তাঁদের বয়ানে হুমায়ূন আহমেদ এর গল্প

'হুমায়ূন আহমেদ'

হুমায়ূন আহমেদ । বাংলাসাহিত্যের জনপ্রিয় লেখকদের মধ্যে একজন।  ছিলেন ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার, চিত্রনাট্যকার ও চলচিত্রনির্মাতা। লেখক-জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তিনি নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও খুব সমাদৃত। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তিন শতাধিক। বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁকে সংলাপ্রধান নতুন শৈলীর জনক বলা হয়। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশ কিছু লেখা স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত। আজকের আয়োজনে থাকছে হুমায়ূন আহমেদের গল্প। তাঁরই কিছু ঘনিষ্ঠজন বিভিন্নসময় এসব গল্প স্মৃতিচারণ করেছেন। তাঁদের বয়ানে হুমায়ূন আহমেদ এর গল্পগুলো এখানে তুলে ধরা হলো-

এরোসল গিফট

অভিনেত্রী, মেহের আফরোজ শাওন, হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী

স্বভাবতই লেখকেরা একটু অন্যরকম হয়ে থাকেন। সাধারণ মানুষের সাথে তাঁদের পার্থক্যেরও অভাব নেই। অদ্ভুত ও উদ্ভট চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ান। অন্য এক জগতে ডুবে থাকেন। কিছুটা আনমনা, অগোছালো, উদাসীনতা, বেখেয়ালিপনাই যেন তাদের একান্ত কাছের বিশেষণ। এই নেতিবাচক বিশেষণগুলো তাঁরা তাঁদের উদ্ভট সুন্দর কাজ দিয়ে ইতিবাচক করে তোলেন। হুমায়ূন আহমেদ এমনই একজন ব্যক্তি।

তাঁর সাথে আমার প্রেম চলাকালীন সময়ের ঘটনা এটি। একাডেমিক পরীক্ষা চলছিল আমার। রাতে হুমায়ূন আহমেদ লিখতে বসে খেয়াল করলেন তাঁকে মশা কামড়াচ্ছে। তিনি ভাবলেন- শাওন পড়ছে। চেয়ারে বসে টেবিলের নিচে পা দুলিয়ে দুলিয়ে পড়ছে। নাহ্! পা দোলাচ্ছে না। নিশ্চয়ই পা স্থির রেখে মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। মশারা এই সুযোগটা মিস করবে না কোনোভাবেই। হয়তো শাওনের পায়ে এতক্ষণে চড়ুইভাতির আয়োজন করে ফেলেছে! শাওন ব্যথায় কাঁতরাচ্ছে। মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে তার।

মেহের আফরোজ শাওন
অভিনেত্রী, মেহের আফরোজ শাওন

পরেরদিনই হুমায়ূন আহমেদ আমার জন্য মশা নিধনের বিষ এরোসল গিফট করলেন। গিফট পেতে কার না ভালো লাগে? কিন্তু এরোসলও যে গিফট হতে পারে, তা আমার জানা ছিল না। এটি ছিল আমাকে দেওয়া হুমায়ূন আহমেদের প্রথম গিফট।

 ব্যাঙের ডাক

কার্টুনিস্ট, আহসান হাবীব, হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই।

বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ তখন আমেরিকায় পিএইচডি করতে গেছে। আমার মাকে চিঠি লিখে জানাল… শাহীন (আমার ডাক নাম) যেন ব্যাঙের ডাক রেকর্ড করে পাঠায় তাকে, সে বর্ষা কালের ব্যাঙের ডাক খুব মিস করছে। কী আর করার। বড় ভাইয়ের হুকুম। আমি আমার এক বন্ধুর রেকর্ডার নিয়ে বের হলাম ব্যাঙের ডাক রেকর্ড করতে। মুশকিল হচ্ছে তখনও বর্ষাকাল শুরুই হয়নি, ব্যাঙ কোথায় পাব। একজন বলল সংসদ চত্বরের ক্রিসেন্ট লেকে নাকি কিছু ব্যাঙ আছে তারা বর্ষাকাল ছাড়াও দয়া করে মাঝে মধ্যে ডাকে। একদিন সাত সকালে ক্রিসেন্ট লেকে গিয়ে হাজির হলাম ব্যাঙের ডাক রেকর্ড করতে।

কিন্তু রেড হ্যান্ড কট। পুলিশ ধরল আমাদের।

– এখানে কি হচ্ছে?

– ইয়ে ব্যাঙের ডাক রেকর্ড করছি। আমি বলি।

– মানে? পুলিশের ভ্রু কুচকে গেছে। ততক্ষণে আমার বন্ধু হাওয়া!

 

আহসান হাবীব
কার্টুনিস্ট, আহসান হাবীব

আমি ব্যাখ্যা করলাম আমার বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ সে একজন লেখক সে আমেরিকায় থাকে। তার বাংলাদেশের ব্যাঙের ডাক শোনার শখ হয়েছে। তাই ব্যাঙের ডাক রেকর্ড করে তাকে পাঠাব। শুনে পুলিশের ভ্রু যেন আরো কুচকে গেল! আমি নিশ্চিত সংসদ চত্বরে সন্দেহজনক আচরণের জন্য পুলিশ স্টেশনে নিয়ে গিয়ে আমাকে এখন ‘ডলা’ দেওয়া হবে। কিন্তু কি আর্শ্চয! পুলিশ বলল-

– এদিকে আসুন।

বলে ক্রিসেন্ট লেকের একটা কোনায় নিয়ে গেল। দেখি সত্যি সত্যি সেখানে বেশ কিছু ছোট বড় ব্যাঙ আয়েশ করে বসে আছে। তবে তারা ডাকছে না। পুলিশ বলল, অপেক্ষা করুন এরা একটু পরেই ডাক শুরু করবে। রেকর্ড করুন। আপনার নাম কি …?

নাম বললাম। পুলিশ অফিসার আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বিদায় নিলেন।

আমি পরে সাফল্যের সঙ্গে ব্যাঙের ডাক রেকর্ড করে বড় ভাইয়ের কাছে ক্যাসেট পাঠাতে পেরেছিলাম

পায়ে সাবান মাখা  

অভিনেতা, জাহিদ হাসান।

হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে একেক সময়ে একেক রকম সম্পর্ক ছিল।  কখনও পিতা-পুত্রের মতো, কখনও বন্ধুর মতো আবার কখনও বা বড় ভাই, ছোট ভাইয়ের মতো। ১৯৯৭-৯৮ সালের কথা। তখন আমরা সবুজছায়া নাটকটির শুটিং করছি গাজীপুরের হোতাপাড়ায়। রাতে সাপের প্রচণ্ড ভয়। হুমায়ূন ভাই বুদ্ধি দিলেন পায়ে লাইফবয় সাবান মেখে ঘুমাতে। পায়ে সাবান কেন? হুমায়ূন ভাই বললেন, ‘সাবানে কার্বলিক অ্যাসিড থাকে। পায়ে সাবান মাখলে সাপ আর ধারেরকাছে ঘেঁষবে না।’ যে-ই বুদ্ধি সে-ই কাজ। এবং বুদ্ধিটা বেশ কাজেও দিল। এক রাতে, রাত ১২টার দিকে হুমায়ূন ভাই জানতে চাইলেন, ‘এখন কী খেতে চাও?’ আমি বললাম, ‘আম।’ হুমায়ূন ভাই তাঁর এক সহকারীকে পাঠালেন গাজীপুরে। রাত পৌনে একটার দিকে তিনি আম নিয়ে এলেন। হুমায়ূন ভাই খুশি খুশি গলায় বললেন, ‘আসো, আম খাই।’

জাহিদ হাসান
অভিনেতা, জাহিদ হাসান।

স্বপ্ন পূরণ

অভিনেতা, এজাজুল ইসলাম।

হুমায়ূন আহমেদ স্যারের সঙ্গে শুটিং করতে গিয়েছিলাম বনুর গল্প নাটকের। এক বাসে আমরা সবাই। স্যার সামনের দিকে বসা, আমি পেছনে। কিছুক্ষণ পর স্যার আমাকে ডাকলেন, তাঁর পাশের সিটে বসতে বললেন। বসলাম। স্যার বললেন, ‘আমার খুব ইচ্ছা একটা সুন্দর বাগানবাড়ির। তোমাকে দায়িত্ব দিলাম, তুমি সব করবে।’ শুরু করলাম জায়গা খোঁজা। নির্ভেজাল জায়গা পাওয়া খুব কঠিন কাজ। অবশেষে বাড়ির জায়গা পেয়ে গেলাম। স্যারকে জানালাম। স্যার দেখতে এলেন। এত মুগ্ধ হতে স্যারকে আমি কখনো দেখিনি। পুরো জায়গা দেখার পর স্যার আমাকে কাছে ডাকলেন, পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘তুমি আমার জীবনের একটা বড় স্বপ্ন পূরণ করে দিলে।’ আমার চোখে তখন পানি।

নুহাশপল্লী হওয়ার পরে প্রথম ঘর বানানো হলো; বনের মাঝে কাঠের বাংলো। গভীর রাত পর্যন্ত সবাই জ্যোৎস্না দেখলাম। তারপর স্যার ঘুমাতে গেলেন। ঘরে যাওয়ার আগে আমাকে ডেকে বললেন, ‘ডাক্তার, ঘর তো একটা, তোমরা থাকবে কোথায়?’ আমি বললাম, ‘কোনো অসুবিধা হবে না, স্যার। আমরা থাকব এক জায়গায়।’ আকাশের নিচে, খোলা মাঠে শুয়ে পড়লাম আমরা। জ্যোৎস্না দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি, স্যার ঘরের বারান্দায় বসা। মহাবিরক্ত তিনি! কেন আমরা সারা রাত খোলা আকাশের নিচে থাকলাম।

এজাজুল ইসলাম
অভিনেতা, এজাজুল ইসলাম।

বই উৎসর্গ

অভিনেতা, ফারুক আহমেদ। 

হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে অনেক দিন ধরে কাজ করি। একদিন হঠাৎ মনে হলো- হুমায়ূন ভাই আমাকে কোনো বই উৎসর্গ করেননি। এই চিন্তাটা খুবই স্বাভাবিক ছিল। এমন যখন ভাবছি, তখন ফেব্রুয়ারি মাসে হঠাৎ একদিন স্বাধীন খসরু ফোন করলেন, ‘ফারুক ভাই, হুমায়ূন স্যার আপনাকে একটা চমৎকার বই উৎসর্গ করেছেন।’ কথাটা শুনেই আমি তুমুল রোমাঞ্চিত। খোঁজ নিয়ে দেখলাম হুমায়ূন ভাই আমাকে তাঁর লিলুয়া বাতাস বইটি উৎসর্গ করেছেন।

 লিলুয়া বাতাস
Buy now – লিলুয়া বাতাস ( হার্ডকভার )   

সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করলাম, হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করব। তখন তিনি দখিন হাওয়া বাসায় ছিলেন। কিন্তু তাঁর জন্য কী নিয়ে যাই! হুমায়ূন ভাইয়ের ডায়াবেটিস, মিষ্টি খাওয়া নিষেধ। তাই ফুল নিয়ে বিপুল উৎসাহে গেলাম দখিন হাওয়ায়। দোরঘণ্টি বাজালাম। হুমায়ূন ভাই দরজা খুললেন। আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, ‘ও, বই উৎসর্গ করেছি বলে ফুল নিয়ে এসেছ! জীবনে তো একটা ফুলের পাপড়িও দিলে না!’ আমি খুব বিব্রত। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম খানিকক্ষণ। হুমায়ূন ভাই শেষে বাসার ভেতরে ঢোকালেন আমাকে। হঠাৎ জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘তোমাকে আগেই একটা বই দেওয়া উচিত ছিল। যাক, এতদিন পরে খুব পছন্দের একটা বই দিতে পারলাম।’

ফারুখ আহমেদ
অভিনেতা, ফারুক আহমেদ। 

জিনের কেরামতি

শিল্পি, এস আই টুটুল।

আমার ভাই একদিন ফোন করে জানালেন, আমাদের কুষ্টিয়ায় দুজন লোকের সন্ধান পেয়েছেন। দুজনের সঙ্গেই নাকি জিন আছে। এবং জিনওয়ালা দুজন মানুষের হাত দেখে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারেন। বিনিময়ে কিছুই নেন না, শুধু পাঁচ কেজি গরুর মাংস রান্না করে খাওয়ালেই হয়। আমি এই ‘আবিষ্কারের’ কথা জানালাম হুমায়ূন আহমেদকে। স্যার বললেন, ‘ওদের আমার কাছে নিয়ে আসো।’ তথাস্তু, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে দুই গণককে নুহাশপল্লীতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলাম। নুহাশপল্লীতে গিয়ে আমার চক্ষু চড়কগাছ! প্রায় ৫০ জনের মতো অতিথি এসে বসে আছেন স্যারের নিমন্ত্রণে। তাঁরা সবাই গণকদ্বয়ের কেরামতি দেখতে উদগ্রীব!

কে নেই সেখানে! হুমায়ূন স্যারের আম্মা থেকে নায়ক রিয়াজ, নুহাশও এসেছে দেখলাম। আর আমাদের পরিচিতজনেরা তো ছিলেনই। স্যার এরই মধ্যে পাঁচ কেজি গরুর মাংস রাঁধিয়ে বসে আছেন। গণক দুজন আরাম করে খেল। খাওয়ার পরে সবাই বসেছি। গণকেরা বললেন, ‘ঘরের বাত্তি নেভান।’ বাতি নেভানো হলো। স্যার বললেন, ‘প্রথমে কে হাত দেখাবে?’ নায়ক রিয়াজ বললেন, ‘আমি।’ প্রথমজন রিয়াজের হাত পর্যবেক্ষণ শেষে দ্বিতীয়জন কী কী মন্ত্র আওড়ালেন। তারপর বললেন, ‘আপনি তো বিশাল বড় অফিসে কাজ করেন। আপনার আব্বা আজকে সকালে ৭০০ টাকা দিয়ে একটা বিরাট ইলিশ মাছ কিনেছেন। আপনার আম্মা তো বছর দুয়েক আগে ইন্তেকাল করেছেন। তিনি সবার কাছে দোয়াপ্রার্থী।’ সবার চোখে-মুখে বিস্ময়। রিয়াজের মা যে পাশেই বসা! এবং আগের কথাগুলোও পুরোপুরি ভুল। স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হুম!’ আমার এদিকে কালো ঘাম ছুটে যাচ্ছে! আমার মান-ইজ্জত আর রাখল না!

এস আই টুটুল
শিল্পি, এস আই টুটুল।

রিয়াজের পরে নুহাশের পালা। তার বেলায় তো আরেক কাঠি সরেস! নুহাশ নাকি ২৩ বছর বয়সে ডিগ্রি ‘পাস দিয়েছে’! খুব শিগগির ‘বিবাহ’ করতে যাচ্ছে। আমি তখন পালানোর রাস্তা খুঁজছি। স্যার ততক্ষণে খেপে টং! চিৎকার করে ধমক দিলেন দুই গণককে, ‘ভণ্ডামি করার জায়গা পাও না! পাঁচ কেজি মাংস খেতে চাও, খাও। তাই বলে এত বড় বাটপারি!’ গণকদ্বয়ের অবস্থা একেবারে নাজেহাল। ফাঁক বুঝে চম্পট দিল গুণধর গণকদ্বয়! অনেক কষ্টে তাদের খুঁজে বের করে দিলাম আচ্ছা বকুনি, ‘আমার মান-ইজ্জত কিছুই তো রাখলেন না!’ গণকদ্বয়ের উত্তর, ‘আমাদের কী দোষ! স্যারের কাছে একটা শক্তিশালী জিন আছে। ওই জিনের কারণে আমাদের জিনটা ঘরেই ঢুকতে পারে নাই, কেরামতি দেখাব কেমনে!’

লেখক হলেন প্রকাশক

ফরিদ আহমেদ, প্রকাশক, সময় প্রকাশনী

 হুমায়ূন আহমেদ সদলবলে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন। তাঁর ছোট গাড়িতে গাদাগাদি করে বসলেও পাঁচজনের বেশি বসা যায় না বলে তিনি একটা মাইক্রোবাস কিনে ফেললেন। আর কিনেই পুরো পরিবার নিয়ে ঢাকার বাইরে যাত্রা হলো শুরু। ১৯৯২ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ, ‘সময় প্রকাশন’-এর একটি উপন্যাস লেখা প্রায় শেষ পর্যায়ে। লেখা শেষ হওয়ার পরপরই বই দেখার জন্য অস্থির হয়ে যেতেন তিনি। আমরা যারা তখন হুমায়ূন আহমেদের নিয়মিত প্রকাশক ছিলাম, সবাই এটা মাথায় রেখেই বইয়ের কাজ করতাম। যখন যতটুকু লেখা শেষ হতো, ততটুকুই মেকআপ দিয়ে ফর্মা মিল করে প্রেসে পাঠিয়ে দেওয়া হতো ছাপার জন্য। বইয়ের প্রচ্ছদও অগ্রিম ছাপিয়ে রাখা হতো। অক্টোবরের শেষ দিন হুমায়ূন ভাই আমার হাতে জলপদ্ম বইয়ের শেষ অংশ এবং উৎসর্গ দিয়ে বললেন, ‘আমি যশোর যাচ্ছি। তুমি বই নিয়ে কাল আসো।’ যশোরে একটি বইমেলা শুরু হয়েছে ঢাকার প্রকাশকদের অংশগ্রহণে।

জলপদ্ম
Buy now – জলপদ্ম ( হার্ডকভার )

এক দিনের মধ্যে বইয়ের কাজ শেষ করে খুব ভোরে ১০০ বইয়ের বান্ডিল নিয়ে যশোরগামী বাসে উঠে বসলাম। দুপুরে যশোর পৌঁছে বইমেলায় চলে গেলাম। সেখানে বইয়ের বান্ডিল রেখে দুটি বই হাতে নিয়ে সার্কিট হাউসের দিকে রওনা হলাম। হুমায়ূন আহমেদের কক্ষে ঢুকে দেখি, স্বভাবসুলভভাবে তিনি খালি গায়ে একটা চেয়ারে বসে আছেন। ঘরের মেঝেতে এক ফুটফুটে শিশু খালি গায়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে। রুমে একটা কিছু কাজে ব্যস্ত হুমায়ূন-গিন্নি গুলতেকিন আহমেদ। আমি হুমায়ূন আহমেদের দিকে বই দুটি বাড়িয়ে দিলাম, বই দুটি হাতে নিয়ে হুমায়ূন ভাই আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। প্রতিবার নতুন বই হাতে নিয়ে এ রকম একটি অনুভূতি প্রকাশ করতেন তিনি।

যশোর থেকে ঢাকায় ফেরার পরদিন বিকেলে শহীদুল্লাহ হলের বাসায় গেলাম হুমায়ূন ভাইয়ের নতুন বইয়ের রয়্যালটি দিতে। তিনি আমাকে বললেন, ‘ফরিদ, ১৩ নভেম্বর আমার জন্মদিন। অনেক বছর পর আমার ছোট ভাই জাফর ইকবাল পরিবার নিয়ে দেশে আসছে। এ উপলক্ষে একটি বই বের করতে চাই। এক সপ্তাহ সময় আছে, তুমি পারবে তো? রয়্যালটি এখন দিতে হবে না। এই টাকা দিয়ে তুমি কাল কাগজ কিনো আর আজ রাতেই সমর মজুমদারের সঙ্গে দেখা করো। এই নাও বইয়ের নাম, একটা কভার বানাতে বলো খুব তাড়াতাড়ি; না, একটা না, দু-তিনটা ডিজাইন করতে বোলো। না থাক, তোমাকে একা যেতে হবে না। আমিও যাব।’

সন্ধ্যার পর আমার বাইকের পেছনে চেপে বসলেন হুমায়ূন ভাই। আমার বাইকে চড়ে হুমায়ূন ভাই সম্ভবত খুব মজা পেতেন। আমরা শিল্পী সমর মজুমদারের বাসায় এলাম। শিল্পীর কাছে তার তৈরি করা কী কী ডিজাইন আছে, সেগুলো দেখতে চাইলেন হুমায়ূন ভাই। সমরদা একের পর এক ডিজাইন দেখিয়ে চলেছেন আর হুমায়ূন ভাই ঘাড় নাড়ছেন। পরে সিদ্ধান্ত হলো সমরদা নতুন ডিজাইন বানাবেন। অনেকক্ষণ বসলাম আমরা, চা-সিগারেট পান করা হলো। ‘এখন উঠতে হয়।’ ওঠার সময় সমরদা বললেন, ‘হুমায়ূন ভাই, একটা ডিজাইন আপনাকে দেখাতে চাই। এটা আপনার বইয়ের জন্য নয়। আমি একটা ভিন্ন ধরনের ডিজাইন করেছি, তা-ই আপনাকে দেখাব।’ ডিজাইনটা হুমায়ূন ভাই হাতে নিলেন, একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর আমার হাতে ডিজাইনটা দিয়ে বললেন, ‘এটাই আমার পছন্দ। তুমি কাল প্রসেস করতে দিয়ে দাও। আর কাল বিকেলে কপি নিতে আসো।’

পরদিন বিকেল থেকে শুরু হলো নতুন বইয়ের কাজ। সকালে শহীদুল্লাহ হলের বাসায় গিয়ে কপি নিয়ে আসি আর রাতে সেই কপির প্রুফ দিয়ে আসি। বই প্রায় শেষ পর্যায়ে। একদিন সকালে বাসায় গেলাম। গুলতেকিন ভাবি দরজা খুলে আমার হাতে কয়েকটি কপি দিয়ে বললেন, ‘এগুলো কম্পোজে দিয়ে আপনাকে জামালপুর চলে যেতে বলেছে ও।’ আমি রওনা দিলাম জামালপুরের উদ্দেশে।

নানা ঘটনায় নির্দিষ্ট দিনে বইটি আর বের করা গেল না। আমার মন বেশ খারাপ। ১৩ নভেম্বর, ১৯৯২, বিকেলে হুমায়ূন ভাইয়ের বাসায় গেলাম কেক নিয়ে। একান্ত পারিবারিকভাবে হুমায়ূন ভাই জাফর ইকবালসহ সবাইকে নিয়ে জন্মদিন পালন করলেন। হুমায়ূন ভাই আমাকে পরদিন সকালে আসতে বললেন।

ফরিদ আহমেদ
প্রকাশক, ফরিদ আহমেদ ।

১৪ নভেম্বর খুব সকালে, হুমায়ূন ভাই আমার হাতে কিছু কপি দিয়ে বললেন, ‘তুমি কাজ শুরু করো, আমি ইউনিভার্সিটির ক্লাসটা নিয়ে আসছি। আজই বই শেষ করে দেব।’ আজিমপুর সুপার মার্কেটের ‘নূশা কম্পিউটার’-এ বইয়ের শেষ অংশের কাজ চলছে। তখন সকাল নয়টার দিকে আমার এক আত্মীয় সেখানে এল ভয়াবহ এক দুঃসংবাদ নিয়ে। কাল রাতে আমার আম্মা মারা গেছেন। আমার চোখ বুজে এলো, সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। আমি বাড়ি চলে এলাম। পরবর্তী চার দিন আমার আর কোনো কিছু মনে ছিল না। কুলখানি শেষে আবার রওনা দিলাম ঢাকার পথে। বাসে বসে মনে হলো, একটি বইয়ের কাজ করছিলাম আমি, বইটির কী হলো? হুমায়ূন ভাই নতুন বইয়ের মুখ দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছিলেন। তিনি কি জানেন আমি কোথায়? তাঁকে তো কোনো খবর দিতে পারিনি। নিশ্চয় লেখক রাগ করেছেন।

ঢাকা পৌঁছেই লেখকের বাসায় গেলাম। সন্ধ্যারাত, শহীদুল্লাহ হলের দ্বিতলের বাসার দরজা খুলল লেখকের বড় কন্যা নোভা। সে আমাকে বসতে বলে ভেতরে চলে গেল, একটু পর ফিরে এসে আমার সামনের টেবিলে একটা বই রেখে বলল, ‘বইটা দেখেন, ড্যাডি ক্লাবে গেছে, চলে আসবে, আপনি বসেন আঙ্কেল, আপনাকে চা দিতে বলি।’ আমার সামনে সমর মজুমদারের করা প্রচ্ছদে মোড়া হুমায়ূন আহমেদের আয়নাঘর বইটি দেখে আমি চমকে উঠলাম। এ কী? এই বই তো আমার প্রকাশ করার কথা! তবে কী…

পেছনের ঘটনা: সেদিন ইউনিভার্সিটির ক্লাস শেষে বাসায় এসে আমার জন্য অপেক্ষা করেছেন হুমায়ূন ভাই। পরে আমার খোঁজে আসেন নূশা কম্পিউটারে। সেখানে অপারেটরের কাছ থেকে শোনেন আমার দুঃসংবাদ। এরপর তিনি নিজেই কম্পিউটারের সামনে বসে অসমাপ্ত প্রুফ সংশোধন করে, বইয়ের ট্রেসিং অর্ডার দেন। যে প্রেসে কাগজ দেওয়া ছিল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বইটি ছাপার ও বাঁধাইয়ের ব্যবস্থা করেন। এভাবেই সময় প্রকাশন থেকে লেখক নিজে বের করেন হুমায়ূন আহমেদের ‘আয়নাঘর’।

 ভালবাসাই জীবন

আমি আর আমার স্ত্রী ইয়াসমিন যখন হুমায়ূন আহমেদের পাশে থাকার জন্য নিউ ইয়র্ক গিয়েছিলাম তখন একজন ছাত্রের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। সে হুমায়ূন আহমেদের সেবা করার জন্য তার কেবিনে বসে থাকত। শেষ কয়েক সপ্তাহ যখন তাকে অচেতন করে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হল তখনও এই ছেলেটি সারারাত হাসপাতালে থাকত। হুমায়ূন আহমেদ যখন আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তখনও সে আমাদের সঙ্গে ছিল। সেই দিন রাতে এক ধরনের ঘোরলাগা অবস্থায় আমরা যখন নিউ ইয়র্ক শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তখনও এই ছেলেটি নিঃশব্দে আমাদের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে গেছে।

দেশে ফিরে এসে মাঝেমধ্যে তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়। শেষবার যখন তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, সে বলেছে, এখনও মাঝেমধ্যে সে বেলভিউ হাসপাতালে গিয়ে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে বসে থাকে।

কেন বসে থাকে আমি জানি না। আমার ধারণা সে নিজেও জানে না। শুধু এইটুকু জানি, এই ধরনের অসংখ্য মানুষের ভালবাসা নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।

আমার মনে হয় এই ভালোবাসাটুকুই হচ্ছে জীবন।

মুহম্মদ জাফ ইকবাল, লেখক, হুমায়ূন আহমেদের মেঝো ভাই।

 হুমায়ূন আহমেদের সকল বই

Nasrin Akter

Nasrin Akter

Published 16 Jan 2020
  1      1
 

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png