্ফোরিত করে চলেছিলেন। আর পাশে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যাচ্ছিল তার সমকালীন এবং প্রাক্তন সকল বঙ্গীয় রাজনীতিবিদ। জনগণকে ভুল পথেও নিয়ে যাওয়া যায়; হিটলার মুসোলিনির মতো একনায়কেরাও জনগণকে দাবানলে, প্লাবনে, আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করেছিলো, যার পরিণতি হয়েছিলো ভয়াবহ। তারা জনগণকে উন্মাদ আর মগজহীন প্রাণীতে পরিণত করেছিলো। একাত্তরের মার্চে শেখ মুজিব সৃষ্টি করেছিলো শুভ দাবানল, শুভ প্লাবন, শুভ আগ্নেয়গিরি, নতুনভাবে সৃষ্টি করেছিলেন বাঙালি মুসলমানকে, যার ফলে আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম।”

সাদ্দাম হুসাইন

ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসাইন ১৯৭৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ২৪ বছর দেশটিকে শাসন করে গিয়েছেন। মানবতারবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০০৬ সালে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রথম শহীদ। তাই তিনি অমর।

jiji
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (বামে) ও সাদ্দাম হোসেন (ডানে)

কেনেথ কাউণ্ডা

কেনেথ কাউন্ডা, যিনি সংক্ষেপে কেকে নামেই পরিচিত, জাম্বিয়ার একজন সাবেক রাজনীতিবিদ যিনি ১৯৬৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

“শেখ মুজিবুর রহমান ভিয়েতনামী জনগণকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।”

জেমস লামন্ড

ব্রিটিশ এমপি জেমস লামন্ড ১৯৭০ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ওল্ডহাম ইস্ট এবং ১৯৮৩ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ওল্ডহাম সেন্ট্রাল ও রয়টনের প্রতিনিধি হিসেবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন।

“বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড বাঙলাদেশই শুধু এতিম হয়নি বিশ্ববাসী হারিয়েছে একজন মহান সন্তানকে।”

ব্র্যায়ন ব্যারন

১৯৭৫ সালে জনাব জিয়াউর রহমান সাহেব যখন ক্ষমতায় তখন তিনজনের একটা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকের টিম বাংলাদেশে এসেছিলেন। তাদের একজন ব্র্যায়ন ব্যারন। যাদের তিন দিন শেরাটনে আটকিয়ে রেখে স্বৈরশাসক সরাসরি বিমানবন্দর দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। দেশে ফিরে ব্যারন লিখেছিলেন,

১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে লিখিত তার সংবাদ বিবরণীতে বলা হয়, শেখ মুজিব সরকারিভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং জনসাধারণের হৃদয়ে উচ্চতম আসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবেন। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার। এটা যখন ঘটবে, তখন নিঃসন্দেহে তার বুলেট-বিক্ষত বাসগৃহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্মারক-চিহ্ন এবং তার কবরস্থান পুণ্য তীর্থে পরিণত হবে।’ (দি লিস্নার, লন্ডন, ২৮ আগস্ট, ১৯৭৫)।

আনোয়ার সাদাত

মিশরের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত ১৯৭০ থেকে নিহত হবার আগে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশটির শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করেন।

আনোয়ার সাদাত

তোমরা আমারই দেয়া ট্যাংক দিয়ে আমার বন্ধু মুজিবকে হত্যা করেছ!আমি নিজেই নিজেকে অভিশাপ দিচ্ছি।

হেনরি কিসিঞ্জার

হেনরি কিসিঞ্জার একজন মার্কিন রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিক। রিচার্ড নিক্সন ও জেরাল্ড ফোর্ডের শাসনামলে তিনি সেক্রেটারি অফ স্টেট ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

হেনরি কিসিঞ্জার

“আওয়ামী লিগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মতো তেজী এবং গতিশীল নেতা আগামী বিশ বছরের মধ্যে এশিয়া মহাদেশে আর পাওয়া যাবে না।”

ব্রিটিশ লর্ড ফেন্যার ব্রোকওয়ে

“শেখ মুজিব জর্জ ওয়াশিংটন, গান্ধী এবং দ্যা ভ্যালেরার থেকেও মহান নেতা।”

জাপানী মুক্তি ফুকিউরা

জাপানী মুক্তি ফুকিউরার প্রকৃত নাম তাদামাসা ফুকিউরা। যুদ্ধ চলাকালে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তিনি সাহায্য করে যান আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের, যে কারণে তার নাম হয়ে যায় ‘জাপানী মুক্তি’।

“আজও তারা বাঙালি দেখলে বলে বেড়ান, ‘তুমি বাংলার লোক? আমি কিন্তু তোমাদের জয় বাংলা দেখেছি। শেখ মুজিব দেখেছি। জানো, এশিয়ায় তোমাদের শেখ মুজিবের মতো সিংহ-হৃদয়ের নেতার জন্ম হবে না বহুকাল।”

মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী

শেখ মুজিবুর রহমান
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (ডানে) ও মরহুম মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী (বামে)

মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন একজন ইসলামী পণ্ডিত ও তুখোড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সাতচল্লিশে সৃষ্ট পাকিস্তান এবং একাত্তরের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন প্রবাদতুল্য এই জননেতা।

টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবের কবর একদিন সমাধিস্থলে রূপান্তরিত হবে এবং বাঙালির তীর্থস্থানের মতো রূপলাভ করবে।

তানাকা মাসাআকি

তানাকা মাসাআকি জাপানের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক, শিক্ষক, গবেষক ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞ।

শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন নেতাজি সুভাষ বসুর যোগ্য উত্তরসূরি।

অধ্যাপক কাজুও আজুমা

কাজুও আজুমা জাপানের একজন জনপ্রিয় সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। রবীন্দ্র গবেষণা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি কর্তৃক সম্মানসূচক ফেলোশিপ অর্জন করেন।

কেন আপনারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেন? কী অপরাধ করেছিলেন তিনি? অপরাধ হয়ে থাকলে তাঁকে জেলে দিতেন, বিচার করতেন, সপরিবারে হত্যা করলেন কেন?

rokomari

rokomari

Published 29 Jan 2018
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png