তারকাদের চোখে হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ যা ছুঁতেন, তাই যেন স্বর্ণ হয়ে যেত৷ তাঁরই হাত ধরে বিনোদন জগতে এসেছেন অনেক তারকা। কাকে দিয়ে কী কাজ হবে সেটি উনি বুঝতেন। টিভি নাটকে তাঁর অবদান সবাই জানেন। তাঁর মাধ্যমে বেশকিছু গুণী শিল্পী অভিনয়ে নাম লেখান, যারা কখনোই অভিনয়ের সঙ্গে সম্পৃক্তই ছিলেন না। কেমন ছিলেন তাদের কাছে হুমায়ূন আহমেদ?

মনিরা মিঠু

হুমায়ূন আহমেদের খুঁজে পাওয়া নক্ষত্র ছিলেন চ্যালেঞ্জার, আর তারই ছোট বোন হলেন মনিরা মিঠু। একদিন হুমায়ূন আহমেদ চ্যালেঞ্জারকে ডেকে বললেন, “আমার তো কালকের মধ্যে একটা এক্সট্রা মেয়ে লাগবে যাকে জীবনেও কোনো দর্শক দেখেনি। তোমার অভিনয়ের ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকায়ও তুমি যেই প্রতিভা দেখালা, তোমার পরিবারে আর কেউ এমন নেই? তোমার বোন-টোন আছে?”

চ্যালেঞ্জার বললেন, “আমার ছোট বোন আছে স্যার। সে খুব লাজুক, কিন্তু আপনার বই পড়ে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারি।”

তখন ভাই এসে মনিরাকে বললেন, “তুমি কি হুমায়ূন আহমেদের ‘ওপেনটি বায়োস্কোপ’ নাটকে অভিনয় করবা? কাজের মেয়ের চরিত্রে? সেটা এক মিনিটের হতে পারে, দেড় মিনিটের হতে পারে। তুমি তিন ঘন্টা ভেবে আমাকে জানাও।”

তিনি ভাবলেন যে কখনো যেহেতু শুটিং দেখা হয়নি, এই সুযোগে একটু দেখেই আসি। যাওয়ার পরেই স্যার বললেন, “চ্যালেঞ্জারের যেই বোন এসেছে, তাকে দ্রুত একটা উগ্র বাজে  মেকাপ দাও তো।”

যখন মেকাপটা দিচ্ছে তখন চেহারার দিকে তাকিয়ে মনিরার কান্না পেয়ে গেল। কারণ ছোটবেলা থেকেই তিনি যেটুকু সাজগোজ করতেন, তার সাথে এইটা কোনোভাবেই যায় না। তখন শামীমা নাজনীন এসে বললেন, “আপু এই ডায়ালগটা একটু পড়ো তো।” ডায়ালগ পড়েই হেসে ফেললেন। যখন হুমায়ূন আহমেদ শামীমা নাজনীনকে জিজ্ঞেস করলেন যে কী অবস্থা নতুন অভিনেত্রীর, তিনি বললেন, “মনে হয় উনি পারবেন। কারণ তিনি ডায়ালগ দেখেই হেসে দিয়েছেন।”

চম্পা, আসাদুজ্জামান নূর এবং জাহিদ হাসানের সাথের সেই শটটায় প্রথম টেকেই ওকে হয়ে গেল। শট শেষে হুমায়ূন আহমেদ চ্যালেঞ্জারকে ডেকে বললেন,”তুমি কি আমাকে মিথ্যা কথা বলেছো? তোমার বোন তো মনে হয় অভিনয় করে।” এমনকি পরদিন তার অভিনয় দেখানোর জন্যই নুহাশসহ অনেককেই হুমায়ূন আহমেদ শুটিং সেটে নিয়ে আসেন।

হুমায়ূন আহমেদ সুযোগ পেলেই আশেপাশের মানুষদের চমকে দিতেন। মনিরা সেরকমই এক চমকের কথা বলেন, “একবার আমার জন্মদিনে নুহাশ পল্লীতে শুটিং করছিলাম। কীভাবে যেন স্যার বিষয়টি জানতে পারলেন। শীতের সন্ধ্যায় স্যার আমাকে বৃষ্টি বিলাসে ডাকলেন। গিয়ে দেখি পুরো মাটির দেয়ালে মোমবাতি জ্বালানো। সবাই চিৎকার করে আমাকে শুভেচ্ছা জানাল। তারপর স্যার শুটিং প্যাকআপ করে দেন। এটি এখন পর্যন্ত আমার জন্মদিনের সেরা সারপ্রাইজ।”

ফারুক আহমেদ

“মতি মিয়া নিজের ইচ্ছায় চলে, অন্যের ইচ্ছার ধার ধারে না”।

আজ রবিবার’ নাটকে তার সংলাপগুলো আজো মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। সোশ্যাল মিডিয়াতেই তার এসব ছবির দেখা মেলে অহরহ। এরকম আরো অসাধারণ কিছু সংলাপ আছে যা সাহিত্যের নিপূণ কারিগর হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টি। তবে এই সংলাপগুলো যিনি দর্শকের কাছে তুলে এর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছেন, তিনি বাংলা নাট্যঙ্গনের অন্যতম স্বনামধন্য অভিনেতা ফারুক আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদের সাথে কাজ করা তার প্রথম নাটক ছিল ‘অচীন বৃক্ষ’। এর মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন এবং তাঁর প্রায় সব নাটকেই তাকে দেখা যায়। তবে হুমায়ূন আহমেদের সাথে তার পরিচয় ১৯৭২ সাল থেকে। তাঁর ছোট ভাই আহসান হাবীব ছিলেন ফারুক আহমেদের সহপাঠী। তাঁরা থাকতেন মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে, আর তিনি ছিলেন হুমায়ূন রোডে। তাঁর কাছে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন বেশ গুরুগম্ভীর একজন মানুষ। কপটতা পছন্দ করতেন না। কাউকে কিছু বলতে চাইলে তা সরাসরি মুখের উপর বলে দিতেন। কিন্তু এই গুরুগম্ভীর মানুষটাই যখন জানতেন শুটিং ইউনিটের কারও জন্মদিন, তখন কাউকে পুরো বিষয় না জানিয়ে একজনকে ডেকে কেক নিয়ে আসার দায়িত্ব দিতেন। জন্মদিন উপলক্ষে কেক কাটা, গান-বাজনা সবই হতো, আর যার জন্মদিন, সেও খুশি হতো। এত অমায়িক ছিলেন তিনি। মানুষকে প্রচুর সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। অসুস্থ হয়েছে এমন কেউ কিংবা নাট্যাঙ্গনের কেউ বিপদে পড়লে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে কার্পণ্যবোধ করতেন না তিনি।

শামীমা নাজনীন

শামীমা নাজনীনের অভিনয় জীবন শুরু হুমায়ূন আহমেদর ‘সবুজ সাথী’ ধারাবাহিক নাটকে অভিনয়ের মধ্যদিয়ে। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রে সুবলের মা’র ভূমিকায় অভিনয় করে প্রশংসিত হন শামীমা নাজনীন। তার অভিনয় এখনো দর্শককে মুগ্ধ করে। এরপরে হুমায়ূন আহমেদের অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেন তিনি। তার অভিনয়ের ভিত্তি মূলত হুমায়ূন আহমেদই গড়ে দিয়েছিলেন। তিনি অভিনয়ে তার আজকের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট। আর তিনি যে অবস্থানে আছেন এবং তার অভিনয়ে ভালো করার নেপথ্যে পুরোপুরি অবদান হুমায়ূন আহমেদের। কারণ, তিনি আগে অভিনয়ের কিছুই জানতেন না। তারপরও তাঁর শেখানো কৌশলেই তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আজকের শামীমা নাজনীন হতে পেরেছেন, দর্শকের ভালোবাসা পাচ্ছেন। আজকের শামীমা নাজনীন হয়ে উঠার নেপথ্যে পুরো কৃতিত্বই তাঁর। তিনি তাকে ভীষণ স্নেহ করতেন, অনেক ভালোবাসতেন।

স্বাধীন খসরু

হুমায়ূন আহমেদের সান্নিধ্য লাভের জন্য মানুষ কত কিছুই না করতো। তবে স্বাধীন খসরু ব্রিটেনে থাকা বাদ দিয়ে তাঁর সাথে কাজ করতে চলে আসেন!

লন্ডনে লেখাপড়া, লন্ডনেই নাট্যচর্চা। ২০০২ সালের দিকে এক বন্ধুর মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদের সাথে তার পরিচয়। যার কারণে তাঁর নাটকের সাথে তিনি বেশ ভালোভাবেই জড়িয়ে পড়েন। পরিচয়ের পরই তাঁর পরিচালনায়  ‘যাত্রা’ নামক একটা নাটকে অভিনয় করার সুযোগ পান। কয়েকবছর বাংলাদেশে থেকে নাটক-সিনেমার কাজ করে আবারো ব্রিটেনে ফিরে যান।

২০০৪ সালের কথা। তখনো স্বাধীন খসরু বাংলাদেশে থিতু হওয়ার ব্যাপারে চিন্তা করেননি। এদিকে তখন হুমায়ূন আহমেদ তাঁর ধানমণ্ডির দক্ষিণ হাওয়া বাসায় একা থাকতেন। একদিন ফোন করে বলেন, “তুমি চলে আসো আমার বাসায়, এখানেই থাকো।” প্রথমে আসতে রাজি না হলেও পরে চলে গেলেন। প্রথম দিন সকাল ৭টায় ঘুম থেকে উঠেই দেখলেন হুমায়ূন আহমেদ তার দরজার সামনে এক কাপ চা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চা খাওয়া শেষে তিনি তাঁকে বললেন, “এবার তুমি আমার জন্য চা করে আনো। তোমার এখানে কোনো সমস্যা হবে না। আর বন্ধু-বান্ধব দেখা করতে আসলে তুমি তোমার রুমে আড্ডা দিও, সমস্যা নেই তো।” এতটাই অমায়িক ছিলেন তিনি৷

রমজান মাসে তিনি গ্রামের মানুষসহ নূহাশপল্লীতে ইফতার করতেন। আর শুটিং ইউনিটে কারও জন্মদিন থাকলে মজার মজার উপহার ও খাবারের ব্যবস্থা থাকত। যা হয়তো সেই ছেলে বা মেয়েটি কখনো ভাবতেই পারিনি যে তার জন্য এতো সব আয়োজন থাকবে।

তার মতে হুমায়ূন আহমেদ এতই খুঁতখুঁতে ছিলেন যে ‘নক্ষত্রের রাত’ এ একজন শিল্পীকে দিয়ে কাজ করানো শেষে নাটকটি আর ভালো না লাগায় ওই অভিনেতার বদলে আরেকজনকে দিয়ে পুরো কাজটা করিয়ে নেন! স্বাধীন খসরু এবং হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একে অপরের বন্ধু। বন্ধুত্বের প্রতিদান দিতে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর হিমু সিরিজের ‘সে আসে ধীরে’ বইটি তার নামে উৎসর্গ করেন।এক রাতে হুমায়ূন আহমেদ হার্ট অ্যাটার্ক করলেন। স্বাধীন খুব দ্রুত তাঁকে মিরপুর হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করালেন এবং সারা রাত তাঁর সাথেই ছিলেন। এরপর চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে চলে যাওয়ার আগে ‘সে আসে ধীরে’ বইটি স্বাধীন খসরুর নামে উৎসর্গ করে যান। এই কাণ্ড দেখে তিনি সাথে সাথে ফোন করলেন হুমায়ূন আহমেদকে। তিনি তাকে বললেন, “বোকা তোমার কাজ তুমি করেছো, আমার কাজ আমি করেছি।”

হুমায়ূন আহমেদের বই সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading