জাহানারা ইমাম : জননী সাহসিকা যাঁর উপাধি

জাহানারা ইমাম

‘আমি কিন্তু আপনাকে টেলিফোন করেছি কিছু কঠিন কথা বলার জন্যে।’

‘বলুন।’

‘আপনি রাগ করুন বা না করুন কথাগুলো আমাকে বলতেই হবে।’

‘আমি শংকিত হয়ে আপনার কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছি।’

‘আপনি স্বাধীনতাবিরোধীদের পত্রিকায় লেখেন কেন? আপনার মত আরো অনেকেই এই কাজটি করে। কিন্তু আপনি কেন করবেন?’

তিনি কথা বলছে নিচু গলায়, কিন্তু বলার ভঙ্গিতে কোন অস্পষ্টতা নেই। কোন আড়ষ্টতা নেই।’

আমি হকচকিয়ে গেলাম। আক্রমণ এইদিক থেকে আসবে ভাবিনি। তবে পত্রিকায় লেখা দেয়ার ব্যাপারে আমার কিছু যুক্তি আছে। খুব যে দুর্বল যুক্তি তাও না। যুক্তিগুলো তাকে শোনালাম। মনে হল এতে তিনি আরও রেগে গেলেন। কঠিন গলায় বললেন, ‘আপনার মিসির আলী বিষয়ক রচনা আমি কিছু কিছু পড়েছি, আপনি যুক্তি ভালো দেবেন তা জানি। কিন্তু আমি আপনার কাছ থেকে যুক্তি শুনতে চাচ্ছি না। আপনাকে কথা দিতে হবে ওদের পত্রিকায় লিখে ওদের হাত শক্তিশালী করবেন না। আপনি একজন শহীদ পিতার পুত্র। ‘তুই রাজাকার’ শ্লোগান আপনার কলম থেকে বের হয়েছে। বলুন আর লিখবেন না।’

আমি সহজে প্রভাবিত হই না। সে রাতে হলাম । বলতে বাধ্য হলাম, আপনাকে কথা দিচ্ছি আর লিখব না। এবার বলুন আপনার রাগ কি কমেছে? তিনি হেসে ফেললেন।

**

উপরের লেখাটুকু হুমায়ূন আহমেদের। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সঙ্গে তার কথোপকথনের ব্যাপারে তিনি লিখেছিলেন ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’ বইটিতে। হুমায়ূনের স্বতন্ত্র রসবোধের ভেতর জাহানারা ইমামের সঙ্গে তার সম্পর্ক উঠে এলেও আমরা দেখতে পাই সেসময়ে জাহানারা ইমামের প্রাসঙ্গিকতা। কিন্তু মৃত্যুর এতদিন পরেও জাহানারা ইমাম কি এখনও প্রাসঙ্গিক নয়?

মুক্তিযুদ্ধের পেরিয়ে গেছে অর্ধশত বছর। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের শক্তি ও স্বাধীন রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রাকে রুখতে যেসব মন্দ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বারংবার, তাদের বিরুদ্ধেই তীব্র কণ্ঠে সুউচ্চ মঞ্চে সত্যের প্রদীপ হাতে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন একজন বাঙালী নারী। যার সন্তান মুক্তিযুদ্ধের ডাকে সাড়া দিয়ে কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন এবং পরবর্তীতে নির্যাতনের ফলে মৃত্যুবরণ করেন। বিজয় লাভের পর রুমীর বন্ধুরা রুমীর মা জাহানারা ইমামকে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে বরণ করে নেন৷ রুমীর শহীদ হওয়া এবং বেঁচে থাকা রুমীর মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুদের সূত্রেই জাহানারা ইমাম হয়ে ওঠেন শহীদ জননী।

জন্মটা হয়েছিলো এক রক্ষণশীল বাঙালি পরিবারে। সময়টা ১৯২৯ সালের ৩রা মে, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে। মাতা সৈয়দা হামিদা বেগম এবং পিতা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন তৎকালীন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। রক্ষণশীল পরিবারের থাকার পরেও গতানুগতিক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের মেয়ের মত পিছিয়ে পড়েননি পড়াশোনায়। ১৯৪২ সালে মাধ্যমিক পাশ করেন। তার দুই বছর পর ১৯৪৪ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হন। পরের বছর উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন কোলকাতার লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজে। দেশভাগ হবার বছরেই বি.এ পাশ করেন সেখান থেকে। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এড ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন জাহানারা ইমাম। তার চার বছর পর ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সার্টিফিকেট ইন এজুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন। এবং সবশেষে তার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পাস করেন।

নব্বই দশকের শুরুতে শহীদ জননী এসেছিলেন জনতার মঞ্চে। বৃদ্ধ বনে যাওয়া শরীর নিয়ে জানান দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অশুভ ও মন্দ শক্তিকে রুখতে চির তারুন্য বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

তবে তার আগে জাহানারা ইমামের পেশাগত জীবন শুরু হয়েছিলো শিক্ষক হিসাবে ময়মনসিংহ শহরে। সেখানে বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসাবে ১৯৪৮ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তিনি কর্মরত ছিলেন। এরপর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (১৯৫২-১৯৬০), বুলবুল একাডেমি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক (১৯৬২-১৯৬৬) এবং ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রভাষক (১৯৬৬‌-১৯৬৮) হিসাবে তার কর্মজীবন অতিবাহিত হয়। তিনি কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটেও খন্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে কাজ করেছিলেন।

নব্বই দশকের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের মন্দ শক্তির ভিত নাড়িয়ে দিতে জাহানারা ইমাম বিক্ষোভ শুরু করেন। তারই অংশ হিসেবে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। তিনি হন এর আহবায়ক। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়।

সেই সময়কে নিয়ে নিজের সঙ্গে শহীদ জননীর কথার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। ‘তার অনেক কাছের মানুষ ছিলো আমার মা। আমার ছোট ভাই জাফর ইকবাল। জাফর ইকবালের উল্লেখ তার লেখাতে পাই। ব্যাক্তিগত আলাপেও জাফর ইকবালের প্রসঙ্গে তাকে উচ্ছ্বসিত হতে দেখি। শুধু আমার ব্যাপারেই এক ধরণের শীতলতা। হয়তো তার ধারণা হয়েছিল, যে মহান আন্দোলনের নেতৃত্ব তিনি দিচ্ছেন আমি সেই আন্দোলন এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছি। যে ১০১ জনকে নিয়ে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আদি যাত্রা, আমি সেই ১০১ জনের একজন। অথচ পরে আমার আর কোন খোঁজ নেই। কাজেই আমার ভূমিকায় অস্পষ্টতাতো আছেই। তিনি আমার প্রতি শীতল ভাব পোষণ করতেই পারেন। সেটাই স্বাভাবিক’।

জাহানারা ইমামের মন্দের বিরুদ্ধে শক্ত কণ্ঠে সোচ্চার হবার এই প্রবণতা নব্বই দশকে শুরু হয়নি। শহীদ জননীর আসল মর্মার্থ আমরা খুঁজে পাই তার বিখ্যাত বই ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে। যেটি পরবর্তীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও সেসময়ের ইতিহাসের এক শক্তিশালী স্বাক্ষী হয়ে টিকে আছে এখনও। আগুন ঝড়া দিনগুলো কিন্তু শুরু হয়েছিলো সেই একাত্তরের শুরুতেই। ১৯৭১ সালে বড় ছেলে রুমী ইমামকে হারান। কয়েক মাসের মধ্যে স্বামী শরীফ ইমামকেও পাকিস্তানী হানাদাররা নির্মম নির্যাতন করে আহত অবস্থায় মুক্তি দেয়। বিজয়ের তিন দিন আগে শরীফ ইমাম মারা যান। বিজয়ের পরে রুমীর সব বন্ধুসহ সকল মুক্তিযোদ্ধা তাকে তাদের জননী হিসেবে মেনে নিয়েছিল। এক শহীদের জননী, হাজার শহীদের জননী, হাজার মুক্তিযোদ্ধার জননী হয়ে ওঠা পরিচিতি পান সবার শহীদ জননী হিসেবে।

সংসার জীবনের বাইরে তার লেখনিতে বারবার উঠে এসেছে সংগ্রাম এবং সাধারণ মানুষের পক্ষের কথা। বাঙালি নারীর চিরায়ত নিয়মে আটকে পরে থেমে যাননি কখনই। মোটকথা সংসার জীবন এবং লেখক জীবনের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পত্রিকা সাংবাদিকতাতেও। কলাম লিখতেন দৈনিক বাংলায়।

লিখেই ক্ষান্ত হননি। প্রজন্মের জন্য কাজ করে গেছেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যারা নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিলো, তাদের বিচারের দাবিতে দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ‘পাবলিক ট্রায়াল’-এর আয়োজন করেছিলেন, যা সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিলো। সেই একই আদলে বাংলাদেশে ‘গণ-আদালত’ গঠন করে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিচারের আয়োজন করে জাতীয়  কমিটি। এ আন্দোলন সারাদেশে  ব্যাপক সাড়া জাগায়। দেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনে জাহানারা ইমাম বাধাগ্রস্থ হয়েছেন একাধিকবার। কিন্তু তার অভূতপূর্ণ নেতৃত্ব ও প্রজন্মকে মন্দের বিরুদ্ধে নেবার আন্দোলন সবকিছুকেই ছাড়িয়ে গেছে বারবার।

ফিরে যাই জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ প্রসঙ্গে। শহীদ জননীর মুখোমুখি হয়ে সরদার ফজলুল করিম একবার প্রশ্ন করেছিলেন- একাত্তরের দিনলিপি আপনি কীভাবে তৈরি করেছেন? সব ঘটনা বিস্তারিত এসেছে। এত বিস্তারিত কি আপনি নোট রাখতে পেরেছিলেন, নাকি স্মৃতি থেকে এইটা বিস্তারিত করেছেন?

তখন জাহানারা ইমাম বলেন, ‘ন্যাশনাল আর্কাইভে গিয়ে একাত্তরের কিছু কাগজটাগজ দেখেছি, কবে কোথায় কী মিটিং হতো, প্রতিবাদের মিটিং হতো—এসব। আমার ডায়েরিতে হয়তো লেখা থাকত, আজকে পাঁচটায় বাংলা একাডেমিতে মিটিং, যাব ওখানে। পরে কোন মিটিংটা কী প্রসঙ্গে হয়েছিল এবং নামটামগুলো আমি কাগজ দেখে ঠিক করে নিয়েছি। তারপরও ধরুন, ছেলেদের যে অ্যাকশনগুলো হতো, শাহাদাত চৌধুরী আর আলম ঠিক কোন তারিখে ঢাকায় এসেছিল, এসে যে তারা আমার কাছ থেকে ওই ব্রিজের ডিজাইন নিয়ে গেল—মানে আমার স্বামীর কাছ থেকে জোগাড় করে দিলাম—নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু ও রাইসুল ইসলাম আসাদ। আমি ঘটনাগুলো প্রথমে লিখেছি। তারপর ওদের ডেকে বলেছি, ঘটনাগুলো তোমরা শুনে আমাকে বলো। তা ছাড়া ওদের ডেকে আমি ক্যাসেটে বলেছি, তোমাদের ঘটনাগুলো আগে আমাকে বলো। আবার আমি বলেছি, যাতে আমার স্মৃতিবিভ্রম হয়ে না যায়’।

একাত্তরের দিনগুলির পাতা ওল্টালে আমাদের ফিরে যেতে হয় সেই আগুন ঝড়া সময়ে। যার পাতায় পাতায় আমরা দেখতে পাই সামাজিক ও ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের মাঝেও কিভাবে এগিয়ে যায় দেশের জন্য সংগ্রাম। ছেলে রুমীকে সবসময় বলতেন, ছাত্রজীবন শুধু পড়ার সময়। কিন্তু এই কথাটিই মিথ্যে হয়ে দাঁড়ায় ১৯৭১ সালের এপ্রিলে। ছাত্র রুমীর তখন ছাত্রজীবনে পড়া ছাড়া দেশকে বাঁচাতে যুদ্ধ করতে যাওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বাবা-মায়ের সঙ্গে ছেলের বাস্তবিক আলাপনে কি সেটি মেনে নেয়া এতটাই সহজ ছিলো?

১৯শে এপ্রিল একাত্তরের দিনগুলিতে জাহানারা ইমাম লিখেছেন-

‘রুমীর সাথে কয়দিন ধরে খুব তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে। ও যদি ওর জানা অন্য ছেলেদের মতো বিছানায় পাশ-বালিশ শুইয়ে বাবা-মাকে লুকিয়ে পালিয়ে যুদ্ধে চলে যেত, তাহলে একদিক দিয়ে বেঁচে যেতাম। কিন্তু, ওই যে ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছি লুকিয়ে বা পালিয়ে কিছু করবে না। নিজের ফাঁদে নিজেই ধরা পড়েছি। রুমী আমাকে বুঝিয়েই ছাড়বে, সে আমার কাছ থেকে মত আদায় করেই ছাড়বে। কিন্তু, আমি কী করে মত দেই? রুমীর কি এখন যুদ্ধ করার বয়স? এখন তো তার লেখাপড়া করার সময়। কেবল আইএসসি পাস করা এক ছাত্র, এখানে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছে, আবার আমেরিকার ইলিনয় ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতেও ওর এডমিশন হয়ে গেছে। এই বছরের ২ সেপ্টেম্বর থেকে সেখানে ক্লাস শুরু হবে। ওকে আমেরিকা যেতে হবে আগস্টের শেষ সপ্তাহে। সেখানে গিয়ে চার বছর পড়াশোনা করে তবে সে ইঞ্জিনিয়ার হবে। আর এই সময় সে কি না বলে যুদ্ধ করতে যাবে?’

তুইতো এখানে পড়বি না। আইআইটি’তে তোর ক্লাস শুরু হবে সেপ্টেম্বরে, তোকে না হয় কয়েক মাস আগেই আমেরিকা পাঠিয়ে দেব। আম্মা, দেশের এইরকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত। কিন্তু, তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মতো অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়ত বড় ডিগ্রি নিয়ে এসে বড় ইঞ্জিনিয়ার হব, কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনোদিনও মাখা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি তাই চাও আম্মা’?

এই মহিয়সী নারীর মৃত্যু হয় ১৯৯৪ সালের ২৬শে জুন।  জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে জানাযা শেষে তাকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধা গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের আটজন সেক্টর কমান্ডার শহীদ জননীকে গার্ড অব অনার প্রদান করেছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের ভাষায় তার মৃত্যুর খবর দিয়ে এই লেখা শেষ করছি।

‘তার মৃত্যু সংবাদ আমাকে দেন আসাদুজ্জামান নূর।

বাসায় তখন ক্যাসেট প্লেয়ার বাজছে। আমার মেয়েরা জন ডেনভারের গান শুনছে ‘রকি মাউন্টেন হাই, কলারাডো।’ সঙ্গে সঙ্গে গান বন্ধ হয়ে গেলো। মেয়েরা তাদের নিজেদের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। আমার মা আমার কাছে জানতে চাইলেন, আন্দোলন এখন কে এগিয়ে নিয়ে যাবে? আমি তাকে বললাম, দ্বিতীয় জাহানারা ইমাম আমাদের নেই। জাহানারা ইমাম দু’টা তিনটা করে জন্মায় না। একটাই জন্মায়। তবে কেউ না কেউ এগিয়ে আসবেই। অপেক্ষা করুন।

মা জায়নামাজে বসলেন। আর আমি একা একা বসে রইলাম বারান্দায়। এক ধরনের শূণ্যতা বোধ আমার ভেতর জমা হতে থাকল। কেবলই মনে হতে লাগল একটা মস্ত ভুল হতে গেছে। কি পরিমান শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা এই মানুষটির প্রতি আমার ছিল তা তাকে জানানো হয়নি। আমার একটাই স্বান্ত্বনা মৃত্যুর ওপাশের জগত থেকে আজ তিনি নিশ্চয়ই আমার বিপুল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অনুভব করতে পারছেন। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমি সবসময়ই তার পাশে ছিলাম। যে ক’দিন বেঁচে থাকবো তাই থাকব। বঙ্গ-জননীর পাশে তার সন্তানরা থাকবে না তা কি কখনো হয়?

বাংলার পবিত্র মাটিতে তাঁর পায়ের চিহ্ন আর পড়বে না। স্বাধীনতাবিরোধীদের এই সংবাদে উল্লসিত হবার কিছু নেই। বাংলার হৃদয়ে তিনি জ্বেলে দিয়েছেন অনির্বাণ শিখা। ঝড়-ঝাপ্টা যত প্রচন্ডই হোক না কেন সেই শিখা জ্বলতে থাকবে।

 কি সৌভাগ্য আমাদের, তিনি জন্মেছিলেন এই দেশে’!

 

জাহানারা ইমামের আলোচিত বই ‘একাত্তরের দিনগুলি’

জাহানারা ইমামকে নিয়ে লেখা বইগুলো 

Zubayer Ibn Kamal

Zubayer Ibn Kamal

For the last half a decade, I have been writing stories, articles, features, and other content in various national level magazines. I am most interested in creative writing. I have read thousands of fiction books in the last few years. I have memorized the book of the last revelation of God. My day goes by reading books and thinking.

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading