শার্লক হোমস: এ যেন স্যার আর্থার কোনান ডয়েলেরই প্রতিচ্ছবি

images (8)

ধীর পায়ে বাবা-মার সামনে এসে দাঁড়ালেন সদ্য স্নাতক পাশ করা ডয়েল। আর পাঁচটা বাবা-মায়ের মতন তাঁরাও চান তাঁদের সন্তান যেন তাঁদেরই দেখানো পথে চলে। তাই তাঁদের আশা ছিল হয়তো বা ডয়েল আর্টসেই পড়াশোনা করবেন। কিন্তু ডয়েলের মনে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিন্তাভাবনা। আর্টসের চেয়ে তাঁকে চিকিৎসাবিজ্ঞানই বেশি আকর্ষিত করলো।

কৌতুহলী চোখ নতুন কিছু শেখার আগ্রহে চকচক করছে। ভর্তি হয়ে গেলেন এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্লাস করতেন আর অন্যমনস্ক হয়ে খাতার আশেপাশে টুকটাক আঁকিবুঁকি করতেন। কার জানি অবয়ব তুলে ধরার চেষ্টা করতেন খাতায়। এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর ড. জোসেফ বেল। এক আশ্চর্যজনক ক্ষমতা ছিল এই জোসেফ বেলের। রোগীকে দেখেই রোগ বলে দিতে পারতেন তিনি। তাঁর রুমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কোনান ডয়েল দেখলেন এক রোগী তাঁর কাছে রোগ নির্ণয়ের জন্য এসেছেন। ড. বেল না নিলেন তাঁর স্টেথোস্কোপ, না দেখলেন রোগীর প্রেশার। শুধুমাত্র রোগীর চোখের দিকে তাকিয়েই বলে দিলেন তার সমস্যাটা কী। একে বলে ‘ডিটেকশন’। তরুণ ডয়েলের মনে ব্যাপারটা বেশ ভালোমতো নাড়া দেয়। ড. বেলের পর্যবেক্ষণের গভীরতা তাঁকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে এর থেকে ডয়েল তাঁর বিখ্যাত কল্পিত গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমস তৈরি করার অনুপ্রেরণা পান।

এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহপাঠী এবং ভবিষ্যতের সহযোদ্ধা জেমস বারি এবং রবার্ট লুই স্টিভেনসনের সাথে দেখা করার সৌভাগ্যও ডয়েলের হয়েছিল। ওই সময়ই তিনি টুকটাক লেখালেখির সাথে যুক্ত হয়ে যান।

মেডিকেল স্কুলের তৃতীয় বর্ষ চলাকালীন তিনি আর্কটিক সার্কেলের উদ্দেশ্যে এক জাহাজে শিপ সার্জনের পোস্ট নেন। সেই সমুদ্রযাত্রা ডয়েলের সাহসিকতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, এটি এমন এক অনুভূতি যা তাঁকে গল্প লিখতে আরো উদ্বুদ্ধ করে।

ছয় ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা, চৌকো মুখমণ্ডল, মাথায় হ্যাট, পরনে লম্বা গাউন, ঠোঁটের এক কোনায় চুরুট। তিনিই হলে আমাদের শার্লক হোমস। তাঁর পুরো নাম ‘উইলিয়াম শার্লক স্কট হোমস।’ যদিও প্রথমে ভেবেছিলেন তাঁর সৃষ্টিকর্মের নাম রাখবেন ‘শেরিনফোর্ড হোমস’। পরে তা পরিবর্তন করা হয়। ডিডাকশানহোমস পদবীটি কোনান ডয়েল নিয়েছিলেন বিখ্যাত মার্কিন লেখক অলিভার ওয়েন্ডেল হোমসের নাম থেকে। আর শার্লক নামটি নেন তাঁর এক সতীর্থ ক্রিকেটারের নাম থেকে। স্যার আর্থার কোনান ডয়েল একজন প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটার হিসাবে মেরিলবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবে প্রায় ৭ বছর খেলছেন।

আমাদের এই প্রাইভেট গোয়েন্দা তাঁর মক্কেলকে দেখেই বলে দিতে পারেন তিনি ঠিক কোন পেশায় রয়েছেন। আবার সিঁড়িতে কারো জুতার শব্দ শুনেও তিনি বুঝতে পারতেন সেই মানুষটা ঠিক কী রকম বিপদে পড়েছেন। ইতিহাসের এক কালজয়ী চরিত্র। প্রফেসর বেলের চরিত্র দেখে অনুপ্রাণিত হলেও, শার্লক হোমসের মধ্যে যার ছায়া প্রকটভাবে দেখা যায়, তিনি হলেন স্যার আর্থার কোনান ডয়েল নিজেই। তাঁর প্রতিচ্ছবি হলো এই শার্লক হোমস। কারণ শার্লকের বাবার ইচ্ছে ছিলো শার্লক বড় হয়ে হবেন ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু শার্লক হয়ে গেলেন বিশ্বের একমাত্র কনসাল্টিং গোয়েন্দা।

অভিনব যুক্তি এবং বাঁধা ধরা নিয়মের বাইরে গিয়ে কাজ করে শার্লক হোমস। তাঁর সব কাজই ছিল বিজ্ঞানসম্মত। এমনকি সেই সময়ের চেয়ে অনেক আগানো ছিল তাঁর চিন্তাভাবনা। তাঁর দেখানো প্রক্রিয়াতেই এখন অপরাধী শনাক্ত করা হয়৷ অপরাধ যেখানে সংঘটিত হয়েছে, সেখানে যাওয়ার পর তিনি সবার আগে যেই কাজটা করেন, তা হলো গভীর পর্যবেক্ষণ। এমনকি তাঁর আইকিউ ১৯০, যা কীনা আইন্সটাইন থেকে বেশি!

স্যার আর্থার কোনান ডয়েল বহু গবেষণার মাধ্যমে উদঘাটিত তথ্য এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বাস্তব ঘটনার প্রেক্ষিতে রচিত করেছেন শার্লক হোমসের সব গল্প এবং উপন্যাস। আর এ কারণেই এর তাঁর কাজকর্ম, চিন্তনশৈলী, যুক্তি এবং দক্ষতায় বুঁদ হয়ে গেছে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ।

শুধু সাধারণ মানুষ না। ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়াও ছিলেন শার্লক হোমসের পাঁড় ভক্ত। একজন কাল্পনিক চরিত্র হওয়া স্বত্তেও শার্লক হোমসকে রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি থেকে ফেলোশিপের প্রস্তাব দেওয়া হয়! এর মূল কারণ হলো ডয়েল তাঁর কেসগুলোয় ফরেনসিক রিপোর্টের উপর বেশি জোর প্রদান করতেন। ফরেনসিক সায়েন্স এবং অ্যানালাইটিকাল কেমিস্ট্রিই ছিল তাঁর কেস সমাধানের মূল উপাদান। এই কারণেই তাঁকে ২০০২ সালে ফেলোশিপের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

তবে ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত হওয়া শার্লক হোমসের প্রথম উপন্যাস ‘আ স্টাডি ইন স্কারলেট‘ কিন্তু প্রথমেই মার খেয়েছিল। পাঠকদের মতে বইয়ের ছবিগুলো বেশ জঘন্য ছিল! মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই ছবিগুলো কোনান ডয়েলের বাবা মদ্যপ অবস্থায় এঁকেছিলেন!

শার্লককে নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাস কারো প্রশংসা না পেলেও, আরেক বিখ্যাত ঔপন্যাসিক অস্কার ওয়াইল্ড এক ডিনার পার্টিতে এর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। মূলত সে কারণেই শার্লককে নিয়ে তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাসটি লেখা। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শার্লক হোমসকে নিয়ে সব মিলিয়ে ৪টি উপন্যাস এবং ৫৬টি ছোটগল্প।

তবে একটা কথা না বললেই নয়, যেখানে আমাদের দেশের অধিকাংশ সন্তানই বিজ্ঞান বিভাগে না পড়ে কলা বিভাগে পড়তে চায়, সেখানে কোনান ডয়েল কলা বিভাগ ছেড়ে বিজ্ঞান বিভাগে চলে আসলেন! এদেশে থাকলে তাঁকে বোধহয় যোগ্য সন্তান হিসেবেই ধরা হতো…..

স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের সকল বই সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading