সুফিয়া কামাল, এক সাহসী কবি, লেখিকা, নারীবাদীর গল্প !

সুফিয়া কামাল

সুফিয়া কামাল, আজ বাংলার নারীরা যেটুকু এগিয়ে এসেছেন, যে দীপ্ত বাণীর চর্চা তারা করছেন, এর পেছনে যে মানুষগুলোর অনন্য অবদান রয়েছে- তাদেরই একজন। নারী হিসেবে শুধু এই মানুষটি নিজেকে তুলে ধরেননি। পিছিয়ে পরা পুরো নারী সমাজকে টেনে সামনে আনতে চেয়েছেন। কবিতার মাধ্যমে সাহস, আত্মবিশ্বাস আর ভালোবাসাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। কবি সুফিয়া কামালকেই আমরা বেশি চিনি। তবে শুধু কবিতা নয়, গদ্য, ছোটগল্প, ভ্রমণ কাহিনীতেও বাকিদের হার মানিয়েছেন এই নারী। সর্বমোট বিশটি বই লিখেছেন সুফিয়া কামাল। ‘অভিযাত্রিক’, ‘দিওয়ান’, ‘সাঁঝের মায়া’, ‘মায়া কাজল’, ‘কেয়ার কাঁটা’, ‘একাত্তরের ডায়েরি’ এমন মনে রাখার মতো কিছু লেখনী উপহার দিয়েছেন তিনি আমাদের। তবে সবার মনে আনন্দ ছড়িয়ে দিলেও সুফিয়া কামালের ছোটবেলাটা কেটেছে অনেকটা অনন্দহীনভাবেই। বরিশালের শায়েস্তাবাদে ১৯১১ সালের ২০শে জুন জন্ম নেন লেখক। বাবা সৈয়দ আবদুল বারী আর মা সৈয়দা সাবেরা খাতুনের ভালোবাসার মেয়েটি অবশ্য খুব দ্রুতই বুঝতে শুরু করে পৃথিবীটা খুব একটা সহজ স্থান নয়। উকিল বাবা সুফিয়া কামাল ছোট থাকতেই ঘর ছেড়ে চলে যান। সাধক হওয়ার ইচ্ছার কাছে তার পরিবারের প্রতি ভালোবাসা পরাজিত হয়। ফলে ছোটবেলা থেকেই মা সাবেরা খাতুনের সাথে নানার বাড়িতে একরকম অবহেলায় সময় কাটাতে হয় সুফিয়া কামালকে।

সুফিয়া কামালের বইয়ের কিছু অংশ পড়ে দেখতে এবং সংগ্রহ করতে 

 

সুফিয়া কামালের পরিবারে নারীরা সংসারের বাইরে পা রাখার অধিকার রাখেতো না। তবে মা মেয়েকে বাঁধা দেননি। মায়ের সাহায্যেই নিজে নিজে বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে পড়াশোনা চালু রাখেন সুফিয়া কামাল। এভাবেই হয়তো নিজে নিজে চলার পথ তৈরি করতেন সুফিয়া। হয়তো হতাশ হয়ে পরাজয় মেনে নিতেন। কিন্তু ১৯১৮ সালে ঘটে যাওয়া একটি ছোট্ট ঘটনা লেখকের জীবন আমূল পাল্টে দেয়। সেসময় কলকাতায় হুট করে তার দেখা হয়ে যায় নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সাথে। নিজের জীবনের অন্য এক মানে যেন খুঁজে পান সুফিয়া কামাল এই ঘটনার পর। সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ জন্মায়। কিন্তু এর মাঝেই আসে বাঁধা। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সাথে সুফিয়া কামালের বিয়ে হয়ে যায়। অবশ্য বিয়ের পর যেন এক অসম্ভবকে সম্ভব করার জানালা খুলে যায় বেগম সুফিয়া কামালের সামনে।  নেহাল হোসেন স্বামী হয়ে নয়, বন্ধু হয়ে সুফিয়া কামালকে সাহায্য করেন। পড়াশোনা, সাহিত্যচর্চা- সবকিছুতেই একটু একটু করে এগিয়ে যান লেখক।

১৯২৩ সালে স্বামীর উৎসাহে ‘সৈনিক বধূ’ নামে একটি গল্প লেখেন সুফিয়া কামাল। সেটা বরিশালের ‘তরুণ’ পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়। ১৯২৫ সালে মহাত্মা গান্ধীর সাথে কথা বলার সুযোগ পান সুফিয়া কামাল। এরপর তার লেখালেখি আর শুধু কাগজে আবদ্ধ ছিলো না। ‘মাতৃমঙ্গল’ নামে একটি কল্যাণমূলক সংগঠনের সাথে যুক্ত হন তিনি। নিজের সাথে অন্যান্য নারীদেরকেও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় নিয়োজিত সুফিয়া কামালের জীবনে আরো পরিবর্তন আনেন কাজী নজরুল ইসলাম। কবি সুফিয়া কামালের কবিতা তার খুব পছন্দ হয়। পরবর্তীতে এই উৎসাহেই ‘সওগাত’এ লেখা শুরু করেন লেখক। ১৯২৬ সালে তার এই সাহিত্যযাত্রা শুরু হয়। ১৯২৯ সালে ‘আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলাম’-এ যোগদান করেন কবি। তার বই প্রকাশিত হয় এরপর। শুধু তাই নয়, সুফিয়া কামালের ‘সাঁঝের মায়া’ বইটির প্রস্তাবনে লিখে দেন বিদ্রোহী কবি নিজে। কবির পরিচিতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এসময়েই একটি বড় ধাক্কা খান কবি নিজের জীবনে। ১৯৩২ সালে সবসময়ের সহযোগী নেহাল হোসেন মৃত্যুবরণ করেন। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে একেবারে একা হয়ে পড়েন সুফিয়া কামাল। শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। ১৯৪১ সাল অব্দি শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন তিনি। ১৯৩৯ সালে নিজেকে গুছিয়ে নেন সুফিয়া কামাল। বিয়ে করেন চট্টগ্রামের লেখক কামালউদ্দীন আহমদকে। নাম নেন- সুফিয়া কামাল। স্বামী কামালউদ্দীনকেও সবসময় নিজের পাশে পেয়েছেন লেখক। ১৯৪৬ সালে কলকাতার ধর্মীয় দাঙ্গা, ১৯৫২, ১৯৬১, ১৯৬৯- দেশের সমস্ত কাজে পাশে ছিলেন এই কবি। ‘কচিকাঁচার মেলা’, ‘সুলতানা’, ‘মহিলা সংসদ পরিষদ’ ইত্যাদি গঠিত হয় তার হাত ধরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের নাম তো শুনেছেন। এই নাম দেওয়ার জন্য আবেদন করেন সুফিয়া কামাল। সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলন পরিচালনা করেন রবীন্দ্রনাথের ৬১তম জন্ম শতবর্ষতে। বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক- এমন অনেক পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন সুফিয়া কামাল। তার লেখা অনুবাদ হয়ে নানা ভাষায়। ১৯৯৯ সালের ২০শে নভেম্বর আমাদের ছেড়ে চলে যান এই সাহসী নারী।  তার প্রতি সম্মান রেখে গুগল ডুডল সেজেছে বিশেষভাবে। আর সাধারণ মানুষ, তাদের মনে সুফিয়া কামাল বেঁচে থাকবেন আজীবন! 

আরও পড়ুন শুধু ছুটলে চলে না, থামতে হয় -অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

rokomari

rokomari

Published 29 Jan 2018
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png