গুড ওল্ড আনিসুল হক !

আনিসুল হক

নব্বইয়ের দশকে যারা বেড়ে উঠেছেন, এবং সেই সময়কার লেখকদের নিয়মিত পাঠ করতেন, তাদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করেন, আনিসুল হক কে? তারা নিশ্চিতভাবেই একটু ভাবালুতায় ডুবে যাবেন। তখনকার তরুণ আনিসুল হক যে কত দুরন্তপনা করেছেন লেখা নিয়ে সে খবর এখন কজন রাখে! তিনি পড়াশোনা করতেন বুয়েটে। তবে তার দাবী বুয়েটে তিনি মূলত লেখালেখি শেখার কাজেই সময় দিয়েছেন। সময় পেলে পড়াশোনা করেছেন! আনিসুল হক সারাজীবন লেখার মধ্যেই থাকতে চেয়েছিলেন। তাই প্রকৌশলের শাখায় কাজ শুরু করেও শেষ পর্যন্ত আর থিতু হন নি। লিখেছেন একের পর এক গল্প, কবিতা, উপন্যাস, সিনেমার চিত্রনাট্য, কিশোর উপন্যাস, কলাম আরো কত কিছু!

আনিসুল হক পড়তে আসেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯৮৪), এসেই ঘোষণা করেন যে তিনি কবি হতে চান। বুয়েটে পড়ার সময়ই তার প্রথম কবিতার বই বের হয়, ‘খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে’ (১৯৮৯)। বুয়েটের শেষ পরীক্ষা দিয়ে তিনি চলে যান সাপ্তাহিক পূর্বাভাস পত্রিকায়। সেখানে সাংবাদিকতা শুরু করেন, এই আশায় যে তাতে তাঁর গল্প কবিতা লেখালেখি প্রকাশ করা সহজ হবে। তিনি ১৯৮৯ সালে লিখতে শুরু করেন গদ্যকার্টুন। ১৯৯৩ সালে বই হিসেবে গদ্যকার্টুন প্রকাশিত হয় এবং বইমেলায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

তার সেই সময়ের নিরীক্ষার একটি অসাধারণ উদাহরণ হলো ‘ফাঁদ’ নামক একটি ছোট্ট উপন্যাস। সাপ্তাহিক চলতিপত্রে  প্রকাশিত হয়েছিলো সেটি। উপন্যাসটির কাহিনীর ব্যাপ্তি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। উমম, কত সেকেন্ড, সেটা যদি নিখুঁতভাবে জানতে চান, তাহলে অংক কষে ফেলুন, দশ তলা থেকে একজন মানুষ যদি ঝাঁপ দেয়, তাহলে নিচে পড়তে কতক্ষণ সময় লাগবে? এক সেকেন্ড, নাকি দু সেকেন্ড? ওরকমই হবে। কাহিনীটা এরকম-

ম নামক একজন ব্যক্তি দশতলার ছাদ থেকে লাফ দিচ্ছেন। উদ্দেশ্য খুব সরল। আত্মহত্যা। কিন্তু নামতে নামতে প্রতিটি তলার জানালা থেকে তিনি দেখে নিচ্ছেন জীবনের বৈচিত্রপূর্ণ সব বাস্তব। প্রতি তলা তিনি অতিক্রম করেন, আর আমরা পেয়ে যাই নতুন নতুন সব গল্প

কোনটা রাজনৈতিক শঠতার, কোনটা যৌন অবদমনের, কোনটা বাৎসল্যের, কোনটা দেশপ্রেমের! এমন মোট দশটা গল্প। সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় নিয়ে এমন গল্প লেখার চিন্তা তার কোথা থেকে এলো জানতে পারলে খুব ভালো হত, জানাতে পারলে ভালো হত এ সময়ের পাঠক এবং লেখকদের! তবে এটি বই হিসেবে বের হলে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তার প্রশংসা করে রিভিউ লেখেন, তিনি বলেন যে, ফাঁদ ওই বছরে প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর একটা।

gr
ফাঁদ

এক্সপেরিমেন্টাল লেখা আপনার ভালো নাও লাগতে পারে। সহজ একটা লেখার কথা বলা যাক। তার আরেকটি আকারে ছোট উপন্যাস ‘খেয়া। এই গল্পের শুরুটা খুব সাধারণ, আটপৌরে-

খুকু নামক প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী, তার প্রেমিক, মাসুদ রানা পড়া দাদীমা এবং তার বাবা। খুব সহজ শোনাচ্ছে, তাই না? হ্যাঁ, তবে এখানে একটু ব্যাপার আছে। তার বাবার পেশাটা একটু সমস্যাযুক্ত। তিনি কাফনের কাপড়ের ব্যবসা করেন। যত মানুষ মারা যাবে, তত তার লাভ। একজন স্নেহময়ী পিতা কি তার সংসারের ক্রান্তিলগ্নে অন্যদের বেশি বেশি মৃত্যু কামনা করবেন? কী মনে হয় আপনার, পাঠক?

এবার একটু সিনেমা নিয়ে কথা বলা যাক। মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর মেড ইন বাংলাদেশ সিনেমাটা তো দেখেছেন নিশ্চয়ই? অন্তত নাম তো শোনার কথা! দেখে না থাকলে ইউটিউবে দেখে নিয়েন। এই সিনেমাটিতে একজন বেকার যুবক একটি কক্ষে সরকারের উচ্চপদস্থ কিছু কর্মকর্তাকে বন্দী করে রাখেন। তার দাবীগুলি অদ্ভুত। সে কোন টাকা পয়সা চায় না। তার দাবী- দেশে কোন দুর্নীতি থাকবে না, কোন অরাজকতা চলবে না, এইসব! আপনি কি জানেন, এমন একটা ঘটনা আসলেই ঘটেছিলো বাংলাদেশে? কোন এক পার্বত্য জেলায় এমন একটি ঘটনা আসলেই ঘটিয়েছিলেন একজন যুবক। এও আপনার জানা থাকা দরকার, এই ঘটনাটি নিয়ে তৈরি সিনেমাটি আনিসুল হকের ‘জিন্মি’ উপন্যাসটি অবলম্বনে লেখা। ডার্ক হিউমার এবং থ্রিলের সমন্বয়ে অনবদ্য এক রচনা! এছাড়াও, টেলিভিশনে প্রচারিত হয় তাঁর নাটক ‘নাল পিরান’। ২০০৩ সালে টেলিভিশনে ধারাবাহিক নাটক ৫১-বর্তী প্রচারিত হচ্ছে, আর প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর উপন্যাস ‘মা’। এরপরে আর তাঁকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। 

ইতিহাস এবং রাজনীতিসচেতন আনিসুল  হক একের পর এক ঐতিহাসিক ফিকশন লিখেছেন।  ১৯৭৭ এর সামরিক বাহিনীতে গনফাঁসি নিয়ে রচিত ‘আয়েশামঙ্গল’, অনেকদিন পর খুঁজে পাওয়া একমাত্র মহিলা বীর প্রতীক তারামন বিবিকে নিয়ে লেখা “বীর প্রতীকের খোঁজে”, শহীদ আজাদ এবং তার মা’কে নিয়ে লেখা ‘মা’ (কিছুদিন আগে যার নিরানব্বইতম সংস্করণ বের হলো),  তার দিকে আলাদা নজর দিতে বাধ্য করলো পাঠককে। খুব স্বাভাবিক! সেই সময়ে এত বৈচিত্রপূর্ণ বিষয়ে খুব কম লেখকই লিখতেন!

fyg
আয়েশামঙ্গল, বীর প্রতিকের খোঁজে, মা

পাঠক, লেখার শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। এখন একটু “এসো গান শিখি”র মত করে আমরা গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরে যাই!

“আমার বয়স হলো সাতাশ
আমার সঙ্গে মিতা পাতাস
তোর দু-হাত পেতে ধরি
চাই এইটুকু মাত্তরই ”

মনে পড়ে সঞ্জীবদার ভরাট গলার সেই গান? হ্যাঁ, এটাও আনিসুল হকেরই লেখা গান! অবাক হচ্ছেন? অবাক হবার কিছু নেই। ছাত্রাবস্থায় তিনি প্রচুর কবিতা লিখেছেন। কবিতার বইও আছে তার। এখন কেন লিখছেন না, সেই অনুযোগ আপনি জানাতেই পারেন তাকে!

আপনাকে তো নব্বই থেকে শূন্য দশকের শুরুর আনিসুল হকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। এই পরিচিত হওয়াটা জরুরী ছিলো। কারণ তিনি এমন সব কালোত্তীর্ণ লেখা সেই সময় লিখেছেন, যা রয়ে যাবে যুগের পর যুগ। এখনকার আনিসুল হককে সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে নানারকম রঙ্গ তামাশার লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ফেলা হয়েছে। যিনি নিজে বিদ্রুপের রাজা, তাকেই কি না সইতে হচ্ছে এমন বিদ্রুপ! এ কেমন কথা! সময় এমনই নিষ্ঠুর শাসক। তবে একটা সময় যিনি দুর্দান্ত এক্সপেরিমেন্টে সচল রেখেছিলেন আমাদের স্বপ্ন, ইতিহাস এবং ভালোবাসা, তার প্রতি আমাদের আচরণ তো আরেকটু সম্মানজনক হওয়াটাই উচিত!

আমি আমার সময়ের কথা বললাম। আপনি আপনার সময়ের কথা বলুন! তার “জেনারেল ও নারীরা”, ২০১১ সালে শুরু করা যারা ভোর এনেছিল, উষার দুয়ারে, আলো-আঁধারের যাত্রী এবং এই পথে আলো জ্বেলের পর বেরুল এই সিরিজের তাঁর ৫ম উপন্যাস, ‘এখানে থেমো না।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা, মওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন আহমদ থেকে শুরু করে বেগম মুজিব তাঁর বইয়ের চরিত্র। তিনি উপন্যাসের আকারে লিখে রাখছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির গড়ে উঠবার কাহিনি। এই সিরিজ  উপন্যাসগুলো  কি সময়কে অতিক্রম করতে পারবে?

আপনি চাইলে ‘গুড্ডুবুড়া’ সিরিজের বই আমলে নিতে পারেন, নাও নিতে পারেন!

আনিসুল হকের বই সমগ্র 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Published 05 Dec 2018
Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh
  0      1
 

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png