মুহম্মদ জাফর ইকবাল : আমাদের শিশু সাহিত্যের বরপুত্র

Untitled-1ৈ

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বাংলাদেশের অন্যতম বরেণ্য একজন ব্যক্তিত্ব, যার পরিচয় দিতে গেলে বলতে হয় তিনি একাধারে একজন শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, গবেষক, কথা সাহিত্যিক, লেখক, কলামিস্ট বুদ্ধিজীবী। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও লেখার দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে এদেশের শিশু-কিশোরেরা। তাঁর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীগুলোকে ঘিরেই এদেশের শিশুরা তাদের শৈশবের পরাবাস্তব জগত সাজায়। গণিত অলিম্পিয়াডের উদ্যোক্তা হিশেবে হাতে ধরে এদেশের তরুণ প্রজন্মকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন গণিতকে।

১) মুহম্মদ জাফর ইকবাল এর জন্ম ও শৈশব

১৯৫২ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটের মিরাবাজারে পুলিশ অফিসার ফয়েজুর রহমান আহমেদ এবং তার স্ত্রী আয়েশা আকতারের কোয়ার্টারের ছোট্ট বাসায় জন্ম নেন পরিবারের দ্বিতীয় পুত্রসন্তান মুহম্মদ জাফর ইকবাল। মুহম্মদ জাফর ইকবাল-এর জন্ম ও শৈশব এর একটা অংশ কেটেছে সিলেটেই। ছেলেবেলায় প্রথম পাওয়া ডাকনামটি ছিলো বাবুল। বাবা ফয়েজুর রহমানের ছিলো লেখালেখির অভ্যাস। পরিবারে তাই শুরু থেকেই ছিলো এক সাহিত্যমনষ্ক, সাহিত্যচর্চার অনুরাগী আবহ যা পরিবারের সব সদস্যকেই স্পর্শ করেছে কোনো না কোনোভাবে। ছোট জাফর ইকবালের হাতেও তাই তখনই এসে গিয়েছিলো সহজ-সাবলীল ভাষায় লেখার জাদু! মাত্র সাত বছর বয়সে মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লিখে ফেলেছিলেন।

বাবার বদলির চাকরির সুবাদে ঘুরে বেড়িয়েছেন, থেকেছেন দেশের নানা জায়গায়। আর সব ছেলের মতোই শৈশব, কৈশোর ঘিরে তাঁরও রয়েছে দূরন্ত এবং মজার সব গল্প। লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল সেসব ঘটনাই তাঁর নিজের ভাষায় লিখেছেন তাঁর স্মৃতিচারণমূলক বই ‘আধ ডজন স্কুল’ এ।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল , মা ও ভাই-বোনদের সঙ্গে
মা আয়েশা ফয়েজ ও তাঁর ছয় সন্তান এক ফ্রেমে; Image Source: attoprokash.com

মুহম্মদ জাফর ইকবালের প্রথম আত্মসম্মানবোধ উপলব্ধি করতে শেখা সেই পাঁচ বছর বয়সে। তখন তিনি কিশোরী মোহন পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করছিলেন। একদিন স্যার যথারীতি ক্লাসে এলেন, দুটো অংক করতে বললেন। তিনি কখনো পড়া না পারলে তাঁর বোন তাকে বলে দিতেন। সেদিন সবাই খাতা জমা দিলে তিনিও তাঁর বোনের পিছু পিছু জমা দিলেন। স্যার প্রথমে ফার্স্টবয়ের খাতাটা দেখে তাকেই বাকিদের খাতা দেখার দায়িত্ব দিয়ে দিলেন। যাদের অংক দুটোই ঠিক হলো তারা খাতা ফেরত পেল, যাদের হলো না তাদের বেতের মার খাওয়ার পালা। বোন খাতা ফেরত পেলেও জাফর ইকবাল পেলেন না। ভয় জড়োসড়ো তাকে বোন শেফু শিখিয়ে দিলেন- “যেয়ে বলবি, স্যার মাফ করে দেন আর কোনো দিন ভুল হবে না।” কিন্তু যখন স্যারের সামনে গেলেন তখন ক্ষমা না চেয়ে হাত পেতে বেতের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। যদিও কেঁদে-কেটে একাকার, তবুও প্রথম বেতের বাড়ি খেয়ে হাত সরালেন না। ঐ বয়সেই প্রচন্ড অপমানবোধ হয়েছিলো। সেদিনই ঠিক করে ফেললেন- অংকে আর ভুল করবেন না। যে অংক ভুল হয়েছে সেটা দিয়েই শুরু করেন এই যাত্রা। কিন্তু কী অদ্ভুত ব্যাপার- ঐ অংকটা যতবারই করেন ফলাফল একই আসে! বাবাকে দেখালে বাবা বললেন, তাঁর অংকে ভুল ছিল না। বিনা দোষেই জীবনের প্রথম বেতের বাড়িটা খেয়েছিলেন। কিন্তু এই ঘটনার অবদানেই হয়তো লেখকের গণিতের সাথে সুন্দর এক সম্পর্ক ও দীর্ঘ পথচলার শুরু হয়ে গিয়েছিলো।

২) মুহম্মদ জাফর ইকবালের ব্যক্তিগত জীবন

মুহম্মদ জাফর ইকবালের সুন্দর পারিবারিক জীবনে ছন্দপতনটি আসে মুক্তিযুদ্ধের ঝড়ো হাওয়ায় করে। পুলিশ বাবা ফয়েজুর রহমান আহমেদ  হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। বাবার মৃত্যুর সংবাদ মাকে জানানোর মাধ্যমটি হতে হয়েছিলো জাফর ইকবালের নিজেকেই। মুহম্মদ জাফর ইকবালের ব্যক্তিগত জীবন-এর ভয়ংকরতম অনুভূতির একটি ছিলো বাবা যে আর বেঁচে নেই তা মাকে বিশ্বাস করানোর জন্য কবর খুঁড়ে বাবার লাশ দেখানোর গুরুদায়িত্বটি পালন করা।

বাবার মৃত্যুতে ছয় ভাই-বোন আর মাকে নিয়ে শুরু হলো টানাপোড়েনের সংসার। সেসময়ে জীবনের যে কঠিন ও কঠোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিলো, সেই সম্পর্কে মুহম্মদ জাফর ইকবাল এর বই ‘রঙিন চশমা’তে তিনি নিজেই লিখেছেন। শহীদ পরিবার হিসেবে স্বাধীনতার পর থাকার জন্য একটি বাড়ি বরাদ্দ পেয়েছিলেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ফয়েজুর রহমান আহমেদ পরিবার। হঠাৎ করেই একদিন রক্ষিবাহিনী এসে তাদের উচ্ছেদ করে দেয় সেখান থেকে। আসবাবপত্রসহ সাত সদস্যের পরিবারটির ঠাঁই হয় রাস্তায়, খোলা আকাশের নিচে।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁর মা ও সাহিত্যিক সহোদরদের সাথে...
তিন কথা সাহিত্যিক সহোদর ও তাঁদের মা একই ফ্রেমে, বাম থেকে জাফর ইকবাল, আয়েশা ফয়েজ, হুমায়ুন আহমেদ ও আহসান হাবীব; Image Source: businessnews24.com

রঙিন চশমা বইতে মুহম্মদ জাফর ইকবাল এই ঘটনা সম্পর্কে লিখেছেন,

“আমরা রাস্তার মাঝখানে চেয়ার টেবিল পেতে বসে আছি। মাথার ওপর কোনো আশ্রয় নেই, তখন তাই ভেবেছিলাম। আসলে মাথার ওপর আশ্রয় ছিল আকাশ। একবার আকাশের আশ্রয়ে বেঁচে থাকা শিখে গেলে আর কিছু লাগে না। স্বাধীনতার পর সেই ভয়াবহ দুঃসময়ে আমরা টিকে গিয়েছিলাম শুধু এই একটি কারণে! আকাশের যে আশ্রয় সেটা কেউ কেড়ে নিতে পারে না!”

৩) মুহম্মদ জাফর ইকবালের শিক্ষাজীবন

বাবার চাকরির সুবাদে বাংলাদেশের নানা শহর, জেলার স্কুলে পড়ে শেষ করতে হয়েছিলো প্রাথমিক শিক্ষা। ১৯৬৮ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৭০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতক পাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে যান মুহম্মদ জাফর ইকবাল। সেখানে তার পিএইচডির বিষয় ছিলো, ‘Parity violation in Hydrogen Atom‘। এরপর বিখ্যাত ক্যালটেকে যান তাঁর ডক্টরেট উত্তর গবেষণা সম্পন্ন করতে। মুহম্মদ জাফর ইকবালের শিক্ষাজীবন এর নানারকম ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় তার স্মৃতিচারণমূলক বইগুলোতে। আর দশটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যবিত্ত ছাত্রের মতোই জীবন ছিলো আজকের বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবালের। তবে এর মাঝেও আছে চমৎকার সব মজার ঘটনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি ছুঁয়েছেন যখন তখন মাথার উপর বাবার ছায়া আর নেই। মা যে একা হাতে কীভাবে সংসার সামলাচ্ছিলেন তা ছিলো আয়েশা আকতারের সন্তানদের কাছে এক অজানা রহস্যের মতো। সেই সময় নিজেই কিছু উপার্জনের চিন্তা তাড়া করছিলো পদার্থবিজ্ঞানের চৌকষ ছাত্র মুহম্মদ জাফর ইকবালকেও। লোকচক্ষুর আড়ালে গিয়ে পড়িয়েছেন টিউশন, দিনের পর দিন পত্রিকা অফিস ঘুরে কার্টুন আঁকার কাজও পেয়েছিলেন। কার্টুন আঁকিয়ে নাম হিশেবে বেছে নিয়েছিলেন ‘বিচ্ছু’। মুহম্মদ জাফর ইকবালের আঁকা কার্টুন সেসময় ছাপা হতো তখনকার জনপ্রিয় পত্রিকা গণকন্ঠে। কার্টুন তখন যত না মনে আসা হাস্যরসবোধ থেকে এঁকেছেন, তার চেয়ে বেশি এঁকেছেন পারিশ্রমিকের জন্য। সামান্য কিছু পারিশ্রমিকের জন্য তখন সম্পাদকদের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে নিজেকেই একটা কার্টুন চরিত্র মনে হতো লেখকের। একবার একটা কার্টুন এঁকেছিলেন এমন– “একটা শাড়িকে দড়ি হিসেবে ব্যবহার করে একজন মানুষ গলায় দড়ি দিয়ে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছে, নিচে তার স্ত্রী হাউমাউ করে কাঁদছে আর বলছে, “ওগো” তুমি আমার এত দামি শাড়িটা এভাবে নষ্ট করলে!” (রঙিন চশমা)

মুহম্মদ জাফর ইকবাল এর ছাত্রজীবনে আঁকা কার্টুন
মুহম্মদ জাফর ইকবালের ছাত্রজীবনে আঁকা কার্টুন, ক্যাপশন তাঁরই দেওয়া; Image Source: campus2career24.com

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে হলজীবন আর হলের ক্যান্টিনের স্বাদও নিতে হয়েছিলো জাফর ইকবালকে। একদিন হলের ডাইনিংয়ে বন্ধুদের সাথে খেতে বসেছিলেন। সেদিনকার মেন্যু শিং মাছের একটির মাথা হাতে নিয়ে এক বন্ধু বলে উঠলো, “দেখো, মাছের মাথা থেকে বড়শিটাও খোলেনি।” এই বলে বন্ধুটি মাছের মাথা ফেলে দিতে গেলে তাকে থামিয়ে দেন জাফর ইকবাল। বলেন, “মাছ ধরতে নাকি টোপ হিসেবে কেচো ব্যবহার করে। দেখি তো কেঁচোটা ফেলতে মনে আছে কি না!” বলতে বলতেই মাছের মাথা থেকে বের করলেন মোটা একটা কেঁচো। এ দৃশ্য দেখে সবার খাওয়া বন্ধ হয় গেলো। মুহম্মদ জাফর ইকবাল কিন্তু খাওয়া বন্ধ করলেন না। বললেন, “বন্ধ করবো কেন? আমরা হলে থাকি তো!”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র থাকাকালে মুহম্মদ জাফর ইকবালের সবচেয়ে প্রিয় ক্লাসটি ছিলো প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস। একবার এক এক্সপেরিমেন্ট করার সময় সিলভার নাইট্রেটের দ্রবন এক ফোঁটা তাঁর হাতে পড়ে একটু কালচে মতো রং হলো। এই দাগ হয়তো কিছুদন স্থায়ী হবে ভেবে মুহম্মদ জাফর ইকবালের আঁকিয়ে সত্ত্বা তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। তিনি তখন সিলভার নাইট্রেট দিয়ে হাতে একটা মাছের ছবিই এঁকে ফেললেন যা দেখে লেখকের বন্ধুরা মুগ্ধ হয়ে গেলেন। কিন্তু কিছু পরেই লেখক আঁকানো ছবিটা জুড়ে যন্ত্রণা অনুভব করতে লাগলেন, যা ক্রমশ বাড়লো আর ফুলে যেতে লাগলো। সেরে যাওয়ার কোনো নামই ছিলো না, বরং দগদগে ঘা-তে পরিণত হলো। শেষপর্যন্ত লেখক মেডিকেলে ইমার্জেন্সিতে গেলেন। ডাক্তার দেখে তো অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে ছিলেন তাঁর দিকে, সব শুনে একটা ইনজেকশন দিয়ে বলেছিলেন, “ইনফেকশন হয়ে আপনি শকে চলে যেতে পারতেন, ভবিষ্যতে এমন পাগলামো করবেন না।” – (রঙিন চশমা)

মুহাম্মদ জাফর ইকবাল , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নকালীন ছবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নকালীন ছবি, ক্যাপশন মুহাম্মদ জাফর ইকবালের দেওয়া; Image Source: campus2career24.com

মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৯৮২ সালে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে ডক্টরোত্তর গবেষণাও শেষ করেন সাফল্যের সাথে।

৪) মুহম্মদ জাফর ইকবালের পারিবারিক জীবন

মুহম্মদ জাফর ইকবালের স্ত্রী ইয়াসমীন হকের সাথে পরিচয় ও বিয়ে নিয়ে প্রচলিত আছে মজার এক গল্প। বাসায় বইপত্র থাকার সুবাদে জাফর ইকবালের সব ভাইবোনই কম-বেশি হাত দেখার কায়দা শিখে গিয়েছিলেন। ভার্সিটিতে উঠে লেখকের খুব নাম-ডাক হয়ে গেলো এই হাত দেখার জন্য। তিনিও প্রত্যেকের হাত দেখা বাবদ এক প্যাকেট সিগারেট নির্ধারণ করে দিলেন। সেই নির্ধারিত এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে ক্লাসের প্রায় সবাই-ই হাত দেখিয়ে ফেললো মুহম্মদ জাফর ইকবালকে। শুধু ক্লাসের অতি আধুনিকা এক মেয়ে বাদ রয়ে গেলো। একদিন সেই মেয়েও সিগারেট হাতে চলে আসলো তাঁর কাছে হাত দেখাতে। লেখক সেই মেয়ের হাত দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, অনেক ধনী পাত্রের সাথে তার বিয়ে হবে।

এরপর ১৯৭৮ সালে আমেরিকায় অধ্যয়নকালে সহপাঠী ইয়াসমীন হকের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বিয়ের রাতে  লেখকের সহধর্মিনী লেখকের শার্টের কলার ধরে বলেছিলেন, “আমার নাকি খুব বড় লোকের সাথে বিয়ে হবে?” অথচ তখন লেখক বিয়ের খরচ মেটাতে স্ত্রীর কাছেই কিছু টাকাপয়সা ধার নিয়েছিলেন। এই ঘটনার পর লেখক আর কারো হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলতে যাননি কোনোদিন!

মুহম্মদ জাফর ইকবাল , স্ত্রী, পুত্র-কন্যাসহ এক ফ্রেমে
স্ত্রী, পুত্র-কন্যাসহ এক ফ্রেমে মুহম্মদ জাফর ইকবাল; Image Source: amadershomoy.com

বর্তমানে ইয়াসমীন হক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁদের দুই সন্তান ইয়েশিম ইকবালনাবিল ইকবাল। নাবিল ইকবাল যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করে পিএইচডি করছেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। ইয়েশিম ইকবাল কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেছেন এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে পিএইচডি করছেন। তিনি জাফর ইকবালের কিশোর উপন্যাস ‘আমার বন্ধু রাশেদ’কে ‘Rashed, My friend’ নামে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বেশ পরিচিতি লাভ করেছেন।

৫) মুহম্মদ জাফর ইকবালের কর্মজীবন

শিক্ষাজীবনে মুহম্মদ জাফর ইকবাল সবসময় যে অদম্য মেধার পরিচয় দিয়ে এসেছেন তা-ই যেন পথনির্দেশক হয়েছে তাঁর কর্মজীবনেও। ১৯৮৮ সালে তিনি বিখ্যাত বেল কমিউনিকেশন রিসার্চ (বেলকোর) এ গবেষক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু বরেণ্য এই গবেষক, বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিকের মনে কখনোই বিদেশের মাটিতে থিতু হওয়ার ভাবনা আসেনি। তাই ১৯৯৪ সালে বেলকোরে ইস্তফা দিয়ে চলে এলেন বাংলাদেশে। দেশে এসেই নতুন উদ্যমে শুরু হলো শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবালের কর্মজীবন। ১৯৯৪ সালেই তিনি সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিশেবে যোগদান করেন।

দেশে ফিরে তিনি দেশের তরুণ প্রজন্মকে যে অসাধারণ উপহারটি দিয়েছিলেন তা হলো জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াড এবং গণিতের প্রতি ভালোবাসা। ১৯৯৪ সালে দেশে ফিরেই গণিত অলিম্পিয়াডের আরেক আয়োজক মোহাম্মদ কায়কোবাদের সাথে শুরু করেন বাংলাদেশে গণিত অলিম্পিয়াডের যাত্রা শুরুর পরিকল্পনা। অনেক কাজেকর্মে সময় পার হয়ে যায় বেশ, তবে ভাটা পড়ে না মুহম্মদ জাফর ইকবালের উদ্যমে।

২০০১ সালে সবাইকে গণিত অলিম্পিয়াডের ধারণা দিতে জনপ্রিয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’তে গণিত সমস্যার মজার আয়োজন ‘নিউরণে অনুরণন’ শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ২০০৩ সালে আয়োজিত হয় প্রথম জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াড। তারপর? তারপর সেই যাত্রা আর থামেনি। ২০০৫ সাল থেকে জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াড থেকে নির্বাচিত দল বাংলাদেশের হয়ে অংশগ্রহণ করছে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে, নিয়মিত দেশের জন্য বয়ে আনছে অসাধারণ সব সম্মাননা।

৬) কথা সাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবাল

সাহিত্যমনা পরিবারের সেই সাত বছরের ছেলেটি, যে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লিখে ফেলেছিলো, তাঁর সাহিত্যজীবনের হাতেখড়ি তখন থেকেই ধরা যায়। বড়বেলায় তাঁর সাহিত্যজীবনের শুরুটা হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

৬.১) মুহম্মদ জাফর ইকবালের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী

সাপ্তাহিক বিচিত্রা প্রথম মুহম্মদ জাফর ইকবালের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীমূলক গল্প ‘কপোট্রনিক ভালোবাসা’ ছাপে। এটা পড়ে এক পাঠক সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এই লিখে চিঠি পাঠালেন যে, এটি রাশিয়ান কোনো এক গল্প থেকে চুরি করা। এর জবাবে মুহম্মদ জাফর ইকবাল ধারাবাহিকভাবে বিচিত্রায় এমন আরো কিছু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখেন, যার জন্য খোদ শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর গল্পগুলো পড়ে প্রশংসা করেন।

৬.২) প্রকাশিত প্রথম বই

এই গল্পগুলোই নিয়েই আমেরিকায় থাকাকালে প্রকাশিত হয় মুহম্মদ জাফর ইকবাল এর বই ‘কপোট্রনিক সুখ দুঃখ’। আমেরিকায় বসেই তিনি আরও বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ও উপন্যাস লেখেন। পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জগতে তিনি নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন এক অনতিক্রম্য উচ্চতায়। গ্লিনা, প্রজেক্ট আকাশলীন, সেরিনা, ক্রেনিয়াল, টুকুনজিল, কেপলার টুটুবি, ক্রোমিয়াম অরণ্য, প্রডিজি, অবনীল, জলমানব, নিঃসঙ্গ গ্রহচারী, অক্টোপাসের চোখ ইত্যাদি তার রচিত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী গ্রন্থ।

৬.৩) মুহম্মদ জাফর ইকবাল রচিত উপন্যাস সমূহ

মুহম্মদ জাফর ইকবাল রচিত প্রথম উপন্যাস ছিলো ‘আকাশ বাড়িয়ে দাও’। এছাড়াও মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাসসমূহ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিবর্ণ তুষার, কাচ সমুদ্র, সবুজ ভেলভেট, মহব্বত আলীর একদিন ইত্যাদি।

৬.৪) মুহম্মদ জাফর ইকবালের সৃষ্ট কিশোর সাহিত্য

মুহম্মদ জাফর ইকবালের সৃষ্ট কিশোর সাহিত্যগুলোই মূলত তাঁকে এদেশের সাহিত্যিকদের মাঝে নিয়ে গেছে অন্য এক অবস্থানে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হাতকাটা রবিন, জারুল চৌধুরীর মানিকজোড়, মেকু কাহিনী, শান্তা পরিবার, কাজলের দিনরাত্রি, টুনটুনি ও ছোটচাচ্চু, আমি তপু ইত্যাদি। তাঁর রচিত উপন্যাস ‘দীপু নাম্বার টু’ ও ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ অবলম্বনে চলচ্চিত্রও তৈরি করা হয়েছে।

৬.৫) অন্যান্য সাহিত্যকর্ম

মুহম্মদ জাফর ইকবালের সাহিত্যকর্ম এর মধ্যে আরও আছে ভ্রমণ ও স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ দেশের বাইরে দেশ, রঙিন চশমা, আধডজন স্কুল; এবং বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ক বই নিউরণে অনুরণন, গণিতের মজা মজার গণিত, বিগ ব্যাং থেকে হোমো স্যাপিয়েনস ইত্যাদি।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল এর চলচ্চিত্রায়িত দুটি উপন্যাসের পোস্টার
মুহম্মদ জাফর ইকবালের চলচ্চিত্রায়িত দুটি উপন্যাসের পোস্টার; Image Source: newsnarayanganj24.net

৭) পুরস্কার

সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলাদেশের জনপ্রিয় এই সাহিত্যিক পেয়েছেন অসংখ্য সাহিত্য পুরস্কার। ২০০৪ সালে সায়েন্স ফিকশনের জন্য বাংলা একাডেমি কর্তৃক মুহম্মদ জাফর ইকবাল সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও তিনি শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে ২০০৫ সালে মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার, ২০০২ সালে কাজী মাহবুবুল্লা জেবুন্নেছা পদক, ২০০৪ সালে ইউরো সাহিত্য পুরস্কার সহ অজস্র পুরস্কার লাভ করেন। উল্লেখযোগ্যভাবে তিনি ২০০৫ সালে মোহা. মুদাব্বর-হুসনে আরা সাহিত্য পদক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক সম্মাননা পদক, আমেরিকা অ্যালাম্নাই অ্যাসোসিয়েশন পদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালাম্নাই অ্যাসোসিয়েশন পদক লাভ করেন।

৮) মুহম্মদ জাফর ইকবালকে হত্যা প্রচেষ্টা

২০১৮ সালের মার্চ মাসের ৩ তারিখটি জনপ্রিয় এই লেখকের পাশাপাশি বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনের জন্যও একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। কারণ, সেদিন জনপ্রিয় এই লেখক নিজ কর্মস্থল শাবিপ্রবিতেই একটি প্রতিযোগিতার সমাপনী অনুষ্ঠানে থাকাকালে হামলার শিকার হন। হামলাকারী ফয়জুর রহমান ছুরির সাহায্যে ন্যাক্কারজনক এই ঘটনাটি ঘটাতে চেয়েছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্যদের সহায়তায় খুব দ্রুতই তাকে পাকড়াও করে ফেলা হয়। এ ঘটনায় সারা দেহে মোট ৩৮টি সেলাই নিয়ে অবশেষে বাড়ি ফেরেন জনপ্রিয় এই সাহিত্যিক।

অজস্র প্রতিকূলতার মোকাবিলা করেই এই দেশে বসবাস করছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল, লিখছেন কলাম, প্রকাশ করছেন বই। তাঁর এই নির্ভীক যাত্রা অবিরত থাকলেই বাংলাদেশ মেধাচর্চার একজন বটবৃক্ষের ছায়া পেতে থাকবে।

তথ্যসূত্রঃ

https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%B9%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%A6_%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%AB%E0%A6%B0_%E0%A6%87%E0%A6%95%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B2#cite_note-14

http://attoprokash.com/

https://www.boibazar.com/blog/public/article/%E0%A6%A1.-%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%B9%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%A6-%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%AB%E0%A6%B0-%E0%A6%87%E0%A6%95%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B2-:-%E0%A6%AC%E0%A7%88%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9E%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%95%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%80-%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%96%E0%A6%BE-%E0%A6%93-%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%A3%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A6%A5%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%83%E0%A7%8E

জাফর ইকবালের বইসমূহ 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article


Notice: Undefined offset: 3 in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-includes/class-wp-query.php on line 3300

Notice: Trying to get property 'ID' of non-object in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 30

Notice: Trying to get property 'ID' of non-object in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 31

Notice: Trying to access array offset on value of type bool in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 33
Rokomari-blog-Logo.png
Loading