কাফকা : নৈঃশব্দ্যের রাজ্য থেকে উঠে আসা শব্দের রাজকুমার

কাফকা

“আমার এক বন্ধু এক রাতে ফ্রানৎস কাফকা র ছোটগল্পের একটা বই আমাকে পড়তে দিয়েছিলো। আমি ‘মেটামরফোসিস’ পড়তে শুরু করি। প্রথম লাইনটি পড়ে আমি প্রায় বিছানা থেকে পড়ে যাই, এতটাই বিস্মিত হয়েছিলাম আমি। প্রথম লাইনটা ছিলো- “নানান অস্বস্তিকর স্বপ্ন দেখার পর এক সকালে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে গ্রেগর সামসা আবিষ্কার করলো, বিশাল এক পোকায় পরিণত হয়ে বিছানায় পড়ে আছে সে।“ এরকম কিছু একটা কেউ যে লিখতে পারে, জানতামই না আমি। জানলে আরও অনেক আগে থেকেই লেখা শুরু করতাম। ফলে, আমি তৎক্ষণাৎ ছোটগল্প লিখতে শুরু করলাম।“

কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ পড়ে এটাই ছিলো বহু সুসাহিত্যিকের প্রিয় সাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের প্রতিক্রিয়া। বলা যায়, মার্কেজ ছোটগল্প লিখতে শুরু করেন কাফকা পড়েই। মার্কেজ সেটা স্পষ্ট করেই বলেছেন। আসলে মার্কেজের এই উক্তিও এত বেশি চর্চিত হয়েছে যে, এখানে নতুন করে বলারও কিছু নেই। তবু কাফকার লেখার শক্তি বোঝাতে গিয়ে কাফকাপ্রেমীরা, এমনকি সমালোচকরাও মার্কেজের এই উক্তি বার বার টেনে আনেন।

বৃত্তবন্দী অথচ বৃত্তহীন কাফকা

কাফকার জন্ম ১৮৮৩ সালের ৩ জুলাই, প্রাগে। একটা মধ্যবিত্ত জার্মান-ইহুদি পরিবারে। ১৮৮০ সালের পর প্রাগের মাটিকে যারা সাংস্কৃতিকভাবে উর্বর করেছেন, সেই জার্মান-ইহুদি বৃত্তের লেখকদের মধ্যে সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ নাম ফ্রানৎস কাফকা; ‘বৃত্ত’ শব্দটি যার সঙ্গে একেবারেই মানানসই নয়—না তার লেখালেখির দিক থেকে, না জীবন-যাপনের দিক থেকে।

হ্যান্ডসাম কাফকা
হ্যান্ডসাম কাফকা

আসলে জীবন-যাপনের দিক থেকে কাফকা মূলত বৃত্তবন্দীই ছিলেন, কিন্তু ‘ছিলেন না’ এই মর্মে যে, সমসাময়িকদের মধ্যে অন্যরা যেমন জীবন যাপন করেছিলো বা করতে চেয়েছিলো, কাফকা মোটেই তেমন জীবন বেছে নেননি। আর ‘ছিলেন’ এই মর্মে যে, কাফকা একেবারেই তার নিজের মতোন নিরিবিলি অথচ প্রচন্ড অস্থির একটি জীবন কাটিয়েছিলেন।

জনসংযোগবিচ্ছিন্ন অস্থির জীবন

কাফকা এতোটাই নিরিবিলি থাকতেন যে, অনেক কাফকা-গবেষক আজকাল মনে করেন, কাফকা ‘SPD’-তে (schizoid personality disorder) আক্রান্ত ছিলেন (এই ডিজঅর্ডারে আক্রান্তরা সামাজিকতাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে একলা এবং বিচ্ছিন্ন জীবন-যাপনে বেশি আগ্রহী হয়। ) কাফকার এই বিচ্ছিন্নতাবাদীতার কারণেই হয়তো কোনো প্রেমই তাঁর টেকেনি, বিয়ে পর্যন্ত গড়ানো তো দূর অস্ত; যদিও ফেলিস নামের এক নারীর সঙ্গে তিনি দু’বার সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা যায়।

সত্যিই তো, কাফকার গোটা জীবন ঘেঁটেও তার পাঁচ জন অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধুর নাম বের করা যাবে না। বন্ধু বলতে ঐ ম্যাক্স ব্রড,যে মৃত্যুপথযাত্রী কাফকার সব লেখা পুড়িয়ে ফেলার আদেশ বা অনুরোধ উপেক্ষা করে একে একে সব ছেপে দিয়েছিলেন (ভাগ্যিস! এমন ‘প্রতারক’ বন্ধু ছিলেন ব্রড। তা না হলে কাফকার এমন ‘অসম্ভব রকমের সম্ভব’ মেধার সঙ্গে আমরা পরিচিত হতাম কী করে!)। আরেক জনের নাম করা যায়- কাফকার ছোট বোন ‘অটলা’। সে কাফকার বিচ্ছিন্নতাবাদী জীবনকে সমর্থন করে কাফকাকে ঘরে থাকতে সাহায্য করেছিলো। কাফকার জীবন সম্পর্কে বেশিরভাগ জানা যায় ব্রডের বক্তব্য, ব্রড ও কাফকার মধ্যে চালাচালি হওয়া চিঠি, কাফকার ব্যক্তিগত ডায়েরি আর বাবার কাছে লেখা তার ঐতিহাসিক চিঠি থেকে।

ভাল্লি, এল্লি, অটলা- কাফকার তিন বোন
ভাল্লি, এল্লি, অটলা- কাফকার তিন বোন

প্রত্যাশার চাপ, হতাশার শুরু

বাবা চেয়েছিলেন ছেলে নাম করবে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে কাফকার দুই ভাই তার বয়স ৭ বছর হওয়ার আগেই মরে গিয়েছিলো বলে কাফকাই হয়ে উঠেছিলেন বড় সন্তান। আর সবার বড় হিশেবে কাফকার ওপর এসে পড়েছিলো সীমাহীন প্রত্যাশার চাপ, বিশেষ করে তার বাবার দিক থেকে। বস্তুবাদী বাবা কাফকাকে বৈষয়িক দিক থেকে সফল দেখতে চেয়েছিলেন। কাফকার লেখালেখির ওপরও ছিলেন অসম্ভব বিরক্ত। বলা বাহুল্য, কাফকা পরিবারের দিক থেকে লেখালেখির ব্যাপারে তেমন সমর্থন পাননি। তবুও বাবার ইচ্ছা পূরণের জন্য আইনে পড়াশোনা করেছিলেন, যে বিষয় বা পেশার প্রতি আদৌ তার কোনো অনুরাগ ছিলো না। অন্যদিকে, কাফকার কাছে যা কিছু ছিলো ভালোবাসার, সেসবের কিছুই পরিবারে মূল্যায়িত হয়নি।

হারম্যান ও জুলি - কাফকার বাবা-মা
হারম্যান ও জুলি – কাফকার বাবা-মা

পিতার প্রতি চিঠি : অভিমান ও অভিযোগ

পিতার প্রতি কাফকার অসন্তোষ, অভিযোগ আর অভিমানের প্রবল বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ১৯১৯ সালের নভেম্বরে পিতার কাছে লেখা তার ৪৭ পৃষ্ঠার সেই চিঠিতে, যেটি পরবর্তীতে ‘Letter to His Father’ শিরোনামে বই আকারে প্রকাশিত হয়, যাতে কাফকার বেদনাময় শৈশবই চিত্রিত হয়েছে; অথচ যে চিঠি বাবার হাতে কখনো পৌঁছেনি। চিঠিটি তিনি বাবা হারম্যান কাফকার কাছে পোস্ট না করে তুলে দিয়েছিলেন মা জুলির হাতে। আশা ছিল মা তুলে দেবেন বাবার হাতে। কিন্তু তা না করে চিঠিটি তিনি কাফকাকেই ফেরত দিয়েছিলেন। কাফকার লেখার সঙ্গে যারা পরিচিত তারা জানেন, কাফকার লেখা কতটা রহস্য, আঁধার, মানসিক পীড়ন ধারণ করে। কাফকার লেখায়ও এমন বাবার চরিত্র পাওয়া যায়, যাতে অনেকটা কাফকার বাবার চরিত্রই প্রতিফলিত হয়।

বাবার কাছে লেখা কাফকার চিঠির প্রথম পৃষ্ঠা
বাবার কাছে লেখা কাফকার চিঠির প্রথম পৃষ্ঠা

বাবার নার্সিসিস্টিক, অতি শৃঙ্খল চরিত্রকে কাফকা চিঠিতে প্রকাশ করেছেন এভাবে-

“ The main thing was that the bread should be cut straight. But it didn’t matter that you did it with a knife dripping with gravy. Care had to be taken that no scraps fell on the floor. In the end it was under your chair that there were most scraps.”

বাবার আচরণ কিভাবে কাফকাকে আরও বেশি শামুকধর্মী, ভীত আর আত্মবিশ্বাসহীন করে তুলেছিলো তার প্রমাণ রয়েছে চিঠির এই অংশটুকুতে-

“[Your] frightful, hoarse undertone of anger and utter condemnation … only makes me tremble less today than in my childhood because the child’s exclusive sense of guilt has been partly replaced by insight into our helplessness, yours and mine.

The impossibility of getting on calmly together had one more result, actually a very natural one: I lost the capacity to talk. I dare say I would not have become a very eloquent person in any case, but I would, after all, have acquired the usual fluency of human language. But at a very early stage you forbade me to speak. Your threat, “Not a word of contradiction!” and the raised hand that accompanied it have been with me ever since. What I got from you — and you are, whenever it is a matter of your own affairs, an excellent talker — was a hesitant, stammering mode of speech, and even that was still too much for you, and finally I kept silent, at first perhaps out of defiance, and then because I could neither think nor speak in your presence. And because you were the person who really brought me up, this has had its repercussions throughout my life.”

কাফকার সৃজন

কাফকার সাহিত্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কাফকারই সেই ভীত, আত্মবিশ্বাসহীন, নিশ্চুপ আর বেদনাময় জীবনের ছবি। সবকিছু থেকে পালানোর একমাত্র পথ হিশেবে কাফকা বেছে নিয়েছিলেন তাঁর লেখালেখিকে। একের পর লিখেছেন ‘রূপান্তর’, ‘ধেয়ান’, ‘পুত্রেরা’, ‘এক গ্রাম্য ডাক্তার’, ‘এক অনশন শিল্পী’র মতো অসাধারণ কালোত্তীর্ণ সব গল্প। লিখেছেন ‘বিচার’, ‘দুর্গ’র মতো জটিল অথচ সমাজ, রাষ্ট্র ও জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় ঋদ্ধ সব উপন্যাস।

জীবন থেকে খুব বেশি দূর পালাতে পারেননি সত্যান্বেষী কাফকা। ১৯২৪ সালের ৩ জুন মাত্র ৪০ বছর বয়সে যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে কার্লিং-এ ডাক্তার হফম্যানের স্যানেটোরিয়ামে চিকিৎসায় থাকা অবস্থায় মারা যান কাফকা। তাঁর গলার অবস্থা এতোই খারাপ হয়ে গিয়েছিলো যে, কিছুই খেতে পারতেন না তিনি। না খেতে পারার কারণেই আরও শোচনীয় হয়ে যায় অবস্থা। উল্লেখ করার মতো তথ্য- কাফকা তাঁর ‘এক অনশন শিল্পী’ নামক গল্পটি মৃত্যুশয্যায় এডিট করে যান। প্রাগের ‘নিউ জিউয়িশ সিমেট্রিতে’ শায়িত আছেন এই মহান শব্দ-শিল্পী, যাঁর জীবনের সমস্ত খ্যাতি এসেছে মৃত্যুর পর। খ্যাতির দাসত্ব কাফকা করেনওনি, সেটা কে না জানে!

কাফকার বইগুলো দেখতে ক্লিক করুন

 

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading